একাত্তরের গুলির চিহ্ন আজও শুভপুর সেতুতে

বখতিয়ার আবিদ

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৪, ০৪:৪৭ পিএম | আপডেট: ১১ মে ২০২৪, ০৭:০৬ পিএম

শুভপুর সেতুর যুদ্ধে শহীদ দুই মুক্তিযোদ্ধার জোড় কবর। ছবি: সাম্প্রতিক দেশকাল

শুভপুর সেতুর যুদ্ধে শহীদ দুই মুক্তিযোদ্ধার জোড় কবর। ছবি: সাম্প্রতিক দেশকাল

১৯৭১ সালে মার্চের শুরু থেকে সারা দেশের মতো চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার করেরহাট ইউনিয়নের মানুষের মাঝেও উৎকণ্ঠা আর উত্তেজনার পারদ চড়তে থাকে। থেকে থেকে বিক্ষিপ্তভাবে রাজধানী ঢাকার উত্তাল পরিস্থিতির খবর পেতে থাকে করের হাটের মানুষ। এলাকার পরিবেশ থমথমে হয়ে যায়। স্থানীয় তরুণরা সংগঠিত হতে শুরু করে, সঙ্গে যুক্ত হয় নানা বয়সের মানুষ। 

ভৌগোলিক অবস্থানের দিক দিয়ে করেরহাট ইউনিয়ন ও শুভপুর সেতুটি কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল সে সময়। করেরহাটের উত্তর প্রান্তে বয়ে চলা ফেনী নদী চট্টগ্রাম জেলা ও ফেনী মহকুমাকে দুদিকে রেখে বঙ্গোপসাগরের দিকে চলে গেছে। আর শুভপুর সেতুটি সড়কপথে এ দুই জনপদকে যুক্ত করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে টিকে রয়েছে। এর কয়েক কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্ত। আর একেবারে পূর্বদিকে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল।

২৫ মার্চ কালরাত্রিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ভয়ঙ্কর হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে সেই খবর খুব স্বল্প সময়ে করেরহাটের মানুষের কাছে এসে পৌঁছায়। স্থানীয় মানুষজন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন শুভপুর সেতুকে যে কোনোভাবে ধ্বংস করে দিতে হবে, যাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নদী পেরিয়ে চট্টগ্রামের দিকে ঢুকতে না পারে। সে রাতেই তৎকালীন ন্যাপের (ভাসানী) স্থানীয় নেতা ওবায়দুল হক খন্দকার এবং ১৯৭০-এর নির্বাচনে মিরসরাই থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সে সময়কার প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে করেরহাটের অগণিত মানুষ শুভপুর সেতু ভাঙতে এগিয়ে আসেন। সেতুটির মূল কাঠামো স্টিলের হলেও পাটাতন ছিল কাঠের। উত্তেজিত জনতা করেরহাট বাজার থেকে কেরোসিন তেল ও বিটুমিন এনে তাতে আগুন ধরিয়ে দেন। তবে সেতুটি পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি, তবু যতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বেশ বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিল পরবর্তীকালে। ২৫ মার্চের পর কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শুভপুর সেতুর পাটাতনে মোটা তারের নেট বিছিয়ে পার হয়ে যায়। এবং এক সেকশন সেনা রেখে যায় সেতুটির পাহারায়। এ সেতু নিজেদের দখলে রাখতে মুক্তিবাহিনী ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মধ্যে চারবার বড় ধরনের যুদ্ধ হয়। 

প্রথম যুদ্ধটি হয়েছিল ২৯ মার্চ। সেদিন করেরহাট হাইস্কুলে আয়োজিত একটি সভায় ন্যাপ (ভাসানী) নেতা ওবায়দুল হক খন্দকারের ডাকে স্থানীয় তরুণ ও পশ্চিম আলিনগর বিওপি ক্যাম্পের ইপিআর সদস্যরা শুভপুর সেতুতে পাহারারত পাকিস্তানি সৈনিকদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করে। কিন্তু পাকিস্তানি সৈনিকদের ভারী অস্ত্রের মুখে টিকতে না পেরে তারা পিছু হটেন। ৩১ মার্চ দ্বিতীয় যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা প্রথম সাফল্য পান। হাবিলদার মইনের নেতৃত্বে এই যুদ্ধে ৭ জন পাকিস্তানি সৈনিক মারা যায় এবং পালিয়ে যাওয়ার সময় সাধারণ জনগণের গণধোলাইতে আরও একজন মারা যায়। এ যুদ্ধে তিন জন মুক্তিযোদ্ধা ইপিআর শহীদ হন। তাদের মধ্যে দুজনকে করেরহাট বাজারের নিকটে একটি মসজিদের পাশে একই কবরে সমাহিত করা হয়, যা স্থানীয়ভাবে আজও জোড় কবর নামে পরিচিত। একজনের বাড়ি ফরিদপুর জানা গেলেও অপরজনের বাড়ি কোথায় ছিল তা জানা যায়নি এবং তাদের কোনো স্বজন আজ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি। এরপর ভিন্ন ভিন্ন সময় এই সেতুর দখল নিয়ে মুক্তিবাহিনী ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মধ্যে আরও দুটি যুদ্ধ হয়েছিল, যার চিহ্ন সেতুটি আজও বহন করে চলছে। 

সেতুটির করেরহাট অংশের পূর্ব পাশে এখনো গুলির দাগ স্পষ্ট। বেশ কয়েকটি বুলেট সেতুর পুরু স্টিল ভেদ করে চলে যাওয়ার চিহ্নও রয়েছে। সব শেষে ৬ ডিসেম্বর ফেনী মুক্ত করে মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়ক ধরে এগিয়ে ৯ ডিসেম্বর শুভপুর সেতু মুক্ত করেন। মুক্তিযোদ্ধা কাজী মহসিন জানালেন, ‘বীর উত্তম ক্যাপ্টেন কাদের এই শুভপুর সেতুর একটি যুদ্ধে পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন, আমরা তাকে উদ্ধার করে প্রাথমিকভাবে একটি মাচার ওপর শুইয়ে রেখেছিলাম। এই শুভপুর সেতুটি প্রথমে ওবায়েদ বলীরা (ওবায়দুল হক খন্দকার) ভেঙে দিয়েছিলেন, আমাদের চাক্ষুষ দেখা।’

সম্পাদক ও প্রকাশক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh