বাসু চ্যাটার্জির কাছে অনেক কিছু শিখেছি: ফেরদৌস

ফেরদৌস।

ফেরদৌস।

তখনো আমার কোনো ছবি মুক্তি পায়নি। মাস ছয়েকের মতো কাজ করেছি। কাজ বলতে সালমান শাহর অসমাপ্ত একটি ছবি শেষ করেছি আর ‘পৃথিবী আমারে চায় না’ ছবির কাজ করছি। সে সময়ই বাসুদা ঢাকায় আসেন। তার সঙ্গে দেখা হয়। প্রথম দেখাতেই ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ ছবির জন্য আমাকে নির্বাচিত করে ফেলেন। প্রথমদিন থেকেই তার প্রতি এক অদ্ভুত ভালোলাগা শুরু হয়ে যায়।

এক সপ্তাহের মধ্যেই কলকাতা থেকে ফোন দিয়ে আমাকে ওখানে নিয়ে যান। ছবিটির শুটিং শুরু হয়ে যায়। আমি জানতাম বাসুদা অসম্ভব বড় পরিচালক। তার কিছু ছবি আমার দেখা ছিল। যেমন ‘সৌখিন’, ‘পছন্দ আপনা আপনা’, ‘সারা আকাশ’ ইত্যাদি। তার রোমান্টিক ছবিগুলো একদম আলাদা। বাস্তবে ভালোবাসার গল্প। ব্যাপারগুলো আমার ভালো লাগত। কাজ করতে গিয়ে ভয় লাগলেও পরে দেখলাম তিনি একদম আমার মতো। যেন আমার বন্ধু। কলেজের বন্ধুর সঙ্গে মিশলে যেমন লাগে তার সঙ্গে মিশলে তেমনই লাগত।


তিনি এত বড় একজন পরিচালক যার সঙ্গে অমিতাভ বচ্চন, রাজেশ খান্না, মিঠুন চক্রবর্তীসহ সে সময়ের তারকারা কাজ করেছেন। আমার কখনো তা মনে হয়নি। তিনি আমার মতো নতুন একটা ছেলেকে দিয়ে অসাধারণ একটি কাজ করিয়ে নিলেন। এভাবেই তার সঙ্গে একটা বন্ধন তৈরি হয়ে গেল।

আমি অন্য কোনো ছবির শুটিংয়ে কলকাতায় গেলে তিনিও তখন কলকাতায় আসার পরিকল্পনা করতেন। কিংবা মুম্বাই গেলেও তার সঙ্গে শুটিংয়ের ফাঁকে দেখা হতো। বের হতাম, শপিং করতাম বৌদিসহ। আমি অন্যান্য ছবি করলেও তিনি ওসব নিয়ে কিছু বলতেন না। কী কাজ করলাম জানতে চেয়ে প্রয়োজনীয় আলাপে চলে যেতেন। অন্যকে নিয়ে কোনোরকম আলোচনা-সমালোচনাও করতেন না। আমার প্রশংসাও তিনি করতেন না। শট শেষে আমি যদি বলতাম ‘শটটা কি আরেকবার দেব?’ তিনি বলতেন, ‘কেন আগের শটে কী সমস্যা?’ আমি যখন বলতাম, ‘মনে হলো ওই জায়গাটা ...’ তখন তিনি বলে বসতেন, ‘তুমি ডিরেক্টর না আমি? আমি সব দেখছি। খারাপ হলে আমি বলব।’ তখন বুঝতাম, সব ঠিক আছে। আমি তার কাছে অনেক কিছু শিখেছি। 


আমি যখন ‘চুপি চুপি’ করছি তখন বাসুদা ‘এক কাপ চা’ এর গল্পটা শোনালেন। বললেন, আমাকে এ চরিত্রে মানাবে না। একজন শিক্ষকের চরিত্র। তখনো ছাত্রের চরিত্র করছিলাম। তাই তিনি বললেন আরও কিছুদিন পর এ চরিত্র করতে পারব। পরে একসময় আমি ছবি বানানোর পরিকল্পনা করলাম। ‘এক কাপ চা’ এর গল্পটা বেছে নিলাম। তাকে পরিচালনা করতে বললাম। তিনি রাজি হলেন না। আমাকে পরিচালনা করতে বললেন। কারণ তখন তিনি দৌড়াদৌড়ি হবে এমন কাজ করতে চাচ্ছিলেন না। আমি সাহস করতে পারছিলাম না। তখন নেয়ামুলের কথা বলায় তিনি সায় দিলেন। ছবি দেখার পর ভালো-মন্দ কিছুই বললেন না। অনেক খরচা করেছি ছবিতে, এতটুকুই মত দিলেন।

বাসুদার সঙ্গে ২০১৮ সালেই একটা ছবি করার কথা ছিল। বিমল করের ছোট গল্প ‘বৌ নিয়ে খেলা’ অবলম্বনে বাসুদা চিত্রনাট্য প্রস্তুত করেন ‘বিয়ের ফাঁদে’। আমার কাছে চিত্রনাট্য আছে। যৌথ প্রযোজনার আনুষঙ্গিক কাজ এগিয়েও গিয়েছিল। তখন থেকেই তার শরীর খারাপ হতে শুরু করে। তার পরিবার থেকেই আমাকে অনুরোধ করল, পরিচালনা করতে মানা করতে। আমি বললাম, ‘না না আমি দাদাকে মানা করতে পারব না।’ পরে অবশ্য তাকে বলি, ‘দাদা আমরা কাজটা কদিন পর শুরু করব। তোমার শরীরটা একটু ভালো হোক।’ তিনি তখন বললেন, ‘আমি পারব। প্রয়োজনে বসে বসে নির্দেশনা দেব। শুধু তো ক্যামেরা অ্যাকশন বলা। বাকি কাজ তো তুমি করে ফেলবে।’ আমি কয়েকটা দিন দেখার কথা বললাম। এভাবে দেখতে দেখতে তার শরীর খারাপ হতে শুরু করল। ভুলে যেতে শুরু করল।


একদিন ফোনে বললাম, ‘দাদা কী অবস্থা, ছবিটার কী ...’ তখন বললেন, ‘কোন ছবিটা বলো তো?’ তখন বুঝতে পারলাম এসব নিয়ে আলোচনা করে লাভ নেই। তার বেঁচে থাকাটা জরুরি। পরে মানুষকেও চিনতে পারতেন না। কথাও বলছেন না। এভাবেই তিনি চলে গেলেন। তার সঙ্গে আমার অসংখ্য স্মৃতি, সব বলে শেষ করা যাবে না। তিনি ছিলেন আমার বন্ধু, ভাই, বাবা।

(অনুলিখন : মোহাম্মদ তারেক)

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

<