রাসবিহারী এভিনিউতে অন্যরকম সকাল এবং ‘বাড়ি নিয়ে বাড়াবাড়ি’

শরৎচন্দ্রের বাসভবন

শরৎচন্দ্রের বাসভবন

এক

সময়কাল ২০১৯। ক্যালেন্ডারের পাতায় মাসের নামটি জুন।

সেবার কলকাতায় আমি উঠেছি রাসবিহারী এভিনিউর একটি হোটেলে। হোটেলটির নামের সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল যুক্ত থাকলেও এর চরিত্র ও চারিত্র্যটি ন্যাশনাল। এলাকাটি সেই অর্থে পশ নয়; কিন্তু কলকাতার পালস টের পাওয়া যায় এখানে। বিশেষ কারণে এই এলাকার প্রতি আমার একটি বাড়তি টান আছে। সুনীলদার বাড়ি এই রাসবিহারী এভিনিউ অঞ্চলেই। নব্বই-এর সূচনার দিকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের রাসবিহারী এভিনিউর এপার্টমেন্টে আমি এসেছিলাম। কত স্মৃতি আমার এই কৃতী বাঙালি লেখকের সঙ্গে!

রাসবিহারী এভিনিউটি গড়িয়াহাটে। কেনাকাটার জন্য বিখ্যাত গড়িয়াহাট। এখানে বিশাল মার্কেটে বাঙালি মনের আনন্দে কেনাকাটা করেন। বিশেষ করে মহিলারা। বাংলাদেশ থেকে বেড়াতে আসা মহিলাদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণের নাম গড়িয়াহাট। শাড়ি-গয়নার দোকানপাটের দাপটে এক কালের স্নিগ্ধ ছিমছাম আবাসিক এলাকা বাণিজ্যিক এলাকায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের সাহা-বসাকরাই মূলত এই এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যের বিপুল প্রসার ঘটিয়েছেন।

কানাডা থেকে উড়ে এসেছি। সুতরাং দু’তিন দিনের জেট ল্যাগের খপ্পরে তো পড়তেই হবে।

ক্যালেন্ডার অনুসারে তারিখ ১৫ জুন। ঘুম ভেঙে গেল খুব ভোরে। ছ’টায়। জানালার পর্দা সরিয়ে দেখি মহাব্যস্ত গড়িয়াহাট-রাসবিহারী এলাকাটিতে সুনসান নীরবতা। মনে হলো এখনো ঘুমিয়ে আছে। মাঝে মধ্যে একটি দুটি বাস-অটো কিংবা ট্যাক্সি যাচ্ছে। হাঁটা-চলা করা মানুষজনের সংখ্যা হাতে গোনা। কাল সন্ধ্যায় এবং রাতে এই এলাকায় রাস্তা পার হওয়াটাই ছিল ব্যাপক হাঙ্গামার।

ফুটপাথ জেগে উঠছে, কারণ ফুটপাথের ওপর সারিবাঁধা ছোট্ট ছোট্ট দোকানগুলো নড়েচড়ে উঠছে। চুলোয় আগুন জ্বলেছে। তৈরি হচ্ছে হাতে গড়া রুটি, লুচি, আলুর দম, ঘুগ্নি ডাল। কুঁচি করে কাটা আলুভাজি। ডিম সেদ্ধ, অমলেট এবং পোচ।

রাসবিহারীর একটি গলির নাম একডালিয়া। নামটি পছন্দ হওয়াতে ওই গলির একটি ছাপড়া দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালাম। (এই একডালিয়াতেই বাড়ি, সুনীলদার। এবং সুনীলদার বাড়ির খুব কাছেই বিখ্যাত সলিল চৌধুরীর বাড়ি। প্রিয় সলিলদার বাড়িতেও গিয়েছি একদিন। ১৯৮৯ সালে। দীর্ঘ একটি আড্ডার স্মৃতি আছে আমার, তার এপার্টমেন্টে।) এক ভদ্র মহিলা লুচি ভাজছেন। সদ্যভাজা লুচি দেখে বসে পড়লাম বেঞ্চিতে। ঘর্মাক্ত তিনি বললেন, দেব? খাবেন?

বললাম, দিন। কি আছে লুচির সঙ্গে খাওয়ার?

তিনি বললেন, আলুর দম খেতে পারেন নইলে মটর আছে। (মটর-ঘুগ্নি ডাল ধরনের।)

মটর দিয়ে লুচি খেলাম পাঁচটি। শুকনো পাতার পাত্রে তিনি তা পরিবেশন করলেন।

দাম পড়ল কুড়ি রুপি। চা নেই এখানে। বললেন, কালকেও ছিল। কিন্তু আজ নেই। তবে দুপুরে ভাত হবে।

ভাতের সঙ্গে কী থাকবে?

বললেন, মাছ থাকবে। তারপর থাকবে ডিম। আলুভাজি।

বললাম, দাম কত পড়বে?

বললেন, পঞ্চাশ রুপি।

বললাম, একটা ছবি তুলি আপনার দোকানের?

মুখের ঘাম আঁচলে মুছে নিয়ে হাসিমুখে হ্যাঁ সূচক সাড়া দিলেন ভদ্রমহিলা।

পাশে থাকা লোকটি জিজ্ঞেস করল, আপনি কলকাতার নন?

বললাম, না। সেই জন্যেই তো ছবি তুলছি!

একডালিয়ার বিপরীত দিকে যাবার জন্যে পা বাড়ালাম। ওইদিকে আরও কিছু ছাপড়া দোকান দেখা যাচ্ছে।

ইন্টারসেকশন পেরুতেই চোখে পড়লো চারদিক থেকে ছুটে আসা নানান সাইজের গাড়ি এবং লোক চলাচলকে উপেক্ষা করে রাস্তার পাশের উন্মুক্ত কল তলায় স্নান করছেন এক দরিদ্র ভদ্রমহিলা।

তাকে অতিক্রম করে ছাপড়া দোকানগুলোর দিকে গিয়ে দেখি এদিকটায় বেশি খরিদ্দার একডালিয়ার চাইতে। কর্মক্ষেত্রে যাবার আগে ঝটপট সকালের নাস্তা সেরে নিচ্ছেন স্বল্প আয়ের মানুষজন। একটায় দেখলাম ধোঁয়া ওঠা চা আছে। এক কাপ চাইলাম। ভাবলাম মাটির খোঁড়ায় দেবেন হয়তো। কিন্তু শীর্ণ দেহের বয়স্ক লোকটি আমাকে চা দিলেন ছোট একটি কাগজের কাপে। এতো ছোট কাপ হয় এটি চোখে না দেখলে বিশ্বাসই হতো না। কানাডার এক্সট্রা স্মল কাপের চার ভাগের একভাগ সাইজ। ছোট্ট সোনামণিদের রান্নাবাটি খেলার সরঞ্জামের মতোন, এইটুকুন।

তিনটি চুমুক দিতেই চা ফিনিস। দাম নিলো পাঁচ রুপি।

ছোট্ট এইটুকুন কাপটায় লাল রঙে লেখা-এঞ্জয় দা ডে উইথ এ কাপ অব টি।

হ্যাঁ, একটি অসাধারণ দৃষ্টিনন্দন খুদে কাপের শুভেচ্ছাবার্তার মাধ্যমে আরেকটি দিন শুরু হয়েছিল আমার, কলকাতায়। এবার সেই গল্প-

দুই

রাসবিহারী এভিনিউটায় চক্কর দিচ্ছিলাম বিখ্যাত ছড়াকার দীপ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। প্রথম দর্শনে এই অঞ্চলটিকে পশ মনে না হলেও ইন্টেলেকচুয়ালি হাইলি পশ এরিয়া এই রাসবিহারী এভিনিউ। একটি সরু লেনে যতীন্দ্র মোহন বাগচীর আবক্ষ মূর্তি দেখে অজান্তেই গুনগুনিয়ে উঠলো স্মৃতি, হারিয়ে ফেলা দিদির জন্য বাঙালি ভাইদের হৃদয় মোচড় দেয়া চিরকালের বেদনার সেই উপাখ্যান-বাঁশ বাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে অই/মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই?...

মূর্তির পেছনের বাড়িটি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর ছিল। এই সড়কের নামটিও তার নামানুসারে-যতীন বাগচী রোড।

তার আরও দুটি বাড়ি রয়েছে পাশের লেনে, হিন্দুস্তান পার্কে। বাড়ির নাম ‘ইলা বাস’। নগর পরিকল্পনার নকশার কারণে বাড়ি দুটির মাঝখানে ডিভাইডারের মতো একটি রাস্তা তৈরি হয়েছে। বাড়ির একটি অংশে টিনটিন নামের একটি রেস্টুরেন্ট আছে। অর্থাৎ কি না টিনটিন এখন ইলাবাসের ভাড়াটে। অন্য অংশটি দাঁড়িয়ে আছে বিধ্বস্ত পোড়োবাড়ির অবয়ব নিয়ে। এই ভাঙা বাড়িটি নাকি দখলের পাঁয়তারা চলছে।

হিন্দুস্তান পার্ক-এর আরেকটি গলির মুখেই ফুটপাথ লাগোয়া একটি বাড়ির দরোজার ডান দিকে শ্বেত পাথরে কালোয় লেখা ‘ভালো বাসা’। অন্য পাশে লেখা নরেন্দ্র দেব আর রাধা রাণী দেবীর নাম। এই বাড়িটি নবনীতা দেব সেনের বাবা নরেন্দ্র দেব-এর। এই বাড়িতে নবনীতা দেব সেন বাস করেন। এই বাড়ির নিচের একটি অংশতেও ‘বুনকারী ইন্ডিয়া’ নামের একটি বুটিকশপের বর্ণাঢ্য সাইন। এই ‘ভালো বাসা’ নামের বাড়িতে অমর্ত্য সেনও থাকতেন একসময়। নবনীতা এবং অমর্ত্য নাম দুটি রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

হিন্দুস্তান পার্ক-এ জ্যোতিবসুর ৫৫বি নম্বরের বাড়িটি এখন হাইরাইজ গেস্ট হাউস।

আচার্য্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ির নাম-সুধর্মা। এটিও হিন্দুস্থান পার্কে। শ্বেত পাথরে খোদাই করা বাড়ির নামটি ‘চাটুর্জ্যে বাড়ি’ ‘১৬ সংখ্যক হিন্দুস্থান পার্ক’। এই বাড়িটিরও একটি অংশ ভাড়াটের দখলে।

পাঞ্জাবির জন্য বিখ্যাত ‘ফেব ইন্ডিয়া’র লোগো সম্বলিত সাইনবোর্ড ঝুলছে সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে!

এই রাসবিহারী এভিনিউতেই জীবনানন্দ দাশ ট্রামের তলায় চাপা পড়েছিলেন। সেই জায়গাটায় আমাকে নিয়ে গেলেন দীপ। মনটি কেমন বিষন্ন হয়ে গেল খানিক সময়ের জন্য। আহা জীবনানন্দ! জীবন-সংসার আপনার সঙ্গে কী রকম কানামাছিই না খেলল জীবন ভর!

রাসবিহারী এভিনিউর অশ্বিনীদত্ত রোডে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি। এই বাড়িতে একটি জাদুঘর আছে। আর আছে ছোট্ট একটি হল রুম। যে হলটি ভাড়া দেয়া হয়।

দেবব্রত বিশ্বাসের বাড়ির পাশ দিয়ে গেলাম আমরা। কেমন একটি শিহরণ অনুভব করলাম যেন। করোটির ভেতরে সক্রিয় হয়ে উঠলেন দেবব্রত-প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে মোরে আরও আরও আরও দাও প্রাণ ...।

বিখ্যাত হারমোনিয়াম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘পাকরাশি’-ও রাসবিহারী এভিনিউতে।

পিসি সরকারের বাড়িটিও এখানেই। জামির লেনে।

এবং বাংলা ছড়ার উজ্জ্বল নক্ষত্র আমার বন্ধু দীপ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িটিও এই রাসবিহারীতেই। বাড়ির নাম সুপর্ণ।

বুদ্ধদেব বসুর বাড়িটি আমার হোটেলের আশপাশেই!

এক রাসবিহারী এভিনিউতেই এতো এত বিখ্যাত বাঙালির বাড়ি! বাড়ি নিয়ে এই বাড়াবাড়িটি রীতিমতো বিস্ময়কর না!

লাভ ইউ রাসবিহারী এভিনিউ!

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //