ইউএস ওপেন জিতে ইতিহাসে এমা রাডুকানু

 এমা রাডুকানু

এমা রাডুকানু

জীবনের দ্বিতীয় গ্র্যান্ড স্ল্যামে খেলতে নেমেই জয় পেলেন এমা রাডুকানু। ১৮ বছরের এমা ইউ ওপেন জিতে ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। অবাছাই হিসেবে খেলতে নেমে ব্রিটিশ টেনিসের নতুন তারা জিতে নিলেন জীবনের প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম।

কোয়ালিফায়ার থেকে উঠে আসা কোনো টেনিস খেলোয়াড় এর আগে গ্র্যান্ডস্ল্যাম জিততে পারেননি। রাডুকানুই প্রথম। সেরেনা উইলিয়ামসের পর দ্বিতীয় নারী টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে একটিও সেটে না হেরে চ্যাম্পিয়ন হলেন রাডুকানু। সেইসঙ্গে ৫৩ বছর পর প্রথম ব্রিটিশ নারী হিসেবে গ্র্যান্ডস্ল্যাম জিতলেন এমা।

উইম্বলডনে খেলার এক মাস আগেও নারীদের সিনিয়র টেনিসে একটা ম্যাচও খেলেননি। ব্যস্ত ছিলেন নিজের পড়াশুনা নিয়ে। বিশেষ করে অংক ও অর্থনীতি তার ভয়ের অন্যতম একটা কারণ। 


উইম্বলডন দ্বিতীয় সপ্তাহে পা দেয়ার আগেই ছিটকে গিয়েছিলেন বাকি ব্রিটিশ খেলোয়াড়রা। তৃতীয় রাউন্ডে বিদায় নিয়েছিলেন দেশের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় অ্যান্ডি মারে। রজার ফেদেরারের কাছে হেরে গিয়েছিলেন ক্যামেরন নরি। কিন্তু সবাইকে অবাক করে টিকে গিয়েছিলেন রাডুকানু, যার গোটা বিশ্ব তো দূর, ইংল্যান্ডেরও বেশি লোক জানতেন না।

মেয়েদের এককে সাড়া জাগানো দুই টিনএজারের ফাইনালে লায়লা ফার্নান্দেজকে ৬-৪, ৬-৩ গেমে জিতে অনন্য কীর্তি গড়লেন ১৮ বছর বয়সী এই ব্রিটিশ তারকা।


টুর্নামেন্টে ফার্নান্দেজের যাত্রা শুরু হয়েছিল প্রথম রাউন্ড থেকে গত ৩০ আগস্ট। কিন্তু রাডুকানুর শুরু হয়েছিল তার পাঁচদিন আগে। বাছাইপর্বের তিনটি ম্যাচও তো তাকে জিতে আসতে হয়েছে! ১৭ দিনের মধ্যে ১০টি ম্যাচ জিততে সামর্থ্যের সবটুকু নিংড়ে দেন তিনি। প্রতিটি ম্যাচের স্কোরবোর্ডেই তা পরিষ্কার হয়ে ওঠে।

এই ১০ ম্যাচে একটি সেটও হারেননি র‌্যাঙ্কিংয়ে ১৫০তম স্থানে থেকে আসর শুরু করা রাডুকানু। প্রত্যেকটি ম্যাচ জেতেন সরাসরি সেটে এবং প্রতিটি লড়াইয়েই ফুটে ওঠে তার আগ্রাসী মনোভাব ও প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রবল ইচ্ছাশক্তি।


ফাইনালের শেষ পর্যায়ে গিয়ে অবশ্য ক্ষণিকের জন্য খেই হারানোর শঙ্কা জেগেছিল রাডুকানুর। দ্বিতীয় সেটে ৫-৩ গেমে এগিয়ে থাকার সময় পায়ে আঘাত পান তিনি। তবে মেডিকেল টাইম আউট নিয়ে ফেরার পর আর বেশি সময় নেননি, দুর্দান্ত একটি ‘এইস’ মেরে নিশ্চিত করেন শিরোপা।

জিতেই দুই হাতে মুখ ঢেকে কোর্টে শুয়ে পড়েন রাডুকানু, যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না তার! সবচেয়ে কম বয়সী ব্রিটিশ খেলোয়াড় হিসেবে গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়ের ইতিহাসও লেখা হয়ে গেল তাতে।

কানাডার টরন্টোয় ২০০২ সালে জন্ম রাডুকানুর। বাবা রোমানিয়ার, মা চীনের। তার বয়স যখন দুই, তখন লন্ডনে চলে আসে পরিবার। ঘোড়ায় চড়া, সাঁতার, নাচ, বাস্কেটবল, স্কি, গলফ, মোটোক্রস — এমন কোনো খেলা নেই যা তিনি ছোটবেলায় খেলেননি। কিন্তু শুরুতেই বুঝে গিয়েছিলেন টেনিসই তার সব থেকে পছন্দের। তবে রয়েছে পিতৃভূমির প্রতি টানও। 


রোমানিয়ার খাবারও তার খুব পছন্দের। টেনিসে তার আদর্শ খেলোয়াড়ের প্রসঙ্গ এলে শুধু রোমানিয়া নয়, মায়ের দেশ চীনকেও উপরের দিকে রাখেন এই তরুণী। চীনের লি না যেমন তার খুব কাছের, তেমনই আবার রোমানিয়ার সিমোনা হালেপকেও অনুসরণ করেন রাডুকানু।

পাঁচ বছর থেকেই টেনিসে হাতেখড়ি। লন্ডনের ব্রমলি টেনিস অ্যাকাডেমিতে শেখা শুরু করেন। মা-বাবা তাকে ভর্তি করে দেন ব্রমলির নিউস্টেড উড স্কুলে। পড়াশুনার পাশাপাশি পুরোদমে চলতে থাকে টেনিসও। উইম্বলডনে নামার মাসদুয়েক আগেই ‘এ’ পর্যায়ের পরীক্ষা দিয়ে এসেছেন। এখনো তার ফলাফল বেরোয়নি।

টেনিসের পাশাপাশি প্রথম থেকেই পড়াশোনাতেও খুব ভাল রাডুকানু। অংক ও অর্থনীতিকে ভয় পেলেও বরাবর ভাল ফল করেছেন তিনি। আর সেটাই তাকে প্রথম থেকে টেনিসেও সাহায্য করেছে বলে মনে করেন রাডুকানু। 


তিনি বলেন, ‘আমি স্কুলে ভাল ফল করতে চেয়েছি সব সময়। মা-বাবার প্রত্যাশা পূরণ করেছি। টেনিস অনুশীলনের পর পড়াশুনা নিয়েই থাকতাম আমি। সব সময়ই নিজেকে ব্যস্ত রাখতে ভালোবাসি। পড়াশোনায় ভাল হওয়ায় আমার টেনিসের রণকৌশলগত দিক থেকে আমার অনেক সুবিধে হয়েছে।’

টেনিস কোর্টে নাম অচেনা হলে কী হবে, বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতায় রাডুকানুর সাফল্য রীতিমতো ঈর্ষণীয়। বিভিন্ন বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতায় তিন বার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। গত বছর বিলি জিন কিং কাপের ব্রিটেন মহিলা দলের সদস্য হয়ে স্লোভাকিয়ার বিরুদ্ধে খেলতে যান। ‘ব্যাটল অব ব্রিটস’ টেনিস প্রতিযোগিতার দলেও ছিলেন রাডুকানু।

মাস খানেক আগে নটিংহ্যাম ওপেনে ওয়াইল্ড কার্ড হিসেবে খেলার সুযোগ পান। প্রথম রাউন্ডে হ্যারিয়েট ডার্টের কাছে হেরে গেলেও কিছুদিন পরে একই জায়গায় অন্য একটি প্রতিযোগিতার কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিলেন। সেই দেখেই তাকে ওয়াইল্ড কার্ড হিসেবে উইম্বলডনে খেলার সুযোগ দেন আয়োজকরা।

 লায়লা ফার্নান্দেজ

এদিকে ফাইনালে হেরে গেলেও লায়লা ফার্নান্দেজের ট্রফির লড়াইয়ে আসার গল্পটাও কম বিস্ময়কর নয়। নাওমি ওসাকা, আঞ্জেলিক কেরবারদের মতো তারকাদের হারিয়ে ফাইনালে ওঠেন তিনি। রাডুকানুর সঙ্গে মিলে জন্ম দেন গ্র্যান্ড স্ল্যামের ইতিহাসে নারী-পুরুষ মিলে প্রথম এমন ফাইনালের, যেখানে দুই প্রতিদ্বন্দ্বীই অবাছাই খেলোয়াড়!

র‌্যাঙ্কিংয়ে ৭৩তম স্থানে থেকে টুর্নামেন্ট শুরু করা কানাডার এই তরুণী ফাইনালের পথে একে একে বিদায় করেন তৃতীয় রাউন্ডে গতবারের চ্যাম্পিয়ন ওসাকা, চতুর্থ রাউন্ডে আঞ্জেলিক কেরবার, কোয়ার্টার-ফাইনালে পঞ্চম বাছাই এলিনা সলিতোলিনাকে, সেমি-ফাইনালে হারান দ্বিতীয় বাছাই আরিনা সাবালেঙ্কাকে।

অনেক শক্ত বাধা পেরিয়ে ফাইনালে উঠলেও রাডুকানুর সামনে কোনো প্রতিরোধই গড়তে পারেননি লায়লা। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে অচেনা লায়লা এখন যেন টেনিস বিশ্বের মধ্যমণি। টুইটারে তাকে অভিনন্দন জানান রড লেভার, মার্তিনা নাভ্রাতিলোভার মতো কিংবদন্তিরা।


এই শিরোপা জয়ে ১৫০ নম্বর থেকে এক লাফে র‌্যাঙ্কিংয়ে ২৩ নম্বরে উঠে আসবেন রাডুকানু। হয়ে যাবেন ব্রিটেনের এক নম্বর। সেই সঙ্গে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে ১৮ লাখ পাউন্ড!

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //