মধ্যযুগীয় বিশ্বাস ও বিজ্ঞানের সমান্তরাল অগ্রযাত্রা

মধ্যযুগীয় সময়কাল বা মধ্যযুগ, একদিকে রোমান সাম্রাজ্যের পতন অন্যদিকে রেনেসাঁ ও বিজ্ঞানের নবজাগরণের উন্মোচন- এই দুইয়ের উন্মেষের মধ্য দিয়েই মধ্যযুগের সূচনা। তিনটি ঐতিহ্যবাহী পাশ্চাত্য ইতিহাসমণ্ডিত একটি যুগ অর্থাৎ ধ্রুপদী সভ্যতা বা প্রাচীন সভ্যতা, মধ্যযুগীয় সময়কাল এবং আধুনিক যুগের মধ্যভাগ নিয়ে গঠিত এই ‘মধ্যযুগ’। 

মধ্যযুগকে বিজ্ঞানের ইতিহাসের ‘কালো অধ্যায়’ বলে অভিহিত করা হয়, যা ছিল যুক্তি-তর্ক বা জ্ঞানের আলোর বিপরীতে শুধু আত্মিক বিশ্বাসে ধাবিত এক অধ্যায়। এ যুগকে ‘কালো অধ্যায়’ বলার আর একটি কারণ হলো এই যে, এ যুগ সম্পর্কিত দলিল বা প্রমাণাদির পরিসর অত্যন্ত সীমিত। ষষ্ঠ শতাব্দী ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত সময়ে মধ্যযুগের ব্যাপ্তি। 

রোম সাম্রাজ্যের পতনের পর পর পুনঃসমন্বয় সাধনের প্রচেষ্টার পাশাপাশি মধ্যযুগীয় সমাজ শান্তি, সাম্য এবং সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রতি জোর দিলেও জ্ঞানের চর্চা নিয়ে তাদের কোনো আগ্রহ ছিল না। ইউরোপ মহাদেশের জনগণের ঐক্য সমন্বয়েও কোনো রাষ্ট্রীয় বা সরকারি পদক্ষেপের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং ক্যাথলিক চার্চ হয়ে ওঠে সবচাইতে ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান। প্রাক মধ্যযুগকে (৬ষ্ঠ হতে ১০ম শতাব্দী) প্রকৃত অর্থে মধ্যযুগের কালো অধ্যায় বলা হয়। কারণ, মধ্যযুগীয় সমাজ তখন অজ্ঞতা এবং বর্বরতার চূড়ান্তে। যদিও মধ্যযুগ ছিল যুদ্ধ আর জনপদীয় স্থানান্তরের যুগ, তবুও এ যুগে অতি স্বল্প পরিসরে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি দেখা যায়। ভাইকিংস (নরওয়ের জলদস্যু) ও সাক্সন জনগণের ধাতুবিদ্যার শৈল্পিক দক্ষতা হলো তার উদাহরণ।

‘সাটন হু’ এবং ‘ল্যাডবিস্কিবেট’ ভূমিতে পাওয়া ধাতব তরবারি আর অলঙ্কারও এর নিদর্শন। কোনোরূপ প্রশিক্ষণ বা প্রযুক্তিগত দক্ষতা ছাড়াই তৎকালীন কারিগরেরা নিত্যনতুন শৈল্পিক পদ্ধতির চর্চা করে যেতেন দক্ষ হাতে। বলা যেতে পারে যে, ধাতুবিদ্যার এরকম অগ্রগতি মধ্যযুগীয় বাণিজ্যক্ষেত্রকে প্রভাবিত করে। নর্স নাবিকেরা ছিল দক্ষ। তারা কোনো ধরনের যন্ত্রের ব্যবহার ছাড়াই সমুদ্র যাত্রায় পারদর্শী ছিল, এমনকি নক্ষত্রের সাহায্য ছাড়াই। এ ছাড়াও মধ্যযুগে আরও কিছু বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি দেখা যায়। সন্ন্যাসগত বিদ্যায় যদিও বিজ্ঞানের চর্চা পরিলক্ষিত হয়; কিন্তু বেশির ভাগই ছিল বাইবেল সংক্রান্ত।

এ ছাড়াও পশ্চিম ইউরোপের মঠসমূহ মেডিসিন সংক্রান্ত বিদ্যাচর্চা করে অসুস্থদের শুশ্রুষার এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে চর্চার লক্ষ্যে। ইউরোপীয় শাসকগোষ্ঠী এবং চার্চের অধিপতিরা উপলব্ধি করতে পারে যে, শান্তি এবং সাম্য বজায় রাখতে হলে প্রয়োজন জ্ঞানচর্চা। প্রাক মধ্যযুগের প্রথমার্ধে, ইউরোপের পশ্চিমাংশে বহু চার্চ গঠন করা হয় যাতে তারা নিজেদের ক্ষমতা বজায় রাখতে পারে। কিন্তু দশম শতাব্দী শুরুর দিকে তারা যুক্তি, ধর্মতত্ত্ব এবং দর্শনের সঙ্গে সঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা শুরু করে যাতে খ্রিস্টীয় চিন্তাবিদদের চিন্তাশীলতার উন্নতি সাধিত হয়। 

অন্যদিকে, তৎকালীন মুসলিম বিশ্বে বিজ্ঞান চর্চার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। ইসলাম ধর্ম মতে, পবিত্র দিশা হলো মক্কার দিশা। মুসলিম বিশ্ব তাদের প্রার্থনা এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি মক্কামুখী হয়ে পালন করে থাকে। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিড এ. কিং তার একটি আর্টিকেলে উল্লেখ করেন যে, দশম শতাব্দীর মুসলিম জ্যোতির্বিদরা এই পবিত্র দিক নিরূপণ করেন এবং আরবি ভাষায় এর নামকরণ করেন ‘কিবলা’।

মুসলিম জ্যোতির্বিদদের মতে এটি একটি গাণিতিক ভূগোল এবং তাঁরা এর সাপেক্ষে জটিল ত্রিকোণোমিতিক এবং জ্যামিতিক সমাধান সম্পন্ন করেন। এমনকি তাঁরা একটি ধারা প্রণয়ন করেন যেখানে কিবলার একটি কৌণিক সম্পর্ক প্রকাশ করা হয়। এই গাণিতিক সম্পর্কে মক্কার প্রতি অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমাংশের সঙ্গে এই কৌণিক সম্পর্কের ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়। এ ছাড়া তিনি ওই আর্টিকেলটিতে আরবের তৎকালীন জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চাবিষয়ক বিভিন্ন তথ্য নিয়ে আলোচনা করেন যা কিবলার দিকের সঙ্গে সম্পর্কিত। 

এ পর্যায়ে, আমরা যদি মেডিসিন ও চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে পর্যালোচনা করি তবে পুণরায় সাফল্যের কর্ণধার করতে হয় মুসলিম বিশ্বকে। ৮ম শতাব্দীতে কিডনি সম্পর্কিত বিভিন্ন রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় আরব উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেন। আরবের এ সাফল্য মোহাম্মদ আর. আরডালান তাঁর ‘নেফ্রলজি ডায়ালাইসিস ট্র্যান্সপ্ল্যান্টেশন’ শীর্ষক জার্নালে উপস্থাপন করেন। প্রাক মধ্যযুগীয় বিশ্বের বিজ্ঞান চর্চায় মুসলিম বিশ্বের অবদান পশ্চিম ইউরোপের তুলনায় অনেক বেশি উল্লেখযোগ্য। মুসলিম বিশ্ব যখন প্রাক মধ্যযুগে বিজ্ঞান চর্চায় মগ্ন- তখন পশিম ইউরোপ যুদ্ধবিগ্রহ, সাম্য, শান্তির দ্বন্দ্বে জড়িয়ে নিজেদেরকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আশীর্বাদ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। 

একাদশ শতাব্দী চতুর্দশ শতাব্দীতে পশ্চিম ইউরোপ যুদ্ধবিগ্রহ থেকে বেরিয়ে এসে জ্ঞান চর্চায় আগ্রহনিবেশ করে। একাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে মুসলিম বিশ্ব একাধিক প্রাচীন গ্রিক গ্রন্থের আরবি অনুবাদ করে এবং ইউরোপের পণ্ডিতেরা উক্ত আরবি অনুবাদগুলোর পুনঃ ল্যাটিন অনুবাদ করে। এই প্রক্রিয়ায় তখন সার্বজনীন জ্ঞান চর্চা সাধিত হয়। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে পশ্চিম ইউরোপের জ্ঞানকেন্দ্র ‘স্টাডিয়াম জেনারেল’ (পশ্চিম ইউরোপের একটি মধ্যযুগীয় বিশ্ববিদ্যালয়) এর উৎপত্তি ঘটে।

এখানে আশপাশের সমগ্র অঞ্চল থেকে পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গ সংঘবদ্ধ হয়ে গ্রিক এবং মুসলিমদের সম্বন্ধীয় জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক ও ধর্মীয় জ্ঞানকে ত্বরান্বিত করেন। যদিও মধ্যযুগের এই অধ্যায়ে তেমন কোনও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। তবুও মধ্যযুগীয় এ অধ্যায়ের এক চিলতে আলো আগামী দিনের বৈজ্ঞানিক জয়যাত্রাকে সুগম করে। এ সময়ের দুই প্রগতিশীল চিন্তাবিদ টমাস অ্যাকিনাস এবং ফ্রান্সিস বেকনের অবদানকে আমরা ভুলে যেতে পারি না। 

মধ্যযুগের শেষার্ধ বলা হয় চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত সময়কালকে এবং এ সময়কে ইউরোপের বৈজ্ঞানিক প্রগতির সূচনালগ্ন বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। যদিও ইউরোপ এ সময়ে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ‘ব্ল্যাক ডেথ’-এর মত ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে, যার ফলশ্রুতিতে ইউরোপের প্রায় এক- তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যু হয় বলে ধারণা করা হয়। প্রচণ্ড দুর্ভিক্ষে, খাদ্যাভাবে এবং মহামারি রোগে মানুষ মারা যায়। ইংল্যান্ড আর ফ্রান্সের মধ্যকার ভয়াবহ যুদ্ধ যাকে ‘শতবর্ষী যুদ্ধ’ বলা হয়, তাতে অসংখ্য মানুষ মারা যায়। কিন্তু এত কিছুর পরেও বিজ্ঞানের প্রগতি এবং বিপ্লব থেমে থাকেনি। ডেভিড জে. কলিন্স শিকাগো জার্নালে উল্লেখ করেন যে, তৎকালীন সময়ে বিজ্ঞান এবং ধর্মের অন্তঃর্দ্বন্দ্বে মানুষ কুসংস্কার এবং যুদ্ধের শিকল ভেঙে বেরিয়ে আসতে পেরেছিল। 

মধ্যযুগের শেষভাগে বহু প্রগতিশীল চিন্তাবিদের আবির্ভাব ঘটে। কপারনিকাস এ সময় তাঁর বিখ্যাত সৌরকেন্দ্রিক মতবাদ প্রকাশ করেন যা ‘হেলিওসেন্ট্রিক থিওরি’ নামে পরিচিত। টমাস ব্র্যাডওয়ার্ডিনের পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ক অনুসন্ধান, জোহানেস কেপলারের গাণিতিক উদ্ভাবন এবং অন্যান্য দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের অবদান আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রগতির পথকে সুগম করে তোলে। চতুর্দশ শতাব্দীর শেষার্ধকে ‘এইজ অব ডিসকভারি’ বা ‘বিজ্ঞানের স্বর্ণযুগ’ বলে অভিহিত করা হয়। এ সময়ে ইউরোপীয়রা দুর্ভিক্ষ, ব্ল্যাক ডেথের কারণে ঘটে যাওয়া ক্ষয়ক্ষতি থেকে ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করতে থাকে।

জনসংখ্যার বৃদ্ধি, নগরায়ণ, সরকার গঠন, দ্রুতহারে বাণিজ্যিক উত্তোরণ, নগরায়ণের প্রভাব- এসব কিছু ছিল জ্ঞান ও শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে। উইলিয়ামস অব ওকাম এ সময়ে ‘প্রিন্সিপাল অব পার্সিমনি’ মতবাদ প্রকাশ করেন, যার মূলবক্তব্য ছিল এই যে, ‘যুক্তি এবং বিশ্বাস- এ দুটি বিষয়ের পৃথক অবস্থান বাঞ্ছনীয়।’ তাঁর এ মতবাদ বিজ্ঞানের পথকে মুক্ত করে। মুক্ত ধারার চিন্তাকে উদ্বুদ্ধ করে। জিন বারিডান, নিকোল ওরিসমি এবং অক্সফোর্ড ক্যালকুলেটর এরিস্টটলের সূত্রের বিপরীতে মতবাদ রাখে এবং গতির সম্পর্কিত সূত্রাবলিতে বিশেষ অগ্রগতি সাধন করেন। বারিডানের ‘থিওরি অব ইম্পেশাস’-এর উন্নতি ‘মোশন অব প্রোজেক্টাইলস’-এ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

এ ছাড়াও এ সময়ে বিভিন্ন গুরত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনার প্রমাণ পাওয়া যায়। বারুদ, প্রিন্টিং প্রেস, কম্পাস এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। প্রিন্টিং প্রেসের আবিষ্কার ছিল তৎকালীন সময়ে তথ্য ও জ্ঞানের প্রচার এবং আদান-প্রদানের গুরত্বপূর্ণ মাধ্যম। অন্যদিকে, কম্পাসের আবিষ্কার সমুদ্রযাত্রাকে সহজ করে তোলে। 

মধ্যযুগীয় সময়কাল খুব বেশি স্থিতিশীল ছিল না। বিশ্বাস ছিল যুক্তির পথের মূল অন্তরায়। ধর্মকে ভর করে মানুষ ক্ষমতা বজায় রাখার চেষ্টা করত। সর্বত্র বিরাজমান ছিল যুদ্ধবিগ্রহ, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোগশোকে পরিস্থিতি ছিল অস্থিতিশীল, কিন্তু তবুও বিজ্ঞান থেমে থাকেনি। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা ছিল গতিশীল। আধুনিকতা ও বিজ্ঞানের পথে চলতে হয় এরূপ অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতেও বিভিন্ন প্রগতিশীল চিন্তাবিদ ও বিজ্ঞানী তাদের অবদান রেখে গেছেন। আধুনিক বিজ্ঞানের জয়যাত্রা রচনা করে গেছেন। আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি নির্মাণ করেছেন। আধুনিক বিজ্ঞানের এই ভিত্তি নির্মাণের অবদান আমরা কোনো একজন বিশেষ চিন্তাবিদ অথবা একক গোষ্ঠীকে দিতে পারি না। কারণ, আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রগতির পেছনে সব অঞ্চলের সকল সময়ের প্রগতিশীল চিন্তাবিদ ও বিজ্ঞানীর অবদান রয়েছে এবং এ সাফল্য অর্জনে লেগেছে বহু বছর। মধ্যযুগের পরেও একইভাবে সকল চিন্তাবিদ ও বিজ্ঞানীরা তাঁদের নিজ নিজ জায়গা থেকে স্বকীয় অবদান রেখে গেছেন বলেই আধুনিক বিজ্ঞানের জয়যাত্রা ও আধিপত্য আজও বিরাজমান।

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh