করোনাভাইরাস

করোনাভাইরাস: ঝুঁকিমুক্ত নয় বাংলাদেশ

চীনে করোনাভাইরাসে মৃতের সংখ্যা বাড়ছেই। ১২ ফেব্রুয়ারি রাত পর্যন্ত প্রাণঘাতী এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে কমপক্ষে ১৩৫৫ জন। চীনা কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার। দৈনিক আক্রান্ত হচ্ছেন তিন হাজারেরও বেশি। চীনের বাইরে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ১৫০ জন এবং ফিলিপাইনে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন একজন। 

ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ ঝুঁকিমুক্ত না হলেও ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভয়াবহ এ রোগে কেউ শনাক্ত হয়নি। ইতোমধ্যে চীনের হোবেই প্রদেশের রাজধানী উহান থেকে ৩১২ বাংলাদেশি ফিরে এসেছেন। তাদের সবাইকে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের পাশে আশকোনা হজ ক্যাম্পে বিচ্ছিন্ন (কোয়ারেন্টাইন) করে রাখা হয়েছে। এখানে তারা থাকবেন ১৪ দিন। ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সিএমএইচে পর্যবেক্ষণে ছিলেন ৮ জন।

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে যে সাতজনকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল, তাদের মধ্যে করোনাভাইরাস না থাকায় তাদের গত সোমবার হজ ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তাদের কয়েকজনের জ্বর দেখা দিলেও কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হননি। বাংলাদেশের রোগ তত্ত্ব, রোগ নির্ণয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা গত ৩ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত করেছেন, বাংলাদেশে কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হননি। বিমানবন্দরে চীন থেকে আগত যাত্রীদের পরীক্ষা করে ছাড়া হচ্ছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে চীনা কর্মীদের বিচ্ছিন্ন (কোয়ারেন্টাইন) করে রাখা হয়েছে। 

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ৩ ফেব্রুয়ারি বিএমএ আয়োজিত সেমিনারে বলেছেন, ‘আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এখানে করোনাভাইরাসে কেউ আক্রান্ত হলে তা মোকাবেলার প্রস্তুতি আমাদের আছে। তাছাড়া এ রোগটি শীতে খুব বেশি কার্যকর থাকে। গরমে তা টিকতে পারে না। আমাদের দেশে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই গরম পড়বে। সে কারণে আমরা মনে করছি, আমাদের দেশে করোনাভাইরাস ছড়াবে না।’

এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জীবাণু গবেষণা কেন্দ্র সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (সিডিসি) জানিয়েছে, প্রকৃতিতে করোনাভাইরাস মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মারা যায়। চীন থেকে যেসব পণ্য আসছে, তা ব্যবহার করলে কোনো সমস্যা হবে না। অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছেন, আধা মিটার দূরত্বের বাইরে কেউ করোনাভাইরাসের রোগীর কাছে থাকলে সে নিরাপদ থাকবে। ভাইরাসটি হাঁচি-কাশি, লালার মাধ্যমে ছড়ায়, কিন্তু প্রকৃতিতে বেশিক্ষণ টিকতে পারে না। সেজন্য আক্রান্তসহ সবাইকেই সব সময় মাস্ক পরে থাকতে হবে। 

করোনাভাইরাসে বাংলাদেশ ঝুঁকিমুক্ত না হওয়ার কারণ হলো- চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। সতর্কতা অবলম্বন না করলে যে কোনো সময় বিপদ ঘটে যেতে পারে। বাংলাদেশের কয়েকশ’ মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে দৈনিক চীনে যাচ্ছে এবং চীন থেকে আসছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রয়োজন না হলে কেউ যেন চীনে এ মুহূর্তে না যায়। পদ্মা সেতুর মতো বিভিন্ন মেগা প্রকল্প এবং ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে চীনা নাগরিকদের বাংলাদেশে যাওয়া-আসা রয়েছে। তাদের মাধ্যমে এখানে ভয়াবহ এই রোগটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

চীন কার্যত বিচ্ছিন্ন দেশ

চীনে যেন করোনাভাইরাস আর ছড়াতে না পারে সেজন্য সরকার এর উৎস শহর উহানকে চারদিক থেকে অবরুদ্ধ (লকড ডাউন) করে রেখেছে। উহানের সঙ্গে বিমান, ট্রেন, বাস, পাতাল রেল যোগাযোগ বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এমনকি নাগরিকরা ঘরের বাইরেও বেরুতে পারছেন না। অভ্যন্তরীণ প্রাইভেট গাড়ি চলাচলও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। শুধু উহান নয়, চীনের যেসব শহরের মানুষ করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন, ওইসব শহরের সঙ্গেও বাইরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে। 

একেবারেই নতুন প্রজাতির ভাইরাস

চীনে করোনাভাইরাসের বর্তমান প্রজন্মটি একেবারেই নতুন। এর আগে এটি কখনো মানুষের মধ্যে ছড়ায়নি। এ জন্য এ ভাইরাসটির নাম দেয়া হয়েছে ‘কভিড-১৯’। করোনাভাইরাসের অনেক প্রজাতির মাত্র ছয়টি মানুষের দেহে সংক্রমিত হতে পারে। তবে নতুন ভাইরাসটিসহ এ সংখ্যা এখন থেকে হবে সাতটি। 

২০০৩ সাল থেকে চীনে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের আরেকটি প্রজাতি সার্স (সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) ভাইরাসের সংক্রমণে চীনসহ অন্যান্য দেশে ৮১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সার্স ভাইরাসে সাড়ে আট হাজার মানুষ সংক্রমিত হয়েছিলেন। নতুন এই করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) সংক্রমণে প্রতি চারজনে একজনের অবস্থা মারাত্মক হয়ে থাকে বলে জানা যায়। 

গবেষণাগারে করোনাভাইরাস

এদিকে, গত ২৯ জানুয়ারি অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীরা বলছেন, তারা প্রথমবারের মতো চীনের বাইরে অস্ট্রেলিয়ায় করোনাভাইরাস তৈরি করতে পেরেছেন গবেষণাগারে। বিজ্ঞানীরা জানান, তাদের এ আবিষ্কার দ্রুত করোনাভাইরাস শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসায় সহায়তা করবে। তারা গবেষণার তথ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে ভাগাভাগি করবেন। এর আগে চীনা বিজ্ঞানীরা নতুন এই করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) জন্মরহস্য (জিন সিকুয়েন্সিং) বের করতে পেরেছেন, কিন্তু গবেষণাগারে করোনাভাইরাস তৈরি করতে পারেননি। 

কীভাবে সুস্থ হওয়া যায়

জটিলতা ছাড়াই এই রোগ ভালো হয়ে যেতে পারে। তবে জটিলতা থেকে মৃত্যুর আশঙ্কাও থাকে। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে জটিল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের এমন অবস্থা বেশি হতে পারে। নিউমোনিয়া না হওয়া পর্যন্ত শ্বাসকষ্ট হয় না। একজন মানুষকে সংক্রমিত করার পর আক্রান্ত ব্যক্তি পরবর্তী দুই মাস টিকে গেলে ওই সময়ের মধ্যেই তার দেহ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই।

পরবর্তী সময়ে আর কখনো ওই ব্যক্তিকে করোনাভাইরাসের নতুন এই প্রজাতিটি আক্রান্ত করতে পারবে না। একইভাবে ডেঙ্গু, মার্স, সার্স ভাইরাসেরও প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে। এটা কেবল তার দেহেই হয়, যিনি একবার সংক্রমিত হয়েছেন। যিনি সংক্রমিত হননি, তিনি ঝুঁকির মধ্যেই থাকবেন বলে জানিয়েছেন আইইডিসিআর’র সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহমুদুর রহমান।

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh