১ম পর্ব

সবখানে হিন্দুত্ববোধ উঁকি মেরে ওঠে

আইডিয়া বা ভাবাদর্শ তৈরির সংগঠন হলো আরএসএস, আর সেই ভাবাদর্শ চর্চার সংগঠন বিজেপি, এটাই এ দুই সংগঠনের সম্পর্ক। এ ছাড়া পাবলিক আরএসএসের আইডিয়া একেকবারে কতটা করে খাবে বিজেপি তা নিয়ে একটা অনুমান তৈরি করে আগে। তারপর সেটাকেও আবার সরাসরি পাবলিকের কাছে নেয় না। বরং নানা কৌশলে পাবলিকের সামনে হাজির করে, যাতে ধীরে সুস্থে তা পাবলিককে খাওয়ানো যায়। তবে বিজেপি নিজেই কোনো রকম না লুকিয়ে বলে থাকে তাদের রাজনীতির নাম ‘হিন্দুত্ব’। এই প্রশ্নে আরএসএসও না-লুকিয়ে বলে থাকে তাদেরও লক্ষ্য হিন্দুত্ব। 

তাহলে হিন্দুত্ব কথাটার মানে কী? হিন্দুত্ব মানে মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদই, তবে আরও কিছু চিহ্ন ও বৈশিষ্ট্যও সঙ্গে থাকে। তাই হিন্দুধর্ম অনুসারী মানুষ মানেই তিনি ‘হিন্দুত্ব’ এই আদর্শের হিন্দু নাগরিক হবেন, এটা ধরে নেওয়া ভুল হবে। ‘হিন্দু’ আর ‘হিন্দুত্ব’ শব্দ দুটি আলাদা, তাদের অর্থও আলাদা। হিন্দু শব্দ দিয়ে আপনি একটা ধর্মকে বা একটা এথনিক জনগোষ্ঠীগত পরিচয়কে বা একটা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের কোনো কিছুকে বোঝানোর জন্য ব্যবহার করতে পারেন। তবু এগুলো একটাও ‘হিন্দুত্ব’ নয়। হিন্দুত্ব এক রাজনৈতিক আইডিওলজি। যদিও বিজেপিকে আদর্শ জোগানো যে সংগঠন আরএসএস, এরা হিন্দুত্ব বলতে যা বুঝায় বা বুঝতে বলে সেই হিন্দুত্বের অর্থ একেবারেই আলাদা।

বিজেপি-আরএসএসের হিন্দুত্ব এক প্রকারের হিন্দু জাতীয়তাবাদী চিন্তা সন্দেহ নাই; কিন্তু তাতেই শেষ নয়, আরও আছে। এটা এক উগ্র জাতীয়তাবাদ। কেমন উগ্র? হিটলারের মতো উগ্র ও রেসিস্ট। তাহলে এরা নিশ্চয়ই সুপ্রিমিস্ট, মানে আমরাই শ্রেষ্ঠ, এমন শ্রেষ্ঠত্বের বয়ান এদের আছে? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। এরা হলো, হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদী। সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী মানে নরওয়ে বা নিউজিল্যান্ডের মুসলমান-নিধনের নায়ক যে হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট; এদের মতোই আরএসএস-বিজেপিও হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদী। তাই বলতে পারেন হিন্দুত্ব মানে হিন্দু জাতীয়তাবাদ প্লাস।   

এটা আসলে ‘বর্ণবাদী (racist) জোনে’ ঢুকে যাওয়া এক হিন্দু জাতীয়তাবাদ। তাই সেটা আর সাদামাটা কোনো জাতীয়তাবাদ নয়। ফলে স্বভাবতই হিন্দু মানেই হিন্দুত্ব নয়। তবে হিন্দু নাগরিকদের মধ্যে যারা হিন্দুত্বের আইডিয়াকে রাজনীতি হিসেবে গ্রহণ করে, প্রচার করে, বিশ্বাস ও বাস্তবায়ন করে, কেবল তারাই হিন্দুত্ব-চিন্তার ব্যক্তিত্ব। এর সোজা মানে হিন্দুধর্মের অনুসারী হয়েও হিন্দুত্ব-চিন্তাকে গ্রহণ করেনি এমন ভারতে প্রচুর আছে। যেমন গত নির্বাচনে (২০১৯ মে) যারা বিজেপি-মোদিকে ভোট দিয়েছে, ফলে তারা হিন্দুত্ব মেনেছে বলে যদি ধরে নেই, তাহলে মাত্র ৩৭.৩৬ শতাংশ ভোটার হিন্দুত্বকে জেনে বা না জেনে বরণ করেছে। বাকিরা হিন্দু হয়েও মানেনি অথবা তারা অহিন্দু ভোটার। অর্থাৎ বাকিরা হিন্দু হয়েও বা অহিন্দু ভোটাররা হলো ৬৩ শতাংশ, যারা হিন্দু মানে হিন্দুত্ব, এ কথা মানেন না।

তবে একটা কথা আছে, হিন্দুত্বওয়ালারা সব সময় চেষ্টা করে থাকে কোনো হিন্দু নাগরিক মানেই সে হিন্দুত্বের অনুসারী, এমন দাবি করা। কথাটা একেবারেই সত্য না। তা হলেও এই প্রপাগাণ্ডা তারা চালায়, যা থেকে সাবধান হতে হবে। এমনকি একালের বাংলাদেশের হিন্দুরাও ইদানীং হিন্দু আর হিন্দুত্ব একাকার করে দেখে। আর এদের বেশির ভাগই হিন্দুত্বের সমর্থক বলে নিজেদের দেখে থাকে। সম্ভবত অব্যাখ্যাত কোনো রাগ-ক্ষোভ থেকে এটা করে। হিন্দু বলতে কেউ হিন্দুত্ব-চিন্তা বুঝে ফেললেও এরা অসুবিধা ও অস্বস্তিও বোধ করে না। যদিও খুব সম্ভবত ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে এসব সিদ্ধান্ত তারা নেয়নি। যদিও আবার বলছি হিন্দু মানেই হিন্দুত্ব নয়, তাই এমন বুঝে নেওয়া আমাদের হিন্দু-মুসলমান যে কারোই ভুল হবে।

কিন্তু ভারতে? এখানে মূল সমস্যা দুটি। প্রথম সমস্যা হলো, ভারতে হিন্দুত্বকে পাবলিকলি সমালোচনা করলে আক্রমণের শিকার হতে পারেন। এমনই হিন্দুত্বের জোয়ার চলছে এখন সেখানে। আবার সবটাই জোয়ার ঠিক তা নয়, তবে জোয়ার দেখিয়ে হাজির করা হয়েছে। বিশেষত কাশ্মীর সরাসরি ভারতের বলে দাবি ও বাস্তবায়নে লেগে পরার পর থেকে মোদিরা ভীষণ ভীতিতে আছে। কখন কী থেকে জানি পরিস্থিতি হাতছুট হয়ে যায়। তাই সব কিছুতে আগাম আগ্রাসী মনোভাব দেখানো, দাবড়ে বেড়ানো, বিরোধিতা করলে মেরে ফেলব, কেটে ফেলব দেখানো, এসবই অনেকটা ভূতের ভয়ে রাস্তা পেরোনোর সময় উচ্চৈঃস্বরে গান ধরার মতো। যা হোক, এই আগ্রাসন পরিস্থিতিতে তাই কেউ হিন্দুত্বের অনুসারী হতে পছন্দ না করলেও তা প্রকাশ্যে বলা বুদ্ধিমানের কাজ না এমন মনে করাই স্বাভাবিক। ডরে, হেনস্তা হওয়ার ভয়ে।

এমনকি কংগ্রেস বা তৃণমূল যারা বিজেপির বিরোধী রাজনীতি করে, তারাও খুব সাবধানে পা ফেলে এখন, যেন বিজেপি তাদের হিন্দুস্বার্থবিরোধী হিসেবে পাবলিকের সামনে না চিনিয়ে দেয় বা খাড়া করে দেয়। ফলে হিন্দু ভোট পেতে চাইলে এই জোয়ারে হিন্দুত্বের সমালোচনা করা বোকামি হবে, বরং উল্টো গা ভাসিয়েছে। এ ব্যাপারে ব্যাপক হিন্দু নাগরিক হিন্দু-হিন্দুত্বের ফারাক উঠিয়ে ফেলে দিয়েছে। হিন্দুত্বের গর্বে বুক ফোলানোর সুযোগ তাদের কেউ কেউ আবার যেন হাতছাড়া করতে চাইছে না, এমন সেজেছে। যেমন ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দিয়ে কাশ্মীরকে ভারতের অংশ করে নেওয়া, এটাকে সমর্থন করা এক ব্যাপক দেশপ্রেমের প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আসলে উলটো কেউ এটাকে সমর্থন না করলে, এটা তার দেশপ্রেমের ঘাটতি, এই বয়ান বাজারে জারি করা হয়েছে।

এমন এক ভয়ের অবস্থা তৈরি করা হয়েছে যেন এই দেশপ্রেমের ডঙ্কার আড়ালে কেউ থাকলেই কেবল সে নিরাপদ। সমাজে এই আওয়াজ তুলে ফেলেছে আরএসএস-বিজেপি। এমনকি অবস্থা এমন, যারা আসলে আরএসএস-বিজেপির দাবি মানতে চান না অথবা আরও এগিয়ে বলতে চান, এটা কাশ্মীরিদের প্রতি অন্যায় হয়েছে তাহলে আপনার দেশপ্রেমে সমস্যা আছে বা আপনি দেশদ্রোহী, এই চাপও হাজির রাখা হয়েছে। 

এরই সঙ্গে আর একটা জজবা তুলে রাখা হয়েছে যে, আপনি হিন্দু হলে কাশ্মীর জবরদস্তিতে ভারতের অংশ করে নেওয়া হয়েছে বলে আপনাকে তা সমর্থন করতে হবে। অর্থাৎ মোদি সরকারের সিদ্ধান্ত মানেই সেটা হিন্দুদের স্বার্থ, তাই এর বাইরে যাওয়া যাবে না। অর্থাৎ ন্যায়-অন্যায় ইনসাফ অথবা চিন্তা বিচার বিবেচনাবোধ বলে কিছু নেই। হিন্দু হলেই মোদির সিদ্ধান্তের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। নইলে দেশদ্রোহী। এই হলো হিটলারিজম। পপুলার ফ্যাসিজম। অর্থাৎ পড়াশোনা, জ্ঞানবুদ্ধি চর্চা, স্কুল কলেজ বিশ^বিদ্যালয়ের গবেষণা ইত্যাদি এসবের যেন আর দরকার নেই। খালি মোদি কোনদিকে সেটা দেখে নিলেই হবে। আর ভারতের হিন্দুদের মোদির সিদ্ধান্ত দেখলেই এর পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। বাংলাদেশের অনেক হিন্দু জনগোষ্ঠীর সদস্যকেও দেখা গেছে এই ভিত্তিতে তারা মোদির পক্ষে। অথচ ব্যাপারটা হলো সিধা আপনি মুসলমান-হিন্দু যেই হন, বিচারের মূল মাপকাঠি হতে হবে ধর্ম নির্বিশেষে ন্যায়-অন্যায়, ইনসাফ বোধের ওপর দাঁড়ানো। কিন্তু তা হচ্ছে না। 

ভারতের এশিয়ান এজ পত্রিকার ভরত ভূষণের রচনা (Tectonic shift towards a very different India) হিন্দুত্ব ও কাশ্মীর ইস্যুতে মোদীর সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে এই লেখার শিরোনামকে বাংলায় লিখলে হয় এরকম : ‘এক ভিন্ন ভারতের দিকে টেকটনিক ঘাড়-বদল ঘটেছে।’ 

কোন নির্বাচনকে পাবলিক কীভাবে নিয়েছে, পপুলার ভোট কাউকে হাতখুলে কিভাবে জিতিয়েছে, এটা নির্বাচিত সরকার পরে কোন দিকে যাবে, তা বোঝার প্রাইমারি নির্দেশক চিহ্ন নয়, বরং সেকেন্ডারি। কারণ, জিতে যাওয়ার পর বিজয়ী দল ও গঠিত সরকার সেই পপুলার ভোট-সমর্থনকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রকে কোন দিকে নিয়ে যাবে- তা দিয়েই নির্ধারিত হবে রাষ্ট্র ও এর জনগণের ভাগ্য। জনগণ কী মনে করে ভোট দিয়েছিল, সেটা সে এবার ভুলে যেতে পারে, তাই এটা গৌণ বা পরের বিষয়। মুখ্য হলো বিজয়ী দল ও সরকারের ‘মনে’ কী আছে।   (চলবে)

গৌতম দাশ
রাজনৈতিক বিশ্লেষক

মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh