সিরিজ জয়ের আত্মতুষ্টিতে ভোগা আত্মঘাতীর শামিল

বাংলাদেশ ক্রিকেট দল এবার ওয়েস্ট ইন্ডিজে পূর্ণ সফরে টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি সিরিজে হারলেও ওয়ানডেতে সফল হয়েছে। সফরের শেষটায় ছিল ওয়ানডে সিরিজের লড়াই। আর তাতে বাংলাদেশ ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করেছে স্বাগতিক ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলকে। ফলে টেস্ট ও টি-টোয়েন্টিতে সিরিজ হার হলেও ওয়ানডের সাফল্যে তৃপ্তি নিয়েই দেশে ফিরেছে তারা।

তবে আত্মতুষ্টিতে ভোগা হবে পুরোপুরি আত্মঘাতীর শামিল। কারণ ওয়ানডেতে বিশ্বের শক্তিশালী দলগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের রেকর্ড এখনো উল্লেখ করার মতো নয়। সেখানে অনেকটাই দুর্বল প্রতিপক্ষ ক্যারিবিয়ানদের সঙ্গে ওয়ানডে সিরিজ জয় সাফল্য হলেও বিশাল কিছু নয়।

বিশ্ব ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে এক একটি দেশ একেক সময়ে শ্রেষ্ঠত্ব দেখালেও বাংলাদেশ কখনো ঐ অবস্থায় পৌঁছতে পারেনি। বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি আর এশিয়া কাপই হলো ওয়ানডের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ আসর। এই তিনটির কোনো একটিতেও বাংলাদেশের শিরোপা জেতা হয়নি। আর এর কারণ ওই একটাই, ওয়ানডেতে বড় দলগুলোর বিপক্ষে বাংলাদেশের চোখে পড়ার মতো সাফল্য নেই।

বর্তমানে ওয়ানডের বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে নিউজিল্যান্ড (১২৮ পয়েন্ট) রয়েছে শীর্ষস্থানে। এরপর ইংল্যান্ড (১২৪ পয়েন্ট), ভারত (১০৬ পয়েন্ট), পাকিস্তান (১০৬ পয়েন্ট), অস্ট্রেলিয়া (১০১ পয়েন্ট) ও দক্ষিণ আফ্রিকাও (৯৯ পয়েন্ট) রয়েছে বাংলাদেশের (৯৭ পয়েন্ট) উপরে। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখন সপ্তম স্থানে। এই ছয়টি দেশের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয় থাকলেও হারের পাল্লা অনেক বেশি। ফলে বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি ও এশিয়া কাপের শিরোপা এখনো অধরাই রয়ে গেছে আমাদের। এশিয়া কাপ শুরু হয় ১৯৮৪ সালে। এ পর্যন্ত ১৩টি আসরের মধ্যে ভারত ৬ বার, শ্রীলংকা ৫ বার এবং পাকিস্তান ২ বার শিরোপা লাভ করেছে। বাংলাদেশের সাফল্য শুধু ২ বার ফাইনালে ওঠা। চ্যাম্পিয়নস ট্রফি অনুষ্ঠিত হয়েছে ৮ বার।

এই টুর্নামেন্টে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া ২ বার করে এবং পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১ বার করে শিরোপা জিতেছে। এর মধ্যে ২০০২ সালের আসরে ভারত ও শ্রীলংকা যৌথভাবে শিরোপা লাভ করে। ওই আসরের ফাইনাল ম্যাচ বৃষ্টিতে পণ্ড হয়ে যায় বলে দুই দলকেই চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করে আইসিসি। এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের সেরা সাফল্য হলো ২০১৭ সালের আসরে সেমিফাইনালে ওঠা। ওয়ানডের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও মর্যাদাপূর্ণ আসর হলো বিশ্বকাপ। যা ১৯৭৫ সালে শুরু হয়।

মোট ১২ বারের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া সর্বাধিক ৫ বার, ভারত ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২ বার করে এবং পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও ইংল্যান্ড ১ বার করে শিরোপা জিতেছে। সেখানে বাংলাদেশের সেরা সাফল্য হলো দুই বার সেরা আটে পৌঁছা। তাহলে অবস্থাটা কী দাঁড়াল? এশিয়া কাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি ও বিশ্বকাপ মিলে ৩৩টি আসরে বাংলাদেশের কোনো শিরোপা নেই। এই তিন ধরনের টুর্নামেন্টের একটি শিরোপা জয়ের যোগ্যতা থেকে বহু দূরে রয়েছে বাংলাদেশ। অতএব বোঝাই যাচ্ছে, বাংলাদেশকে ওয়ানডের সাফল্য পেতে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।

বাংলাদেশ ১৯৯৭ সালে আইসিসি কর্তৃক ওয়ানডে স্ট্যাটাস লাভ করে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ওয়ানডে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে ৩৯৭টি। এর মধ্যে জিতেছে ১৪৩টিতে আর হেরেছে ২৪৭টিতে। জয়-পরাজয় হয়নি ৭টিতে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দলগুলোর মধ্যে জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তান ছাড়া আর কোনো দেশের বিপক্ষে হারের চেয়ে জয় বেশি নেই বাংলাদেশের। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১০ জয়ের বিপরীতে ৩৮ হার, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৪ জয়ের বিপরীতে ২১ হার, ভারতের সঙ্গে ৫ জয়ের বিপরীতে ৩৬ হার, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১ জয়ের বিপরীতে ২১ হার, পাকিস্তানের বিপক্ষে ৫ জয়ের বিপরীতে ৩৭ হার, দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ৬ জয়ের বিপরীতে ২৪ হার, শ্রীলংকার বিপক্ষে ৯ জয়ের বিপরীতে ৫১ হার, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২১ জয়ের বিপরীতে ৪৪ হার, আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৭ জয়ের বিপরীতে ৪ হার রয়েছে বাংলাদেশের। এমনকি দুর্বল প্রতিপক্ষ কানাডা ও নেদারল্যান্ডসের মতো দলের বিপক্ষেও বাংলাদেশের জয়ের চেয়ে হার বেশি। 

তাহলে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশ এবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে ওয়ানডে সিরিজ জিতেছে বলেই যে বিশাল কিছু হয়ে গেছে, তা কিন্তু নয়। আর এ কথাও সত্য, বর্তমান ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল কিন্তু আগের মতো শক্তিশালী নয়। বলা যায়, খুবই দুর্বল একটি দল। ওয়ানডে ক্রিকেটের প্রচলনের সময় ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল ছিল বিশ্বসেরা। তারা প্রথম দুবার বিশ্বকাপের শিরোপা জেতে দুর্দান্ত খেলে। নানা অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে এখনকার ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল একটি দ্বিতীয় শ্রেণির দলে পরিণত হয়েছে। তাই তাদের বিপক্ষে সাফল্যকে বড় করে দেখার কোনো কারণ নেই।

তবে যে কোনো ম্যাচ জয় বা সিরিজ জয় অবশ্যই একটি পজিটিভ বিষয়। আর এটাতে অহংকারী না হয়ে কিংবা ‘মুই কি হনুরে’ না ভেবে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকা দলগুলোর বিপক্ষে জয়ের ধারাবাহিকতা তৈরি করা দরকার। যাতে করে বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে একটি বড় আসরে চ্যাম্পিয়ন হতে পারে।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //