তেলের তেলেসমাতিতে দুর্বিসহ জনজীবন

জনজীবনের নিত্যদিনের আবশ্যক পণ্য সয়াবিন তেল নিয়ে কারসাজি শেষই হচ্ছে না। হঠাৎ হঠাৎ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে পণ্যটির দাম। সর্বশেষ একলাফে পণ্যটির দাম প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ প্রায় ৪০ টাকা বেড়েছে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে প্রতি বছর ১৮ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। মূলত আমদানির মাধ্যমেই এই চাহিদা পূরণ করা হয়। আমদানি থেকে শুরু করে বাজারজাত মূলত বড় বড় ৪টি গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। বিভিন্ন সময় কারসাজি করে ওই গ্রুপগুলো তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে সর্বশেষ দাম বৃদ্ধির জন্য ডিলার-ব্যবসায়ীদের দায়ী করছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং সরকারের তদারকির ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে নানা অজুহাতে দফায় দফায় তেলের দাম বাড়ানো হচ্ছে। এতে নিত্যদিনের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন ভোক্তারা। 

সম্প্রতি মিল মালিকদের সাথে বৈঠক করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এরপর নতুন করে তেলের দাম নির্ধারণ করে, তা কার্যকর করেছে ভোজ্যতেল পরিশোধন ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। নতুন দর অনুযায়ী, বোতলজাত প্রতি লিটার সয়াবিনের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯৮ টাকা। এক সপ্তাহ আগে বোতলজাত প্রতি লিটার সয়াবিন তেল বাজারে ১৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। দাম বাড়ানো হয়েছে ৩৮ টাকা। এক বছর আগে এই তেলের দাম ছিল লিটার প্রতি ১৩৫ টাকা। এই হিসেবে দাম বেড়েছে ৬৩ টাকা। 

এছাড়া খোলা সয়াবিন তেলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি লিটার ১৮০ টাকা। তার আগে দাম ছিল ১৪০ টাকা। এক সপ্তাহে দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ টাকা। ঠিক এক বছর আগে দাম ছিল ১১৮ টাকা প্রতি লিটার। লিটার প্রতি দাম বেড়েছে ৬২ টাকা। অন্যদিকে পামতেলে দাম ১৩০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৭২ টাকা। এক বছর আগে এই দাম ছিল ১০৭ টাকা প্রতি লিটার। এই হিসেবে দাম বেড়েছে ৬৫ টাকা। 

সয়াবিন তেল নিয়ে ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা কারসাজি করেছেন বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। তিনি বলেন, ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের কারচুপির কারণে বাজারে সয়াবিন তেলের সংকট তৈরি হয়েছে এবং দামও বেড়েছে। 

টিপু মুনশি আরো বলেন, ‘বাজারে সয়াবিন তেলের সংকট কেন তৈরি হলো, আমরা তা খুঁজে পেয়েছি। এই কারচুপি বড় গ্রুপের কেউ করেনি। করেছে ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। যারা কারসাজি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। ডিলারশিপ বাতিল করতে মালিকদের বলেছি।’ 

বাণিজ্যমন্ত্রী আরো বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের আমি বিশ্বাস করে বলেছিলাম আপনারা দাম বাড়াবেন না; কিন্তু তারা দাম বাড়িয়েছে। তাদের ভালোবেসে বিশ্বাস করেছিলাম যে, আপনারা দাম বাড়াবেন না; কিন্তু তাদের বিশ্বাস করা ছিল আমার ব্যর্থতা। এভাবে বলা আমার ঠিক হয়নি। আগামী জুন মাস থেকে এক কোটি পরিবারকে সুলভমূল্যে তেল দেওয়া হবে টিসিবির মাধ্যমে। আপাতত টিসিবির তেলের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই। প্রতি লিটার তেল ১১০ টাকা করেই বিক্রি হবে। তেল নিয়ে সিন্ডিকেট হয়নি। তবে খুচরা ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিয়েছেন।’

তবে বৃদ্ধির ব্যাখ্যায় বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে, তাই আমাদের দেশেও বাড়বে, এটা অঙ্ক। এই দাম বাড়ার কথা ছিল রোজার আগেই; কিন্তু সরকার চায়নি রোজায় তেলের দাম বাড়ুক। সেই সময়ে কিছু অসাধু ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ী তেল মজুদ করে রেখেছিল। সে জন্য বাজারে তেলের সংকট তৈরি হলো।

সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দেশের বাজারের ভোজ্যতেলের চাহিদা বছরে ২৫ লাখ টনের কিছু বেশি। এর মধ্যে সয়াবিন তেলের চাহিদা ১২ লাখ টন। চাহিদার মধ্যে ৮ লাখ টনই আমদানি করা হয়। বাকিটা সয়াবিন বীজ মাড়াই করে তেল উৎপাদন করা হয়। পামতেলের চাহিদা ১৩ লাখ টনের মতো। যার পুরোটাই আমদানি করা হয়। এর মধ্যে ৯০ শতাংশই আসে ইন্দোনেশিয়া থেকে। বাকিটা মালয়েশিয়া থেকে আমাদানি করা হয়। সয়াবিন তেল আমদানি করা হয় মূলত ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা থেকে। 

ভোজ্যতেল আমাদানি থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ মূলত ৪টি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। চট্টগ্রামভিত্তিক টি কে গ্রুপ, সিটি, এস আলম ও মেঘনা গ্রুপের অধীনে আমদানির ৯০ শতাংশই সম্পন্ন হয়ে থাকে।

ভোজ্যতেল বাজারের সিংহভাগ পাম অয়েলের দখলে থাকলেও বাসাবাড়িতে বোতলজাত সয়াবিন তেলের চাহিদাই বেশি। পাম অয়েল, সয়াবিন তেল অপরিশোধিত ও পরিশোধিত আকারে আমদানি হয়। অপরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করা ভোজ্যতেল স্থানীয়ভাবে পরিশোধনের পর বাজারজাত করা হয়। দেশের বাজারে ব্যবহার ও আমদানির বেশি হয় প্রধানত পামঅয়েল। তবে গত এক বছরে সবচেয়ে বেশি শুল্কায়ন হয়েছে ১১ লাখ ৫২ হাজার ৩৫১ টন পরিশোধিত (রিফাইন্ড) পাম অয়েলের। এর পরই রয়েছে অপরিশোধিত (ক্রুড) সয়াবিন ৬ লাখ ৬৯ হাজার ৩২২ টন।

বাজার সিন্ডিকেটের বিষয়ে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক সৈয়দ আহসানুল আলম বলেন, তেলের যে চাহিদা সেটা আট থেকে দশ জন ব্যবসায়ীর হাতে জিম্মি করা যায় না। এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। বাজার ব্যবস্থা তথা প্রাইজ ম্যানেজমেন্ট ডিজিটাল মার্কেট ইনফরমেশন চালু করতে হবে। 

তবে মিল মালিকদের দাবি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে তেলের আন্তর্জাতিক বাজার অস্থির। যুদ্ধের আগে টনপ্রতি দাম ১৬শ’ ডলার থাকলেও সম্প্রতি তা উঠেছে সাড়ে ১৯শ’ ডলারে। 

খাতুনগঞ্জ আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সেক্রেটারি মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ বেশ কয়েকটি কারণে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দামে অস্থিরতা চলছে। তবে আমাদের দেশে প্রথম থেকেই বিষয়টি খেয়াল করে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় করে পর্যায়ক্রমে দাম বাড়ালে এখন হুট করে এক লাফে এত দাম বাড়াতে হতো না। আর মানুষের মধ্যেও এভাবে অসন্তোষ তৈরি হতো না। 

তিনি আরো বলেন, ‘সরকার রমজানের আগে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ব্যাপকভাবে সয়াবিন তেল সংগ্রহ করে টিসিবির মাধ্যমে মানুষকে দিয়েছে। আর বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানিকারকদের অনেকেই আর এলসি খোলেননি। যার কারণে সরবরাহ চেন ভেঙে পড়েছে। ২০০৮ সালেও এ রকম একটা সংকট তৈরি হয়েছিল ভোজ্য তেলের বাজারে। তখন সরকারের আশ্বাসে অনেক ব্যবসায়ী তেল আমদানি করেন।’

বাজারে সয়াবিন, সরিষা, সূর্যমূখী, রাইসব্রান্ডসহ বিভিন্ন ধরনের তেল পাওয়া যায়। তবে দামে সস্তা হওয়ায় সয়াবিন জনপ্রিয়। তবে সেই সস্তাটি পণ্যটি ধীরে ধীরে নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। দাম বাড়াতে সময়ে সময়ে নানা অপকৌশল তৈরি করা হচ্ছে। ঈদে আগে চরম প্রয়োজনের সময় সয়াবিন তেল বাজার থেকে গায়েব করে দেওয়া হয়। দোকানের পরিবর্তে বাড়িতে বা গুদামে সয়াবিন তেল লুকিয়ে রাখা হয়। দাম বাড়ানোর পর আবার বিক্রি শুরু হয়েছে। 

এ বিষয়ে আজিমপুরের বাসিন্দা সর্ব রানী রায় বলেন, বাজারে দৈনন্দিন খাবারের সাথে আপ্যায়নের রান্নাবান্নায়ও তেলের ব্যবহার চলে; কিন্তু বাজারে তেল কিনতে পাওয়া যায় না। এখন দাম বাড়িয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। নিজেদের রান্নায় সাশ্রয়ের কথা ভাবলেও, প্রতি সপ্তাহে বা মাসে কয়েকদিন করে আত্মীয়-বন্ধুও আসে, কাজেই চাইলেই তেলের ব্যবহার কমিয়ে ফেলা যাচ্ছে না। ফলে খরচও কমছে না।

এ দিকে ঢাকার মিরপুরের স্কুল শিক্ষক সানজানা হক নিধি অভিযোগ করে বলেন, তেলের দামের সাথে সাথে বাজারের অন্যান্য জিনিসপত্রের দামও ক্রমেই বাড়ছে। এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে কেবল নিম্ন আয়ের মানুষ নয়, তাদের মতো মধ্যবিত্তদেরও রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে।

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //