রাজিয়া বানু: সংবিধান প্রণয়ন কমিটির একমাত্র নারী

আমীন আল রশীদ

প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৪, ০৮:২১ পিএম

রাজিয়া বানু। ছবি: সংগৃহীত

রাজিয়া বানু। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির একমাত্র নারী সদস্য রাজিয়া বানু। তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নাতনি। যখন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের প্রক্রিয়া চলছিল, তার স্বামী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান তখন সংসদ বিষয়ক সচিব। 

রাজিয়া বানুর জন্ম কলকাতায় ১৯২৬ সালের ২৪ জুন। মা নাফিসা বেগম। বাবা প্রথম বাঙালি মুসলমান এসডিও এএইচএম ওয়াজীর আলী ছিলেন শেরে বাংলার ভাগ্নে ও জামাতা। 

রাজিয়া বানুর লেখাপড়া শুরু কলকাতায়। সেখানে লেডি ব্রেবর্ন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর আশুতোষ কলেজ থেকে বি.এ অনার্স পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। বিয়ের পরও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সংসার সামলাতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে ভর্তি হলেও শেষ করতে পারেননি।

রাজিয়া বানু যখন রাজনীতিতে আসেন, তখন বয়স ২৬ বছর। ২৮ বছর বয়সে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তিনি পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পার্লামেন্টে তিনি কৃষক শ্রমিক পার্টির সদস্য ছিলেন। এ সময় তিনি শিক্ষা দপ্তরের পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। 

১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি জাতীয় পরিষদে নারী আসনের সদস্য নির্বাচিত হন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল সংবিধানের খসড়া প্রণয়নের জন্য যে ৩৪ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয় রাজিয়া বানু ছিলেন সেই কমিটির একমাত্র নারী সদস্য। 

গণপরিষদে খসড়া সংবিধানের ওপর দেওয়া বক্তৃতায় তিনি নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রসঙ্গে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপন করেন। বলেন, ‘সংবিধানে লেখা আছে যে, নারীরা সমান অধিকার ভোগ করবে। কিন্তু ধর্মের অজুহাতে, কোরআন-সুন্নাহর অজুহাতে তারা সমান অধিকার ভোগ করতে পারেন না। সুতরাং সংবিধানে এমন ব্যবস্থা থাকা দরকার, যাতে তার ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে এবং তার দ্বারা বহু-বিবাহ, মৌখিক তালাক, বাল্যবিবাহ বন্ধ করা যেতে পারে।’

রাষ্ট্রের সংখ্যালঘুদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তাদের দিকে আমাদের সম্পূর্ণ খেয়াল আছে। তাদের কোনো অধিকার খর্ব হবে না। সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা হবে এবং খেয়াল রাখা হবে। আপনার লাঠি ভর করে চলার অধিকার আছে, কিন্তু সেই লাঠি বগলদাবা করে চলতে গেলে পিছনের লোকের যে খোঁচা লাগবে, তার কী হবে? My right begins where your right ends. কারও অধিকার খর্ব করা চলবে না।’

মায়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রাজিয়া বানুর ছেলে সৈয়দ আনিসুর রহমান জানান, রাজিয়া বানু পঞ্চাশের দশকে সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। বন্দুক চালাতে জানতেন। তার বাবাও ছিলেন একজন দক্ষ শিকারি। তার সংগ্রহে বিভিন্ন দেশের বন্দুক ছিল। রবিবার ছুটির দিনে তিনি এগুলো পরিষ্কার করতেন। আনিসুর রহমান বলেন, ‘আব্বার পোস্টিং তখন ময়মনসিংহে। একটা উঁচু তালগাছে একটা বড় চিল এসে বসলো। আম্মাকে বললাম তুমি কি পাখিটা মারতে পারবে? মা একটা বন্দুক লোড করলেন। গুলি করলেন। পাখিটা পড়ে গেল।’

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসন (৪)-এর সদস্য ছিলেন রাজিয়া বানু। তবে এরপর আর কোনো নির্বাচনে অংশ নেননি। তিনি মহিলা আওয়ামী লীগেরও সভাপতি ছিলেন। ১৯৭৫ সালে ১১৫ সদস্যকে নিয়ে বাকশালের যে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়, সেখানেও ছিলেন রাজিয়া বানু। তবে এরপর রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। 

মেয়ে তাসনিম করিম বেবী বলেন, ‘আব্বা অবসরে যান ১৯৭৪ সালে। ওই বছর পড়ে গিয়ে ভীষণ আহত হন। শয্যাশায়ী হয়ে যান। মা তখন আব্বার দেখাশোনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তার মধ্যে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, ১৯৭৭ সালে ছেলে এবং তার এক বছরের মধ্যে ১৯৭৮ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। সংসারের চাপের কারণেও তিনি আর রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেননি বা থাকতে চাননি। ধীরে ধীরে সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করেন।’ 

স্বামীর মৃত্যুর পর আরও ২০ বছর বেঁচেছিলেন রাজিয়া বানু। ১৯৯৮ সালের ৯ মে তার হার্ট অ্যাটাক হয়। পরদিন ১০ মে তার মৃত্যু হয়। 

বাংলাদেশের রাজনীতি, বিশেষ করে সংবিধান প্রণয়নের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত এই মহীয়সী নারীর মৃত্যুবার্ষিকীতে তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। 

সম্পাদক ও প্রকাশক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh