মৌসুমি প্রযোজকরা কোথায়?

প্রত্যেক সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতেই কৌশলে কালো টাকার মালিকরা বিনিয়োগ করে থাকেন। বলিউডে গডফাদার দাউদ ইব্রাহিমের নাম যেমন শোনা যায়, তেমনি বাংলাদেশের সিনেমাতেও নব্বই দশকে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের নাম শোনা যেত। বাংলাদেশেও কালো টাকার মালিকরা টাকা সাদা করার জন্য চলচ্চিত্র প্রযোজনা করে থাকেন। কালো টাকাকে সাদা করতে মৌসুমি ব্যবসায়িরা সাম্প্রতিক সময়ে যেসব সিনেমার প্রজেক্ট হাতে নিয়েছেন, সেগুলো এখন থমকে গেছে। এই প্রজেক্টগুলোর কাজ হঠাৎ থেমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, বেশ কিছু প্রযোজককেই সন্দেহের চোখে দেখছে সরকার। অনেকের ব্যাংক হিসাবও জব্দ করা হয়েছে। গোয়েন্দা বিভাগের অনুসন্ধান চালানোর কারণেই তাদের নেওয়া প্রকল্পগুলো হঠাৎ করে থমকে রয়েছে।

জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার আব্দুল আজিজের বিরুদ্ধে ঋণ খেলাপির অভিযোগ ওঠায় জাজ মাল্টিমিডিয়ার কার্যক্রম কমে গেছে। প্রতিষ্ঠানটি যেখানে প্রতি মাসেই একটি করে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিল, সেখানে কয়েক মাস ধরেই চলছে মাত্র একটি সিনেমার কাজ। 

অন্যদিকে ক্যাসিনোকানণ্ডের পর হুট করেই আটকে যায় শাকিব খান অভিনীত ‘আগুন’ সিনেমার কাজ। এ সিনেমার প্রযোজকদের বিরুদ্ধে ক্যাসিনো ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। গ্রেফতার হয়েছেন প্রযোজক আরমান। সিনেমার শুটিং শুরু হওয়ার পর মাঝে পাঁচ দিনের মতো শুটিংও বন্ধ ছিল। এখন পুনরায় ছবিটির শুটিং শুরু হলেও সিনেমাটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।

এদিকে প্রযোজক সেলিম খানের ‘শাহেনশাহ’ সিনেমাটি ৪ অক্টোবর মুক্তির কথা থাকলেও সিনেমাটি মুক্তির তারিখ পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। শাকিব খান অভিনীত এই সিনেমাটি আদৌ মুক্তি পাবে কিনা তা নিয়েও রয়েছে সন্দেহ। একই প্রযোজকের ‘বিক্ষোভ’ সিনেমার শুটিং বন্ধ রয়েছে। এই সিনেমার আইটেম গানের জন্যই চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন সানি লিওন, অভিনয় করবেন কলকাতার শ্রাবন্তী। এটি ছাড়াও তাদের আরও একটি সিনেমার শুটিং বন্ধ রয়েছে। এদিকে অন্য একটি প্রযোজনা সংস্থা থেকে দেবের ‘পাসওয়ার্ড’ সিনেমা আমদানি করে মুক্তি দেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত মুক্তি দেওয়া হচ্ছে না বলে জানা গেছে কারণ একই।

কিছুদিন আগেও বেশ কিছু প্রযোজক বিদেশি শিল্পীদের নিয়ে সিনেমা বানানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন। বিশেষ করে ঋতুপর্ণা, শ্রাবন্তী, নারগিস ফাখরিসহ আরও অনেক বিদেশি তারকাকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা দিলেও সেই সব প্রজেক্ট আপাতত থমকে আছে।

একটি সূত্র বলছে, এতদিন যারা ব্যয়বহুল সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন তাদের প্রত্যেকেরই অর্থের উৎসের ব্যাপারে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। ফলে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত সহসাই ব্যয়বহুল সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা দিচ্ছেন না প্রযোজকরা। এ কারণে কিছুদিনের জন্য বেকার হয়ে পড়বেন অনেক কলাকুশলী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিচালক বলেন, ‘সিনেমায় অনেকেই কালো টাকা নিয়ে আসেন এটা ঠিক, কিন্তু তারা এই ইন্ডাস্ট্রিতে বেশি দিন থাকেন না। ফলে যে ব্যাপারটা ঘটে, কালো টাকার মালিকরা সিনেমা নির্মাণ করতে এসে মার্কেটের দিকে না তাকিয়েই ব্যয়বহুল সিনেমা নির্মাণে হাত দেন। কিন্তু কাক্সিক্ষত সাফল্য না পেয়ে তারা আবার চলেও যান। মূলত কালোবাজারি বা ক্যাসিনো মালিকরা সিনেমার মৌসুমি প্রযোজক, তাদের ওপর নির্ভর করে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি চলছে না। কিন্তু তারা এসে সিনেমার সবচেয়ে বড় একটা ক্ষতি করে যান। সেটা হচ্ছে কালো টাকার কারবারিরা এসেই মার্কেটের চেয়ে বেশি বাজেটে সিনেমা নির্মাণ করেন, এতে বাজার নষ্ট হয়। দ্বিতীয়ত, তারা এসে নায়ক-নায়িকাদের পারিশ্রমিক রাতারাতি বাড়িয়ে দিয়ে যান। পরে যখন সাধারণ প্রযোজকেরা ওই নায়ক-নায়িকাকে নিয়ে সিনেমা বানাতে চান তখন তারা মুশকিলে পড়েন। তৃতীয়ত, কালো টাকার দৌরাত্ম্যে শিল্পীরা আসার পর তাদের আচরণ আচরণেও প্রভাব পড়ে। যেটা পরবর্তীতে ইন্ডাস্ট্রির নিয়মিত ও সাধারণ প্রযোজকদের জন্য যন্ত্রণাকর হয়ে পড়ে। এসব কারণে একটা সময় সাধারণ প্রযোজকরাও সিনেমা নির্মাণ ছেড়ে দেন। চতুর্থত, কালো টাকার কারবারিরা সিনে মার্কেটে নোংরা রাজনীতিও করেন। অসম বৈষম্য তৈরি করে কেটে পড়েন। আমি মনে করি কালো টাকা মুক্ত সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলতে পারলে সিনেমারই মঙ্গল হবে।’


মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh