পরীক্ষা ভোগান্তিতে ঘরোয়া চিকিৎসা নিচ্ছেন আক্রান্তরা

দেশে ব্যাপক হারে বাড়ছে কভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা। শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা প্রায় সোয়া লাখ। মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল দেড় হাজারেরও বেশি। মানুষ এখনো পরীক্ষা করাতে ভয় পাচ্ছেন। অনেকে সম্ভাব্য সংক্রমণের পরও হাসপাতালে না গিয়ে বাসায় চিকিৎসার সরঞ্জামাদি নিয়ে আসছেন। কভিড-১৯ উপসর্গ থাকলেও অনেকে স্বীকার করছেন না। নাগালের মধ্যে সেবাকেন্দ্র না থাকা, সেবার মাধ্যম সহজ না হওয়া এবং সমাজের বিরূপ আচরণ এর অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পুরনো ঢাকার গেন্ডারিয়ায় আব্দুল জব্বার নামে একজনের কভিড-১৯ পজিটিভ ধরা পড়ল। তিনি হাসপাতালে না গিয়ে বাসায় অক্সিজেন এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে এসে নিজের চিকিৎসা নিজে করলেন। আবার শান্তিনগরে বেসরকারি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন মারুফ হোসেন। তিনিও পজিটিভ রিপোর্ট আসার পর চিকিৎসার জন্য বাসাকেই নিরাপদ মনে করলেন; কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে তারা জানালেন, গত কয়েক মাস ধরে আক্রান্ত রোগীদের সঙ্গে চিকিৎসক ও প্রতিবেশীদের যে ব্যবহার দেখেছেন, তাতে করে হাসপাতালের ওপর তারা ভরসা রাখতে পারেননি এবং সামাজিকভাবে বয়কট হওয়ার আশঙ্কা থেকে কাউকেই কিছু বলেননি তারা। এরকম চিত্র দেশজুড়েই রয়েছে, যার ফলে কভিড-১৯ আক্রান্ত ও মৃতের সঠিক পরিসংখ্যান জানা যাচ্ছে না। 

আক্রান্তদের সাধ্যমতো সহযোগিতার পাশাপাশি কভিড চিকিৎসার সম্পূর্ণ চিত্র সহজভাবে উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে আস্থা ফেরানো সম্ভব বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ফয়জুল হাকিম। তিনি বলেন, ‘আগে যে কোনো রোগের চিকিৎসা বা ফলোআপের জন্য রোগী স্বেচ্ছায় যোগাযোগের ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর সরবরাহ করলেও উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে। লকডাউনের সময় ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি, বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা, পতাকা টানিয়ে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করা, যাতায়াত সমস্যাসহ নানা কারণে লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পরও টেস্ট করাচ্ছেন না ঝুঁকিপূর্ণরা। গত চার মাস ধরে সামাজিক সংকট ব্যাপকভাবে ভীতির সঞ্চার করেছে মানুষের মনে।’ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো রোগীদের প্রতি সহানুভূতি নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। 

ফয়জুল হাকিম আরো বলেন, ‘কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীকে সহযোগিতা করতে হবে। রাষ্ট্রেরও উচিত তাকে সহযোগিতা করা। সিভিল সার্জন থেকে শুরু করে এলাকার চেয়ারম্যানরাও যেন তার খবর রাখেন, সে ব্যবস্থা করতে হবে। তা হলে হয়তো যারা আক্রান্তের ঝুঁকিতে রয়েছেন তারাও টেস্ট করাতে, হাসপাতালে যেতে আগ্রহী হয়ে উঠবেন।’

আরেক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘দেশে এখন আক্রান্তের চেয়ে মানুষের মধ্যে ভয় বেশি রোগটির চিকিৎসা নিয়ে। প্রতিদিনই কভিড-১৯ রোগীর চিকিৎসা ও রোগটি শনাক্তে নমুনা পরীক্ষা নিয়ে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে মানুষকে। এসব মানুষ একদিকে যেমন রোগটি শনাক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছেন, তেমনি আক্রান্ত হলে চিকিৎসা পেতেও বেগ পেতে হচ্ছে। কভিড পজিটিভ আসার পরও বিভিন্ন জেলায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে প্রথমেই ভর্তি না করিয়ে বাসায় রাখা হচ্ছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে ভর্তি করা হলেও হাসপাতালে চিকিৎসায় অবহেলা করা হচ্ছে। কভিড সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি রোগী মারা গেলে, তার নমুনা পরীক্ষার জন্য স্বজনদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বিশেষ করে কভিড-১৯ উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়া রোগী এখনো চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগ করছেন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে গত তিন মাস ধরেই এসব অভিযোগ করে আসছিল মানুষ; কিন্তু এত দিনেও তা আমলে নেয়নি সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ।’

তিনি আরো বলেন, ‘করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসায় খাপছাড়া কাজ হচ্ছে। প্রতিদিনই ট্রেনিংপ্রাপ্ত ডাক্তার ও নার্সের সংখ্যা প্রচার করছে স্বাস্থ্য অধিদফতর; কিন্তু তাদের কী ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে, তা জানা যাচ্ছে না। হাসপাতালে রোগীদের কাছে ডাক্তার-নার্স যাচ্ছেন না কেন, সেটি খুঁজে বের করতে হবে- ভয়টা কোথায়? ডাক্তার-নার্সদের ভালো করে প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা রোগীর সেবা করেন। হাসপাতালে সব সুযোগ-সুবিধা রাখতে হবে রোগী ও ডাক্তার-নার্সদের জন্য। হাসপাতালে রোগীদের দুই ধরনের চিকিৎসা দিতে হবে। যারা সামান্য আক্রান্ত, তাদের আলাদা রাখতে হবে। আর যাদের সংক্রমণের মাত্রা বেশি, তাদের হাইকেয়ার ওয়ার্ডে রাখতে হবে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় রোগীর কাছে যেতে হবে। খোঁজ নিতে হবে। চিকিৎসার পাশাপাশি তাদের সাহস দিতে হবে। আবার আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে হাসপাতাল ভীতি দূর করতে না পারলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। আক্রান্তরা হাসপাতালে যাবেন না। বাসা থেকে ছড়াবে ভাইরাস। রোগীরা যাতে হাসপাতালে যায়, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।’

অধ্যাপক হারুন অর রশিদ কভিড-১৯ মোকাবেলায় পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির দিকে যাচ্ছি, দিনকে দিন সংক্রমণ বাড়ছে। আর এই সংক্রমণ নিজ থেকে বিদায় নেবে না। সমন্বিত চেষ্টায় আমাদের দেশ থেকে কভিড-১৯ ভাইরাসটি দূর করতে হবে। অসতর্ক চলাফেরা এবং স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে না চললে মোকাবেলা করা কঠিন। রোগীদের শনাক্ত করে তাদের আইসোলেশন করে সংক্রমণের বোঝা কমাতে হবে।’

দেশে আক্রান্ত শনাক্তে পরীক্ষা করাতে সাধারণ মানুষের এখনো অনীহা কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘ল্যাব ও পরীক্ষার সংখ্যা বাড়লেও সংকট কমেনি। অসংখ্য মানুষের অভিযোগ ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকার পরও তারা পরীক্ষা করাতে পারছেন না। আবার নমুনা জমা দিলেও সঠিক সময়ে রিপোর্ট পাচ্ছেন না। ঝুলে থাকছে দিনের পর দিন। এ ছাড়া, রিপোর্টে ভুল তথ্য থাকার অভিযোগও উঠেছে। স্যাম্পলে ৭২ ঘণ্টার বেশি এই ভাইরাস জীবিত থাকে না। সেখানে চার থেকে পাঁচ দিন পর সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষা করায় মানুষের ভোগান্তি হচ্ছে। ল্যাবের সংশ্লিষ্টরাও কষ্ট করছেন; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এর চেয়ে বলে দেয়া ভালো, কোন প্রতিষ্ঠান কতগুলো স্যাম্পল নিতে পারবে। শুধু শুধু মানুষকে আশা দিয়ে ভোগান্তি বাড়ানোর কোনো মানে হয় না। আবার পরীক্ষা করার কিটের দামও অনেক, এগুলো নষ্ট করা মানে সরকারি সম্পদের অপচয়। পরীক্ষা করাতে ভোগান্তির কারণেই অনেকে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকলেও পরীক্ষা করাতে অনীহা প্রকাশ করে ঘরেই চিকিৎসা নিচ্ছেন।’

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

<