ফিলিস্তিনে গণহত্যা- জায়নবাদী সেটলার কলোনিয়ালিজমের পূর্ণ রূপ

আলমগীর খান

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৪, ০৪:৪৭ পিএম

আলমগীর খান

আলমগীর খান

গত বছর ৭ অক্টোবর গাজার হামাস গ্রুপ কর্তৃক ইসরায়েলের ওপর হামলার জবাব হিসেবে ইসরায়েল সমগ্র ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর প্রকাশ্যে চালিয়ে দিয়েছে তার গণহত্যার মেশিন। ইসরায়েলি গণহত্যার শুরু অবশ্য ৭৬ বছর আগে ১৯৪৮ সালে প্যালেস্টাইনের অধিবাসীদেরকে হত্যা ও উচ্ছেদ করার মধ্য দিয়ে। প্রায় শতাব্দীকালীন চর্চা ও প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে ইসরায়েল সরকারের গণহত্যার কলাকৌশল আরো পরিপক্ব ও অপরাজেয় হয়ে উঠেছে। গত সাত মাসে ইসরায়েলি হামলায় প্যালেস্টাইনে এ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেছে ৩৬ হাজারের বেশি মানুষ যাদের অর্ধেক শিশু আর আহত হয়েছে প্রায় ১ লাখ জন। বোমার আঘাতে ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো পড়ে আছে অজানা অনেকে। এই ৭ মাসে প্যালেস্টাইনে অনেক শিশুর জন্ম ও মৃত্যু হয়েছে যাদের সংক্ষিপ্ত মানব জীবনে পৃথিবীতে আসার অভিজ্ঞতা হলো শুধু বোমার আতঙ্ক, গুলি, ক্ষুধা ও সবশেষে মৃত্যুকে বরণ করে ভয়ঙ্কর এই মানবজন্মকে বিদায় জানানো। সম্প্রতি গাজায় সাত মাসের শিশু ফয়েজ আবু আতায়া ক্ষুধায় মৃত্যুবরণ করলেন ইসরায়েলি গণহত্যার শিকার হয়ে। আতায়ারের আগে আরো অনেক ফিলিস্তিনি শিশু কঙ্কালসার দেহ নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে ইসরায়েলসৃষ্ট এই দুর্ভিক্ষে।

গাজায়, রাফায় ও পশ্চিম তীরে যে ইসরায়েলি গণহত্যা চলছে তা হিটলারের নাৎসি বাহিনী কর্তৃক ইহুদিদের ওপর নির্যাতনকেও হার মানানোর পথে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় টেলিভিশন ও ইন্টারনেট ছিল না, ছিল না জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত, মানবাধিকার সংস্থা ইত্যাদি। এখন এইসবের উপস্থিতিতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যা করছে তা হিটলারের পক্ষে সম্ভব হতো কিনা অনিশ্চিত। সেদিন হিটলারের ফ্যাসিস্ট বাহিনী যে ইহুদি নিধনযজ্ঞে মেতেছিল আজ সেই ইহুদিদের রাষ্ট্র ইসরায়েল নেমেছে আরেক গণহত্যায়।

ইতিহাসের এ এক মর্মান্তিক পরিণতি। স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের সৃষ্টি একরকম অপরাধবোধ থেকে- পশ্চিমাদের উপহার। দা হিন্দুর ফ্রন্টলাইনে প্রকাশিত Vivek Katju-র কথায় (India’s partnership with Israel: A tightrope between justice and self-interest, ফ্রন্টলাইন, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৩): “ঠিক, অনেক ইহুদি ঈশ্বর প্রদত্ত ভূমির প্রতি সবসময় একটা আত্মিক টান অনুভব করেছেন। থিয়োডর হার্জেল প্যালেস্টাইনে ইহুদিদের জন্য একটি জাতীয় বাসভূমির রাজনৈতিক প্রকল্পের কথা ভেবেছিলেন ও ১৮৯৭ সালে জায়নবাদী কংগ্রেস আয়োজন করেছিলেন, তাও ঠিক। তারপরও এমনকি ১৯১৭ সালে বেলফুর ঘোষণায় ব্রিটিশের নিশ্চয়তা সত্ত্বেও, হলোকস্ট না ঘটলে প্যালেস্টাইন টুকরা করে ইসরায়েল সৃষ্টি করার কথা ভাবাও সম্ভব হতো না।”

ইহুদিরা ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় সারা ইউরোপ জুড়ে নির্যাতিত ও অপদস্থ হয়ে পালিয়ে ফিরেছে। সেদিনের সেই অসহায় দিনগুলোতে মুসলিম রাষ্ট্রগুল ছিল ইহুদিদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থান। হলোকস্ট ইউরোপের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। সেই কলঙ্ককে ঢাকতে তারা প্যালেস্টাইনকে টুকরো করে তার অধিবাসীদেরকে উচ্ছেদ করে ইহুদিদের জন্য একটি কৃত্রিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রকল্প হাতে নেয়। যা শুরুই হয় ফিলিস্তিনি মানুষ হত্যার নীলনকশা দিয়ে। যা চলছে ১৯৪৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত।

নূর মাসালহা ফিলিস্তিন ইতিহাসের চার হাজার বছর নিয়ে লেখা Palestine: A Four Thousand Year History (Zed, যুক্তরাজ্য, ২০১৮) বইতে লিখেছেন, “জায়নবাদী দখলদারি ঔপনিবেশিকতার শিকড় ইউরোপিয়ান উপনিবেশবাদের গভীরে নিহিত। ... উনবিংশ শতকের শেষ দিকে যখন সব ইহুদিকে জড়ো করে প্যালেস্টাইনে দখলদার-উপনিবেশ স্থাপনের লক্ষ্য ঠিক হলো, প্যালেস্টাইনে যে কোনোরকম মানুষ বাস করে তা বেমালুম ভুলে গেল তারা। ১৮৯৭ সালে রাজনৈতিক জায়নবাদের যাত্রা শুরুর সময় প্রথম জায়োনিস্ট কংগ্রেসে গৃহীত বাসেল কর্মসূচিতে প্যালেস্টাইনের মাটিতে বসবাসকারী প্যালেস্টিনিয়ানদের কোনো উল্লেখই করা হয় না। জায়নবাদী মিশনের লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়: ইহুদি জনগণের জন্য প্যালেস্টাইনে একটি আইনি ও জনস্বীকৃত বসতি প্রতিষ্ঠা।”

ইহুদি বংশোদ্ভূত ইতিহাসবিদ ইলান পাপের The Ethnic Cleansing of Palestine, Oneworld Publications, ইংল্যান্ড, ২০০৬) কথায়, “১৮৮০র দশকে কেন্দ্রীয় ও পূর্ব ইউরোপে জাতীয় পুনরুজ্জীবনের আন্দোলন হিসেবে জায়নবাদের উৎপত্তি হয় ঐসব এলাকায় প্রচলিত সমাজে ইহুদিদের একাত্ম হয়ে যাওয়ার অথবা ক্রমবর্ধমান নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচার লক্ষ্যে। (যদিও আমরা জানি, প্রচলিত সমাজের সঙ্গে সম্পূর্ণ একাত্মতাও নাজি জার্মানি কর্তৃক তাদের নির্মূলীকরণ ঠেকানোর রক্ষাকবচ হয়নি।) বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বেশিরভাগ জায়নবাদী নেতা জাতিগত পুনরুজ্জীবনকে যুক্ত করেছেন প্যালেস্টাইনের উপনিবেশিকরণের সঙ্গে।” 

প্যালেস্টাইন দখলের সেই ঘৃণ্য জায়নবাদী পুনরুজ্জীবনের পূর্ণ রূপই আজকের এই গণহত্যা। পৃথিবীর ইতিহাসে গণহত্যার যেসব কলাকৌশল মানব নামের কতক দানব আবিষ্কার করেছে এবার নেতানিয়াহু ও তার সাগরেদরা তার সবগুলোর সফল প্রয়োগ ঘটাচ্ছে প্যালেস্টাইনে। সঠিকভাবে বললে, পূর্বের গণহত্যার কৌশলগুলোকে বর্তমান ইসরায়েলি সরকার আরো ‘উন্নত ও অব্যর্থ’ করেছে। ইতিহাসে গণহত্যাকারীরা সবসময়ই কিছু সহযোগী রাষ্ট্র, গোষ্ঠী বা শক্তিকে পেয়ে থাকে। এবারকারটা সবচেয়ে ব্যতিক্রমী। গণহত্যাকারী নেতানিয়াহুর সরকার অস্ত্রদাদা ও অর্থদাতা হিসেবে পেয়ে গেছে বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র আমেরিকাকে আর মদদদাতা হিসেবে আছে আরেক সাম্প্রতিককালের বিশ্বসাম্রাজ্যবাদী শক্তি বর্তমান ব্রিটিশ সরকার।

যেকোনো গণহত্যাকারী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কৌশলের মধ্যে থাকে উন্নততর অস্ত্র দিয়ে নির্বিচার হত্যা, উচ্ছেদ ও ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা, পালানোর পথ বন্ধ করে হত্যা, খাদ্য ও চিকিৎসার অভাব সৃষ্টি করে হত্যা, টার্গেট জনগোষ্ঠী ও অধিবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক ও অসহায়ত্ব সৃষ্টি, তাদেরকে পশুতুল্য মনে করা, তাদের গ্রন্থাগার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস, গণহত্যাকারী সৈনিকদের মনে হত্যাকর্মে পাশবিক আনন্দ সৃষ্টি, সংগঠিত মিথ্যাচার, গণহত্যাকে বৈধতা দেয়ার লক্ষ্যে টার্গেট জনগোষ্ঠীকে নিয়ে কোনো একটা কাল্পনিক ও মিথ্যা অভিযোগ তৈরি ইত্যাদি। গত ৭ মাসের ঘটনা থেকে এটাই প্রমাণিত যে বিশ্বের ভবিষ্যতের যেকোনো গণহত্যাকারী রাষ্ট্র বা শক্তির জন্য বর্তমান ইসরায়েল রাষ্ট্র অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রশিক্ষকের ভূমিকা পালন করতে পারবে। ১৯৪৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ ষড়যন্ত্রের ফলে সৃষ্ট ইসরায়েল রাষ্ট্রের বর্তমান পরিণতি এই।

যে হলোকস্ট লজ্জা থেকে বাঁচার জন্য ইউরোপ-আমেরিকা যুগযুগ ধরে নির্যাতিত ইহুদি জনগোষ্ঠীর জন্য একটি রাষ্ট্র উপহার দিলো তা ছিল প্রচলিত ইউরোপিয়ান দখলদারি ঔপনিবেশিকরণেরই (settler colonialism) একটি আধুনিক রূপ ও প্রকল্প। দক্ষিণ অফ্রিকায় এ প্রকল্পের পতনের পর এর নতুন প্রয়োগ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে প্যালেস্টাইনের নিরীহ জনগণের ওপর। দক্ষিণ আফ্রিকার কালো মানুষের মুক্তিসংগ্রাম ও প্যালেস্টাইনের জনগণের মুক্তিসংগ্রাম তাই অনেকটা এক সূত্রে গাঁথা। কেবল কারো জানা নেই আরো কত জীবন দিতে হবে ফিলিস্তিনের মানুষের স্বাধীনতা ফিরে পেতে।

‘গ্লোবাল  প্যালেস্টাইন’ বইয়ের লেখক জন কলিন্সের কথায় প্যালেস্টাইন কেবলমাত্র একটি স্থানীয় রাজনৈতিক সমস্যা নয়। এটি একটি বৈশ্বিক বিষয়। বিশ্বে প্যালেস্টাইন একটি নয়, লক্ষ লক্ষ। যেখানেই অবিচার, বর্ণবাদ, বৈষম্য, উগ্র ধর্মান্ধতা, বিমানবিকীকরণ, গণতন্ত্রের খোলসে নির্মূলীকরণ- সেখানেই প্যালেস্টাইন ও স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ। আমেরিকা ও ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে তাই তরুণশক্তি ফুঁসে উঠেছে ইসরায়েলি গণহত্যার বিরুদ্ধে। নিজেদের জীবন ও নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে মেধাবী শিক্ষার্থীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে প্যালেস্টাইনের মুক্তির দাবিতে যাতে অনন্য সাহস, দৃঢ়তা ও নৈতিকতা নিয়ে অংশগ্রহণ করেছে অসংখ্য ইহুদি তরুণ-তরুণীও। ইসরায়েলি গণহত্যা প্রকল্পের শেষ পরিণতি তাই পরাজয় এ কথা নিশ্চিত বলা যায়। নিশ্চিত যে, প্যালেস্টাইনের মানুষের বিজয়ে উদযাপিত হবে স্বাধীনতা ও মানবতার বিজয়োৎসব।

লেখক: সম্পাদক, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি

সম্পাদক ও প্রকাশক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh