জয়া-মস্কোর স্কুলের সাহসী কিশোরী

মানুষ জন্মগতভাবে একে অন্যের প্রতি নির্ভরশীল এবং দেশপ্রেমিক। যে ভূমিতে জন্মগ্রহণ করে একজন মানুষ, সে সেই ভূমি ও দেশের প্রতি দায়িত্ব পালন কিংবা কর্তব্য পালনে প্রতিজ্ঞ থাকেন। ফলে আমরা দেখি দেশে দেশে মহান বীরদের, যারা তাদের দেশ রক্ষায় নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেন।

১৯৭১ সালে এদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় হাজার হাজার মানুষ দেশের জন্য জীবনবাজি রেখেছিল, তারা মরিয়া হয়ে লড়াই করেছিল দেশের স্বাধীনতার জন্য। কৃষক, মজুর, শিক্ষক, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে বিভিন্ন পেশার মানুষ বাংলাদেশের মক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন- এরা সকলে দেশকে ভালোবেসে চলে গিয়েছিলেন যুদ্ধে।

দেশপ্রেমের এমন অনেক ঘটনা রয়েছে যা আমাদের মনকে কষ্ট দেয় যেমন, তেমনি দেশের জন্য আত্মত্যাগীর প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসে। এমন-ই এক যোদ্ধা কিশোরী ছিলেন- তানিয়া। 

এদেশের লেখক আহমদ ছফা (১৯৪৩-২০০১) অনূদিত ‘তানিয়া’ নামের রুশ ভাষার গ্রন্থটি পি. লিভড রচিত। এ গ্রন্থের প্রেক্ষাপট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার। যখন জার্মানি দীর্ঘদিন রাশিয়া অবরোধ করে রেখেছিল। 

কাহিনিতে দেখা যায়, ১৯৪১ সাল; ডিসেম্বর মাসের শুরু। জার্মানেরা পেট্রিশ্চেভ অঞ্চলের ভেরিয়া শহরের নিকটে একজন সৈনিকের প্রাণদণ্ড দিয়েছিল। সে ছিল একজন আঠারো বছরের তরুণী। 

তরুণীটি কে? কোথা থেকে এসেছিল? পেট্রিশ্চেভের এ শোকাবহ ঘটনা ঘটাবার আগে ভেরিয়ার একজন সৈনিকের সঙ্গে তরুণীর দেখা হয়েছিল। সৈন্যদের দ্বারা তৈরি একটির পরিখার ভেতর গোপনে তারা আশ্রয় নিয়েছিল। তরুণী তার নাম বলেছিল- তানিয়া। তারপর আর স্থানীয় সৈনিকেরা তাকে দেখতে পায়নি। কিন্তু তারা জানতো, বেশি দূরে নয়, কাছাকাছি কোথাও দুঃসাহসী এবং সুকৌশলী মেয়ে তানিয়া তাদের মতো সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।  

মেয়েটির আসল নাম- জয়া আনাতোলিয়েনা কসমোডেসিয়ান স্কাইয়া। সে ছিল মস্কোর ২০১নং স্কুলের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। সে সময়ে মস্কোর অবস্থা খারাপ হয়ে এসেছে। জার্মান বাহিনির ওপরে লাল ফৌজের সর্বাধিনায়ক জেনারেল জোসেফ স্তালিন আকস্মিক আক্রমণ করে সব নিশ্চিহ্ন করবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ফ্রন্টে একদল সৈন্য ছিল যারা লাল ফৌজকে সাহায্য করতো। তারা শত্রুদেরকে বিভ্রান্ত এবং নাজেহাল করার কাজে লাল ফৌজকে সাহায্য করতো। 

এরা পথে পথে হঠাৎ হঠাৎ গুলি করতো- এই গুলির শব্দে যাতে করে জার্মান সেনারা গরম ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করে দিতো, রাস্তা ভেঙ্গে দিতো আবার অল্পসংখ্যক শত্রুসৈন্য পেলে কখনো কখনো আক্রমণ করে বসতো। 

এমনকি ফ্যাসিস্টদের হেডকোয়ার্টারেও ঢুকে পড়ত, সংগ্রহ করত তথ্য- একথায় বলা চলে ওরা সোভিয়েত সেনাবাহিনির জন্য গোয়েন্দাগিরি করে বেড়াত। আর ফ্রন্টের এ সৈন্যদলকে সাহায্য করার জন্য পাঠানো হয়েছিল কিছু অকুতোভয় স্বেচ্ছাসেবক মস্কো থেকে। তখনই তানিয়া নামের এই মেয়েটি ভেরিয়া অঞ্চলের জেলাতে এসে হাজির হয়। একদিন এই মেয়েটি ধরা পড়ে যায় শত্রুদের আস্তাবলে আগুন লাগানোর সময়। গুপ্ত আক্রমণে সে ছিল অত্যন্ত পারদর্শী, যা  নিজের মতো করে করতো এই কিশোরী।

শত্রুদের কারো বোঝার ক্ষমতাও ছিল না তার সাহস সম্পর্কে।  জয়া শত্রুদের হাতে ধরা পড়ার পর তার থেকে জোসেফ স্তালিনের বাহিনীর তথ্য নেওয়ার জন্য জার্মান নাৎসী বাহিনী অকথ্য নির্যাতন করে। 

তাকে টর্চার করার পর খালি পায়ে বরফের ওপর দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, তবু সে কোনো তথ্য দেয়নি। দৃঢ়চেতা মেয়েটি দেশপ্রেমে এতোটাই বলিয়ান ছিল যে- সবসময়ই বলেছিল তার সঙ্গে আর কেউ নেই, সে একাই শত্রুদের আস্তাবলে এসেছে।   

রাশিয়ান বীর এই কিশোরীর মর্মস্পর্শী কাহিনীর পাশাপাশি বইটিতে উপস্থাপিত হয়েছে তার মায়ের সাথে আবেগঘন মুহূর্ত ও পরিবারে সে কোন পরিবেশে বড় হয়ে উঠেছে সেসব। বিদ্যালয়ের পড়াশোনার বাইরে সে কী ধরনের বইপত্র পড়তো, তার বন্ধু ও সহপাঠিদের সাথে কী আচরণ করত। ছোট বেলা থেকে সে প্রতিদিন সময়কে কতটা গুরুত্বের সাথে মূল্যায়ণ করেছে, সেসব কথার খুঁটিনাটি সব ঘটনাগুলো। তার মনের মধ্যে যে ছোটবেলা থেকেই সমাজভাবনা, দেশপ্রেম, মনুষত্ববোধ জায়গা করে নিয়েছে এবং তার পড়ার জগতে পুশকিন, গোগল, তলস্তয়, বেলিনস্কি, তুগেনিয়েভ, চেরনাশেভস্কী, হারজেন, নেক্রাশোভ’রা অতীতের বীরদের যে সব ছবি এঁকেছেন- তা জয়ার কল্পনায় বারবার জ্বলে উঠে তাকে মুগ্ধ করে দিত। 

এই মহান ব্যক্তিদের চিন্তার প্রভাব তাকে আরো দৃঢ় প্রতিজ্ঞ করে তুলেছে তা তার মায়ের স্মৃতিচারণ বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কোনো কিছুর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য তার হৃদয়ে আঘাত করলে সে বাইরের সবকিছু সম্পর্কে ভুলে গিয়ে একা একা কল্পনার পরিমণ্ডলে ঘুরে বেড়াত। জয়া একজন প্রকৃত যোদ্ধা হতে চেয়েছিল। স্বেচ্ছায় একটি বিচ্ছিন্ন সৈন্যদলে যোগ দিয়েছিল। মায়ের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় সে বলেছিল- ‘মামণি তুমি কেঁদো না, আমি বীরাঙ্গনার মতো ফিরে আসবো অথবা মৃত্যুবরণ করবো।’

মাত্র দশম শ্রেণীতে পড়ুয়া একটা বালিকা কতটা বীরত্বের পরিচয় দিয়েছে তার দেশকে ভালোবেসে তা জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছে। তার মৃত্যুদণ্ড সম্পন্ন করতে যখন জার্মান অত্যাচারী সৈনিকেরা তাকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে দেয়, তখন একটুও ভীত ছিলো না তানিয়া। সে বলেছিল- ‘তোমরা এখন আমাকে ফাঁসি দিচ্ছো। কিন্তু আমরা বিশ কোটি মানুষ। সকলকে তোমরা ফাঁসিতে লটকাতে পারবে না। আমার প্রতিশোধ অবশ্যই নেওয়া হবে। এখনো সময় আছে আত্মসমর্পণ করো। জয় অবশ্যই আমাদের।’ 

তানিয়ার এই চিৎকার-মর্মস্পর্শি ধ্বনি জার্মান সৈনিকদের অনুভুতি স্পর্শ করেনি। তাকে চরম নির্যাতনের পর তারা হত্যা করেছে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে।

এরপর তানিয়ার কবরের কাছে দাঁড়িয়ে লালফৌজের সৈন্যরা হিংস্র শপথের বাণী উচ্চারণ করল। প্রত্যেক সৈন্য তানিয়ার ধৈর্য্য, সাহস, অনমনীয় দৃঢ়তার অস্ত্রে অন্তরের ভয় ত্রাস নির্মূল করে যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রু নিপাত করতে ছুটল।

তার অকুতোভয় সাহস ও দেশপ্রেমের কথা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল। গভীর ভালোবাসার টানে দূরের লক্ষ লক্ষ মানুষ বরফ-ঢাকা সাদা কবরটির কথা স্মরণ করল। স্বয়ং স্তালিনও মুগ্ধ হয়ে সোভিয়েত ভূমির জন্য নিঃশেষে আত্মোৎসর্গকারী কন্যার কবর দেখতে এলেন। 

ইউ.এস.এস-এর সুপ্রিম সোভিয়েত এক ঘোষণায় জানালেন- যে তরুণ সাম্যবাদী লীগের একজন সদস্য জয়া কসমোডেসিয়ান স্কাইয়াকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বীরের স্বীকৃতি দেওয়া হলো। 

‘ফুলের মতো সুন্দর তানিয়ার রাশিয়ান মুখমণ্ডলে জেগে আছে অপূর্ব দৃঢ়তা- আশ্চর্য সজীবতা। তার উপরে কে যেন এঁকে দিয়েছে গভীরতর প্রশান্তির স্বাক্ষর।’

একজন মানুষের আত্মত্যাগ, দেশপ্রেম, দৃঢ়তা, শিক্ষা এবং ভাবনার জগৎ একটি আদর্শ জাতি গঠনে ভূমিকা রাখে। প্রকৃত-ই দেশের সর্বস্তরের মানুষ আজো ভালোবাসে এই বীর কিশোরী তানিয়ার আত্মত্যাগ আর সেজন্যেই তানিয়া রুশদের আদর্শ বীর।  

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh