অদম্য সাহস নিয়ে চলতে চাই

ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ, সম্পাদক, সাম্প্রতিক দেশকাল

ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ, সম্পাদক, সাম্প্রতিক দেশকাল

সাপ্তাহিক ‘সাম্প্রতিক দেশকাল’ যাত্রা শুরু করেছিল ২০১৩ সালের ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারির ২ তারিখ। 

আর প্রথম সংখ্যার প্রধান প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘মওলানা ভাসানী : মেহনতি মানুষের কণ্ঠস্বর’, যিনি ছিলেন জনগণের নিবেদিতপ্রাণ সেবক ও ‘মজলুম জননেতা’ হিসেবে সমধিক পরিচিত।

এভাবে প্রথম সংখ্যা থেকেই সাম্প্রতিক দেশকাল মজলুম মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছে। আমরা মানুষের সার্বিক উন্নয়নের পক্ষে। আমাদের লক্ষ্য নির্ভীক ও আপসহীন থাকা, পক্ষপাতহীন মতামত, গঠনমূলক সমালোচনা, অদম্য সাহস ও আপসহীন মনোভাব প্রকাশ করা; কিন্তু সেই লক্ষ্যে আমরা কতটুকু হাঁটতে পেরেছি? 

আজ যখন সাম্প্রতিক দেশকাল সাত বছরে পা রাখছে- তখন পাঠকের কাছে সেই ফিরিস্তি টানার দরকার আছে বলে আমরা মনে করি। কারণ পাঠক আমাদের শক্তি ও অনুপ্রেরণার উৎস। তারাই আমাদের চালিকাশক্তি। আজকের এ দিনে পাঠক, লেখক, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি শুভেচ্ছা, অভিবাদন, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার কোনো সীমা নেই। বিগত বছরগুলোতে আমরা পাঠকের সামনে হাজির হয়েছি পরীক্ষার্থীর মতো। তারাই বিবেচনা করবেন সাম্প্রতিক দেশকাল কতটা কৃতকার্য হলো। কারণ প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে পাঠকই মুখ ফিরিয়ে নেন।

কিন্তু আমরা এ কথা ভেবে আপ্লুত বোধ করি, সাম্প্রতিক দেশকালের প্রচারসংখ্যা বছর বছর বাড়ছে। কোনো বছরই আমাদের মুদ্রণ ও বিক্রয়সংখ্যা কমেনি। বরং ঢাকা মহানগরীসহ দেশের ৬৪টি জেলায় পত্রিকাটি এখন পাওয়া যাচ্ছে। দেশের আনাচে-কানাচে ৭০ প্রতিনিধি প্রতিনিয়ত সমস্যা-সম্ভাবনার চিত্র নির্ভীকভাবে তুলে ধরছেন। দেশের প্রতিটি সাপ্তাহিকের প্রচার শুধু নগরকেন্দ্রিক। কিন্তু সাম্প্রতিক দেশকাল শহর ছাড়িয়ে মেঠোপথের পত্রিকা স্টলেও পৌঁছে গেছে। দিনে দিনে আমাদের পাঠকসংখ্যা বাড়ছে, সাম্প্রতিক দেশকালের প্রতি আপনাদের এই যে ভালোবাসা, এর উৎস কী, আমরা কখনো হয়তো তার হিসাব করিনি। 

কিন্তু আমরা জানি, আজ থেকে সাত বছর আগের দিনটি থেকেই আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট। আমরা স্বাধীন, নিরপেক্ষ, সৎ, সাহসী সাংবাদিকতা ও ভালো চিন্তা, ভালো কাজ ও পরিবর্তনের সহযাত্রী হতে চেয়েছি। কোনো দল, ব্যক্তি কিংবা বিজ্ঞাপনদাতা গোষ্ঠীর কাছে বন্ধক দেইনি নিজেদের। সাধারণ সেই সব মানুষ, যাদের কথা বড় মিডিয়ায় উঠে আসে না আমরা তাদের কথাও তুলে ধরেছি। গণতন্ত্র, কৃষক, বঞ্চিত-নিপীড়িত, মুক্তিযুদ্ধ, নারী-শিশুর অধিকার, প্রান্তিক, আদিবাসী ও সংখ্যালঘুর অধিকারের পক্ষে অবিচল থেকেছি। পাদপ্রদীপের আড়ালের খবরগুলোকে গুরুত্ব দিয়েছি। খবরের উপস্থাপনায়ও ভিন্ন স্বাদ আনার চেষ্টা করেছি। 

আমাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য, অনেক নতুন লেখক তৈরি করতে পেরেছি। আমাদের চারপাশে তরুণ অনেক লেখক আছেন, যাদের লেখার জায়গা একেবারেই সংকুচিত। প্রবীণদের পাশাপাশি আমাদের পাতায় পাতায় গুরুত্ব পেয়েছেন এইসব তরুণ লেখক। আমরা জন্ম দিয়েছি অসংখ্য নতুন কুঁড়ির। আগামী দিনগুলোতে তারা তাদের সৌরভ ছড়াতে থাকবে, আমরা নিশ্চিত। 

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনকে সামনে রেখে আমাদের দায়িত্ব এসব কুঁড়ির যত্ন নেয়া ও এই প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। তাইতো আমরা সাম্প্রতিক দেশকালকে নবীন-প্রবীণ লেখকদের মিলনকেন্দ্রে পরিণত করার চেষ্টা করছি। আমরা নিরন্তর পুনর্নির্মাণ ও নতুনের সংযোজনে পৌনঃপুনিকতার একঘেয়েমির হাত থেকে পাঠক ও শ্রোতাদের পরিত্রাণ দেয়ার চেষ্টা করছি। আমরা নিশ্চিত, যা ধীরে ধীরে পাঠকের সামনে স্পষ্ট ও দৃষ্টিগ্রাহ্য হবে। 

ইতিমধ্যে ত্রৈমাসিক ‘দেশকাল পত্রিকা’ নামে নতুন একটি প্রকাশনা পাঠকের সামনে হাজির করেছি। ২০১৯ সালে ১৬০ পৃষ্ঠার এ পত্রিকাটির চারটি সংখ্যা আমরা প্রকাশ করেছি। ত্রৈমাসিক ‘দেশকাল পত্রিকা’র প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে আমরা তাকিয়ে ছিলাম, পাঠক কীভাবে পত্রিকাটিকে গ্রহণ করছেন, দেখার জন্য। কারণ বাজারে প্রচলিত ম্যাগাজিনগুলোর বাইরে ভিন্ন একটা ধারা আমরা তৈরি করতে চেয়েছি। আমরা চেয়েছি সব রকম পাঠকের উপযোগী রুচিসম্মত ও আনন্দদায়ক একটি প্রকাশনা উপহার দিতে। যতদূর পাঠকরা তাদের মতামত জানিয়েছেন, তাতে আমরা সঠিকপথেই চলছি বলে ধারণা করতে পারি। কেবল ঢাকা নয়, ঢাকার বাইরে থেকেও পাঠকরা তাদের সপ্রশংস মতামত জানিয়েছেন আমাদের। এমনকি কলকাতা থেকেও কয়েকজন লেখক-পাঠক আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, পরামর্শ দিয়েছেন। দেশে ত্রৈমাসিক ‘দেশকাল পত্রিকা’র প্রচারসংখ্যা এখন ১৫ হাজার। দেশের সীমানা পেরিয়ে পত্রিকাটি এখন কলকাতা ও লন্ডনেও পাওয়া যাচ্ছে। 

বলাবাহুল্য ত্রৈমাসিক ‘দেশকাল পত্রিকা’টি সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল থেকে ভিন্ন। এখানে প্রচারের আলোর বাইরে থাকা গুণী মানুষদের আমরা সামনে তুলে আনার চেষ্টা করছি। এ পত্রিকায় রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন যেমন স্থান পাচ্ছে আবার লাইফস্টাইল, ভ্রমণ, সাহিত্য, প্রযুক্তি, তারুণ্যের বিশদ লেখাও গুরুত্বসহ প্রকাশ করা হচ্ছে। মূলত এই ম্যাগাজিনটিকে আমরা চেয়েছি পারিবারিক একটি কাগজ হিসেবে পাঠকের কাছে তুলে ধরতে। আপনাদের পরিবারের একজন সদস্য হয়ে উঠতে। বাড়ির ছোট্ট শিশুটি থেকে গৃহিণী, কর্মজীবী নারী থেকে প্রবীণতম সদস্যের চাহিদা যেন দেশকাল পত্রিকার মাধ্যমে মেটানো যায়। আমরা আনন্দের সঙ্গে জানাতে চাই, দেশকাল পত্রিকা যেমন অফিসের-পাঠাগারের পত্রিকা হয়ে উঠেছে, তেমনি ঘরে গৃহিণীরও প্রিয় পত্রিকা হয়ে উঠেছে। ড্রয়িং রুমের শোভা হিসেবেও এখন আলো ছড়াচ্ছে এটি।

আজকের এই আনন্দের দিনে আমি আপনাদের একটা চমৎকার তথ্য জানাতে চাই। আমরা নতুন আঙ্গিকে ২৪ ঘণ্টার অনলাইন সার্ভিস চালু করেছি। এর মাধ্যমে আমরা অনলাইন সাম্প্রতিক দেশকালকে আরো দৃষ্টিনন্দন ও গতিশীল করার উদ্যোগ নিয়েছি, মুহূর্তের সব খবর, ছবি, ভিডিও পাঠকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি। একঝাঁক তরুণ, মেধাবী কর্মী নিরন্তর অনলাইন সাম্প্রতিক দেশকালকে প্রতিযোগিতার শীর্ষে নিতে কাজ করছেন। 

ই-সাম্প্রতিক দেশকালও পাঠকের প্রিয় হয়ে উঠেছে লক্ষ্য করে আমরা আনন্দিত। সাপ্তাহিক ও ত্রৈমাসিকে আমরা ঘটনার ভেতরের খবর উপস্থাপন করছি, কিন্তু পাঠকের প্রতিদিনের চলমান ঘটনার খবর জানবার আগ্রহের ক্ষুধা নিবারণে আমরা www.shampratikdeshkal.com চালু রেখেছি ২৪ ঘণ্টা।

সৃজনশীল ও ভিন্ন চিন্তার মানুষের মাঝে সেতুবন্ধন তৈরির জন্য আমাদের অগ্রযাত্রায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে ‘বৈঠকি’। মাসিক বৈঠকির মাধ্যমে শিল্প-সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন ও সমকালীন সমাজ-রাষ্ট্রে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিশ্লেষণ হাজির করা হয় মুক্তভাবে। প্রতি পর্বে একজন আলোচক একটি সুনির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে তার বক্তব্য তুলে ধরেন। উপস্থিত অন্য অংশগ্রহণকারীরা প্রশ্নোত্তরপর্বে অংশ নিয়ে তাদের মতামত জানিয়ে থাকেন। বৈঠকির পুরো আলোচনার ভিডিও ধারণ করা হয় এবং সাম্প্রতিক দেশকালের ইউটিউব চ্যানেল ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এ পর্যন্ত আমরা ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে পাঁচটি প্রাণবন্ত আড্ডার আয়োজন করেছি। যেখানে না বলা অনেক কথা উঠে এসেছে। 

তবে এই যে আমাদের অগ্রযাত্রা, স্বপ্নের পথচলা তা খুব সহজ ছিল না কখনই। দীর্ঘ পথচলায় বার বার এসেছে নানা বাধা ও প্রতিবন্ধকতা। আমরা এইসব বাধা ও সীমাবদ্ধতাকে ‘পায়ের ভৃত্য’ মনে করেই এগিয়ে চলেছি। সাহস নিয়ে এগিয়ে গেছি বারবার, যার কাছে সব বাধা পরাজিত হয়েছে। তাইতো এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিশেষ সংখ্যার স্লোগান ‘সাহসী সাত’। আমরা সাহসকে বুকে নিয়েই পথ চলতে চাই। আমাদের প্রত্যাশা দুঃখ, দৈন্য, অপ্রাপ্তি মুছে দেশের মানুষের হাত ধরে সাম্প্রতিক দেশকাল আরো বহুদূর এগিয়ে যাবে। 

মানুষ এখন প্রতিবাদ করতে যেন ভুলে গেছে। চোখের সামনে অন্যায় দেখলেও বিবেক জাগ্রত হয় না। মানুষ যেন সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলতে ভুলে গেছে। আমরা মানুষের মনে শুভ বোধ জাগাতে চাই, সাহস জোগাতে চাই। সাম্প্রতিক দেশকালের জন্মদিনে হতাশা আর নিরাশার কথা শোনাতে না চাইলেও আমাদের প্রিয় দেশ নিয়ে নানাজনের নানা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার দৃশ্যপটটি ভুলে থাকতে পারি না। বর্তমান সরকারের সাফল্যের পাল্লা কম না হলেও ভুলে গেলে চলবে না দেশের বিশালসংখ্যক মানুষ এখনো দরিদ্রসীমার নিচে বসবাস করছে, বৈষম্য এখানে উন্নয়নের প্রতিপক্ষ। সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না আজও, কোটি কোটি শিক্ষিত তরুণ বেকারত্বের ভয়াবহ অভিশাপ নিয়ে সীমাহীন যন্ত্রণায় জীবনযাপন করছে, অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের ওপর নিপীড়ন চলছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে, ব্যাংক থেকে শত শত কোটি টাকা লুটপাট হচ্ছে, গণমাধ্যমকর্মী ও স্যোসাল অ্যাক্টিভিস্টরা নির্ভয়ে কথা বলতে পারছেন না। তবু বলব এই সব কিছুকে নিয়েই ‘যেতে হবে বহু দূর’। 

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিশেষ সংখ্যার থিম ‘সাংবাদিকতা’। সাংবাদিকতার বিভিন্ন চড়াই-উৎরাই ও লেখক-সংবাদকর্মীদের অভিজ্ঞতা দিয়ে সংখ্যাটি সাজানো হয়েছে। আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে। 

সুপ্রিয় পাঠক, সাম্প্রতিক দেশকাল হয়ে উঠতে চায় পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইলের জনতার সম্মিলিত কণ্ঠস্বর। গণতন্ত্র ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে ‘চিন্তা ও তৎপরতার সহযোগী’ হিসাবে আপনাদের পাশে থাকার অঙ্গীকারে আমরা অবিচল, অতন্দ্র। সবাইকে শুভেচ্ছা।

ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ
সম্পাদক, সাম্প্রতিক দেশকাল।

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh