গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম ও পরিবর্তিত সাংবাদিকতা

প্রায় ২১ বছর জনসংযোগ পেশা এবং দুটো প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেখেছি গণমাধ্যমের শক্তির প্রতি অসহায় নির্ভরতা। গণমাধ্যম ছিল আমাদের জন্য এক কঠিন বাধ্যবাধকতা। যার কোনো বিকল্প নেই এবং যাকে কি না রীতিমতো সমীহ ও ভয় করা হতো। প্রতিষ্ঠানের তথ্য ও সংবাদ প্রকাশ এবং ভাবমূর্তি রক্ষায় গণমাধ্যমকে হাতে রাখার যুদ্ধটা এক কথায় ছিল প্রাণান্তকর। ঠিক একইভাবে দু’দশকের বেশি লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত থেকে ভিন্ন আঙ্গিক থেকে দেখেছি গণমাধ্যমের দাপট, প্রভাব ও এর প্রতি অন্ধ পূজা। 

২০১৪ সালের দিকে জনসংযোগ কর্মকর্তাদের ফেসবুক পেজ খোলার জন্য দাপ্তরিক নির্দেশ দেওয়া হলো। ফেসবুক তখন তার যাত্রায় একদশক পূর্ণ করেছে এবং জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। দাপ্তরিকভাবে ফেসবুক খোলা হলো এবং জনসংযোগ কর্মকর্তাদের ফেসবুকে দক্ষতা না থাকা অনেকটা অযোগ্যতা বলে বিবেচিত হয়ে উঠল। ঠিক তখনই সত্যটা হঠাৎ আমাদের কাছে খুব বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠল যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম শুধু ব্যক্তির অনুভূতি আর পরিবারের ছবি পোস্টের জায়গায় আর নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের বুঝে ওঠার আগেই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এরকম একটি বিষয় যখন আলোচনায়, তখন দুনিয়াজুড়ে আরেকটা বির্তকও বেশ জোরদার হয়ে ওঠে সামাজিক যোগাযোগ ‘সংবাদ মাধ্যম’ কি না? আবার অনেকে প্রশ্ন করেন সামাজিক মাধ্যম গণমাধ্যম হয়ে উঠেছে কিনা? 

সামাজিক মাধ্যম ক্রমেই যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এ সত্য অস্বীকার করা না গেলেও কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে, এটি সংবাদ মাধ্যম হতে পারেনি। কারণ খোদ মার্ক জুকারবার্গ ফেসবুকে ‘ভ্রান্ত খবর’ বিষয়ে সতর্ক করে ব্যক্তিগত টাইমলাইনের সংবাদকে প্রাধান্য কম দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে সঙ্গত কারণেই যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে সামাজিক মাধ্যমের নির্ভরযোগ্যতা এবং বিশ্বস্ততা প্রশ্নবিদ্ধ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সংবাদ এবং তথ্যগুলোর কোনো দায় নেই। এর কোনো বিশ্বস্ত তথ্য উৎসও নেই, তাই তা মানুষের আস্থা অর্জনে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে। 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যে মানুষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে সেটি সিঙ্গাপুরের নানিয়াং টেকনোলজি ইউনিভার্সিটির উই কিম উই স্কুল অব কমিউনিকেশন অ্যান্ড ইনফরমেশন বিভাগের একটি জরিপেও উঠে এসেছে। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে ২ হাজার ৫০২ জন ফেসবুক ব্যবহারকারীর ওপর জরিপ চালান এ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এডসন সি টানডর জুনিয়র। গবেষণায় তিনি দেখতে পান, ৭৩ দশমিক ৬০ শতাংশ মানুষ ফেসবুকের মিথ্যা খবর এড়িয়ে যান। এর মধ্যে ১২ দশমিক ২৫ শতাংশ লোক মিথ্যা পোস্ট সরাতে ফেসবুকে রিপোর্ট করেন। 

সামাজিক মাধ্যমের তথ্যের কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা, প্রচুর মিথ্যা বানোয়াট তথ্য এখানে তাৎক্ষণিকভাবে পোস্ট দেওয়া হয়, কিন্তু এটা সত্য যে, সামাজিক মাধ্যমে অসংখ্য বিষয় শেয়ার করা হয়। এত শত বিষয়ের মধ্যে কিছু বিষয়ের তথ্যমূল্য অবশ্যই রয়েছে। মূলধারার সাংবাদিকরা যে সকল বিষয় তুলে আনতে পারেন না, এমন অনেক বিষয় সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ পায়। তাহলে সেগুলোকে আমরা কি বলে চিহ্নিত করব সংবাদ না অন্য কিছু? এখন কাকে আমরা সংবাদ বলব বা তথ্য কীভাবে সংবাদের মর্যাদায় উত্তীর্ণ হবে?

সংবাদ বা খবর সম্পর্কে বলা হয়, সংবাদ বা খবরের নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই। তবে এক কথায় সংবাদ হলো চলতি ঘটনার বস্তুনিষ্ঠ বিবরণ, যা পাঠকের আগ্রহ উদ্দীপিত করে। আরো একটু স্পষ্ট করে বলা যায়- স্থিতাবস্থার পরিবর্তনে সৃষ্ট ঘটনা, যাতে সমাজে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় এবং যা অবশ্যই সত্য, বস্তুনিষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ, তাকে খবর বা সংবাদ বলে। new হচ্ছে নতুন আর সেই new এর  বহুবচন হচ্ছে news। এ জন্য news must be news.

British Journal সংবাদকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে, any event,idea or opinion that is timely, that interests or affects a large number of people in a community and that is capable of being understood by them.

খবরের যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষত্ব আছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে : নতুনত্ব, বস্তনিষ্ঠতা, নির্ভুলতা, নিরপেক্ষতা, সংক্ষিপ্ততা ও স্পষ্টতা। 

সংবাদ ঘটনা নয়, ঘটনার প্রতিবেদন সুতরাং কোনো তথ্য বা ঘটনা সংবাদ হয়ে ওঠার অন্যতম শর্ত হচ্ছে বস্তুনিষ্ঠতা ও নির্ভুলতা। বস্তুনিষ্ঠতা ও নির্ভুলতার অভাবেই সামাজিক মাধ্যমের তথ্যগুলো সংবাদ হয়ে ওঠে না। এ বিষয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে অনলাইন নিউজপোর্টাল বাংলা নিউজটোয়েন্টিফোরের তৎকালীন এডিটর ইন চিফ আলমগীর হোসেন বলেন, এসব তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে থাকাকালে সংবাদ নয়। তবে সাংবাদিক যদি সে তথ্য যাচাই-বাছাই করে সংবাদ মাধ্যমে উপস্থাপন করেন, তখন সেটি সংবাদ হয়ে উঠবে। ফেসবুক বা সামাজিক মাধ্যমে কোনো পরিবেশনা নিউজ বা সংবাদ না। এটাকে সুস্পষ্টভাবেই বলা হচ্ছে ‘পোস্ট’ বা ‘স্ট্যাটাস’। যখন কোনো সাংবাদিক ফেসবুক বা অন্য যোগাযোগ মাধ্যম থেকে নিউজের প্রাথমিক উপাদান (নিউজ পেগ) হিসেবে বেছে নিয়ে তা যাচাই-বাছাই করে পরিবেশন করেন তবেই তা হবে ‘সংবাদ’।

অর্থাৎ সামাজিক মাধ্যমে যে সব তথ্য শেয়ার করা হয় তা সংবাদের মর্যাদা তখনই পাবে যদি এই তথ্যগুলো যাচাই বাছাই করা হয়। তাহলে কি বলা যেতে পারে সামাজিক মাধ্যম সংবাদের উৎস হিসেবে কাজ করে বা করার যোগ্যতা রাখে? তবে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ সামাজিক মাধ্যমের তথ্যকে সংবাদের মাধ্যম বা উৎসের মর্যাদা দিতেও নারাজ। ইন্দোনেশিয়ার দ্য জাকার্তা পোস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দামার হারসানতো বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সংবাদের সোর্স হিসেবে দ্রুতই তার মূল্য হারাবে। কারণ ফেক নিউজ ইন্ডাস্ট্রিও এখন বেশ শক্তিশালী। এই ফেক নিউজই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের চেয়ে সত্যিকারের সংবাদ মাধ্যমকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলবে।

হংকংভিত্তিক দ্য স্প্লাইস নিউজরুমের কো-ফাউন্ডার এলান সুন এর মতে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে সংবাদ মাধ্যমের জনপ্রিয়তা পাওয়ার ইচ্ছেও ভুল প্রমাণিত হবে খুব শিগগিরই। কারণ মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংবাদের শিরোনামের পর সংবাদে ঢুকছে কম। আবার সংবাদ মাধ্যমে প্রবেশ করলেও সেই মাধ্যমের নাম মনে রাখছে না। ফলে অনলাইনকে নিজেদের কনটেন্টের ওপরই গুরুত্ব দিতে হবে।

এইসব বিশ্লেষণ বা ব্যাখ্যার পরেও বলতে হয় অনলাইন পত্রিকার সংবাদেরও একটা বিরাট উৎস এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। আবার অনলাইনে প্রকাশিত সংবাদ শেয়ার করার জন্যও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকেই ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধু অনলাইন নয়, মূলধারার সাংবাদিকতায়ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্যকে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কখনো গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন সামাজিক মাধ্যমে শেয়ারের পর জণগণের কাছে ব্যাপক মাত্রায় আবেদন রাখছে। তাই গণমাধ্যমে সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব বা গুরুত্বকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাচ্ছে না। অনেকেই মনে করেন বিশ্বাসযোগ্যতার জায়গা যাই থাক, সামাজিক মাধ্যম হুমকি হয়ে উঠেছে গণমাধ্যমের। 

‘সামাজিক বনাম মূলধারার গণমাধ্যম কোনটা বেশি শক্তিশালী’ - এ শিরোনামে দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার শেষের পাতায় ১০ আগস্ট ২০১৯, শনিবার মরিয়ম চম্পার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়া গণমাধ্যম হয়ে ওঠার সময় এখনো আসেনি। ভবিষ্যতে কী হবে সেটা বলা যায় না।

তবে এখন পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়া সামাজিক গণমাধ্যম হিসেবেই কাজ করছে। সামাজিক গণমাধ্যম এবং গণমাধ্যমের মধ্যে একটি মূল পার্থক্য হচ্ছে গণমাধ্যমে যে তথ্যটা দেওয়া হয় সেটা সম্পাদনার মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়। অর্থাৎ একটি তথ্যকে সম্পাদনা, যাচাই-বাছাই, মূল্যায়ন করে নির্দিষ্ট ট্রিটমেন্ট দিয়ে পত্রপত্রিকা বা টেলিভিশনে প্রচারিত এবং প্রকাশিত হয়। এই পার্থক্যের কারণে গণমাধ্যমের ভোক্তা, পাঠক এবং দর্শক বিশ্বাস করে যে, নিউজটি সম্পাদিত হয়ে এসেছে। অতএব, এটার ওপর বিশ্বাস রাখা যায়। সামাজিক গণমাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে যে কোনো বিষয় চলে আসে। এক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকতার একটি মূল্যায়ন আছে। কিন্তু পাঠকের মনে গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমের মধ্যে যে পার্থক্য সেটা কিন্তু থেকেই যায়। সম্পাদনা হচ্ছে সাংবাদিকতার প্রাণ। যেখানে সম্পাদনা নেই সেখানে আসলে সাংবাদিকতা হয় না। সম্পাদনা ছাড়া যে সামাজিক মাধ্যম চলে সেগুলো কোনো গণমাধ্যম হতে পারে না”।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘ফেসবুক মূলধারার মিডিয়ার বিকল্প হচ্ছে এ রকম আমার এখনো মনে হয় না। ফেসবুকে যে সকল নিউজ পাওয়া যায় সেগুলোর অথেনটিসিটি নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন থাকে। ফেসবুকের এসব খবরের উৎস অস্পষ্ট থাকে। দ্বিতীয়ত, ফেসবুকে যে সব খবর আসে সেগুলোর পরবর্তীতে পর্যালোচনা করার মতো উপাত্ত থাকে না। মূলধারার মিডিয়াতে যতগুলো ইস্যু একত্রে পাওয়া যায় সেটা কিন্তু ফেসবুকে কভার করা সম্ভব হয় না’।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক মফিজুর রহমান বলেন, ‘এখন তো প্রযুক্তিভিত্তিক সোশ্যাল মিডিয়াগুলোর প্রতি মানুষের মনোযোগ বেড়েছে। ফেসবুক ব্যবহারকারীদের সংখ্যা বিশাল। প্রায় ১২ কোটি মানুষের হাতে মোবাইল ফোন। চার থেকে পাঁচ কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারী। এত বিশাল ব্যবহারকারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা তো একরকম নয়। তাদের বড় একটি অংশ গুজবে বিশ্বাসী। অতএব, সোশ্যাল মিডিয়াকেন্দ্রিক একটি বাজার তৈরি হয়েছে। যেখানে বিশ্বাসযোগ্যতার চেয়ে বড় হচ্ছে মজা, ট্র্যাজেডি, দুঃখ সবকিছুই একটি পণ্যে রূপান্তরিত হয়েছে। সিরিয়াস পাঠকের সংখ্যাটা কম এখানে। সোশ্যাল মিডিয়া একটি বিশাল বাজার তৈরি করেছে, যা সত্যিকার অর্থেই মূলধারার গণমাধ্যমের জন্য কিছুটা হলেও হুমকিস্বরূপ। এ অবস্থায় মূলধারার গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন, বাজারমুখিতা কমে যাবে ধীরে ধীরে’। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. কাবেরী গায়েন এর মতে, ‘হ্যাঁ ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তাই বলে মূলধারার গণমাধ্যমের আবেদন কখনো শেষ হবে না। কারণ, সামাজিক মাধ্যমে যে তথ্যগুলো আমরা পাই সে তথ্যগুলোর কোনো বৈধতা নেই। বস্তুনিষ্ঠতার জন্য লোকে এটা ব্যবহার করে না। তথ্য পাওয়ার জন্য বা কোনো মতামতকে সংগঠিত করার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভালো।

কিন্তু কোনো একটি নিউজের বস্তুনিষ্ঠতা বিচার করতে হলে আমাদের প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের কাছেই যেতে হবে। মানুষ যায়ও। গণমাধ্যম কিন্তু ফেসবুক থেকে অনেক তথ্য নেয়। কিন্তু যাচাই করার পর পত্রিকায় সেটা ছাপে বা প্রকাশ করে। এই জায়গাটিই হচ্ছে সামাজিক মাধ্যমের সঙ্গে মূলধারার গণমাধ্যমের পার্থক্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি তথ্যকে কত আগে প্রকাশ করতে পারে সেই প্রতিযোগিতা থাকে। সেখানে কোনো জবাবদিহি থাকে না। কিন্তু মূলধারার গণমাধ্যমে এই জবাবদিহি আছে। ফলে সাধারণ মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনমত গঠন করে, নানা ধরনের আদান-প্রদান করে। কিন্তু কোনো একটি খবরের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করার জন্য তাদের মূলধারার গণমাধ্যমের কাছে ফিরতে হয়। এটাই হচ্ছে মূলধারার গণমাধ্যমের শক্তির জায়গা”। 

তথ্য-প্রযুক্তিবিদ জাকারিয়া স্বপন বলেছেন, ফেসবুক ইতিমধ্যে বিকল্প মিডিয়া হয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রেই মূল ধারার গণমাধ্যমকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। আমরা যে সেন্সে মূলধারার মিডিয়ার কথা বলছি সেটার মূলধারাটা কিন্তু পৃথিবীব্যাপী ভেঙে গেছে ইতিমধ্যে। কারণ প্রতিটি সাধারণ মানুষ এখন ইনডিভিজ্যুয়াল সাংবাদিক। তথ্য পাস করার যে টেনডেনসি সেটা চলে এসেছে তাদের মধ্যে। আমরা অনেক কিছু এখন ফেসবুকে পেয়ে যাই। যেটা একজন পেশাদার সাংবাদিক অনেক সময় বের করতে পারেন না। যে কারণে লাখ লাখ মানুষ এখন ফেসবুকের কাছে চলে গেছে। বর্তমানে আমরা মূলধারা বলতে যে রেডিও, টেলিভিশন, পত্রিকাকে বুঝি এটাই হয় তো একসময় মূলধারা থাকবে না। ইনডিভিজ্যুয়াল জার্নালিজম বা ইনফরমেশন পাসিং এটাই এক সময় মূলধারা হয়ে যাবে। এখনো সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষেত্রে আমরা খুব আরলি স্টেজে আছি। ভবিষ্যতে সোশ্যাল মিডিয়ার নিউজের ক্ষেত্রে এডিটিং, ফিল্টার, গেটকিপিং অর্থাৎ কোনটা যাবে বা যাবে না, এই ফিল্টারিং মেশিনেই করে ফেলতে পারবে। কারণ মানুষের চেয়ে মেশিনের ব্রেইন অনেক শক্তিশালী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক শামীম রেজা বলেন ‘সোশ্যাল মিডিয়া বিকল্প ধারা হিসেবে শুরু হয়েছিল। কিন্তু এটা বিকল্প মাধ্যম হিসেবে বিকশিত হচ্ছে নাকি গণমাধ্যমের সমান্তরাল হচ্ছে এটা বলার জন্য কিছু সময় প্রয়োজন। তবে এর কাঠামো বিকল্প ধারার। সোশ্যাল মিডিয়া ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠছে এবং তার যে প্রভাব তৈরির ক্ষমতা সেটা গুরুত্বপূর্ণ। একটি রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান থেকে শুরু করে একজন সাধারণ মানুষ পর্যন্ত মতবিনিময়ের একটা অসাধারণ সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। মানুষ নিজের মতামত জানাতে পারছে। ব্যবহারকারী বা জনগণের জন্য সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। যে মাধ্যমে গণতান্ত্রিক কাঠামো বেশি পাওয়া যাবে সেটারই বেশি ভবিষ্যৎ থাকবে।’

ইন্টারন্যাশনাল নিউজ মিডিয়া অ্যাসোসিয়েশন, ইনমার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, আর্ল জে. উইলকিনসন ঢাকায় প্রথম আলোর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে সামাজিক মাধ্যম সম্পর্কে বলেন ‘আপনি জানেন, এগুলো সাংবাদিকতায় এক বিশাল সংযোজক; কাজেই এই বিষয়গুলোয় ভয় পাওয়ার কিছু আছে বলে আমি মনে করি না। এই বিষয়গুলো আমাদের গ্রহণ করা উচিত বলেই আমি করি। দেখুন, দিনের শেষে আমাদের সংবাদ প্রতিষ্ঠান হিসাবেই থাকা উচিত, পাঠক যেখানে যাবেন আমাদেরও সেখানেই যাওয়া উচিত- এবং তারা যদি টুইটারে গিয়ে ভিড় করেন, সেখানেই আমাদের থাকা উচিত, তারা যদি ফেসবুকে গিয়ে জমেন, আমাদেরও সেখানে যাওয়া উচিত। আমরা হঠাৎ করেই বুঝতে পারছি, এই বিষয়গুলো কিঞ্চিত নেতিবাচক হয়ে উঠছে। কিন্তু দেখুন, সাংবাদিকতায় আরও জনবল প্রাপ্তি এবং মানুষকে এর সঙ্গে আরও গভীর থেকে গভীরে সংযুক্ত করতে প্রযুক্তি যতটা ইতিবাচক তাতে হয়তো কিছুটা সামঞ্জস্যের সংকট আছে। কাজেই আমি মানুষকে সম্পৃক্ত করার ব্যাপারে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের কল্যাণে সৃষ্ট সুযোগের জন্য কৃতজ্ঞ এবং এর পেছনে ব্যয়ের পথ খুঁজতে চাই।

বিশেষজ্ঞদের মতামতে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে তার মধ্যে সামাজিক মাধ্যমের প্রধান যে দুর্বলতার কথাটি তারা বলছেন সেটি হচ্ছে এর বিশ্বাসযোগ্যতা, যা ইতোমধ্যেই আলোচিত হয়েছে। সাংবাদিকতা ও সংবাদের ক্ষেত্রে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়নি এটা যেমন সত্য তেমনি এটাও সত্য যে, এই বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি নিয়েও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সংবাদের একটি বড় উৎসে পরিণত হয়েছে এবং শুধু তাই নয় পরিবর্তিত সাংবাদিকতায়ও বিরাট ভূমিকা রাখছে। এমন বেশ কিছু সংবাদ আছে যা শুধু সামাজিক মাধ্যমের জন্যই গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। গুলশানের হলি আর্টিসানে জঙ্গি হামলার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিডিও ফুটেজটি ছিল পাশের এক ভবন থেকে এক কোরীয় নাগরিকের তোলা এবং ফেসবুকেই সেটা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল, যা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে এটি সংবাদ মাধ্যম এবং গণমাধ্যমের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। হলি আর্টিসানের ঘটনার তদন্তকারীরা ভিডিওচিত্র থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পান। এমন আরও অনেক উদাহরণ টানা যাবে যেখানে সংবাদের ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যেমন দিনে-দুপুরে রাস্তায় কুপিয়ে বিশ্বজিৎকে হত্যা, বইমেলা থেকে ফেরার পথে লেখক-ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যা, কলেজছাত্রী খাদিজাকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা, চট্টগ্রামে পুলিশ সুপারের স্ত্রীকে হত্যা এরকম আরও অনেক আলোচিত বিষয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণেই সাধারণের নজরে এসেছে। সিলেটের কিশোর রাজন হত্যাকা- নিয়েও সবার আগে সোচ্চার হয়ে ওঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। 

সামাজিক মাধ্যমে এমন অনেক তথ্য শেয়ার করা হয় যেটা মূলধারার সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেলে হয়তো উঠে আসে না। মূলধারার সাংবাদিকতার ওপর অনেক ধরনের চাপ বিদ্যমান থাকে, তা যেমন সরকারের তেমনি মালিকপক্ষের। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সে রকমের কোনো চাপের মোকাবেলা করতে হয় না বলে অনেক তথ্যই সামাজিক মাধ্যমে প্রচার ও প্রকাশ সম্ভব। সামাজিক মাধ্যমের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে জনগণের প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়। এরকম নানা সুবিধার কারণে মূলধারার গণমাধ্যমের ওপরও সামাজিক মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুকের প্রভাব বেড়েই চলছে। এর অন্যতম কারণও হলো ওই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া।

একটি সংবাদ, তথ্য বা ভিডিও জনগণ কিভাবে গ্রহণ করেছে তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া উঠে আসে সামাজিক মাধ্যমে কিন্তু প্রিন্ট মিডিয়া বা মূলধারার মিডিয়াতে সেটা ছিল অনুপস্থিত। ফলে মূলধারার প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো এখন ব্যবহার করছে ফেসবুক পেজ। যেখানে তারা তাদের প্রতিবেদনগুলোর ওপরে পাঠকের প্রতিক্রিয়া গ্রহণ করছে। এভাবে যেমন ফেসবুক প্রভাব রাখছে মূলধারার গণমাধ্যমের ওপর, তেমনি ফেসবুক বা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য থেকে অনেক সংবাদ প্রকাশ করছে গণমাধ্যম। প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের বিপরীতে ফেসবুক, ব্লগ, টুইটার, ইউটিউব প্রভৃতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ব্যবহারকারীদের বড় সুবিধা হলো এখানে তেমন কোনো অর্থ বিনিয়োগ করতে হয় না। ব্যবহারকারীদের অর্থ বিনিয়োগ করতে হয় না। ফেসবুককে ঘিরে ভুয়া খবরসহ নানা অভিযোগের পরও ফেসবুকের আয় ও ব্যবহারকারীর হার তরতর করে বেড়ে যাচ্ছে। 

ফেসবুক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০১৯ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এ তিন মাসে তাদের মাসিক ব্যবহারকারী ১ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেড়ে ২৪৫ কোটিতে পৌঁছে গেছে। বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে, অর্থাৎ এপ্রিল থেকে জুন মাসে তাদের ব্যবহারকারী বৃদ্ধির হার ছিল ১ দশমিক ৬ শতাংশ। ওই সময় তাদের ব্যবহারকারী ছিল ২৪১ কোটি। বর্তমানে দৈনিক ১৬২ কোটি মানুষ সক্রিয়ভাবে ফেসবুক ব্যবহার করছেন, যা গত প্রান্তিকের তুলনায় ২ শতাংশ বেশি। গত প্রান্তিকে দৈনিক ফেসবুক ব্যবহারকারী ছিলেন ১৫৮ কোটি ৭০ লাখ। আয়ের দিক হিসাব করলে অনেক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠানের করা পূর্বাভাস ছাড়িয়ে গেছে ফেসবুক। 

বাজার গবেষকরা বলছেন, ফেসবুকের গুরুত্বপূর্ণ বাজার যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপে ২০ লাখ করে ব্যবহারকারী বেড়েছে। এতে তাদের ব্যবসার প্রবৃদ্ধি অনেকটাই বেড়ে গেছে। এসব বাজারে গত দুই বছরে ফেসবুকের প্রবৃদ্ধি ছিল সামান্য। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বলেছে, ২২০ কোটি ব্যবহারকারী প্রতিদিন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারে ঢোকেন। ২৮০ কোটি ব্যবহারকারী ফেসবুকের অধীনে থাকা কোনো না কোনো অ্যাপ দৈনিক ব্যবহার করছেন। গত প্রান্তিকের তুলনায় যা অনেক বেড়েছে।

সামাজিক মাধ্যমের ব্যাপক উত্থানের পরেও বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য সংবাদের ক্ষেত্রে এখনো মানুষ গণমাধ্যমের ওপরই নির্ভর করে। তাই সামাজিক মাধ্যমের কারণে গণমাধ্যমে একবারে ধস নেমে এসেছে এমনটি বলা যাবে না। আর সামাজিক মাধ্যমের মতো গণমাধ্যমেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। সামাজিক মাধ্যম যেমন পৌঁছে গেছে একবারে সাধারণ মানুষটির কাছে তেমনি গত তিন দশকে গণমাধ্যমের ব্যবহার এবং ব্যবহারের ধারণায় বিপ্লব সাধিত হয়েছে। আকাশ সংস্কৃতির সঙ্গে বেসরকারি বা প্রাইভেট চ্যানেলের ব্যাপক প্রসার এবং এখন সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহারে গণমাধ্যম বদলে গেছে। গণমাধ্যম ব্যাপক বিষয়কে ধারণ করছে ও বহুমাত্রিক ভূমিকা রাখছে। বদলে গেছে গণমাধ্যমের কৌশলও। নানাভাবে জনগণের একেবারে কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে, গ্রহণ করছে জনগণের প্রতিক্রিয়া এবং জনগণের প্রতিক্রিয়াকে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করছে। 

গণমাধ্যমের পরিবর্তন, সম্প্রসারণ, সামাজিক মাধ্যমের শক্তিশালী হয়ে যাওয়া সকলের হাতে হাতে স্মার্টফোন সবকিছু মিলিয়েই প্রচলিত ধারণা থেকে অনেক এগিয়ে গেছে বর্তমান সাংবাদিকতার ক্ষেত্র। খবরের কাগজ থেকে রেডিও, টেলিভিশন, অনলাইন থেকে মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজমের ধারায় প্রচলিত অনেক ধারণাই পাল্টে যাচ্ছে। বলা হচ্ছে সিটিজেন জার্নালিজম বা জনসাংবাদিকের কথা। জার্নালিজমের এই ক্ষেত্রটি এখন স্বীকৃত। এখন সবাই খবরের কর্মী। সিটিজেন জার্নালিজম অন্তত তাই বলে। সিটিজেন জার্নালিজম মূল জার্নালিজমের ক্ষেত্রকে কঠিন করে দিয়েছে। 

অনলাইন জার্নালিজমের পরে যে ক্ষেত্রটি আলোচিত হচ্ছে, তা হলো মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম। যা মূলত অনলাইন জার্নালিজমের একটি বর্ধিত অবয়ব। অনলাইন জার্নালিজম বলতে বোঝাতো শুধু নিউজ পোর্টালগুলোকে। ইউটিউবসহ অন্য মাধ্যমগুলোকে খুব একটা গোনায় ধরা হতো না। অথচ এখন ইউটিউব তথ্যের জগতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সাক্ষাৎকার, এক্সক্লুসিভ ক্লিপ থেকে ডেইলি ইভেন্টও উঠে আসছে ইউটিউবের মতো মাধ্যমে। 

এভাবে সাংবাদিকতায় একটা আমূল পরিবর্তন এসেছে। সেদিন খুব দূরে নয় যখন প্রেস ব্রিফিং বা প্রেস কনফারেন্স নামক বিষয়গুলো আর থাকবে না। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজস্ব ওয়েব সাইটে বা সামাজিক মাধ্যমে তাদের মতামত ব্যক্ত করবেন। প্রেস ব্রিফিং এ প্রশ্নের সুযোগ থাকে না, কনফারেন্সে সেই সুযোগও দিচ্ছে অনলাইন। লিখিত বা ভিডিও যে কোনো উপায়ে যুক্ত হওয়া যাচ্ছে বিবৃতি দেওয়া ব্যক্তিটির সঙ্গে। সাক্ষাৎকারের এখন আর সশরীর উপস্থিত থাকার প্রয়োজন নেই। এখনই দেখা যাচ্ছে ভিডিও কনফারেন্স। সেটা আবার ফেসবুকে লাইভ স্ট্রিমিং হচ্ছে। যাচ্ছে ওয়েব পোর্টালে। মার্শাল ম্যাকলুহানের ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ আমরা এখন পরিপূর্ণভাবেই দেখতে পাচ্ছি অনলাইন পৃথিবীতে। 

প্রথাগত চাকরির ধারণা থেকেও কিন্তু বেরিয়ে আসছে সাংবাদিকতা। ফ্রিল্যান্সিং এখন একটি আকর্ষণীয় বিষয়। উন্নত বিশ্বে অনেকেই এখন ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত। নিজে খবর লিখছেন, ভিডিও করছেন, সম্পাদনা করছেন। আর সেটি বিক্রি করছেন মাধ্যমগুলোর কাছে। আবার কেউ কেউ নিজেই একটি পোর্টাল কিংবা ইউটিউব চ্যানেল খুলে নিজের তৈরি খবর প্রকাশ ও প্রচার করছেন। 

এই যে প্রযুক্তি, সামাজিক মাধ্যম, মোবাইল, ক্যামেরা এবং ভিডিওর ব্যবহার প্রচলিত সাংবাদিকতাকে ভেঙে দিচ্ছে, নানাভাবেই মুহূর্তের মধ্যেই নানা তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে এই বিষয়টি নানাভাবে বিপদসংকুলও করে ফেলছে বিশ্বকে। বিশেষ করে আমাদের মতো দেশগুলোতে এটি কখনও কখনও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিষয়ে এখনো বেশিরভাগ মানুষেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। তাদের ওপর ভ্রান্ত সংবাদ, এডিটেড ভিডিও মারাত্মক প্রভাব বিস্তার করছে। কখনো কখনো মিথ্যা সংবাদ এবং এডিটেড ভিডিও ভিজুয়্যাল ম্যাটার দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে এবং মুহূর্তেই সমাজকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। সামাজিক মাধ্যমের এই ব্যাপক প্রভাবকে নেতিবাচকভাবে ব্যবহার করছে নানা শ্রেণি ও দল, ব্যবহার করা হচ্ছে স্বার্থের কাজে। সামাজিক মাধ্যমের এই নীতি ও নৈতিকতাবিরোধী ভূমিকার জন্য অনেকেই তাই প্রশ্ন রাখেন সামাজিক মাধ্যম আদতেই সামাজিক হয়ে উঠতে পেরেছে কি না? 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গণমাধ্যমের জন্য হুমকি কি না এ নিয়ে বির্তক যাই থাক, সাংবাদিকতা যে পরিবর্তিত হয়েছে এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কাগজের সংবাদপত্র আগের জায়গায় থাকবে না এটাও নিশ্চিত। সংবাদ ধারণা এবং সাংবাদিকতার ধরনও আমূল বদলে গেছে। এই বদলে যাওয়া সাংবাদিকতায় সামাজিক মাধ্যম যে আরো গুরুত্বপূর্ণ এবং শক্তিশালী হয়ে উঠবে সেটা বেশ ভালোভাবেই অনুমান করা যায়, আর গণমাধ্যমের চেহারাও যে আরও বদলে যাবে সেটাও নিশ্চিত করেই বলা যায়, এমনো হতে পারে সামাজিক মাধ্যমগুলোই গণমাধ্যমে পরিণত হবে। অনুমান করা যায় কাগজের সংবাদপত্রও বদলে যাবে, হয়তো এব চেহারা হয়ে যাবে শুধু বিশ্লেষণধর্মী। তবে সময়ই বলে দেবে কি ঘটবে ভবিষ্যতে। 

মানুষ মত প্রকাশ করতে চায়, মানুষ নিজেকে প্রকাশ করতে চায়। যেখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, যেখানে নিজেকে প্রকাশের সুযোগ থাকবে মানুষ সেখানে যাবেই। মানুষ সত্য জানতে চায়। যেখানে সত্য থাকবে মানুষ তাই আঁকড়ে ধরবে। যেখানে মানুষের মত প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো বাধা থাকবে না, আর যেখানে সত্য বাস করবে সেখানেই নোঙর ফেলবে মানুষ, তা সে গণমাধ্যমেই হোক আর সামাজিক মাধ্যমেই হোক।


লেখক : কবি ও কথাসাহিত্যিক

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh