সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ: গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য জেনে নিন

তপন কুমার ঘোষ। ফাইল ছবি

তপন কুমার ঘোষ। ফাইল ছবি

সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে সরকার জনসাধারণের কাছ থেকে টাকা ধার করে। এ ধার বা কর্জের বিপরীতে সরকার বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণীয় হারে মুনাফা দেয়। বর্তমানে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র প্রচলিত আছে। এগুলো হচ্ছে- পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, পরিবার সঞ্চয়পত্র, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র ও পেনশনার সঞ্চয়পত্র। তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র তিন বছর মেয়াদি। বাদবাকি সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ পাঁচ বছর। বাংলাদেশ ব্যাংকের সব শাখা অফিস, বাণিজ্যিক ব্যাংকের নির্ধারিত শাখাসমূহ, জাতীয় সঞ্চয় ব্যুরো অফিস ও পোস্ট অফিস থেকে সঞ্চয়পত্র কেনা যায়। কে কিনতে পারেন : আঠার বা তদূর্ধ্ব বয়সের যে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র ও তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন। আর পরিবার সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন প্রাপ্তবয়স্ক কোনো বাংলাদেশি নারী এবং পঁয়ষট্টি বা তদূর্ধ্ব বয়সের কোনো বাংলাদেশি পুরুষ। প্রাপ্তবয়স্ক কোনো শারীরিক প্রতিবন্ধী (পুরুষ বা নারী) পরিবার সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন। সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধাস্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য পিআরএল ভোগরত অবস্থায় প্রাপ্ত প্রভিডেন্ট ফান্ড ও চূড়ান্ত অবসর গ্রহণের পর প্রাপ্ত আনুতোষিকের টাকায় পেনশনার সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করতে হয়। এ ছাড়া ক্রেতা ও নমিনীর প্রত্যেকের দুই কপি করে পাসপোর্ট সাইজের সত্যায়িত ছবি, ক্রেতা ও নমিনীর জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, ক্রেতার টিআইএন সার্টিফিকেটের ফটোকপি, ব্যাংক চেক ও সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ফরম পূরণ করে ইস্যুকারী কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হবে। জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি দিতে অপারগ হলে পাসপোর্ট অথবা জন্মনিবন্ধন সনদের ফটোকপি জমা দিতে হয়। পেনশনার সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কাগজ হিসেবে প্রাপ্ত আনুতোষিক ও ভবিষ্য তহবিলের সনদপত্রের কপি জমা দিতে হয়।

নমিনী মনোনয়ন
সঞ্চয়পত্রের এক বা একাধিক নমিনী মনোনয়ন করার বিধান আছে। নাবালক বা নাবালিকাকেও নমিনী করা যায়। ক্রেতা মারা গেলে নমিনী সঞ্চয়পত্র ভাঙাতে পারেন। ক্রেতা ও নমিনী উভয়েই মারা গেলে সাকসেশন সার্টিফিকেট অনুসারে আইনানুগ উত্তরাধিকারীকে সঞ্চয়পত্রের প্রাপ্য অর্থ প্রদান করা হয়। 

ক্রয়সীমা
পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে একক নামে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা এবং যুগ্মনামে সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা যায়। তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রেও একই ক্রয়সীমা। পরিবার সঞ্চয়পত্রে একক নামে সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করা যায়। আর পেনশনার সঞ্চয়পত্রে এ সীমা ৫০ লাখ টাকা। পরিবার বা পেনশনার সঞ্চয়পত্র যুগ্মনামে কেনার সুযোগ নেই। ক্রয়সীমার অতিরিক্ত সঞ্চয়পত্র কিনলে  বিনিয়োগের ওপর কোনো মুনাফা প্রাপ্য হবে না।

উৎসে কর
সঞ্চয়পত্রের মুনাফা প্রদানের সময় মুনাফা থেকে ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তন করা হয়। আগে এ হার ছিল ৫ শতাংশ। নতুন হার চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত মন থেকে গ্রহণ করতে পারেননি খুদে বিনিয়োগকারীরা। সমালোচনায় সরব সোশ্যাল মিডিয়া।

 সঞ্চয়পত্রের মুনাফা
পেনশনার সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার সবচেয়ে বেশি, ১১.৭৬ শতাংশ। পেনশনার সঞ্চয়পত্রে প্রাপ্য মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তনের পর তিন মাস পর পর প্রতি লাখে নিট মুনাফা পাওয়া যায় ২ হাজার ৬৪৬ টাকা। পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১.৫২ শতাংশ। প্রাপ্য মুনাফা থেকে ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তনের পর প্রতি লাখে এক মাস অন্তর নিট মুনাফা পাওয়া যায় ৮৬৪ টাকা। তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার সবচেয়ে কম, ১১.০৪ শতাংশ। উৎসে কর কর্তনের পর প্রতি লাখে তিন মাস পর পর নিট মুনাফা পাওয়া যায় ২ হাজার ৪৮৪ টাকা। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১.২৮ শতাংশ, যা মেয়াদপূর্তির পর পরিশোধ করা হয়। প্রয়োজনে মেয়াদপূর্তির আগেও যে কোনো ধরনের সঞ্চয়পত্র ভাঙানো  যায়। তবে এক বছর পূর্তির আগে ভাঙালে অথবা বছরের ভগ্নাংশের জন্য কোনো মুনাফা প্রদান করা হয় না।

অথরাইজেশন
ক্রেতা কর্তৃক লিখিত অথরাইজেশন ও অথরাইজড ব্যক্তির স্বাক্ষর সত্যায়নসাপেক্ষে মনোনীত ব্যক্তি মুনাফার টাকা উত্তোলন করতে পারেন। তবে মুনাফা-কুপন ক্রেতা কর্তৃক ডিসচার্জকৃত হতে হবে। মনোনীত ব্যক্তি মূল টাকা উত্তোলন করতে পারেন না।

সঞ্চয়পত্রের টুকিটাকি
বর্তমানে  শুধু ব্যাংক চেকের মাধ্যমে সঞ্চয়পত্র কেনা যায়। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র মেয়াদান্তে না ভাঙালে পুনরায় আরও এক মেয়াদের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনর্বিনিয়োগ হয়। সঞ্চয়পত্র হারিয়ে গেলে বা পুড়ে গেলে বা নষ্ট হলে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের পর ‘ডুপ্লিকেট’ সঞ্চয়পত্র ইস্যু করা হয়। সঞ্চয়পত্র লিয়েন করে বা জামানত রেখে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া যায় না। কোনো আয়বছরে পেনশনার সঞ্চয়পত্রে পুঞ্জীভূত বিনিয়োগের পরিমাণ ৫ লাখ টাকা অতিক্রম না করলে পেনশনার সঞ্চয়পত্র থেকে প্রাপ্ত সুদ করমুক্ত। যে কোনো ধরনের সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎসে কর্তিত কর উক্ত খাতের বিপরীতে চূড়ান্ত করদায় পরিশোধ হিসেবে গণ্য হয়। সঞ্চয়পত্র কেনায় বিনিয়োগ করা হলে নির্ধারিত হারে আয়কর রিবেট পাওয়া যায়। ইদানীং ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) পদ্ধতিতে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা ও মূল টাকা সরাসরি বিনিয়োগকারীর ব্যাংক হিসাবে জমা করার পদ্ধতি চালু হয়েছে।

লেখক: সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, জনতা ব্যাংক লিমিটেড।

মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh