হকিতে দরকার স্বপ্ন দেখার যোগ্যতা

বাংলাদেশের হকির মান বেড়েছে বলে মনে করেছিলেন আমাদের খেলোয়াড়, কর্মকর্তাসহ নতুন প্রজন্মের বিশেষজ্ঞরা। ফলে অনেকেই পাকিস্তানকে হারিয়ে এবার এশিয়া কাপে প্রথম বারের মতো পঞ্চম হয়ে ইতিহাস সৃষ্টির ‘দিবাস্বপ্ন’ দেখতে শুরু করেন। মুখের কথা আর মাঠের খেলা এক নয়। জোর করে অনেক কিছুই করা যায়, কিন্তু আন্তর্জাতিক হকি ম্যাচের ফল তো বদলানো যায় না।

বিশ্ব হকিতে আমরা কোথায় রয়েছি, তা হয়তো জানেনই না, যারা পাকিস্তানকে হারানোর দিবাস্বপ্ন দেখেছিলেন। জয়ের বদলে ০-৮ হেরে গোলে বাংলাদেশ সেই ষষ্ঠ স্থানেই থাকল। প্রমাণ হলো, হকিতে স্বপ্ন দেখার যোগ্যতা আগে অর্জন করতে হবে, তারপর স্বপ্ন। 

বিশ্ব হকির সর্বশেষ র‌্যাংকিংয়ে যেখানে পাকিস্তান রয়েছে ১৮ নম্বর স্থানে, সেখানে বাংলাদেশ আছে ২৯ নম্বরে। পার্থক্য মাত্র ১১টি স্থান। এটা দেখে বা শুনেই হয়তো কেউ কেউ ধারণা করেছিলেন, বাংলাদেশ একটু চেষ্টা করলে পাকিস্তানকে হারাতে পারবে। বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ের জায়গা পাওয়া ৯৩টি দেশের মধ্যে ভারত ৪ নম্বরে, মালয়েশিয়া ১০ নম্বরে, দক্ষিণ কোরিয়া ১৩ নম্বরে, জাপান ১৭ নম্বরে, চীন ২৫ নম্বরে, ওমান ২৭ নম্বরে রয়েছে। কিন্তু এই র‌্যাংকিংই সব কিছু নয়। আমাদের দেখতে হবে মানের কতটা উন্নতি ঘটেছে লাল-সবুজদের।  

সময়ের কারণে পাকিস্তান হকি দলের খেলার মান ইউরোপের পেছনে পড়ে গেলেও বাংলাদেশ তো মানে শূন্যতে রয়েছে। ঘাসের মাঠে পাকিস্তান ছিল বিশ্বসেরা। এখন কৃত্রিম মাঠে যতই খারাপ খেলুক, পাকিস্তান তো নিয়মিত বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলছে। আর বাংলাদেশ তো বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন দেখারও অধিকার পায়নি। তাহলে ‘ইঁচড়েপাকা’ কিসিমের বিশেষজ্ঞরা কীভাবে পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়লাভ করার আশা পোষণ করেন? ০-৮ গোলের হার কি স্বাভাবিক বিষয়? বাংলাদেশ ১৯৮৫ সালে এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে দারুণ লড়াই করে মাত্র ০-১ গোলে হেরেছিল। আর ঐ সময় পাকিস্তান একাধারে বিশ্বকাপ, অলিম্পিক ও এশিয়া কাপের ছিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন। ৩৭ বছরে বাংলাদেশ কতটা নিচে নেমেছে, ভাবা যায়? তখন বিশ্বের এক নম্বর দলের কাছে তীব্র লড়াই করে মাত্র এক গোলে হেরেছিল, আর এখন বাংলাদেশ ২৯ নম্বরে থেকে ১৮ নম্বরের কাছে ০-৮ গোলে হেরে যায়। 

আর আমাদের হকি কর্মকর্তারা। তাদের কাছে পদটাই আসল। হকিতে বাংলাদেশ কোথায় ছিল, এখন কোথায় আছে, এভাবে চলতে থাকলে পরিণতি কী হবে হয়তো এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর জানা নেই তাদের।  হকির নির্বাচন, কমিটি গঠন, বিদেশ সফর-এসবে কিছু যায় আসে না খেলাটির মান উন্নয়নে। কিন্তু বছরের পর বছর এটাই চলে আসছে আমাদের হকিতে। পার্থক্য অবশ্যই আছে। সেটা শুধু চেহারায়। আজ যে আছেন হকি ফেডারেশনের কোনো পদে, কাল হয়তো সেখানে অন্য কেউ থাকবেন। কিন্তু হকির সত্যিকারের উন্নয়নে মনোযোগী হয়েছেন, এমন কর্মকর্তা একজনও চোখে পড়েনি। দুঃখ হয়, হকি ছিল ক্রিকেট ও ফুটবলের চেয়ে অনেক বেশি জনপ্রিয় ও সম্ভাবনাময়। আমরা সেটা মনে হয় ভুলেই গিয়েছি।

বিশ্বের যে কোনো দেশ একটি সম্ভাবনাময় বিষয়টিকে দারুণ গুরুত্ব দেয়। ওই বিষয়টিকে আঁকড়ে ধরে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে বেড়ায়। আজ আমরা ওয়েস্ট ইন্ডিজ নামে যে ক্রিকেট দেশটি দেখছি, সেটা আসলে কোনো দেশই নয়। এই কথাটি হয়তো আমরা অনেকেই জানি, আবার অনেকেই জানেন না। শুধু ক্রিকেটের কারণেই একটি ‘অঘোষিত’ রাষ্ট্রে পরিণত ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এন্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডা, জামাইকা, গায়ানা, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, সেন্ট লুসিয়া, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোসহ বিভিন্ন দেশ ওয়েস্ট ইন্ডিজের অন্তর্ভুক্ত। ক্রিকেট যদি ওই সব দ্বীপরাষ্ট্রে জনপ্রিয় না হতো, হয়তো ওয়েস্ট ইন্ডিজ নামটি টিকত না। এমন একটি সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারল তারা, আর আমরা হকি খেলার বিশাল সম্ভাবনাকে বুঝতেই পারলাম না, বোঝার চেষ্টাই করলাম না। কিন্তু পাকিস্তানকে হারানোর কথা বলে ভুয়া বিশেষজ্ঞ সাজতে ভুল করি না।   

আপাতত বেশি দরকার নেই। হকিতে এশিয়ান লেভেলে ওঠার চেষ্টা করতে হবে। ক্রিকেট নিয়ে আমরা কিন্তু সমালোচনা কম করি না। একটি ম্যাচে বাজেভাবে হারলেই ক্রিকেটের উপর দিয়ে মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনার ঝড় ওঠে। আবার ভালো খেললে প্রশংসায় ভেসে যায় ক্রিকেট দল। ক্রিকেট যতই সমালোচিত হোক, তারা তো বিশ্ব মানে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ এখন নিয়মিত ক্রিকেট বিশ্বকাপে খেলছে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি উভয় ফরম্যাটেই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের যত প্রকার আসর রয়েছে তার সবগুলোতেই খেলছে বাংলাদেশ।

কিন্তু হকিতে তো এশিয়ান কাপের বাইরে যেতে পারছে না। সেখানেও রয়েছে বাজে অবস্থানে, এতে আরো একবার প্রমাণ হলো এবারের এশিয়া কাপ হকিতে। এত বছর ধরে বাংলাদেশ হকি খেলছে, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশের আবহাওয়ায় হকি খেলছে, শাহবাজ খান, তাহির জামান, ধনরাজ পিল্লাই, মুকেশ কুমারদের মতো বিশ্ব তারকারা খেলেছেন বাংলাদেশের হকি লিগে। তারপরও বাংলাদেশ হকিতে একটা অবস্থান তৈরি করতে পারল না। তবে এখনো চেষ্টা করলে বাংলাদেশের হকির মান সম্মানজনক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু তার জন্য নতুন করে হকিকে নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //