দেশসেরা ক্রীড়া সংগঠক শামস্-উল-হুদার ৩৩তম মৃত্যুবার্ষিকী

ক্রীড়া ক্ষেত্রে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত (মরণোত্তর) দেশের অন্যতম সেরা ক্রীড়া সংগঠক  শামস্-উল-হুদার ৩৩তম মৃত্যুবার্ষিকী।

অনন্য ক্রীড়া সংগঠক শামস্-উল-হুদা ছিলেন একাধারে একজন সাবেক ফুটবল খেলোয়াড়, বিশিষ্ট সমাজসেবী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। আজ শুক্রবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) তাঁর ৩৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। বিশিষ্ট এ ক্রীড়া সংগঠন ১৯৮৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ৭০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

কৃতি এই ক্রীড়া সংগঠকের অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ যশোরের আধুনিক স্টেডিয়ামের নামকরণ করা হয় ‌‘শামস্-উল-হুদা স্টেডিয়াম’। একই সঙ্গে ‘শামস্-উল-হুদা’ ফুটবল প্রবর্তন তাঁরই স্বীকৃতির স্বাক্ষর বহন করে। ক্রীড়াঙ্গনে তাঁরই প্রচেষ্টায় তৎকালীন যশোরের বড় বড় খেলাগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। তার নামেই যশোরে দেশের প্রথম বেসরকারি ফুটবল একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

শামস্-উল-হুদা ১৯১৮ খৃস্টাব্দে যশোর জেলার বাঘারপাড়ার জহুরপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম শেখ আবুল বারী, মাতা মোছাম্মাৎ আশরাফুননেছা। পিতামহের নাম শেখ ন্যায়তুল্যা। পিতা যশোর সিভিল কোর্টে চাকরি করতেন। মাতামহের নাম কাজী জলিল উদ্দীন। দুই ভ্রাতা পাঁচ ভগ্নির মধ্যে শামস্-উল-হুদা ছিলেন জ্যেষ্ঠ। অনুজ ভ্রাতা শেখ নূরুল হুদা ছিলেন এসপি।

শিক্ষা জীবনে তিনি প্রথমে সম্মিলনী স্কুলে, পরে জেলা স্কুলে এবং ম্যাট্রিক পাশ করেন কালিগঞ্জ হাটপুল থেকে। আইএ ও বিএ যশোর এম এম কলেজ থেকে শেষ করেন। কর্মজীবনে তিনি প্রথমে আহম্মদ আলী সরদারের ঠিকাদারী ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে চাকরি এবং খুলনা মুসলিম ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে বিভাগীয় ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীকালে ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হন। 

তিনি ঝিনাইদহের জাহানারা খাতুনকে বিবাহ করেন। শামস-উল-হুদা ছিলেন পাঁচ পুত্র ছয় কন্যার পিতা। 

শামস্-উল-হুদা খেলোয়াড় হিসেবে ১৯৩০-এ অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে ‘যশোর সম্মিলনী ইন্সটিটিউশন’ ফুটবল দলে প্রথম খেলার সুযোগ পান। গোল রক্ষক হিসেবে দক্ষতার জন্য তখনকার যশোরে প্রতিষ্ঠিত, খ্যাতনামা ‘চিত্তরঞ্জন ক্লাব’ তাঁকে গ্রহণ করে। পরে ১৯৩৯এ জেলা স্কুলে পাঠকালে আন্তঃস্কুল প্রতিযোগতিায় অল বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি যশোর লীগে, টাউন ক্লাব, ইয়ং মুসলিম ক্লাব, যতীন্দ্র মোহন ক্লাব এ নৈপুণ্যতার সঙ্গে খেলায় অংশ নিয়েছেন।

তিনি ইয়াং মুসলিম ক্লাব প্রতিষ্ঠা করে ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে জীবন শুরু করেন। মূলতঃ তিনি খেলোয়াড় ও রেফারি থেকে সফল হয়েছিলেন ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে। যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থা গঠনের পর থেকে সংস্থার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থেকে যশোর ক্রীড়াঙ্গন সচল ও সমৃদ্ধশালী করে তুলেছিলেন। যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থা গঠনের পরবর্তী বছর থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত সংস্থার সাধারণ সম্পাদক পদে অধিষ্ঠিত থেকে যশোর ক্রীড়াঙ্গনকে তিনি দেশ জুড়ে সুপরিচিত এবং মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেন। টিনের বেড়া ঘেরা স্টেডিয়াম থেকে আজকের দেশের অন্যতম স্টেডিয়াম হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার পেছনে তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম, ত্যাগ ও প্রচেষ্টা ছিলো নিঃস্বার্থ।

১৯৫৯-এ যশোর স্টেডিয়ামের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হয় তাঁর পৈত্রিক পুরাতন বাড়ির ভাঙা ইট দিয়ে। তারপর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন চেষ্টায়, তদবির করে সরকারি সাহায্য, স্থানীয় ক্রীড়ামোদী সরকারি প্রশাসন এবং কোনো কোনো সময়ে নিজের ব্যবসা এবং বেতনের টাকা দিয়ে স্টেডিয়ামের ক্রীড়া বিষয়ক কার্যক্রম চালিয়েছেন।

শামস্-উল-হুদার অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে তৎকালীন দেশের ফুটবল অঙ্গনে বেশ কিছু নক্ষত্রের সৃষ্টি হয়েছে। এরা সেই সময়কার মোহামেডান, আবাহনী, ওয়ারী, আজাদ স্পোর্টিং ইত্যাদি ক্লাবের নামী-দামী খোলোয়াড় হিসেবে সুপরিচিতী লাভ করেন। তাঁর সুদক্ষ পরিচালনা ও অক্লান্ত পরিশ্রমে যশোর জেলা দল ১৯৭৬-এ জাতীয় ফুটবল চ্যাম্পিয়নের গৌরব অর্জন করে এবং ফুটবল ও হকিতে কয়েকবার রানার-আপ এর শিরোপা অর্জন করে। তাঁর প্রচেষ্টায় তৎকালীন ঢাকার বাইরে সর্বপ্রথম যশোরে জাতীয় এ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। 

১৯৭৭/৭৮-এ ‘বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি’ শ্রেষ্ঠ জাতীয় ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে তাঁকে স্বীকৃতি দেয়। তাঁর নিবেদিত কর্মকাণ্ডের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ক্রীড়া ক্ষেত্রে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান জাতীয় ক্রীড়া পুরষ্কার (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়।

১৯৪৭-এ দেশ বিভাগের পর অনেক খেলোয়াড় ও ক্রীড়া সংগঠক ভারতে চলে গেলে যশোর ক্রীড়াঙ্গনে শূন্যতা নেমে আসে। তাঁরই সক্রিয় সহযোগিতায় ১৯৫০ এ ‌‘যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থা’ গঠন করা হয়। ১৯৫২-এ সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব লাভ করেন। তারপর ৩৬ বছর তিনি নিষ্ঠার সাথে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। 

তিনি সুদীর্ঘ ৫৬ বছর খেলাধুলার সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছিলেন। খেলা খেলোয়াড় আর মাঠই ছিলোি তাঁর সংসার।

যশোর ক্রীড়াঙ্গনে শামস্-উল-হুদার কঠোর অধ্যাবসায়ের স্পর্শ লেগে আছে। তিনি জেলা ক্রীড়া সংস্থার দায়িত্ব পালনের পাশাপশি অনেক জাতীয় দায়িত্ব ও পালন করেছেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি জাতীয় ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ বোর্ড, ফুটবল ফেডারেশন ও ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের সদস্য ছিলেন। স্বাধীনতার পূর্বকালে তিনি ইস্ট পাকিস্তান স্পোর্টস ফেডারেশনের সদস্য ছিলেন।

শামস্-উল-হুদা ছাত্রজীবনে মুসলিম স্টুডেন্ট লীগ, পরবর্তীকালে বহু সামাজিক সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে পৌরসভার অনেক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখেন। তিনি যশোর ইন্সটিটিউটের  সহ-সভাপতি, যশোর শিল্পকলা একডেমির সহ-সভাপতি, যশোর ক্লাবের সহ-সভাপতি ছিলেন। 

এছাড়া এন এম খান প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, মাহমুদুর রহমান উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি, উপশহর কলেজের সভাপতি, পরিবার পরিকল্পনা সমিতির সভাপতি, বিএভিএসের সভাপতি, যশোর রেড ক্রসের সহ-সভাপতি, যশোর রেলওয়ে, মহিলা কলেজ, নব কিশলয় কিন্ডার গার্টেন স্কুল, মোমিন গার্লস স্কুল, যশোর আলিয়া মাদ্রাসার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন।

খুলনা বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন, বাংলাদেশ টেবিল টেনিস ফেডারেশন, বাংলাদেশ এ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন।

তার সুযোগ্য কন্যা নাহিদা আকতার জাহেদী রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের পরিচালক এবং সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকালের প্রকাশক।

মরহুম শামস-উল-হুদা রেডিয়েন্ট গ্রুপ অব কোম্পানিজের চেয়ারম্যান মো. নাসের শাহরিয়ার জাহেদীর শ্বশুর।

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh