পেঁয়াজের মারপ্যাঁচে বেসামাল বাংলাদেশ

ছবি: স্টার মেইল

ছবি: স্টার মেইল

পেঁয়াজ বাণিজ্য নিয়ে প্রতিশ্রুতি রাখছে না ভারত। দেশটির সরকারের সর্ব্বোচ্চ পর্যায় থেকে দেয়া প্রতিশ্রুতি ভুলে গিয়ে দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কোনো আগাম বার্তা ছাড়াই পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে। যা বাংলাদেশের বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। তাদের এই হঠকারি সিদ্ধান্তের মাশুল দিচ্ছে বাংলাদেশ।

২০১৯ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে বৈঠকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগে উভয় দেশ আগে থেকে অপরকে জানানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। একইভাবে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের বৈঠকে ভারত সম্মত হয় যে পণ্য বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দেয়ার আগে বাংলাদেশকে জানাবে। কিন্তু পেঁয়াজ রফতানির বিষয়ে সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে ভারত।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) যখন বাংলাদেশ বন্ধু রাষ্ট্র ভারতকে পূজার উপহার হিসেবে ১২ টন ইলিশ পাঠালো, ঠিক সেদিনই ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয়। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে জনমনে।

ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয়ার পরই দেশে একদিনেই পেঁয়াজের দাম এক তৃতীয়াংশ বেড়ে গেছে। গেলো সোমবার ঢাকার খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৬০ টাকা দরে বিক্রি হলেও তার পরদিন মঙ্গলবার বিক্রি হয়েছে ৯০ থেকে ১০০ টাকা দরে।

মঙ্গলবার কারওয়ান বাজারে পেঁয়াজ কিনতে আসা রাশেদুল হক বলেন, পেঁয়াজের ঝাঁজেই চোখের জল পড়ছে বেশি। পেঁয়াজ এখন এক আতঙ্কের নাম। কখন যে সবাইকে কাঁদায় তা এখন বলা মুশকিল।  

মেহেদি হাসান নামে এক ক্রেতা বলেন, একদিন আগে পেঁয়াজ কিনেছি ৬০ টাকায়, সেটা কীভাবে একরাতে ১০০ টাকা হয়? রফতানি বন্ধ হলেই বা কি, পেঁয়াজ তো আগেই কেনা। তাহলে দাম বাড়ে কীভাবে? আর যদি বিক্রেতারা দামই বাড়ান তাহলে প্রশাসনের কাজ কী? তারা কেন আটকাচ্ছেন না?

লিটন নামে একজন আক্ষেপ করে বলেন, রাতেই ফেসবুকে দেখেছিলাম পেঁয়াজ আসছে না ভারত থেকে। যখন দেখেছি তখন পেঁয়াজ কেনার মতো অবস্থা ছিলো না। যখন সকাল হলো তখন দেখি পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেছে। আমাদের দোকানদাররা দাম বাড়াতে ওস্তাদ।

জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২৩ লাখ মেট্রিকটন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়। তবে নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর প্রায় ১৯ লাখ মেট্রিকটন পেঁয়াজ থাকে। অথচ চাহিদা রয়েছে ৩০ লাখ মেট্রিকটন পেঁয়াজের। বাকি ১১ লাখ মেট্রিকটন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়, যার বেশিরভাগই আসে ভারত থেকে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, আমাদের ৫ লাখ টন পেঁয়াজ মজুদ আছে। আর এক মাস সময় পেলেই আমরা বিকল্প বাজার থেকে আমাদের প্রয়োজনীয় পেঁয়াজ আনতে পারবো।

তবে বাংলাদেশের ক্রেতারা ভয় পাচ্ছেন, পরিস্থিতি সামাল দেয়া না গেলে গত বছরের মতো এবারো পেঁয়াজের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গেলবার পেঁয়াজের দাম ৩০০ টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

বাংলাদেশের পেঁয়াজ আমদানিকারক এবং পাইকারি বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যাচ্ছে, বর্তমানে দেশে যে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে, তা দেশেই উৎপাদিত অথবা আগের স্বল্প মূল্যে কেনা পেঁয়াজ। কিন্তু ভারত থেকে আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নিজেদের হাতে থাকা পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন বিক্রেতারা।

ঢাকার শ্যামবাজারের একজন পাইকারি বিক্রেতা জি এস মানিক বলেন, এখন যারা বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন, এগুলো আসলে তাদের আগের কেনা। বাড়তি লাভ করার জন্য তারা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। তবে পেঁয়াজ আমদানির বেশিরভাগই হয় ভারত থেকে। সেখান থেকে আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই পেঁয়াজের দাম বাড়বে। কারণ মিয়ানমার, পাকিস্তান, তুরস্ক বা মিশর থেকে পেঁয়াজ আনতে হলেও তাতে সময় লাগবে।

তিনি বলেন, তবে গত বছরের মতো আকাশচুম্বী দামের দিকে পেঁয়াজ যাবে। এই বছর আমাদের একটা প্রস্তুতি আছে। গত বছরের পেঁয়াজ আমদানির অভিজ্ঞতাও আছে। এছাড়া দেশে যে মজুত আছে, তাতে আরো অন্তত দুইমাস চলবে। আমার মনে হয় না যে এইবার পেঁয়াজের দাম গত বছরের মতো হবে।

অযৌক্তিকভাবে বাড়তি দামে পেঁয়াজ বিক্রি করার কারণে পাইকারি বাজার শ্যামবাজারে মঙ্গলবার অভিযান চালিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। বেশ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে এই সময় জরিমানাও করা হয়েছে।

আমদানিকারকরা বলেন, ভারত যে পেঁয়াজ রফতানিকে নিষেধাজ্ঞা দেবে, সেটা তারা আগে থেকে কোনো ধারণা করতে পারেননি।

শ্যামবাজারের পবিত্র ভাণ্ডার নামের একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রধান হাজী হাফিজ মিয়া বলেন, আচমকা তারা এই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। কয়েকদিন ভারতের বাজারে দাম বাড়ছিল। কিন্তু তারা যে রফতানি বন্ধ করে দেবে, এমন কোনো আভাস পাইনি। বাংলাদেশের অনেক ব্যবসায়ীর পেঁয়াজ এখন ভারতের অভ্যন্তরে গাড়িতে আটকা পড়ে রয়েছে। অনেকে লেটার অব ক্রেডিট বা এলসি খুলেছেন, কিন্তু আনতে পারেননি।

পেঁয়াজ রফতানি নিষেধাজ্ঞায় ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কোনো কারণ উল্লেখ করেনি। তবে একটি গণমাধ্যমের সংবাদদাতা বলেন, ভারতের বাজারে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই পেঁয়াজের দামে যে অস্থিরতা চলছিল, তারই জের ধরে এই নিষেধাজ্ঞা।

তিনি বলেন, ভারতের রাজনীতিতে পেঁয়াজের দাম বড় একটি ইস্যু। এর জের ধরে অতীতে সরকার পতনের মতো ঘটনাও ঘটেছে। ফলে ভারতের সরকার কোনভাবেই চায় না যে, পেঁয়াজের দাম অনেক বেড়ে যাক। এ কারণেই গত বছর পেঁয়াজের দাম বাড়তে শুরু করলে সরকার নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, এই বছরেও তাই।

তিনি বলেন, বিশেষ করে গত বছর যখন পেঁয়াজ রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিল, তার কিছুদিন পরেই মহারাষ্ট্রের নির্বাচন ছিলো। এবার কিছুদিন পরেই বিহারের নির্বাচন রয়েছে। ফলে এই সময়ে পেঁয়াজের দাম নিয়ে কোন অসন্তোষ তৈরি হোক, সেটা সরকার চায় না। সবমিলিয়ে পেঁয়াজ রফতানি নিষেধাজ্ঞা দেয়ার ক্ষেত্রে এসব রাজনৈতিক হিসাব নিকাশ কাজ করেছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

গত একমাসে ভারতের মহারাষ্ট্রে পেঁয়াজের পাইকারি দাম তিনগুণ হয়ে গেছে। বিশেষ করে ভারি বর্ষণে কর্ণাটক এবং অন্ধ্রপ্রদেশে পেঁয়াজের চাষাবাদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমদানিকারকরা বলেন, ভারত রফতানি বন্ধ করে দেয়ার প্রভাব পড়েছে পেঁয়াজের আন্তর্জাতিক বাজারেও।

একদিনের ব্যবধানেই আন্তর্জাতিক বাজারে পেঁয়াজের দাম টন প্রতি ৫০ থেকে ১০০ ডলার বেড়ে গেছে। শ্যামবাজারের আমদানি কারক হাজী হাফিজ মিয়া বলেন, ভারত রফতানি বন্ধ করে দেয়ার পর আমরা মিয়ানমার, তুরস্ক, মিশর, পাকিস্তানে যোগাযোগ করছি। কিন্তু সেখানেও গতকালের চেয়ে আজ দাম বেড়ে গেছে। ভারতের বাজার বন্ধ, তাই এসব দেশের পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সবাই যোগাযোগ করছে। তারাও দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।

তবে এসব দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির বড় সমস্যা হলো, জাহাজে করে এসব পেঁয়াজ দেশে আনতে ২০ দিন থেকে শুরু করে একমাস সময় লাগে। এমনকি সীমান্ত বন্ধ থাকায় বাংলাদেশের আরেক প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের পেঁয়াজ আনতে হলেও সিঙ্গাপুরে ঘুরে আনতে হবে, যে কারণে তাতেও তিন সপ্তাহের মতো সময় লাগতে পারে।

অনেক আমদানিকারক মিয়ানমার, পাকিস্তান, মিশর এবং তুরস্কের সঙ্গে যোগাযোগ করে এর মধ্যেই এলসি খুলতে শুরু করেছেন। আবার কোনো কোনো আমদানিকারকদের আশঙ্কা, তারা এসব দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির এলসি খোলার পর, এই একমাসের মধ্যে যদি ভারত তাদের বাজার আবার খুলে দেয়, তাহলে তাদের অনেক লোকসান হবে। কারণ বাংলাদেশের বাজারে দেশি পেঁয়াজের পরই ভারতীয়, মিয়ানমার বা পাকিস্তানের পেঁয়াজের চাহিদা বেশি।

শ্যামবাজারের ব্যবসায়ী রফিক হাজী বলছেন, আমি এখন মিসর বা তুরস্ক থেকে পেঁয়াজ আমদানি করতে গেলাম। তিন সপ্তাহ পর ভারত আবার বাজার খুলে দিলো। তখন তো আমি এসব পেঁয়াজ বেঁচতে পারবো না। তাই অনেক ব্যবসায়ী অন্য দেশ থেকে এলসি খোলার সাহসও পাচ্ছেন না।

তিনি পরামর্শ দেন, সরকার যদি এই নিশ্চয়তা দেয় যে, তখন তারা পেঁয়াজ কিনে নেবে বা রফতানি চালু করা হলেও বাংলাদেশের তরফ থেকে ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানিকে বিধিনিষেধ দেয়া হবে, তাহলে তারা ঝুঁকি নিতে পারেন।

গত বছর সেপ্টেম্বরের ২৯ তারিখে ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয়ার পর বেসরকারি আমদানিকারকদের পাশাপাশি নিজেরাও পেঁয়াজ আমদানি করে সামাল দেয়ার চেষ্টা করেছিল সরকার। কিন্তু তারপরেও ৩০ টাকা থেকে পেঁয়াজের দাম ৩০০ টাকায় উঠে যাওয়া বন্ধ করা যায়নি।

সরকারিভাবে কম দামে খোলা বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে সরকার। পাশাপাশি ভারত ছাড়াও বিকল্প বাজারের খোঁজ নিতে শুরু করেছে।

বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা বিকল্প বাজার থেকে পেঁয়াজ আমদানি করার চেষ্টা করবো। গত বছর থেকে আমাদের তো কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে। মায়ানমার, টার্কি, ইজিপ্ট, চায়না থেকে। বাইরে থেকে আমদানি করা সম্ভব হলে পরিস্থিতি ভালো হবো। তবে গত বছরের মতো পরিস্থিতি এবার হবে না। কারণ দেশে তো পর্যাপ্ত পেঁয়াজ রয়েছে। হয়তো ৩০/৪০ টাকা হবে না, কিন্তু গত বছরের মতো অতো দামেও বিক্রি হবে না। আমরা বিভিন্ন বাজারে খোঁজ নিচ্ছি। আশা করছি, অন্যান্য জায়গা থেকে পেঁয়াজ এনে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবো।

সরকারি বিক্রয় প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবির) মুখপাত্র মো. হুমায়ুন কবির বলেন, আমরা বেশ কিছুদিন ধরেই ২৮৫টি পয়েন্টে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করছি। সেই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি অন্যান্য দেশ থেকেও পেঁয়াজ আমদানির যে নিয়মিত প্রক্রিয়া, সেটাও অব্যাহত রয়েছে।

তবে যে যতই আশা দিক না কেন সাধারণ মানুষ এখন এক প্রকার পেঁয়াজ নিয়ে ভয়েই আছে। ক্রেতারা জানান, একবারে উচ্চবিত্ত ছাড়া দেশে যেকোনো জিনিসের দাম বাড়লে মানুষকে সেটি ভোগায়।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh