করোনাভাইরাসের মাঝে তেলযুদ্ধ, আসল টার্গেট যুক্তরাষ্ট্র

গত ৯ মার্চ আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজারমূল্য একদিনে ৩০ শতাংশের বেশি কমে যায়। ১৯৯১ সালে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের পর থেকে এটা ছিল তেলের বাজারে একদিনে সর্বোচ্চ ধস। 

এর একটা কারণ ছিল বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের কারণে তেলের চাহিদা পড়ে যাওয়া। তবে এই ধসের সাথে যোগ হয়েছে সৌদি আরব ও রাশিয়ার মাঝে তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে সমঝোতায় না পৌঁছানো। 

গত ৬ মার্চ অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় এক বৈঠকে সৌদি কর্মকর্তারা করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবেলায় রাশিয়াকে তেলের উৎপাদন কমাতে অনুরোধ করেন। এই প্রস্তাবে রাশিয়া রাজি না হওয়ায় সৌদি আরব প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে উৎপাদন এক কোটি ২৩ লাখ ব্যারেলে উঠানো ও বিশেষ ক্রেতাদের জন্য ২০ বছরের মাঝে সর্বোচ্চ মূল্য কর্তনের ঘোষণা দেয়। 

সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ জানায়, সৌদিদের কমদামি তেলের বাজার ধরতে উত্তর-পূর্ব এশিয়ার ক্রেতারা ব্যর্থ হবার ফলে এটা নিশ্চিত হয়ে যায় যে, ইউরোপ হতে যাচ্ছে ওই তেলের বাজার, যা ছিল রুশ তেলের মূল বাজার। উত্তর এশিয়ার ক্রেতারা হালকা অপরিশোধিত তেল চাইলেও সৌদিরা তাদের মধ্যম ও উচ্চ অপরিশোধিত তেল কেনার প্রস্তাব দেয়। এতে ওই ক্রেতারা রাজি হননি। 

অন্যদিকে, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ায় সৌদিরা মধ্যম অপরিশোধিত তেল সরবরাহ বাড়াচ্ছে।

গোল্ডমান সাকসের বিশ্লেষকরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ২০ ডলারে নেমে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। তেলের বাজারে ধসের সাথে সাথে তেল কোম্পানিগুলোর শেয়ারের মূল্যেও ব্যাপক দরপতন হয়েছে। গত ১১ মার্চ সৌদি তেল কোম্পানি আরামকো ঘোষণা দেয়, তারা তেলের উৎপাদন ২০২০ সালের মাঝেই বাড়িয়ে দৈনিক এক কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল করবে। 

একইসাথে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানিও ঘোষণা দেয়, তারা এপ্রিলে উৎপাদন ১০ লাখ ব্যারেল বাড়িয়ে ৪০ লাখ ব্যারেল করবে। 

ব্লুমবার্গ জানায়, ইরাক ও নাইজেরিয়াও তেলে উৎপাদন বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। সিএনএন এই ব্যাপারটার ব্যাখ্যা দিয়ে জানায়, তেলের মূল্য নিয়ে এই যুদ্ধের মাঝে সবাই চাইবে যে করেই হোক তেলের বাজারে অংশীদারিত্ব বাড়িয়ে নিতে। গত তিন বছর ধরে সৌদিরা রাশিয়ার সাথে সমঝোতা করে তেলের বাজারে উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করেছে; কিন্তু এখন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে সমঝোতা শেষ হয়ে যাওয়ায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান উৎপাদন বাড়ানোর আক্রমণাত্মক কৌশল নিয়েছেন। 

এ প্রসঙ্গে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান জেপি মরগ্যানের বিশ্লেষক জোসেফ লুপটন বলেন, তেলের মূল্য কমায় ব্যবহারকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সুবিধা হবে। তবে সেদেশের তেল কোম্পানিগুলো সমস্যায় পড়তে পারে। তিনি সৌদি আরবের লক্ষ্যের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, সৌদিরা বাজারে তেলের বন্যা বইয়ে দিতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলোকে চাপে ফেলার জন্য। ২০১৫-১৬ সালের দিকে তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার থেকে ৩০ ডলারে নেমে গেলে তখনো অয়েল ইন্ডাস্ট্রি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছিল। কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ হারায়, চাকরি হারায় বহু মানুষ। 

তখন মার্কিন ব্যাংকগুলোর প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছিল। এখন মার্কিন অয়েল ইন্ডাস্ট্রি আগের চেয়ে শক্ত অবস্থানে থাকলেও তারা সেখানে বিনিয়োগ করতে রাজি নয়। আবার তেলের বাজারে ধসের সাথে সাথে শেয়ার বাজারে যেমন ধস নেমেছে, তেমনি তেল কোম্পানিগুলোর বন্ডও ব্যাপকভাবে মূল্য হারাচ্ছে। 

জেপি মরগ্যান জানায়, ২০২০ সালের দ্বিতীয়াংশে তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৪০ ডলার ও ২০২১ সালে ৫০ ডলারে উঠলেও ২০২১ সালে প্রায় ২৪ শতাংশ তেলের কোম্পানির বন্ড খেলাপি হয়ে যেতে পারে।

সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, সৌদিরা তেলযুদ্ধে নেমে ঘোষণা দিচ্ছে- তারা নিয়ন্ত্রণ না করে তেলের বাজারকে মুক্ত বাজার হিসেবে চলতে দিলে বিপর্যয় নেমে আসবে। সুতরাং বিশ্বকে সৌদি নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে হবে। 

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর তেলের উৎপাদন খরচ সর্বনিম্ন হওয়ায় তারাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে তারা অনেক কম দামে বিশ্বকে তেল দিতে সক্ষম।

তেলের বাজারের পত্রিকা অয়েল প্রাইসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যদিও কেউ কেউ ধারণা করছিলেন যে, চীনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কমে আসার সাথে োথে তেলের বাজারে চাহিদা বাড়বে; কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না- বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের ব্যবহারকারী যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাসের সাথে যুদ্ধ শুরু হয়েছে মাত্র। 

মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন এডমিনিস্ট্রেশনের হিসেবে, ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল ব্যবহার করেছে, যা সারা দুনিয়ার তেল ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশ। তখন চীন ব্যবহার করেছে এক কোটি ৩৬ লাখ ব্যারেল তেল। যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সাথে সাথে মানুষের যাতায়াত কমতে শুরু করবে। ইতোমধ্যে দেশটির বাস্কেটবল, আইস হকি ও বেসবল লিগ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, তেলের মূল্য যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শেইল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে রাশিয়া। 

মার্কিন গবেষণা সংস্থা হাডসন ইনস্টিটিউটের থমাস দুস্তারবার্গ ফোর্বস ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণের বৈশ্বিক বিপর্যয়ের মাঝে সৌদি ও রুশদের তেলের যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক ঋণগ্রস্ত তেল কোম্পানিগুলোকে দেউলিয়াত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের কথায় এটা নিশ্চিত যে, করোনাভাইরাসের অনিশ্চয়তার মাঝে সবাই নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে চাইছে; এতে অন্য কারও ক্ষতি হোক বা না হোক।

বাজার দখলের সাথে সাথে ভূরাজনৈতিক প্রভাবেও ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে। উত্তর-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকায় ভাইরাসের আক্রমণ যে ভূরাজনৈতিক ভূমিকম্পের সূচনা করেছে, তেলযুদ্ধ তার একটি ফল মাত্র।


মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh