আশুরার ফজিলত ও আমল

সারাবিশ্বের মুসলমানদের কাছে আশুরার দিন নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। শরিয়ত ও ইতিহাস উভয় বিবেচনায় মাসটি অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। 

ইতিহাসের অনেক অনুপ্রেরণামূলক ঘটনার সাক্ষী এই মহররম মাস। শুধু উম্মতে মুহাম্মদীই নয়, পূর্ববর্তী অনেক উম্মত ও নবীর অবিস্মরণীয় ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল এই মাসে। 

আশুরা অর্থ দশম। মহররম মাসের ১০ তারিখ আশুরা নামে খ্যাত। আশুরাতেই নভোমণ্ডলে সৃষ্টিকুলের প্রাথমিক বিভাজনপ্রক্রিয়ার সূচনা হয়। হযরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টি, স্থিতি, উত্থান ও অবনমন- সব ঘটনাই ঘটেছিল আশুরায়। 

হযরত নুহ (আ.)-এর নৌযানের যাত্রারম্ভ ও বন্যাবস্থার সমাপ্তি ছিল আশুরাকেন্দ্রিক। হযরত মুসা আলাইহিস সাল্লামের সমুদ্রপথের ধাবমান রওনা ও এর তাওয়াক্কুল যাত্রায় যে সময় বেছে নেয়া হয়েছিল, তা ছিল আশুরা। 

এ ধারাবাহিকতায় আল্লাহর রাসুল হযরত মুহাম্মদ (সা.) কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনার কথা আশুরার সময়ে বা আশুরাকেন্দ্রিক হতে পারে বলে আশা ও আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। এ সময় এলেই তিনি বিনম্র থাকতেন, রোজা রাখতেন। (তাফসিরে তাবারি, ইবনে জারির)।

তবে মুসলিম ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই মাসকেন্দ্রিক অনেক কুসংস্কার, ভুল বিশ্বাস ও কাজের চর্চা রয়েছে মুসলিম সমাজে। যার বেশিরভাগই ভিত্তিহীন। 

ভিত্তি রয়েছে এমন তিনটি আমল নিম্নে তুলে ধরা হলো:

রোজা রাখা

আশুরার দিনে আমল হিসেবে তিনটি কাজ করা যায়। প্রথমত রোজা রাখা। এ আমল সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আশুরা উপলক্ষে দুইদিন রোজা রাখা মুস্তাহাব। মহররমের ১০ তারিখের আগে বা পরে এক দিন বাড়িয়ে রোজা রাখার কথা হাদিস শরিফে এসেছে। ইসলামে আশুরার রোজার বিশেষ গুরুত্ব আছে। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজা ফরজ ছিল।

১০ মহরম আশুরার রোজার ফজিলত প্রসঙ্গে হযরত রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আশুরার দিন রোজা রাখার কারণে আল্লাহতায়ালা বান্দার বিগত এক বছরের গুনাহসমূহ মাফ করে দেন। (সহিহ মুসলিম ১১৬২)

সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবি হজরত আবু হোরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রমজানের পর সর্বাধিক উত্তম রোজা হলো মহররম মাসের রোজা। আর ফরজের পরে সর্বাধিক উত্তম নামাজ হলো তাহাজ্জুদের নামাজ। 

মহানবী (সা.) বললেন, মুসা (আ.)-এর সাথে আমাদের সম্পর্ক তোমাদের চেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ। অতঃপর তিনি মহররমের ৯-১০ অথবা ১০-১১ মিলিয়ে দুটি রোজা রাখতে বললেন, যাতে ইহুদিদের সাথে সাদৃশ্য না হয়। 

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুল (সা.) আশুরা ও রমজানের রোজা সম্পর্কে যেরূপ গুরুত্বারোপ করতেন, অন্য কোনো রোজা সম্পর্কে রাসুল (সা.)-কে সেরূপ গুরুত্ব দিতে দেখিনি।’ (সহিহ বোখারি, হাদিস : ২০০৬; মুসলিম, হাদিস : ১১৩২)

ভালো খাবারের আয়োজন

আরেকটি আমল বর্ণনা সূত্রে দুর্বল হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আর তা হলো- আশুরার দিনে যথাসাধ্য খাবারে উদারতা প্রদর্শন করা। যথাসম্ভব ভালো খাবার খাওয়া। আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, ‘যে ব্যক্তি আশুরার দিনে পরিবারে প্রশস্ততা প্রদর্শন করবে, সে সারা বছর প্রশস্ততায় থাকবে।’ (তাবরানি, মুজামে কবির, হাদিস : ১০০০৭; বায়হাকি, হাদিস : ৩৭৯৫)

এ হাদিসের বর্ণনা সূত্রে দুর্বলতা আছে। তবে ইবনে হিব্বানের মতে, এটি ‘হাসান’ বা গ্রহণযোগ্য পর্যায়ের হাদিস। আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর দাবি রিজিকে প্রশস্ততার ব্যাপারে কোনো হাদিস নেই; এটি ধারণাপ্রসূত। ইমাম আহমদ (রহ.) বলেছেন, এটি বিশুদ্ধ হাদিস নয়। তবে এ বিষয়ে একাধিক বর্ণনা থাকার কারণে ‘হাসান’ হওয়া অস্বীকার করা যাবে না। আর ‘হাসান লিগাইরিহি’ পর্যায়ের হাদিস দ্বারা আমল করা যায়। (আস-সওয়াইকুল মুহরিকা আলা আহলির রফজি ওয়াদ দালাল ওয়াজ জানদিকা : ২/৫৩৬)

নবীর পরিবারের জন্য দোয়া করা

আরেকটি আমল যুক্তি দ্বারা প্রমাণিত। আর তা হলো, আহলে বাইত তথা নবীর পরিবারের সদস্যরা শাহাদতের কারণে তাদের জন্য দোয়া করা, দরুদ পড়া ও তাদের কাছ থেকে সত্যের ওপর অটল থাকার শিক্ষা গ্রহণ করা। 

এই তিনটি কাজ ছাড়া আশুরায় অন্য কোনো আমল নেই। মনে রাখতে হবে, ইসলামের ইতিহাসে মহররম মাসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিভিন্ন কারণে। প্রাক-ইসলামি যুগেও মহররমের ঐতিহ্য বিদ্যমান ছিল। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, জাহেলি যুগে মক্কার কুরাইশ বংশের লোকরা আশুরার রোজা রাখত এবং রাসুল (সা.)-ও আশুরার রোজা রাখতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৩২)

মহররম মাস সম্পর্কে সাধারণে কিছু ভুল ধারণা রয়েছে। যেমন- এই মাসে বিয়েশাদি না করা, নতুন ঘরবাড়ি নির্মাণ না করা, কোনো শুভ কাজ বা ভালো কাজের সূচনা না করা, গোশত না খাওয়া ও নিরামিষ আহার করা, পান না খাওয়া, নতুন কাপড় ও সুন্দর পোশাক পরিধান না করা, সাদা কাপড় বা কালো কাপড় তথা শোকের পোশাক পরা, সব ধরনের আনন্দ উৎসব পরিহার করা ইত্যাদি। এসবই কুসংস্কার। 

কোরআন ও হাদিসে এসবের কোনো ভিত্তি নেই। ইবাদত ও ইসলামী পর্বসমূহ কোরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে পালন করা বিধেয়, দলিল–প্রমাণহীন আমলে সুফল আশা করা যায় না। বরং এতে বহুবিধ ক্ষতির আশঙ্কা বিদ্যমান রয়েছে।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh