ব্রেক্সিট: যুক্তরাজ্যের অবসান না নতুন যুগের সূচনা

গাজীউল হাসান খান। ফাইল ছবি

গাজীউল হাসান খান। ফাইল ছবি

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রশ্নে এক বহুমুখী সংকটের মধ্যে পড়েছে ব্রিটেন বা যুক্তরাজ্য। ব্রেক্সিট নিয়ে রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক বহু অনিশ্চয়তায় এখন অস্থির হয়ে উঠেছে যুক্তরাজ্যবাসী। বর্তমানে রক্ষণশীল (কনজারভেটিভ) দলীয় প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা বহু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বব্যাপী। উল্লিখিত সময়ের মধ্যে ইইউর সঙ্গে ভবিষ্যৎ ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা বৃহত্তরভাবে সম্পর্কের প্রশ্নে কোনো চুক্তিতে পৌঁছতে না পারলে এমনিতেই বেরিয়ে যাওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছেন বরিস, তাতে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে যুক্তরাজ্যবাসী। কারণ কোনো চুক্তি ছাড়া ইইউ ত্যাগ করলে বিদেশি কম্পানি কিংবা শিল্প-কারখানায় কর্মরত বহু মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে অবাধ ব্যবসা-বাণিজ্য হারাবে এবং চরম সংকট দেখা দেবে বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী, জ্বালানি এবং এমনকি বিভিন্ন জীবন রক্ষাকারী ওষুধপত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে।  তা ছাড়া পরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থা তো অচল হয়ে পড়বেই। তাতে রক্ষণশীল ইংল্যান্ডবাসীর চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের অধিবাসীরা। তারা এমনিতেও পারস্পরিক স্বার্থের প্রশ্নে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে (ব্রেক্সিট) গণভোটে রায় দেয়নি। তদুপরি ব্রিটিশ শাসনাধীন উত্তর আয়ারল্যান্ড এবং তার নিকট-প্রতিবেশী স্বাধীন আইরিশ প্রজাতন্ত্রের মধ্যে কোনো সীমান্ত নেই। এ ক্ষেত্রে ‘গুড ফ্রাইডে অ্যাগ্রিমেন্ট’ নামে তাদের মধ্যে এক ঐতিহাসিক চুক্তি রয়েছে, যা তারা কোনোমতেই ভাঙতে রাজি নয়। ব্রেক্সিট হলে এ দুই অঞ্চলের মধ্যে কঠোর সীমান্ত ব্যবস্থা চালু করতে হবে বলে ইইউ অতীতে বহুবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। এটি অন্যান্যের মধ্যে একটি অন্যতম প্রধান শর্ত, যার কোনো সুরাহা করতে পারেননি বলে রক্ষণশীল দলীয় প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মেকে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে হয়েছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব, আইন ও ঐতিহ্য রক্ষার পক্ষে আপসহীন ও অনেকটাই জাতীয়তাবাদী বলে পরিচিত রক্ষণশীলদলীয় প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন উল্লিখিত সংকট নিরসনের আগেই ৩১ অক্টোবর ইইউ ত্যাগ করার ঘোষণা দিয়েছেন। তার পেছনে স্কটল্যান্ড, উত্তর আয়ারল্যান্ড এবং এমনকি বিশাল নগরী লন্ডনসহ ইংল্যান্ডের বহু নাগরিকের সমর্থন না থাকলেও তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ইইউ ত্যাগ করার পক্ষপাতী। এতে পেছন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে পূর্ণ মদদ জোগাচ্ছেন, তাতে একমত ব্রেক্সিট-বিরোধীরা।

উল্লিখিত বিভিন্ন কারণে শুধু অনিশ্চিত নয়, আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন যুক্তরাজ্যব্যাপী সাধারণ মানুষ ও তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। তাই রক্ষণশীলদলীয় বেশ কিছু সদস্যসহ সবাই চান ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করার আগে বিভিন্ন বিষয়ে একটি সমন্বিত চুক্তি বা ‘ব্রেক্সিট ডিল’। কিন্তু বিষয়টি এত সহজ হবে না। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ব্রেক্সিট প্রশ্নে নতুন কোনো চুক্তিতে আসতে রাজি নয়। যাতে তারা আগে সম্মত হয়েছিল, সেটিই তাদের শেষ কথা। ব্রেক্সিট প্রশ্নে তারা দুই আয়ারল্যান্ডের মধ্যে কঠোর সীমান্ত ব্যবস্থাসহ কাস্টমস ইউনিয়ন এবং অন্য কয়েকটি ব্যাপারে আর কোনো সমঝোতায় আসতে প্রস্তুত নয়। এ অবস্থায় বরিস জনসন কোনো চুক্তি ছাড়াই তাঁর পূর্বঘোষিত সময়ের মধ্যে ইইউ ত্যাগ করতে প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কোনো চুক্তি ছাড়া আপাতত ইইউ ত্যাগ করার ব্যাপারে তাঁর সরকার মোটামুটি ব্যবস্থা নিয়েছে। ব্রেক্সিট-বিষয়ক মন্ত্রী মাইকেল গোভ ও অর্থমন্ত্রী (চ্যান্সেলর অব এক্সচেকার) সাজিদ জাভিদ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির ব্যাপারে জনগণকে অবহিত করলেও বিরোধীদলীয় লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন এবং বেশ কিছু সংসদ সদস্য তা মেনে নিতে রাজি নন। লেবার পার্টি, লিবারেল ডেমোক্র্যাটস, স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (এসএনপি) এবং রক্ষণশীল দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা চান একটি সুনির্দিষ্ট ডিল। এর সুযোগ নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা জেরেমি করবিন পার্লামেন্টে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের বিরুদ্ধে একটি অনাস্থা প্রস্তাব আনার ব্যাপারে ঘোষণা দিয়েছেন। প্রস্তাব এসেছে ব্রেক্সিটের আগে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে। বর্তমান পার্লামেন্টে মাত্র একটি আসনে রক্ষণশীল দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। বলতে গেলে একটি নাজুক সুতার মধ্যে ঝুলে রয়েছে বরিসের বর্তমান সরকার। তার পরও ব্রেক্সিট সমর্থক সংখ্যাগরিষ্ঠ ইংল্যান্ডবাসী বরিস জনসনের প্রতিই তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেছে। নেতৃত্বের প্রশ্নে অর্থাৎ ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে জেরেমি করবিনকে পাঠানোর ব্যাপারে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আশ্বস্ত হতে পারছে না। তারা জেরেমি করবিনের নেতৃত্বের প্রতি মোটেও আস্থাবান হতে পারছে না। তাই বিকল্প প্রস্তাব এসেছে সংসদের বর্ষীয়ান রক্ষণশীলদলীয় সদস্য (ফাদার অব দ্য হাউস) কেনেথ ক্লার্ককে অন্তর্বর্তীকালীন অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার। কিন্তু অশীতিপর বৃদ্ধ এ নেতার বর্তমান কর্মক্ষমতা নিয়ে যথেষ্ট অনাস্থা রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্রেক্সিটপন্থীরা বরিস জনসনের নেতৃত্বের প্রতিই আস্থা প্রকাশ করেছেন। এ অবস্থায় কেউ বলছেন, ব্রেক্সিট নিয়ে আরেকটি গণভোট অনুষ্ঠান করা হোক। তা ছাড়া একটি সম্ভাব্য চুক্তির ব্যাপারেও জনগণের মতামত নেওয়া আবশ্যক। কেউ কেউ আবার আরো এক ধাপ এগিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করার আগে উদ্ভূত বিভিন্ন জটিলতা নিরসনের জন্য একটি সাধারণ নির্বাচন ডাকার তাগিদ দিয়েছেন। কিন্তু বরিস জনসনের সেই একই কথা—চুক্তি অথবা চুক্তি ছাড়াই ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তাঁর সমর্থকের সংখ্যাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়।

আগামী কিছুদিনের মধ্যে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল ও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার কথা জানিয়েছেন বর্তমান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। তাতে বিশেষ কিছু না হলে যথারীতি ৩১ অক্টোবরের মধ্যেই ইইউ ত্যাগ করতে বদ্ধপরিকর বর্তমান রক্ষণশীলদলীয় ব্রেক্সিটপন্থী সরকার। এরই মধ্যে এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে যে বিষয়টি লক্ষ করা গেছে, তা হচ্ছে বেক্সিট প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সরকারি নেতাদের ঘন ঘন সফর এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা। হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা জন বল্টন এরই মধ্যে লন্ডন সফর করে ব্রেক্সিট-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে তাঁর দেশের অবাধ বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। তা ছাড়া ব্রেক্সিট-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যের অন্যান্য চাহিদা কিংবা প্রয়োজনীয়তার কথাও যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে ভাবছে বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতিনিধি বল্টন। ব্রেক্সিট-পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী, জ্বালানি ও ওষুধপত্র সরবরাহের ব্যাপারেও উভয় সরকার চিন্তাভাবনা করছে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া এসব ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র যে জার্মান, ফরাসি ও মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের সঙ্গে কথা বলছে না, এমন নয়। যুক্তরাজ্য বা ব্রিটেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গণ্ডি থেকে মুক্ত হয়ে একটি বৈশ্বিক ব্রিটেন বা ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’-এ পরিণত করার ব্যাপারে বিগত বছরগুলোতে হন্যে হয়ে উঠেছিলেন নব্য জাতীয়তাবাদী বরিস জনসন ও তাঁর রক্ষণশীলদলীয় সহযোগীরা। তাঁরা মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের বন্ধুপ্রতিম দেশগুলো এবং বিশেষ করে কমনওয়েলথের সহযোগী দেশগুলোর সাহায্য-সমর্থন নিয়ে ব্রেক্সিটপন্থীদের দেশ আবার প্রকৃত অর্থেই ‘গ্রেট ব্রিটেন’ হয়ে উঠবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প যেমন ভাবেন, তাঁর নেতৃত্বে 'অসবত্রপধ রিষষ নব মত্বধঃ ধমধরহ', তেমনি নব্য জাতীয়তাবাদী বরিস জনসনও ভাবেন, তাঁর নেতৃত্বে 'ইত্রঃধরহ রিষষ নব মত্বধঃ ধমধরহ'। বৃহত্তর ইউরোপভিত্তিক প্রগতিশীল রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজ-সংস্কৃতিভিত্তিক অগ্রসরতার পরিপন্থী এ ধ্যান-ধারণা। এ মন্তব্য মুক্ত চিন্তায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের, যাঁরা পুরো ইউরোপের মানুষকে অর্থনৈতিক দিক থেকে মুক্তি এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাত থেকে নিষ্কৃতি দিতে কাজ করছিলেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ব্রেক্সিটকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন যুক্তরাজ্যে যে নতুন যুগের সূচনা করতে চাচ্ছেন, তাঁর সেই স্বপ্ন কি তিনি বাস্তবায়ন করতে পারবেন? নাকি সম্পূর্ণভাবে অবসান ঘটবে বর্তমানে অবশিষ্ট নামে মাত্র যুক্তরাজ্যের?

যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে একদিন সূর্য অস্ত যেত না বলে বলা হতো, ইংল্যান্ড ছাড়া তার এখন স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডও বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তার সবচেয়ে বড় কারণ হলো ব্রেক্সিট। অর্থাৎ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাওয়ার সংকল্প। এই ব্রেক্সিটের প্রশ্নে ব্রিটেন বা যুক্তরাজ্য শুরু থেকেই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে রয়েছে। স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ড বাণিজ্যসহ তাদের বিভিন্ন স্বার্থের প্রশ্নে ইইউতে থাকার পক্ষে। অন্যদিকে ইংল্যান্ড (লন্ডন মহানগরী বাদে) তার অতীত ইতিহাস, ঐতিহ্য, ওয়েস্টমিনস্টার পার্লামেন্ট, আইন ও সর্বোপরি সার্বভৌমত্ব ষোলো আনা ধরে রাখার অজুহাতে বেরিয়ে যেতে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ। এ ক্ষেত্রে ইইউর সঙ্গে কোনো চুক্তি (ডিল) হোক আর না-ই হোক, বর্তমান রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন নির্ধারিত তারিখের পর ব্রাসেলসের সঙ্গে আর থাকবেন না। তাতে ইংল্যান্ডবাসী ব্রেক্সিটপন্থীরা খুব একটা উদ্বিগ্ন নয়। কিন্তু শঙ্কিত হয়ে পড়েছে স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডবাসী। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা, কর্মসংস্থান, পরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রাখার প্রশ্নে তারা ব্রাসেলসের সঙ্গে একটি পরিষ্কার বন্দোবস্তে পৌঁছাতে চায়। নতুবা বিরাট এক ধস নামবে তাদের অর্থনীতিতে। কর্মসংস্থান হারাবে অসংখ্য মানুষ। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হবে হিসাবের বাইরে। এ অবস্থা কাটিয়ে ওঠা তাদের পক্ষে কত দিনে সম্ভব হবে, তারা তা জানে না। রক্ষণশীল দল ও তার নেতা বরিস জনসনের কর্মকাণ্ডে মোটেও সন্তুষ্ট নন স্কটল্যান্ড ও স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির (এসএনপি) নেতারা ও তাঁদের সমর্থকরা। কোনো চুক্তি ছাড়া বরিস ইইউ ত্যাগ করলে তাঁরা তাঁদের স্বাধীনতার প্রশ্নে আবার গণভোটে যাবেন বলে এসএনপি নেতারা জানিয়েছেন। ইংলিশদের আধিপত্য, স্বার্থ ও ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য স্কটিশরা আর ক্ষতিগ্রস্ত হতে মোটেও রাজি নয়। সেই কারণে জাতিগতভাবেই তারা বিচ্ছিন্ন হতে চায় ওয়েস্টমিনস্টার থেকে। অন্যদিকে ইংল্যান্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উত্তর আয়ারল্যান্ডও শেষ পর্যন্ত তাদের স্বার্থের প্রশ্নে যুক্তরাজ্য থেকে পৃথক হয়ে প্রতিবেশী মূল আইরিশ প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে এক রাষ্ট্রে পরিণত হতে চায়। স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দেয়নি। অন্যদিকে আইরিশ প্রজাতন্ত্রও সম্পূর্ণভাবেই ইইউর সঙ্গে থাকার পক্ষপাতী। বর্তমানে বিভক্ত উত্তর আয়ারল্যান্ড আইরিশ প্রজাতন্ত্র থেকে আলাদা হলেও এ দুই অঞ্চলের মধ্যে কোনো সীমান্ত নেই। তারা একে অন্যের সঙ্গে মুক্তভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য ও চলাফেরা করতে পারে, এ বিষয়টি লেখার প্রারম্ভেই উল্লেখ করা হয়েছে। পারস্পরিক ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ইইউ ত্যাগ করার আগে সুস্পষ্ট চুক্তি না হলে স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ড শেষ পর্যন্ত বরিস জনসনের ব্রেক্সিট মেনে না-ও নিতে পারে। এতে আরো এক মস্ত বড় সংকটের সম্মুখীন হতে পারেন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। তাতে তিনিই হতে পারেন বর্তমান যুক্তরাজ্যের সর্বশেষ  প্রধানমন্ত্রী।

স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির নেত্রী এবং স্কটল্যান্ডের বর্তমান প্রথম মন্ত্রী (ফার্স্ট মিনিস্টার) নিকোলা স্টারজেন্ট ব্রিটিশ লেবার পার্টি এবং বর্তমান বিরোধী দলের নেতা জেরেমি করবিনের কাছে সম্প্রতি একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছেন, যা ব্রিটিশ নাগরিকদের বিস্মিত করেছে! এসএনপি নেত্রী স্টারজেন্ট বলেছেন, জেরেমি করবিন যদি স্কটিশ স্বাধীনতার প্রশ্নে তাঁর (স্টারজেন্ট) গণভোটের প্রস্তাবকে সমর্থন দেন, তবে তিনি জেরেমি করবিনকে জাতীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ব্যাপারে পূর্ণ সমর্থন দেবেন। অন্যদিকে উত্তর আয়ারল্যান্ড কোনোভাবেই তার প্রতিবেশী আইরিশ প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে ব্রেক্সিট-পরবর্তী কঠোর সীমান্ত মেনে নেবে না বলে জানিয়েছে। তারা ব্রিটেন থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে আইরিশ প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে যোগ দেবে। তাতে বর্তমান ব্রিটেনে অবশিষ্ট থাকবে ইংল্যান্ড ও ওয়েলস। এই যদি ব্রেক্সিটের শেষ পরিণতি হয়, তাহলে তা কতটুকু যুক্তিযুক্ত হবে সেটা ভাবার লোকের অভাব ব্রিটেনে নেই। তথ্যাভিজ্ঞ মহলের ধারণা, নির্ধারিত সময়ের আগে একটি সুস্পষ্ট চুক্তিসহ ব্রেক্সিট হলে যুক্তরাজ্য অন্তত আরো কিছুদিন যুক্ত থাকবে। নতুবা  সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, কোনো নতুন যুগের সূচনার কথা বলেই বর্তমান যুক্তরাজ্যকে আর অবিচ্ছিন্ন রাখা সম্ভব হবে না। চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিটের আশঙ্কায় ব্রিটিশ অর্থনীতিতে এরই মধ্যে কিছুটা অবনতি দেখা দিয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। তাতে হাজার হাজার মানুষ এরই মধ্যে কর্মসংস্থান হারিয়েছে। এ বিষয়টি নিয়ে বহু আগে থেকেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলেন লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন। প্রগতিশীল বাম ধারার নেতা জেরেমি চেয়েছিলেন ঐক্যবদ্ধ ইউরোপে শ্রমজীবী মানুষের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শ্রমিক সংগঠনের শক্তি অর্জন। পরিকল্পিত শিল্পায়ন ও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূর করে অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করা। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বার্থপরতার কারণে তা ভয়ানকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে ইউরোপের প্রগতিশীল অংশের ধারণা। কেউ কেউ মনে করেন, বরিস জনসন হতে চান ব্রিটেনের ট্রাম্প। কিন্তু সেই সময় ও সুযোগ বরিস কতটুকু পাবেন তা দেখার জন্য অনেকেই এখন শঙ্কিতচিত্তে অপেক্ষা করছেন। শিল্পপ্রধান দেশ যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অর্থনৈতিক মন্দা এখন ক্রমে ক্রমে তার কালো থাবা বিস্তার করছে বলে অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ এরই মধ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। সেই প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের ব্রেক্সিট ও যুক্তরাজ্যে নতুন যুগের সূচনার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা কতটুকু ফলপ্রসূ হবে, তা সত্যিই একটি দেখার বিষয় বলে মনে করা হচ্ছে।

লেখক: গাজীউল হাসান খান
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
gaziulhkhan@gmail.com

মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh