কয়েদি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি অবরোধের পর থেকে রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে যে বিপুল পরিবর্তন ঘটে, ফিলিপাইনের সাহিত্যে তার প্রতিফলন স্পষ্টই চোখে পড়ে। এই সময় বাস্তববাদী সমাজ-ভাবনায় উদ্বুদ্ধ যে সমস্ত তরুণ সাহিত্যিক নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেন, রোজেলিও সিকাত তাঁদের অন্যতম। জন্ম ১৯২৭ সালে, আতেনিও শহরে। পেশায় সাংবাদিক। তাগালগ এবং ইংরেজি উভয় ভাষাতেই সাহিত্যচর্চা করতেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পসংকলন দুটি হলো- ‘নতুন দিগন্ত’ এবং ‘নির্জন মরুদ্যান’।

প্রথমে পৌরভবন প্রাঙ্গণে ভিড় খুব কমই ছিল; কিন্তু বেলা যত বাড়তে লাগলো, কাবেসাং তানোর খুন হওয়ার খবরটা যত ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। মানুষের ভিড়ে পৌরভবন প্রাঙ্গণ ততই উপচে উঠতে শুরু করলো। ঠেলাঠেলি, হুড়োহুড়ি করে জেলফটকের সামনে যাবার জন্য সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠেছে।

‘কথাটা কী সত্যি, তাতা সেলো?’

‘জমি থেকে উনি আমাকে উচ্ছেদ করতে চেয়েছিলেন, তাই আমি ওঁর গলায় কাস্তের কোপ বসিয়ে দিয়েছি।’

জেলখানার অ তাতা সেলো, একজন বৃদ্ধ চাষি, লোহার গরাদ শক্ত করে অ রয়েছে। তার কপালে হাঁ-হয়ে থাকা ইঞ্চি খানেক লম্বা গভীর একটা ক্ষত-চিহ্ন। অন্ধকার হাতড়ে বেড়ানো মানুষের মতো উদাস দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে রয়েছে, ঝাপসা চোখের কোণ থেকে টুপটাপ ঝরে পড়ছে অশ্রুধারা। তার পরনে কনুই আর পিঠের কাছে তালি দেওয়া জীর্ণ জামা এবং টেকসই সাদা নুনের বস্তা থেকে তৈরি হাঁটু পর্যন্ত লম্বা প্যান্ট, তাতে শুকিয়ে যাওয়া কাদার ছোপ ছোপ দাগ। অন্য একজন চাষি তার সঙ্গে কথা বলছে। লোকটার জমি তাতা সেলোর জমির প্রায় লাগোয়া। বিশৃঙ্খল মানুষের ভিড় সামলানো পুলিশ বেষ্টনী ভেদ করে সে কোনো রকমে সামনে পৌঁছুতে পেরেছে।

চাষিটা মাথা নাড়তে নাড়তে বলল- ‘আমি কিন্তু বিশ্বাস করতে পারছি না, সত্যিই আমি বিশ্বাস করতে পারছি না তাতা সেলো!’

কপালের ক্ষতচিহ্নে তাতা সেলো কাঁপা কাঁপা হাতে আঙ্গুল বোলাল। রক্ত এখন জমাট বেঁধে গেছে। জেলখানা থেকে একটু দূরে, তার ঠিক সামনেই, সেপাইরা চেঁচিয়ে পেছনে ঠেলে তাকে দেখতে চাওয়া মানুষদের ভিড় সামলাচ্ছে। তাদের মাথার ওপরে সূর্যের জ্বলন্ত উত্তাপ। কোথাও এতটুকু বাতাস বইছে না। পায়ে পায়ে উড়ছে ধুলোর মেঘ।

ব্যথাহত স্বরে তাতা সেলো বলল- ‘কেন উনি আমাকে আমার জমি থেকে উচ্ছেদ করতে চাইলেন? আমি কী ওঁকে কখনো ঠকিয়েছি, ওঁর ভাগ কম দিয়েছি? কথাটা কী সত্যি নয় যে ফসল কাটার সময় কাউকে আমি এক আঁটিও খড় দিই না বলে অনেকেই আমাকে অপছন্দ করে?’

গরাদঘেরা জেলখানার সামনে তাতা সেলো একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার দৃষ্টি রয়েছে বাইরের দিকে; কিন্তু কোনো কিছু বা কাউকেই লক্ষ্য করছে না। 

‘কাবেসাকে কাস্তের কোপ বসানো তোমার উচিত হয়নি।’ কথাটা বলল একজন তরুণ, সান রোকোয়ের এক ধনী জমিদারের ছেলে, পরিচয়সূত্রে যার পুলিশ বেষ্টনী আর জেলখানার অ অবাধে ঘুরে বেড়াতে কোনো বাধা নেই। ছেলেটি বেশ লম্বা, পরিষ্কার গায়ের রঙ, চোখে রোদ-চশমা, পরনে খেলোয়াড়দের মতো দামি লাল বুক- খোলা শার্ট। কোমরে হাত রেখে, ধূমপান করতে করতেই সে তাতা সেলোর সঙ্গে কথা বলছিল।

তাতা সেলো তরুণটির দিকে তাকালো।

অনুযোগের সুরে সে বলল- ‘উনি আমাকে জমি থেকে তাড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন, ক্ষেত-খামারে কাজ করতে না পারলে কোথায় যাবো বলুন?’

ভাবভঙ্গি এবং চেহারা দেখে স্পষ্টই বোঝা যায় ধনী তরুণটির বয়েস কুড়ির বেশি নয়। ভারিক্কি চালে সে বলল- ‘কাবেসাকে খুন করার সেটাই যথেষ্ট কারণ হতে পারে না। ওঁর জমি তুমি চাষ করো। উনি চাইলে যে কোনো সময়েই তোমাকে জমি থেকে তাড়াতে পারেন।’

তাতা সেলোর শীর্ণ মুখখানা গরাদের ফাঁক দিয়ে প্রায় বেরিয়ে এসেছে।

‘হ্যাঁ, কিন্তু আপনি ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছেন না।’ তরুণটির দিকে তাকিয়ে সেলো হাসার চেষ্টা করল, যে তখন জ্বলন্ত সিগারেটটা মাটিতে ফেলে গোঁড়ালি দিয়ে পিষছে। ‘আপনি হয়তো জানেন না, জমিটা একদিন আমাদেরই ছিল। বউয়ের অসুখের সময় আমি ওটা বন্ধক রেখেছিলাম। ঠিক সময়ে টাকা দিয়ে কাবেসার কাছ থেকে ছাড়াতে পারিনি বলে তামাদি হয়ে গিয়েছিল; কিন্তু আমি আজও ওই জমিটা কিনে নেওয়ার স্বপ্ন দেখি। সেই জন্য খামারে তোলার সময় কাউকে আমি এক আঁটিও খড় দিই না। তাছাড়া জমিটা যদি কিনতে নাও পারি, নিজে হাতে চাষ তো করতে পারি। বিশ্বাস করুন, আমি কাবেসার কাছে অনেক কাকুতি-মিনতি করেছি, বলেছি- ‘দোহাই আপনার, আমাকে তাড়াবেন না। বুড়ো হয়েছি সত্যি কিন্তু আপনি তো নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছেন, আমি এখনো শক্ত রয়েছি, এখনো চাষবাষের কাজ নিজেই করতে পারি;’ কিন্তু উনি আমার কথা কানেই নিলেন না। বরং এই দেখুন, নিজের চোখেই দেখুন উনি কী করেছেন! বেতের ছড়ি দিয়ে আমার কপাল ফাটিয়ে দিয়েছেন।’

তরুণটি নতুন আর একটা সিগারেট বার করে ধরাল, তারপর পায়ে পায়ে যেখানে একজন পুলিশ কর্মচারী দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই দিকে এগিয়ে গেলো।

‘সত্যি কী ঘটেছিল বলো তো, তাতা সেলো?’

চকিতে দৃষ্টি ফেরাতেই তাতা সেলো দেখতে পেল গরাদের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে একটি চাষির ছেলে। ম্লান ঠোঁটে সে হাসল। এখন অন্তত এমন একজনকে অ গেছে, যে চাষি কিংবা চাষির ছেলে, যে নিশ্চয়ই তার কথা বিশ্বাস করবে। ছেলেটির মাথার চওড়া কানাওয়ালা টুপিটা কপালের ওপর নেমে এসেছে। রোদে পোড়া মসৃণ তামাটে চামড়া, হাতে পায়ে ধান গাছের ধারাল পাতায় ছুড়ে যাওয়া সাদা সাদা দাগ। কোমরের কাছে, কাদার ছোপ লাগা প্যান্টের মধ্যে গোঁজা রয়েছে একটা কাস্তে।

‘আমাকে খুঁজতে উনি মাঠে গিয়েছিলেন, বাবা,’ তাতা সেলো ছেলেটিকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করল। ‘খালপাড়ে ওঁর সঙ্গে দেখা হয়ে গিয়েছিল। উনি আমাকে বললেন জমি ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে, এখন অন্য একজন লোক চাষ করবে। আমি ওঁর হাতে-পায়ে ধরে অনেক কাকুতি-মিনতি করলাম। বললাম, আমাকে জমি থেকে উচ্ছেদ করবেন না; কিন্তু উনি আমার কথা কানেই নিলেন না, বেতের ভারি ছড়িটা দিয়ে মারলেন। মাঠে কাজ না করতে পারলে কোথায় যাব তুমিই বলো?’

কিছুটা বুঝতে পারার ভঙ্গিতে ছেলেটি চোখের পাতা নাচাল।

‘আমি জানি, সত্যিই তোমার যাবার কোনো জায়গা নেই, তাতা সেলো।’

বৃদ্ধের চিবুক বেয়ে নেমে এলো জলের দুটি ধারা। ছেলেটি নীরবে তাকিয়ে রইলো তার মুখের দিকে।

‘উনি কী মারা গ্যাছেন?’

তাতা সেলোর আঙ্গুলের গাঁটগুলো সাদা হয়ে উঠেছে, মাথাটা ঝুলে পড়েছে হাতের বাঁকে। কান্নার নিরুদ্ধ আবেগে ফুলে ফুলে উঠছে সারা দেহ।

‘সালিং এখন কেমন আছে, তাতা সেলো?’

সালিং তাতা সেলোর একমাত্র মেয়ে। মা-মরা, বছর সতেরো বয়েস। কাবেসাং তানোর বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে। মাত্র দু’দিন আগে ঘরে ফিরে এসেছে। তাতা সেলোর আপত্তি সত্ত্বেও গত বছর নবান্ন উৎসবের সময় চাষিরা ওকে ‘রানি’ নির্বাচন করেছিল।

‘সালিং এখন কেমন আছে, তাতা সেলো?’

তাতা সেলো দু-হাতে গরাদ দুটি আরও শক্ত করে চেপে ধরল। মেয়র এখনো তাতা সেলোর সঙ্গে কথা বলেননি। পুলিশ প্রধানকে নিয়ে তিনি যখন এলেন তখন প্রায় এগারোটা। এতক্ষণ ওঁরা কাবেসার বাড়িতে ছিলেন। প্রচণ্ড গর্জন করে ভিড়ের মধ্যে এসে জিপটা থামতে না থামতেই সবাই ছেঁকে ধরল।

‘উনি কী মারা গ্যাছেন, মেয়র?’

‘কোথায় কোপ মারা হয়েছে?’

মেয়রের কাছাকাছি পৌঁছানোর জন্য ঘেমে নেয়ে ওঠা মানুষগুলো তখন নিজেদেরই মধ্যে ঠেলাঠেলি ধাক্কাধাক্কি শুরু করে দিয়েছে। মেদবহুল হাত দুটি তুলে মেয়র ওদের শান্ত হতে বললেন। দশাসই চেহারার পুলিশ প্রধান কিন্তু কয়েকজনকে লাথি মেরে সামনে থেকে সরিয়ে দিলেন।

‘কোন জায়গায় কোপ মারা হয়েছে?’

‘মুখে,’ ঠোঁটের ডান কোণ থেকে পুরুষ্ট তর্জনীটাকে দ্রুত সরিয়ে নিয়ে গিয়ে উনি ঘাড়ের পেছনে কানের পাশ পর্যন্ত একটা জায়গা নির্দেশ করলেন। ‘দাঁতগুলো একেবারে ছিটকে বেরিয়ে গেছে। বেচারি কাবেসাকে চেনাই যাচ্ছে না।’

জনতা আবার বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠায় পুলিশকে লাঠি চালাতে হলো। মেয়র এবার সিদ্ধান্ত নিলেন দপ্তরে ডেকে পাঠিয়ে তাতা সেলোর সঙ্গে কথা বলবেন। দু’জন সিপাহি গেলো বন্দিশালা থেকে তাকে আনার জন্য।

‘তোমার নির্ঘাত জেল হবে!’ তাতা সেলো দপ্তরে ঢুকতে না ঢুকতেই মেয়র মন্তব্য করলেন, তারপর ইশারায় তাকে সামনের চেয়ারে বসতে বললেন। ‘সত্যি করে বলো তো, কী এমন ঘটেছিল যে কাবেসার গলায় কোপ বসাতে গেলে?’ মেয়রের গলায় ফুটে উঠল কর্তৃত্বের সুর।

জবাব দেওয়ার আগে তাতা সেলো একটু সময় নিল।

‘উনি আমাকে আমার জমি থেকে তাড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন, প্রেসিদেন্তি।’ নগরপ্রধানকে মেয়র না বলে ‘প্রেসিদেন্তি’ বলেই সম্বোধন করল তাতা সেলো। আসলে কুয়েজোনের সময়ে মেয়রকে ‘প্রেসিদেন্তি’ বলেই সম্বোধন করা হতো। ‘আমি চলে যেতে চাইনি। জমিটা একসময়ে আমাদেরই ছিল, আমি শুধু বন্ধক রেখেছিলাম। ঠিক সময়ে টাকা দিতে পারিনি বলে উনি জমিটা তামাদি করে নিয়েছিলেন।’

‘ওসব কথা আমি আগেই শুনেছি।’ টেবিল চাপড়ে মেয়র বলে উঠলেন। তাতা সেলো রীতিমতো দমে গেলো। পরে যখন আবার মুখ তুলল, তার ঝাপসা চোখের কোণে টল টল করছে দু ফোঁটা অশ্রু।

ধরা ধরা গলায় তাতা সেলো বলল- ‘আমি এখনো শক্ত আছি, নিজে হাতে চাষ করতে পারি, জমি থেকে তাড়িয়ে দেওয়াটা কী ওঁর উচিত হয়েছে, আপনিই বলুন? খাটার মতো শক্তি আমার এখনও আছে।’

‘কোথায় নিয়ে গিয়ে তুমি কাবেসাকে কোপ বসিয়েছিলে?’

‘খালের ধারের জমিতে আমি যখন আল বাঁধছিলাম, কাবেসা তখন সেখানে গিয়েছিলেন। আমি জানি উনি অনেকক্ষণ ধরেই আমাকে লক্ষ্য করছিলেন, তাই আমিও ওঁকে আপ্রাণ বোঝাবার চেষ্টা করছিলাম যে আমার শক্তি আছে। চাষবাষের কাজে আমি এখনো যথেষ্ট খাটতে পারি। হঠাৎ উনি আমাকে ডাকলেন। খালপাড়ে আমি ওঁর কাছে গেলাম। উনি বললেন জমিটা ছেড়ে দিতে হবে, এখন থেকে অন্য আর একজন কাজ করবে।’

আমি বললাম, ‘কেন, হুজুর? আমি কী আপনাকে মান্য করিনি? ভাগে আমি কী কখনো আপনাকে ঠকিয়েছি?’ উনি বললেন, ‘জমি তোমাকে ছেড়ে দিতেই হবে।’ আমি আবার বললাম- ‘কেন হুজুর, আপনি তো নিজে চোখেই দেখছেন আমি এখনো খাটতে পারি!’ উনি কিন্তু আমার কোনো কথাই কানে নিলেন না। হাতে-পায়ে ধরে অনেক কাকুতি-মিনতি করলাম, উনি বেতের ছড়ি দিয়ে আমার কপাল ফাটিয়ে দিলেন।

‘আর সেইজন্য তুমি ওঁর গলায় কাস্তের কোপ বসিয়ে দিলে?’ চাপা গলায় পুলিশ প্রধান গর্জে উঠলেন।

মুহূর্তের জন্য মেয়রের দপ্তরজুড়ে নেমে এলো একটা নীরবতা। সবার, এমন কী কেরানিদেরও দৃষ্টি এখন স্থির হয়ে রয়েছে তাতা সেলোর ওপর। জবুথবু হয়ে সে বসে রয়েছে, নোংরা প্যান্টের ওপর হাতের আঙ্গুলগুলো অস্থির ভাবে কাঁপছে। জুতো না পরার ফলে চামড়া ফেটে যাওয়া কাদামাখা রুক্ষ গোঁড়ালি দুটি ঘঁষছে সদ্য মোম-পালিশ করা মেঝেতে।

‘আমি শুনেছি তোমার মেয়ে কাবেসার বাড়িতে কাজ করত,’ মেয়র জানতে চাইলেন।

তাতা সেলো কোনো জবাব দিলো না।

‘তোমাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে।’ পুলিশ প্রধান কনুই দিযে তাকে গুঁতো দিলেন। তাতা সেলো মুখ তুলল।

‘সালিং ঘরে ফিরে এসেছে, প্রেসিদেন্তি।’

‘কবে?’

‘দু-দিন আগে।’

‘ও ফিরে এলো কেন?’

তাতা সেলোর হাত দুটো আপনা থেকেই মুঠো হয়ে গেলো, নত হয়ে এলো চোখের পাতা। চাপা স্বরে সে বলল- ‘ও অসুস্থ, প্রেসিদেন্তি।’

পৌরভবনের ঠিক উলটো দিকের গির্জায় বারোটা বাজার ঘণ্টাধ্বনি শোনা যেতেই মেয়র তাড়াতাড়ি দুপুরের খাবারের জন্য বেরিয়ে গেলেন। তাতা সেলো রইলো পুলিশ প্রধান-সহ তিনজন রক্ষীর হেফাজতে।

‘তাহলে তুমি কাবেসাকে খুন করেছো?’ তাতা সেলোর দিকে তাকিয়ে পুলিশ প্রধান রুক্ষস্বরে বললেন, তারপর নতমুখে নিশ্চল বসে থাকা বৃদ্ধ মানুষটার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন।

‘উনি আমাকে আমার জমি থেকে উচ্ছেদ করতে চেয়েছিলেন, হুজুর।’

পুলিশ প্রধানের বাদামি হাতের মুঠোটা চকিতে ছিটকে গেলে, তাতা সেলো মুখ থুবড়ে পড়লো মেঝেতে। কপালের ক্ষতস্থানটা হাত দিয়ে চেপে ধরলেও আঙুলের ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে এলো গাঢ় রক্তের ধারা।

‘উনি আমাকে মেরেছেন, বেত দিয়ে আমার কপাল ফাটিয়ে দিয়েছেন, হুজুর।’ সজল চোখে কাঁপতে কাঁপতে সে পুলিশ প্রধানের খাঁকি উর্দিটা আঁকড়ে ধরল।

পিঠের কাছে তালি দেওয়া কামিজটা খামচে ধরে পুলিশ প্রধান তাকে টেনে তুলেই প্রচণ্ড জোরে একটা ঘুঁষি মারলেন তার পেটে।

‘উনি আমাকে মেরেছেন, বিশ্বাস করুন হুজুর কাতরাতে কাতরাতে তাতা সেলো কোনো রকমে বলল- ‘বেতের ছড়ি দিয়ে উনি আমাকে মেরেছেন।’

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সিপাহি দু’জন তখন নির্বিকার চিত্তে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। ওদের একজন বলল- ‘আমার চাকরির জন্য কাবেসাই মেয়রের কাছে তদ্বির করেছিলেন।’

পুলিশ প্রধান যখন আর একবার ঘুঁষি চালালেন, তাতা সেলো তখন এক টুকরো ছেঁড়া নেকড়ার মতো নেতিয়ে পড়ল মাটিতে।

পরের দিন রাত শেষে আবার টকটকে লাল সূর্য উঠল। পৌরভবন প্রাঙ্গণ তখন ঝাঁট দেওয়া হয়নি, আগের দিনের ছেঁড়া কাগজের টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সারা মাঠে। ফলে যখনই দমকা বাতাস বইছে, ছেঁড়া কাগজের টুকরো আর ধুলোয় ঘূর্ণি পরস্পরে লুকোচুরি খেলছে।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার পৌরভবন প্রাঙ্গণে ভিড় বাড়তে শুরু করল। মাঠ থেকে আসা চাষিদের চাইতে শহরে লোকের সংখ্যাই ছিল বেশি। কেননা বিকেলে কাবেসাং তানোকে সমাধিত করার খবরটা আগেই ছড়িয়ে পড়েছিল। এখন ওরা অবাক বিস্ময়ে খুনী তাতা সেলোর দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রয়েছে যেন সে খাঁচার বন্দি কোনো অস্বাভাবিক জীব।

গতকালের মতো আজও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে সূর্য। তখন প্রায় দুইটা বাজে। নেতিয়ে পড়ে থাকা বাবার বিষণ্ণ মূর্তি দেখে তাতা সেলোর মেয়ে আঁতকে উঠল।

সালিং এসেছে শুনে মেয়র ওকে দপ্তরে ডেকে পাঠালেন। একটু পরে তাতা সেলোকেও নিয়ে আসার হুকুম দিলেন। সিপাহি দু’জনকে প্রায় ধরাধরি করে আনতে হলো, কেননা তাতা সেলোর তখন হাঁটার ক্ষমতা ছিল না।

মেয়েকে মেয়রের সামনে বসে থাকতে দেখে তাতা সেলোর মনে হলো তার হারানো শক্তি যেন একটু একটু করে ফিরে আসছে। সালিংও দৌড়ে গেলো বাবাকে জড়িয়ে ধরার জন্য।

‘এখানে কেন এলি? অসুস্থ শরীরে তোর এখঅনে আসা উচিত হয়নি, সালিং।’ সম্পূর্ণ ভেঙে যাওয়া গলায় তাতা সেলো কোনো রকমে বলল।

প্রায় অচেতন বাবার শীর্ণ শরীরটাকে আঁকড়ে সালিং চুপচাপ বসে রইলো। ওর সুন্দর মুখখানা ম্লান, ঘন কালো চুলগুলো এলোমেলো, পরনের পোশাকটা বদলানো হয়নি গত দু-দিন।

‘যা হয় হোক, তুই ঘরে যা, সালিং!’ কোনো রকমে ফিসফিসিয়ে বলল সে। ‘ঘরে যা মা... ওদের কাউকে কিছু বলিস না...’

চেয়ারে এলিয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেয়র হুকুম দিলেন তাকে জেলখানায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবার। জনতা আবার ভিড় করল ফটকের সামনে। শোনা গেলো গুঞ্জন আর নানা ধরনের মন্তব্য।

কে যেন বলল, ‘আমি জানি, গতকাল রাত্তিরে ভিজে বস্তা জড়িয়ে ওকে মারা হয়েছে, সেই জন্য গায়ে কোনো দাগ নেই।’

‘শুনলাম ওর মেয়ে এসেছে?’

‘হ্যাঁ, মেয়রের ঘরে বসে রয়েছে।’

সিপাহি দু’জন তাতা সেলোকে কারাকক্ষে ফিরিয়ে আনতেই সে হুমড়ি খেয়ে পড়ল এক কোণে; কিন্তু দরজার তালা লাগানোর শব্দে সে যেন সম্বিৎ ফিরে পেল, কোনো রকমে নিজেকে টেনে নিয়ে গেলো গরাদের সামনে। দু’হাতে গরাদ দুটিকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরল, যেন এখুনি মুচড়ে ভেঙে ফেলবে। সিপাহি দু’জনকে সে ডাকতে চাইল; কিন্তু গলা দিয়ে কোনো স্বর বেরুল না। তাছাড়া সিপাহি দু’জন তখন চলে গেছে। গরাদের মধ্যে দিয়ে একটা হাত বাড়িয়ে সে ইশারা করার চেষ্টা করল; কিন্তু তার আগেই মুখ থুবড়ে পড়ল মাটিতে। কেউ একজন তাকে না ডাকা পর্যন্ত সে ওই ভাবেই পড়ে রইল।

‘তাতা সেলো... তাতা সেলো...’

তাতা সেলো ধীরে ধীরে মুখ তুলল। তার ঝাপসা দৃষ্টির সামনে কারো চেহারা স্পষ্ট না হয়ে উঠলেও, গলার স্বরটা তার খুব একটা অচেনা নয়।

কণ্ঠস্বরটা গতকালের সেই কিষাণ ছেলেটির। এখন সে উবু হয়ে বসে একটা হাত বাড়িয়ে তাতা সেলোর হাতটা জড়িয়ে ধরেছে।

‘প্রেসিদেন্তির ঘরে সালিং রয়েছে,’ ক্ষীণ স্বরে তাতা সেলো কিশোরটিকে বলল, ‘তুমি ওকে বাড়ি যেতে বলো... তুমি বরং ওকে সঙ্গে করেই নিয়ে যাও...’ তার মুখটা আবার মাটিতে থুবড়ে পড়ল। কিশোরটি মুহূর্তের জন্য ইতস্তত করল, তবু মনে মনে স্থির করল বৃদ্ধের ইচ্ছাকেই পূরণ করবে।

বিকেল প্রায় চারটে। সূর্য ঢলে পড়েছে এক পাশে। জেলখানার গরাদ ধরে তাতা সেলো বাইরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সূর্যের একফালি বাঁকা রশ্মি এসে পড়েছে ব্যাকুল হয়ে কী যেন খুঁজে ফেরা তার ঝাপসা দুটি চোখে। কারাকুঠরির বাইরে দাঁড়িয়ে অনুতপ্ত কিশোরটি বলছে তাকে মেয়রের দপ্তরে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয়নি। তাতা সেলো কিন্তু তার কথা কিছুই শুনছে না, নিজের মনেই সে তখন বিড়বিড় করে কী সব যেন বলছে... 


ভাষান্তর : সালেহ আশেক

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //