ইলিশের উৎপাদন দ্বিগুণ : সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে

পহেলা বৈশাখের অন্যতম অনুষঙ্গ হচ্ছে ইলিশ।  বৈশাখকে ঘিরে প্রতি বছরই ইলিশের দাম চড়া থাকে। প্রতি বছর এ নিয়ে ক্রেতাদের ক্ষোভ থাকে। গত বছর করোনার প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে লকডাউন শুরু হলে পহেলা বৈশাখ ঘিরে ইলিশ নিয়ে তেমন মাতামাতি ছিল না।

এ বছরই পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু হচ্ছে তৃতীয় দফা লকডাউন। ক্রেতা-বিক্রেতা সবার মধ্যে এক ধরনের হতাশা বিরাজ করছে। 

রাজধানীর কারওয়ান বাজার, শান্তিনগর, ঠাটারি বাজার ও জুরাইন মাছের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বৈশাখ ঘিরে প্রচুর ইলিশ উঠলেও দাম যেমন চড়া, তেমনি ইলিশ ক্রেতাশূন্য বাজার। বিক্রেতারা জানান, লকডাউনের কথা শুনে এখন সবাই অন্য কেনাকাটায় বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। আর ক্রেতারা বলেন, এমনিতেই বৈশাখকে ঘিরে প্রতি বছর ইলিশের দাম বেশি থাকে। এবারও তাই। যে দাম দিয়ে ইলিশ কেনা হবে, তার চেয়ে অন্য কিছু কেনাই অনেক শ্রেয় মনে হচ্ছে। এ দিকে মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত দশ বছরে ইলিশ উৎপাদন বেড়েছে দ্বিগুণ; কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ইলিশ নেই । 

ঠাটারি বাজারের মাছ বিক্রেতা জসিম মিয়া বলেন, গত ১০/১৫ দিন ধরে বরফ দিয়ে ইলিশ মাছ হিমায়িত করে রেখেছি; কিন্তু দেখছি এখন বরফের দামও উঠবে না। ইলিশ মাছ কেনায় ক্রেতার আগ্রহ নেই। এ জন্য অবশ্য তারা করোনাভাইরাসকে দায়ী করছেন। 

কারওয়ান বাজারে কথা হয় মাছ ক্রেতা ইদ্রিস আলীর সঙ্গে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, মানুষের আনন্দ যেমন করোনা কেড়েছে, তেমনি বিক্রেতাও মাছের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। এখানে জোড়া চাচ্ছে ১২০০ টাকা করে। এখন এই দুঃসময়ে সাধ থাকলেও এত দাম দিয়ে ইলিশ কেনার ইচ্ছে নেই। 

এসব বাজারে অন্য বছরের বৈশাখের তুলনায় সামান্যই দাম বেড়েছে ইলিশের। বর্তমানে প্রতি এক কেজি ওজনের ইলিশ ১১৫০ থেকে ১২৫০ টাকা, প্রতি ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৯৫০ থেকে ১০৬০ টাকা, ৭৫০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা, প্রতি ৫০০ গ্রাম ইলিশ ৭৫০ টাকা এবং জাটকা বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে।

শাহাদাৎ হোসেন ১৫ বছর ধরে জুরাইন বাজারে মাছ বিক্রি করেন। তিনি বলেন, আমার জীবনের মাছ ব্যবসাকালে ইলিশ মৌসুম এত খারাপ কখনো দেখিনি। এবার বাজারে ক্রেতাই নেই, যারা আসছেন তাদের ইলিশ মাছের প্রতি আগ্রহ নেই। অনেকে মনে করছেন উৎসব নেই তো ইলিশ খাব কেন? 

মৎস্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত দশ বছরে ইলিশের উৎপাদন প্রায় ৭৯ শতাংশ বেড়েছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে জাতীয় এ মাছটির উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৯৮ হাজার টন। সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ ৫০ হাজার টন। এ সময়ে উৎপাদন বেড়েছে ২ লাখ ৫২ হাজার টন। একই সঙ্গে এই সময়ে ইলিশ উৎপাদনের গড় প্রবৃদ্ধি প্রায় ৭ দশমিক ১১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে (২০২০-২১) উৎপাদন ৬ লাখ টনে পৌঁছাবে বলে জানিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।

বাংলাদেশে ২০০৩-০৪ সাল থেকেই জাটকা রক্ষার কর্মসূচি শুরু করা হয়। তখন থেকেই আস্তে আস্তে ইলিশের উৎপাদন বাড়ছিল। ২০০৮ সাল থেকে প্রথম আশ্বিন মাসে পূর্ণিমার আগে-পরে মিলিয়ে ১১ দিনের ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। তখন থেকেই এর সুফল দেখতে শুরু করেন গবেষকরা। 

মৎস্য কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে শুধু ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে তাই নয়, প্রচুর বড় বড় ইলিশও ধরা পড়ছে। বেশি ওজনের ইলিশ এখন পাওয়া যাচ্ছে। সাগর ও নদ-নদীতে ধরা পড়া ইলিশের গড় ওজন গত তিন বছরে ৩৫০ গ্রাম বেড়েছে। আবার ১০ বছর আগে দেশের ২৪টি উপজেলার নদীতে যেখানে ইলিশের বিচরণ ছিল, সেখানে এখন প্রায় ১২৫টি উপজেলার নদীতে ইলিশ বিচরণের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। এর সবই সম্ভব হচ্ছে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে।

সম্প্রতি মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ও ওয়ার্ল্ড ফিশের এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত ১০ বছরে দেশে ইলিশের গড় ওজন বেড়েছে প্রায় ৩৫০ গ্রাম। পাঁচ বছর আগে ধরা পড়া ইলিশের অর্ধেকই ছিল ছোট ও মাঝারি আকৃতির। বড় ইলিশ পাওয়া যেত ২০-৩০ শতাংশ। চলতি বছর এ পর্যন্ত ধরা পড়া ইলিশের ৭০ শতাংশের ওজন ৫৫০ থেকে ১ হাজার ২৫০ গ্রাম, এর মধ্যে ৫৫০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ হচ্ছে ৫৫ শতাংশ। এক কেজি থেকে ১ হাজার ২৫০ গ্রাম ওজনের ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে ১৫ শতাংশ। গত বছর ৮৭০ গ্রাম গড় ওজন এর বিপরীতে এবার ইলিশের গড় ওজন ৯১৫ গ্রাম বেশি দাঁড়িয়েছে। 

চট্টগ্রামের মীরসরাই থেকে শুরু করে ভোলার লালমোহন উপজেলা পর্যন্ত ইলিশের সবচেয়ে বড় প্রজনন ক্ষেত্র। বিশেষ করে মনপুরা, ঢালচর, বালিরচর, মৌলভীরচর-এগুলো হচ্ছে ইলিশের ডিম ছাড়ার সবচেয়ে বড় পয়েন্ট। চট্টগ্রাম, ভোলা, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, চাঁদপুর, পটুয়াখালী, বরগুনা মিলিয়ে প্রায় ৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় ইলিশ মাছ সবচেয়ে বেশি ডিম ছাড়ে। এর বাইরে উপকূলের অন্যান্য নদীতেও ইলিশ ডিম ছাড়ে। 

মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ ব্যবস্থাপনা শাখার সহকারী পরিচালক মাসুদ আরা মমি বলেন, ইলিশের অভয়াশ্রমগুলোতে জাটকা ধরা এবং নিষিদ্ধ সময়ে মা ইলিশ ধরা বন্ধ করার কারণে ধারাবাহিকভাবে ইলিশের উৎপাদন বাড়ছে। শুধু তাই নয়, বেশি ওজনের ইলিশও এখন পাওয়া যাচ্ছে। সরকারের দিক থেকে এ বিষয়ে জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য উদ্দীপনামূলক প্রচারাভিযান চালানো হবে।

মৎস্য বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, এক সময় ১১ দিন ইলিশ ধরা বন্ধ ছিল, পরে ১৫ দিন বন্ধ ছিল, এখন ২২ দিন ইলিশ ধরা বন্ধ। নিষিদ্ধ সময়ে মা ইলিশ ধরা ঠেকাতে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি জেলেদেরও মানসিকভাবে এই কার্যক্রমে যুক্ত করে উপকূলীয় এলাকায় প্রচারকাজ চালাতে হবে। যাতে জেলেরা নিজেরাই নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিরত থাকেন।

কিন্তু তিনি অভিযোগ করে আরও বলেন, ইলিশের উৎপাদন বাড়লেও দাম কিন্তু জনসাধারণের নাগালের মধ্যে নেই। বিভিন্ন উৎসবকে ঘিরে ইলিশের দাম ঠিকই বেড়ে যাচ্ছে। মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্তরা ইলিশ কিনতে পারছে না। তাদের অনেকেই জাটকা কিনেই সন্তুষ্ট থাকেন। 

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ইলিশবিষয়ক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিসুর রহমান বলেন, যে কাজ ২০০৩ সাল থেকে আমরা করছি, তার ফল কিন্তু খুব ভালোভাবে এখন দেখা যাচ্ছে। এদের বিচরণভূমি বেড়ে গেছে। এখন পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র এমনকি হাওরে পর্যন্ত ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। তার মানে সংরক্ষণের প্রভাব পড়ছে। 

তিনি আরো বলেন, ১০ বছর আগে দেশের ২৪টি উপজেলার নদীতে ইলিশের বিচরণ ছিল। এখন দেশের অন্তত ১২৫টি উপজেলার নদীতে ইলিশের বিচরণের প্রমাণ পাওয়া গেছে।


মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh