দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে দিশেহারা মানুষ

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

করোনার কারণে মানুষের আয় যখন কমার পর্যায়ে, সেই সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। চাল, ডাল, সয়াবিন তেল, আটা, চিনি, তরকারি, মাছ, মাংসের দাম দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মধ্যবিত্ত, দরিদ্র, খেটে খাওয়া ও অসহায় মানুষ দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন- এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মতে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এক মাসে প্রায় ১৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেড়েছে, এক মাসের ভেতর দ্রব্যমূল্যের দাম এতটা বাড়তে আগে কখনোই দেখা যায়নি বলে দাবি সংস্থাটির। গত মাসে যেখানে ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল ১৩৫ থেকে ১৪৫ টাকা কেজি, সেখানে এক মাস না যেতেই কেজিতে প্রায় ৪০-৪৫ টাকা দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ১৭৫ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এসব মুরগি। 

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মোহাব্বত হোসেন নামে এক ব্যক্তি জানান, তার সন্তান মাছের তুলনায় মুরগি খেতে বেশি পছন্দ করে। মুরগির দাম বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্কিত তিনি। তার মতো স্বল্প বেতনে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তির পক্ষে মুরগি ছাড়া অন্য যে কোনো মাংস প্রতিনিয়ত কেনা সম্ভব নয় বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। 

রাজধানীর কারওয়ান বাজার, হাতিরপুল, পলাশী, নিউমার্কেট কাঁচাবাজার ঘুরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, ক্রেতা ও খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে। 

বাজারগুলো ঘুরে আরও জানা গেছে, শীত শুরুর আগেই বাজারে এসে গেছে শীতকালীন সবজি। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বস্তি মিলছে না দামে। রাজধানীর অধিকাংশ সবজির বাজারে ঊর্ধ্বমুখী দামের কারণে ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষ স্পষ্ট দেখা গেছে। সোয়াবিন তেল ১৩০-১৪০, পেঁয়াজ ৮০-১০০, ঝিঙ্গা ৬০ থেকে ৮০, চিচিঙ্গা ৫০, বরবটি ৮০, পটোল ৫০ থেকে ৮০, ঢেঁড়শ ৬০, ধুন্দল ৫০, আকার ও জাত ভেদে বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে এবং আকার ভেদে লাউ ৫০ থেকে ৮০ টাকায়, চালকুমড়া ৫০ টাকা পিস। এ ছাড়া ক্যাপসিকাম ২৪০, শিম ১০০ থেকে ১৪০, টমেটো ১৪০ থেকে ১৬০, ফুলকপি প্রতি পিস ৫০, বাঁধাকপি ৫০ এবং লতি ৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচামরিচ ১৬০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ডিমের দাম কমলেও মাছ, মাংস আর তেলের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে অস্বাভাবিক ভাবে। 

বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে আগাম শীতকালীন সবজি উঠছে। তাই দামও একটু বেশি। তবে শীত শুরু হয়ে গেলে এ দাম আর থাকবে না। তখন সাধারণ ক্রেতার নাগালেই থাকবে সবজির দাম। মাংসের দামে অস্বস্তি থাকলেও দাম বাড়ার যুক্তি দিচ্ছেন না বিক্রেতারা।

জুরাইন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আড়াইশ গ্রাম মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায়। মরিচের ঝালের সঙ্গে ক্রেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে পেঁয়াজ। পেঁয়াজের দাম ইতিমধ্যে ৭০ টাকায় উঠে গেছে। দেশি ছোট রসুনের কেজি ৬০ টাকা হলেও, দেশি বড় রসুন ৮০ টাকা; কিন্তু ইন্ডিয়ান রসুনের দাম দেড়শ’ টাকা কেজি। 

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েছেন। আবার স্বল্প আয়ের মানুষগুলোও সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এ শহরে ১০ হাজার টাকা মাসিক আয় করেন এমন লোক অনেক। তাদের দিনযাপনের কাহিনী খুবই করুণ। এ-বাড়ি ও-বাড়ি কাজ করে যেসব নারী গৃহশ্রমিক, যার আয়ে পুরো সংসার চলে; ছেলেমেয়েরা স্কুলে যায়; বাসা ভাড়া দিয়ে খোরাক জুটিয়ে আয়ের পয়সায় তাদের চলে না। শ্রমজীবী এসব মানুষ সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েছেন। নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণিরও আয় কমেছে; কিন্তু বেড়েছে ব্যয়ের মাত্রা। এ ব্যয় সামাল দিতে ধার-দেনা করে সংসার চালাতে তাদের নাকাল হতে হচ্ছে। ফলে তাদের পক্ষে সংসার সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) বলছে, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতার কারণে চাল, আলু আর পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। এই সিন্ডিকেট কেন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না সরকার? সিন্ডিকেট কি সরকারের চেয়েও শক্তিশালী? 

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. এম আসাদুজ্জামান বলেন, যারা নীতিনির্ধারক তাদের সঙ্গে এদের কোথাও না কোথাও সম্পর্ক আছে। সেটা লেনদেনের সম্পর্ক। তা না হলে এটা হতে পারে না। কেউ তো তাদের কন্ট্রোল করছে না। আপনি যদি তার কাছ থেকে সুবিধা পান, তাহলে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে?

সরকারের পক্ষ থেকে খোলাবাজারে চাল-আটা বিক্রি হয়। এ ছাড়া টিসিবির উদ্যোগে তেল, চিনি, ডাল ও পেঁয়াজ বিক্রি করা হয়। বাজারের থেকে কম দামে পাওয়ায় টিসিবির ট্রাক ও ওএমএসের দোকানের সামনে তাই সকাল থেকেই লাইন পড়ে যায়। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে খোলাবাজারের ট্রাক থেকে চাল ও আটা কিনতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্তদের। ৫ কেজি চাল ও ৩ কেজি আটা কিনতে প্রচণ্ড রোদের মধ্যেও লাইনে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকেন তারা। অল্প কিছু টাকা সাশ্রয় হবে, এ আশায় লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য হচ্ছেন মধ্যবিত্ত এসব মানুষ। 

টিসিবির পণ্য কিনতে আসা এক ব্যক্তি বলেন, এটি আমার জন্য অপমানজনক; কিন্তু অন্য কোনো বিকল্প নেই আমার। খাবারের দাম বাড়ার পর থেকে তার পরিবারের সদস্যরা খাওয়া অর্ধেক করে দিয়েছে। মাংস খাওয়া একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছে।

বিক্রেতারা জানান, আগে ট্রাকসেলে কম দামে নিত্যপণ্য কিনতে আসতেন নিম্নআয়ের মানুষ; বিশেষ করে দিনমজুর, রিকশাচালক, গাড়িচালক কিংবা গৃহকর্মী। তবে এখন সেই লাইনে পণ্য কিনতে মধ্যবিত্তরা ভিড় করছেন, যা তাদের জন্য বাড়তি চাপও বটে। আমরা সাধারণত স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে বিক্রি করি। এখন চিত্র ভিন্ন। সাধারণ বাজার থেকে কম বলে অনেকে ভিড় করছেন। আগে আমাদের মালামাল বিক্রি কার্যক্রম শেষ করতে সন্ধ্যা হয়ে যেত। এখন ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে সব শেষ হয়ে যায়। আমাদের বরাদ্দ চাহিদার চেয়ে অনেক কম বলে অনেকে না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //