করোনা মহামারিরকালে হজ: ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা

ছবি: বিবিসি

ছবি: বিবিসি

ফরিদাহ বকতি ইয়াহরা এবছর যেভাবে হজ করার সুযোগ পেয়েছেন, তাকে লটারি জেতার সঙ্গেই তুলনা করা যেতে পারে। এই হজে যাওয়া ছিল তার সারাজীবনের স্বপ্ন।

স্মরণকালের ইতিহাসে এবারের মতো এত কম মানুষ আর হজ করেনি। আর সেবছরই হজে যাওয়ার সুযোগ এক বিরল সৌভাগ্যই বলতে হবে। 

ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক ফরিদাহ তার এই হজের অভিজ্ঞতা তার স্মার্টফোন দিয়ে প্রতি মুহূর্তে শেয়ার করছেন তার পরিবারের সঙ্গে।

৩৯ বছর বয়সী ফরিদাহ তার স্বামী ও তিন মেয়েকে মক্কার ফাইভ-জি নেটওয়ার্কের বদৌলতে হজের প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি আনুষ্ঠানিকতা লাইভ দেখিয়ে যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, আমার স্বামী যে আমার সঙ্গে অনলাইনে যোগ দিতে পারছে, সেই সঙ্গে আমার মেয়েরাও, সেজন্যে আমি খুব খুশি।

হজের প্রথম দিনে বেশিরভাগ মানুষই পরিবার আর বন্ধুদের জন্য হজের আনুষ্ঠানিকতা লাইভ স্ট্রিম করছিলেন। মাত্র গত বছরই মক্কায় সুপার-হাইস্পিড ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক চালু করা হয়। ফলে স্মার্টফোন থেকে এগুলো এখন করা যাচ্ছে খুবই সহজে।

চীনা হজযাত্রী নি হাওয়ু ইন্দোনেশিয়ার ফরিদাহর মতোই আরেক সৌভাগ্যবান। যখন তাকে হজ করার জন্য বাছাই করা হলো, আনন্দে তার চোখে পানি চলে আসে। ৪২ বছর বয়সী নি মাস্টার্স করছেন ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব মদিনায়। সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে মোবাইল ফোনে টেক্সট মেসেজে যখন খবরটি এলো, সেই মুহূর্তের অনুভূতি ভুলতে পারেন না তিনি।

তিনি বলেন, হজ করার জন্য যখন আমাকে বাছাই করা হলো, তারপর থেকে আমি খুশিতে আত্মহারা। আমি কান্না থামাতে পারছিলাম না, কারণ আল্লাহ আমার হজ করার বাসনা পূর্ণ করেছেন। একেবারে বিনা খরচে আমি এই হজ করছি।

গত বছর হজে অংশ নিয়েছিল ২৫ লাখের বেশি মুসলিম। কিন্তু এবার করোনাভাইরাস মহামারির কারণে আর সব কিছুর মতো বিশ্বের মুসলিমদের সবচেয়ে বড় এই সমাবেশের ক্ষেত্রেও সৌদি কর্তৃপক্ষকে জারি করতে হয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ।

এবছর হজে অংশ নেয়া মানুষের সংখ্যা সীমিত করে দেয়া হয়েছে কয়েক হাজারে। শুরুতে সৌদি কর্তৃপক্ষ বলেছিল, মাত্র এক হাজার মানুষকে হজ করতে দেয়া হবে। এখন অবশ্য সৌদি গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, ১০ হাজার মানুষ হজ করার সুযোগ পেয়েছেন।

হজে আসার জন্য আগ্রহী সারা বিশ্বের লাখ লাখ মানুষকে এবার তাই আশাহত হয়ে হয়েছে। যারা এবার হজ করছেন, তাদের ৭০ শতাংশই বিদেশি, বাকি ৩০ শতাংশ সৌদি আরবের বাসিন্দা।

সৌদি আরব থেকে তাদেরকেই হজে যেতে দেয়া হয়েছে, যারা চিকিৎসক বা নিরাপত্তা কর্মী এবং যারা করোনাভাইরাস থেকে সেরে উঠেছেন।

প্রতি বছর যখন লাখ লাখ মুসলিম এসব আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেন, তখন মক্কা ও মদিনাকে ঘিরে চারপাশের এলাকা পরিণত হয় জনসমুদ্রে। মানুষের ভিড়ে পদদলিত হয়ে বহু মানুষ মারা গেছেন এর আগে হজ করার সময়। কিন্তু এবারের হজযাত্রীরা একেবারেই এক ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা বলছেন।

সৌদি নার্স ওয়াজদান আলি বলেন, এবার মানুষের ভিড় নেই, তাই আমি আমার সব আনুষ্ঠানিকতা সহজে পালন করতে পারছি। এবারের পরিবেশটা তাই খুব শান্ত-সমাহিত, অনেক বেশি আধ্যাত্মিক পরিবেশ।

২৫ বছর বয়সী ওয়াজদান আলি থাকেন লোহিত সাগর তীরের শহর জেদ্দায়। সম্প্রতি করোনাভাইরাস থেকে সেরে উঠেছেন। সেজন্যেই তাকে বাছাই করে এবার হজ করার সুযোগ দেয়া হয়েছে।

এবার প্রত্যেক হজযাত্রীর হাতে পরিয়ে দেয়া হয়েছে একটি রিস্টব্যান্ড, যাতে সৌদি কর্তৃপক্ষ সারাক্ষণ জানতে পারেন তার অবস্থান। ওয়াজদান আলি বলছেন, এটা একটা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা।

প্রতিটি হজযাত্রীকে সৌদি কর্তৃপক্ষ করোনাভাইরাস জন্য পরীক্ষা করেছে। তাদের মুখোশ পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং পরস্পর থেকে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হয়েছে। যে পাঁচদিন ধরে হজের আনুষ্ঠানিকতা চলবে, সে কদিন তাদের শরীরের তাপমাত্রা মাপা হবে নিয়মিত।

এবছর হজে অংশগ্রহণকারীরা জানান, সৌদি কর্তৃপক্ষ তাদের যে ইহরাম দিয়েছেন (হজে অংশ নেয়ার সময় সেলাই ছাড়া যে সাদা কাপড় পরতে হয়), সেটি ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী কাপড় দিয়ে তৈরি।

সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত হজের আনুষ্ঠানিকতা ভালোভাবেই আগাচ্ছে। হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য নিয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো উদ্বেগজনক খবর পাওয়া যায়নি, করোনাভাইরাস সংক্রমণের একটি ঘটনাও ধরা পড়েনি।

হজযাত্রীরা আজ আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে ‘শয়তানের দিকে পাথর ছোঁড়ার‌’ যে রীতিটিতে অংশগ্রহণ করেন, সেই পাথরগুলোও ছিল স্যানিটাইজড। তীব্র রোদের মধ্যে তারা যখন মিনা দিয়ে হেঁটে যান, তখন তাদের ওপর সতর্ক নজর রাখছিল নিরাপত্তা রক্ষীরা। -বিবিসি

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh