ডিবি কার্যালয়ে ডা. সাবরিনা, চলছে জিজ্ঞাসাবাদ

রাজধানীর তেজগাঁও থানায় জেকেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা প্রতারণার মামলার তদন্তভার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তেজগাঁও বিভাগে হস্তান্তর করা হয়েছে। ডা. সাবরিনাকে সেখানে জ্ঞিাসাবাদ করা হচ্ছে।

আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাহউদ্দিন মিয়া এ তথ্য জানিয়েছেন।

সালাহউদ্দিন মিয়া বলেন, ‘ডা. সাবরিনাকে (গতকাল) সোমবার রাতেই ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনি এখন ডিবি কার্যালয়ে আছেন। প্রতারণার ঘটনায় দায়ের হওয়া ওই মামলাও ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে।’

এর আগে রবিবার মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবদুল মান্নান স্বাক্ষরিত এক অফিস জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল থেকে সাবরিনাকে বহিষ্কার করা হয়।

ওই আদেশে বলা হয়, ডা. সাবরিনা জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে কর্মরত অবস্থায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জেকেজির চেয়ারম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। করোনা টেস্টের ভুয়া রিপোর্ট ও অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছে। সরকারি কর্মকর্তা হয়ে সরকারের অনুমতি ব্যতীত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত থাকা এবং অর্থ আত্মসাৎ সরকারি কর্মচারি (শৃঙ্খলা ও আপিল), বিধিমালা ২০১৮ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সে জন্য ডা. সাবরিনাকে সরকারি কর্মচারি (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮-এর ১২ (১) বিধি অনুযায়ী সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।

তিনি সাময়িক বরখাস্ত থাকাকালীন বিধি মোতাবেক খোরপোশ ভাতা প্রাপ্ত হবেন। গতকাল দুপুরে তাকে (সাবরিনা) তেজগাঁও বিভাগীয় উপ-পুলিশ কামশনার (ডিসি) কার্যালয়ে আনা হয়। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

এর আগে রবিবার (১২ জুলাই) দুপুরে করোনাভাইরাস পরীক্ষায় জালিয়াতির অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও জোনের একটি টিম তাকে গ্রেফতার করে। পরে পুলিশি হেফাজতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ গণমাধ্যমকে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে যেসব প্রশ্ন করা হয়েছে তিনি সেগুলোর সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। তাই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। 

এর আগে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) এর কার্যালয়ে সাবরিনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রবিবার (১২ জুলাই) দুপুরে তেজগাঁও ডিসির কার্যালয়ে তাকে ডেকে নেয়া হয়। সোমবার ডা. সাবরীনার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। 

ডিবির তেজগাঁও ডিভিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ডা. সাবরীনাকে জ্ঞিাসাবাদ করা হচ্ছে। করোনার ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে প্রতারণার ঘটনার সঙ্গে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের আর কেউ জড়িত কি না, তাও দেখা হচ্ছে। মোট কথা হচ্ছে, তিনদিন তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এই সময়ের ভেতরে সবকিছুর বিষয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’

প্রসঙ্গত, করোনাভাইরাসের পরীক্ষা ছাড়াই ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে গ্রেফতার হওয়া জেকেজি হেলথ কেয়ারের সিইও আরিফ চৌধুরীর প্রতারণার নেপথ্যে ছিলেন তার স্ত্রী ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী। তাদের এক ল্যাপটপেই পাওয়া গেছে ১৫ হাজারেরও বেশি করোনার ভুয়া টেস্ট রিপোর্ট।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসক সাবরিনার দাপটেই আরিফ চৌধুরী করোনা পরীক্ষার অনুমতি বাগিয়ে নেন স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে। জেকেজির চেয়ারম্যান হিসেবে সব যোগাযোগ রক্ষা করতেন সাবরিনাই। কিন্তু অপকর্ম ধরা পড়ার পর গা বাঁচিয়ে চলছেন সাবরিনা। গ্রেফতার হয়েছেন জেকেজির আরিফসহ ছয়জন। প্রায় তিন সপ্তাহ পরও ডা. সাবরিনা ছিলেন বহাল তবিয়তে। অফিস করছেন নিয়মিত। 

তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসক হিসেবে চাকরিতে থেকেই জেকেজির চেয়ারম্যান পদে ছিলেন ডা. সাবরিনা। কীভাবে, কার মাধ্যমে তিনি এ কাজ হাতিয়েছেন, সে ব্যাপারে চলছে অনুসন্ধান। 

পুলিশও বলছে, জেকেজির প্রতারণা থেকে সাবরিনার কোনোভাবেই দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। কারণ তার স্বামী আরিফ চৌধুরী জিজ্ঞাসাবাদে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাবরিনার সক্রিয় সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন।

করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) নমুনা পরীক্ষার জন্য জেকেজি হাসপাতালকে অফিসিয়াল অনুমতি দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কিন্তু ভুয়া রিপোর্টের ফলে জেকেজি হাসপাতাল বন্ধ করে দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে তাদের ভুয়া রিপোর্টের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানতো বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা।

শনিবার (১১ জুলাই) দেশের একটি গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দেন সাবরিনা। সেখানে তিনি বলেন, বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজি ও এডিজি ম্যাডামকে জানিয়ে ছিলাম।

এমন পরিস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে বিকেলে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কভিড-১৯ সেবা সম্প্রসারণ করতে  জেকেজি হাসপাতালকে করোনা পরীক্ষার বুথ বসানোর অনুমতি দেয়া হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি প্রতারণা করতে পারে এমন ধারণাও ছিলো না অধিদপ্তরের।

নমুনা ফেলে দিয়ে হাজারো মনগড়া কভিড-১৯ রিপোর্ট দেয়ার পর জেকেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী এখন বলছেন, প্রতারণার বিষয়ে আগেই জানিয়েছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে।

তিনি চেয়ারম্যান নন দাবি করলেও পুলিশ বলছে, তার সম্পৃক্ততার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন গ্রেফতার হওয়া তার স্বামী আরিফুল। 

করোনা পরীক্ষার মনগড়া রিপোর্ট দেয়া নিয়ে এখন আলোচনায় জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী। অপকর্মের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানের সিইও, তার স্বামী আরিফ চৌধুরীসহ ৬ জন কারাগারে। 

তবে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে সাবরিনা একটি গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি নাকি জেকেজির চেয়ারম্যানই নন। সাবরিনা আরিফ বলেন, জেকেজির চেয়ারম্যান হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। বরং এটা ওভাল কোম্পানির একটি অঙ্গসংগঠন। ওভাল গ্রুপ ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। যেখানকার মালিক হচ্ছেন আরিফুর রহমান।

প্রায় ৩ মাস ধরে নমুনা সংগ্রহের নামে যে প্রতারণা করেছে জেকেজি, সে কার্যক্রমে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন সাবরিনাও। সে সময় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে নিজেকে চেয়ারম্যান পরিচয় দিয়ে সাক্ষাৎকারও দিয়েছেন। তবে এখন কেন পদ-পদবীর কথা অস্বীকার করছেন?

সাবরিনা এ বিষয়ে বলেন, আমি ওনাকে কাজ পাইয়ে দিয়েছি, দিতাম এটা পুরোপুরি মিথ্যে কথা। এখন অভিযোগ প্রমাণ হোক।

পুলিশ বলছে, জেকেজির প্রতারণা থেকে সাবরিনার কোনোভাবেই দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। কারণ তার স্বামী আরিফ চৌধুরী জিজ্ঞাসাবাদে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাবরিনার সক্রিয় সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন।

জানা গেছে, নমুনা সংগ্রহের জন্য জেকেজির হটলাইন নম্বর ছিলো। ওই নম্বরে ফোন করলে প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা বাসায় গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করতেন। আবার অনেকে জেকেজির বুথে এসে নমুনা দিতেন।

বিদেশি নাগরিকদের জন্য নেয়া হতো ১০০ ডলার। আর বাংলাদেশিদের জন্য সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা। যদিও দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতির ভিত্তিতে বিনামূল্যে তাদের স্যাম্পল কালেকশন করার কথা ছিলো।

জেকেজির করোনা পরীক্ষার ভুয়া সনদ বিক্রি নিয়ে জাতীয় সংসদেও আলোচনা হয়। সংসদের বিরোধী দলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের সংসদে বলেন, জেকেজি-রিজেন্ট করোনা পরীক্ষা করার অনুমোদন পেয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগের যথাযথ কর্তৃপক্ষ থেকে। তারা হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। এরা দায়িত্ব কীভাবে ও কতটুকু পালন করছে বা করছে না, সে বিষয় দেখভালের দায়িত্ব ছিলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের।


মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh