৬৪ হাজার কোটি টাকা ঢালার পরও লোকসানে রেল

লোকসানে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে রেল। গত সাড়ে ৯ বছরে প্রায় ৬৪ হাজার কোটি বিনিয়োগেরও পরও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি লাভ দূরে থাক, পরিচালনা ব্যয়ই তুলতে পারছে না। উল্টো আয় কমেছে। 

২০১৮-১৯ অর্থ বছরে রেলে লোকসান দেড় হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর আগের বছর লোকসান ছিল এক হাজার ৪১৮ কোটি টাকা।

২০১৮-১৯ অর্থবছর সাড়ে তিন মাস আগে শেষ হলেও এখনো ওই অর্থ বছরের আয় ব্যয়ের পূণার্ঙ্গ হিসাব দিতে পারেনি রেল কর্তৃপক্ষ। রেলের পরিচালক (হিসাব) মিয়াজী মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ জানিয়েছেন, আরো সপ্তাহখানেক লাগবে পূর্ণাঙ্গ হিসাব হাতে পেতে। দেরির কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘হিসাব বিভাগে অনুমোদিত জনবল থাকার কথা এক হাজার ৩৪৭ জন। জনবল রয়েছে ৬৭২ জন। ৬৭৫টি পদ খালি, এ কারণে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ হচ্ছে না।’ 

হিসাব বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে আয় হয়েছে এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা। আগের বছরে রেলের ব্যয় ছিল দুই হাজার ৭১৬ কোটি টাকা। আয় হয় এক হাজার ২৯৮ কোটি টাকা। 

ব্রিটিশদের হাত ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে রেলের পত্তন। পাশের দেশ ভারতে রেল প্রতি বছর মুনাফা করলেও, প্রথম পৃষ্ঠার পর

বাংলাদেশে রেল বরাবরই লোকসানি খাত। তবে ২০১১-১২ অর্থবছর থেকে রেলে অনুন্নয়ন ব্যয়ের (পরিচালনা) চেয়ে উন্নয়ন খাতে (প্রকল্প বাস্তবায়ন) বেশি বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। 

২০১৭-১৮ অর্থবছরে রেলের পেছনে ব্যয় করা হয়েছে ১০ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে দুই হাজার ৭১৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে পরিচালনায়। বাকি আট হাজার ১০১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নে। গত ১০ অর্থবছরে (২০০৯-১০ থেকে ২০১৮-১৯) রেলে ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ৬৪ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। পরিচালন খাতে ব্যয় করা হয়েছে ২০ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা। বাকি টাকার কাজ চলছে। এত বিপুল ব্যয়েও আয় বাড়েনি, বরং কমেছে। 

বিপুল বিনিয়োগের পরও রেলের দুর্দশার জন্য রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন অতীতের ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন। তিনি বলেছেন, ‘১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ১৭ বছরে রেলে কোনো উন্নয়ন হয়নি। একটিও নতুন ইঞ্জিন, বগি কেনা হয়নি। বিএনপি ১০ বছর ক্ষমতায় থেকে শতাধিক স্টেশন, শতাধিক কিলোমটার লাইন বন্ধ করে দেয়। তার জের এখনো টানতে হচ্ছে।’ 

বিএনপির ১০ বছরের ‘ক্ষতি’ আওয়ামী লীগ ১১ বছরে কেন কাটিয়ে উঠতে পারেনি? এ প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, ‘রেল ঘুরে দাঁড়াবে। ৪৩টি প্রকল্পের কাজ চলছে। ২০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’ চলমান বড় প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন হলে রেল ঘুরে দাঁড়াবে, লাভ করবে বলে আশাবাদী মন্ত্রী।

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রেলের ভাড়া ৭ থেকে ৯ শতাংশ বাড়ানো হয়, এতে গত কয়েক বছরে আয় বাড়লেও এবার তা কমেছে। ২০১২ সালেও বেড়েছিল ভাড়া। অন্যান্যবারের মতো এবারো রেলের আয়ের বড় অংশ এসেছে যাত্রী পরিবহন থেকে। সেখানে লোকসানও বেশি। রেলের হিসাব শাখার তথ্যানুযায়ী, যাত্রী পরিবহনে আয় আগের চেয়ে বাড়লেও ৫০০ কোটি টাকা ছাড়ায়নি। 

আগের অর্থবছরে রেলের পরিচালনা খাতে দুই হাজার ৫৩২ কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে আয় ছিল ১ হাজার ৩০৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। যাত্রী পরিবহনে আয় হয়েছে ৭৮৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা। পণ্য পরিবহনে ছিল ২৮৩ কোটি টাকা। আয়ের মাত্র ২১ ভাগ এসেছিল পণ্য পরিবহন থেকে। এবারো পণ্য পরিবহনে দুর্গতির ছবি খুব একটা বদলায়নি। 

২০১৫-১৬ অর্থবছরে রেলের আয় হয়, ১ হাজার ২৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। যাত্রী পরিবহনে আয় ছিল ৫৯৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। পণ্য পরিবহনে আয় হয় ২০৪ কোটি টাকা। বিপরীতে ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে ভারতীয় রেল আয় করেছে ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি রুপি। ভারতীয় রেল পণ্য পরিবহনে আয় করে ১ লাখ ৯ হাজার কোটি রুপি। 

রেল কর্মকর্তারা বলছেন, পণ্য পরিবহন কমে যাওয়ায় লোকসানের বোঝা ভারী হচ্ছে বছর বছর। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বলে পণ্য পরিবহনের চেয়ে লোকসানি যাত্রী পরিবহনে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। 

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যাত্রী পরিবহনে পৃথিবীর সবদেশের রেল লোকসান করে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। লোকসান পোষানো হয় পণ্য পরিবহনে। বাংলাদেশে রেলে পণ্য পরিবহন কমে যাওয়ায় লোকসান বাড়ছে। 

রেলওয়ের তথ্য অনুসারে, প্রতি কিলোমিটারে যাত্রীপ্রতি রেলের আয় গড়ে ৫৬ পয়সা। ব্যয় এক টাকা ৫২ পয়সা। পণ্য পরিবহনে প্রতি টনে রেলের কিলোমিটার প্রতি ব্যয় ২২ পয়সা। আয় হয় দুই টাকা ৫ পয়সা। ২০০১-০২ অর্থবছরেও পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের আয় ছিল প্রায় সমান। ১৬ বছর পর পণ্য পরিবহনে আয়, যাত্রী পরিবহনের চার ভাগের এক ভাগ। ২০০২-০৩ অর্থবছরে পণ্য পরিবহন করে তিন কোটি ৯১ লাখ ৬২ হাজার যাত্রী। একই সময়ে পণ্য পরিবহন করে ৩৬ লাখ ৬৬ হাজার টন। রেলে যাত্রী প্রায় আট কোটি হলেও পণ্য পরিবহন কমে হয়েছে প্রায় ২৫ লাখ টন। 

রেলের একজন পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তা জানান, এক দশক আগেও দেশের মোট আমদানি-রপ্তানি পণ্যে ১২ ভাগ রেলের মাধ্যমে পরিবহন করা হতো। এখন তা কমে পাঁচ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কেন এ দুরবস্থা- এ প্রশ্নে তিনি জানান, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব ছয় ঘণ্টা। পণ্য পরিবহনে লেগে যায় দুই দিন। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের পুরোটা ডাবল লাইনে উন্নীত হয়নি। যাত্রীবাহী ট্রেনকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে পণ্যবাহী ওয়াগনকে ঢাকা-চট্টগ্রাম পর্যন্ত অন্তত ১৪টি স্থানে ‘ক্রসিং’ (থামাতে হয়) দিতে হয়। এতে সময় বেশি লাগে। তাই রেল সাশ্রয়ী হলেও ব্যবসায়ীরা সময় বাঁচাতে সড়ক পথে পণ্য পরিবহন করেন। 

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যপক ড. সামছুল হক বলেন, ‘পণ্য পরিবহনের ৯৫ ভাগই হয় সড়কপথে। নিরাপদ ও সাশ্রয়ী হওয়ার পরও ব্যবসায়ীরা রেলে আগ্রহী নন, কারণ সময়ের অপচয়। রেলের পরিকল্পিত উন্নয়ন হয়নি বলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।’ 

রেলে পণ্য পরিবহন কমে যাওয়া ও লোকসানের অন্যতম কারণ কোচ (বগি), ওয়াগন ও ইঞ্জিন সংকট। ২০১১ সাল পর্যন্ত আগের ১০ বছরে কোনো ইঞ্জিন কেনা হয়নি। বর্তমান সরকারের সময়ে যাত্রীবাহী বগি কেনা হয়েছে ২৭০টি। পণ্যবাহী ওয়াগন কেনা হয়েছে ৪৪৬টি। ইঞ্জিন সংগ্রহ করা হয়েছে ৪৬টি। যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। রেলে পণ্যবাহী আট হাজার ৬৮০টি ওয়াগানের মধ্যে তিন হাজার ৯৩৯টির আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। 

এদিকে রেলখাত বিশেষজ্ঞ আহসান উলাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এম এম শফিউল্লাহ বলেন, ‘রেলকে লাভজনক করার ইচ্ছা আছে বলে মনে হয় না। যদি থাকত তাহলে বগি ইঞ্জিন সংগ্রহে মনোযোগ থাকত। তা না করে মনোযোগ অবকাঠামোতে, কারণ তাতে দুর্নীতি সহজ।’

মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh