বাঙালি মুসলমানের উৎসব পার্বণ

গাজী তানজিয়া

প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:৩৫ পিএম

পার্বণ উৎসব। ছবি: সংগৃহীত

পার্বণ উৎসব। ছবি: সংগৃহীত

‘বাঙালি মুসলমান’ শব্দটি বাংলায় এত বেশি চর্চিত যে, প্রতিবার এর উচ্চারণে যেন মনে করিয়ে দেওয়া হয়-বাঙালি আদতে মুসলিম জাতি নয়। এই ধারণাটা উর্দুভাষী ভারতীয় মুসলিম থেকে পাকিস্তানি সবারই ছিল। তাই জাতিগত কারণে না হলেও সাম্প্রদায়িক কারণে অনেক বাঙালি মুসলমান সংশয়ে ভুগেছেন।

এ প্রসঙ্গে বদরুদ্দীন উমর ১৯ শতকের বাঙালি মুসলমান সম্পর্কে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের শিক্ষিত মুসলমানেরা অনেক ক্ষেত্রে নিজেদেরকে বাঙালী বলে পরিচয় দিতে দ্বিধা এবং সঙ্কোচ বোধ করতেন। এই দ্বিধা এবং সঙ্কোচের উৎপত্তি সাম্প্রদায়িকতা। সাম্প্রদায়িকতার জন্যই বাংলার সাধারণ সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে মুসলমানেরা নিজেদের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য বলে স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিলেন না।’ (সংস্কৃতির সংকট, বদরুদ্দীন উমর)।

বাঙালি জাতির আছে হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য। অথচ বাঙালি সংস্কৃতি বললে অনেকেই ভাবেন এটা হিন্দু সংস্কৃতি। বাঙালি সংস্কৃতি কি আদতেই হিন্দু সংস্কৃতি? বাঙালির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় এটা মূলত এক সংকর জাতি। 

আবহমান বাংলার কৃষ্টি বিভিন্ন বহিরাগত সংস্কৃতির মিশ্রণে তৈরি হয়ে এসেছে। বাঙালি কখনো মেনে নিয়েছে, কখনো বর্জন করেছে, আবার অনেক কিছু বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গিয়েছে। সবকিছুই কাল ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে শত শত বছর ধরে বাঙালি মুসলিম নামে একটি জাতির আবির্ভাব হয়েছে। এরা সবাই যে ধর্মান্তরিত এ কথা মেনে নেওয়ার বিশেষ কারণ নেই। কারণ মুসলমান রাজারা বহু শতক ধরে বাংলা শাসন করেছেন, কিন্তু তারা কখনোই হিন্দু উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে ধর্মান্তর করার চেষ্টাও করেননি। মুসলমান শাসকদের সেনাবাহিনী বা রাজসভায় পদাধিকারী হিসেবে কাজ করার জন্য হিন্দুদের ধর্ম ত্যাগ করার প্রয়োজন হয়নি। 

এ ক্ষেত্রে মুঘল সেনাবাহিনীতে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের চমৎকার সব বর্ণনা পাওয়া যায়। দেখা যায় মুসলমান অধিকারীকেরা আল্লাহর নামে শপথ নিচ্ছেন আর হিন্দুরা বিষ্ণুর নামে। 

বাঙালি সংস্কৃতিতে হিন্দু-মুসলমান যোগাযোগের ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা করতেন ক্ষিতিমোহন সেন। তার মতে, ধর্মীয় বহুত্বের স্বীকৃতি ছিল সাধারণভাবে মুঘলদের ঘোষিত নীতি। ষোড়শ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে সম্রাট আকবরের হাত ধরে যার সূচনা। রোমের কম্পো দ্য ফিয়োরিতে জোর্দানো ব্রুনোকে যখন ধর্মদ্রোহের অপরাধে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, আকবর তখন আগ্রায় ধর্মীয় সহিষ্ণুতা গুরুত্ব বিষয়ে বক্তৃতা দিচ্ছেন। 


ক্ষিতিমোহন সেন বাঙালি সংস্কৃতিতে হিন্দু-মুসলমান যোগাযোগের ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা করতেন, তাই হিন্দু ইতিহাসবিদরা মুঘল শাসনের শেষ পর্যায়ে, বিশেষত সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলের ‘সাম্প্রদায়িক চরিত্র’ নিয়ে যেসব কঠোর সমালোচনায় মেতেছিলেন, তার এক শতক পরে ক্ষিতিমোহন সেন এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাকে ‘কল্পিত ইতিহাস’ বলে চিহ্নিত করেছেন। চল্লিশের সেই সংঘাতময় সময়ে ‘ভারতের হিন্দু মুসলমানের যুক্ত সাধনা’ বইয়ে তিনি যে কেবল সাম্প্রদায়িক হিংসার সংগঠিত প্ররোচনার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিলেন তাই নয়, অভিজাত বুদ্ধিজীবীরা হিন্দু ও মুসলমানদের বিচ্ছিন্নতাবাদী ইতিহাস রচনাকে যে অগ্রাধিকার দিচ্ছিলেন, তার বিরোধিতা করেছিলেন। এই রচনায় ভারতের হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে আদান-প্রদান কতটা ব্যাপক এবং সৃজনশীল ছিল তার বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন। (অমর্ত্য সেন; জগৎ কুটির, আনন্দ পাবলিশার্স ২০২১)।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় যে, কলকাতার বাঙালিরা নিজেদেরকে প্রকৃত বাঙালি বলে এক ধরনের আত্মগরিমায় ভুগলেও, বাংলা ভাষাটা ১৯৫২ সালের পর থেকে বাংলাদেশের বাঙালিদের পেটেন্ট সম্পদ। 

বাংলাদেশের জনগণের কাছে ধর্মীয় উৎসব বাদে জাতীয় উৎসব হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারি, ষোলোই ডিসেম্বর, ছাব্বিশে মার্চ আছে, পাশাপাশি সংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে বসন্ত উৎসব ও পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে এসেছে। 

বাংলা সন গণনার পেছনে যদিও সম্রাট আকবরের রাজসভার কিছু প্রভাব রয়েছে। তবে বর্তমান সময়ে এসে সে বিষয়টি খুব তাৎপর্যপূর্ণ কিছু নয়। এটা বাঙালির একান্ত নিজস্ব একটি উৎসব হিসেবেই পালিত হয়ে আসছে। সম্রাট আকবর প্রবর্তিত ক্যালেন্ডারটি বাঙালির (হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে) মধ্যে কোনো প্রতিবন্ধকতা কখনো তৈরি করেনি। এর পেছনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল সম্রাট আকবরের উদার অসাম্প্রদায়িক নীতি। সম্রাট আকবর সর্বভারতীয় একটি ক্যালেন্ডার ‘তারিখ-ই-ইলাহী’ প্রবর্তনের প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছিলেন। ষোড়শ শতকের শেষ দিকে, মুসলমান চন্দ্র ক্যালেন্ডার হিজরির প্রথম সহস্রাব্দ যখন শেষ হচ্ছে, আকবর তখন ভারতের জন্য এমন এক দিনপঞ্জির পরিকল্পনা করেছিলেন, যেখানে ছিল বহু সংস্কৃতির মেলবন্ধনের ছাপ। আকবরের প্রচুর আশা থাকলেও, দিল্লি বা আগ্রায় তারিখ-ই-ইলাহী প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি, তা কেবল চালু হয়েছিল আকবরের রাজসভায়। আকবরের পরে ‘তারিখ-ই-ইলাহী’ আর টিকে না থাকলেও টিকে আছে বঙ্গাব্দ। 

সংস্কৃতি মূলত একটি প্রবহমান নদীর মতো। প্রতিনিয়ত এখানে সংযোজন বিয়োজন ঘটে। তাই ৬০ বা ৯০ দশকের বাঙালির সঙ্গে এখনকার বাঙালি মুসলমানের বিস্তর ফারাক। গ্লোবালাইজেশনের যুগে পৃথিবী যখন এক তুড়িতে হাতের নাগালে তখন ধর্মীয় সংস্কৃতিতেও খুব দ্রুত পরিবর্তন ঘটে যায়। মুক্তবাজার অর্থনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার বাঙালি মুসলমানের আচার আচরণ ও পোশাক আশাকে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। হয়তো কিছু পরিবর্তন ঘটেছে তার মনোবৃত্তিতেও। দীর্ঘদিন ধরে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণ অগণতান্ত্রিক রাজনীতি, নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বৈষম্যমূলক অর্থনীতির জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতে অনেকটা আত্মকেন্দ্রিক জনগোষ্ঠীতে পর্যবসিত হতে চলছে। এখানে উদারতার তুলনায় স্বার্থপরতা, পরস্পর বিদ্বেষ যেন আজ প্রধান হয়ে দেখা দিয়েছে। 

পৃথিবীতে যুগে যুগে ধর্মকে কেন্দ্র করে যে উন্মত্ত তৎপরতার প্রসার ঘটেছে, তার গোড়াতে রয়েছে ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির কুটিল হাত। যার ওপর ভর করে সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের প্রসার ঘটে দিকে দিকে। তবে কি দীর্ঘ অগণতান্ত্রিক পরিবেশ, সম্পদের সীমাহীন বৈষম্য মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপর করে তুলেছে! তাই আমাদের ভেতরে এত অসহনীয়তা এত ভেদাভেদ তৈরি হতে দেখা যাচ্ছে! তাই তো আজ আমরা ধর্মীয় উৎসব ছাড়াও কোনো এক সর্বজনীন উৎসবেও নিজেকে লীন ভাবতে কুণ্ঠা বোধ করি। পরস্পরের প্রতি ঘৃণা বিদ্বেষ জাগিয়ে রেখে আজ আমরা নিঃস্ব হতে চলেছি। যেখানে আমাদের উৎসব থাকবে না, থাকবে বেদনা, উল্লাস পরিণত হবে আর্তনাদে। অথচ বাংলার ইতিহাস মূলত ঐক্যের ইতিহাস। ধর্মীয় বিভাজন ও সংস্কৃতি বিচ্ছিন্নতার নয়। সেই বোঝাপড়াই যূথবদ্ধ ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশকে সম্ভব করেছিল, তার উত্তরণ ঘটিয়েছে, এবং তাকে দান করেছে বিশ্বের সঙ্গে নিজের মতো করে যুঝে নেওয়ার শক্তিও। তাই শত প্রতিকূলতার মাঝেও বাঙালি মুসলমান আজও তার অতীত ঐতিহ্য অনুসারে পরমতসহিষ্ণু উদার মনোবৃত্তি ধরে রাখুক, এটাই শুধু কাম্য।

সম্পাদক ও প্রকাশক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh