আবরারের মৃত্যু: দীপ্ত তারুণ্য ও কিছু প্রশ্ন

যদি প্রশ্ন করা যায়, এখন দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী? এই প্রশ্নের উত্তর সবার বা কারও পক্ষেই হয়তো দেওয়া সম্ভব না। কারণ আকণ্ঠ নানা সমস্যার অতল গহ্বরে ডুবে আছি আমরা। একের পর এক ধর্ষণ, সাম্প্রতিক কালের ক্যাসিনোকা- এবং আবরারের মৃত্যু আমাদের পুরো দেশবাসীকে চমকে দিয়েছে, হতবিহ্বল করেছে। ক্ষুব্ধ ভীতসন্ত্রস্ত করেছে। আবরারের অস্বাভাবিক মৃত্যু বা হত্যার পর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। কিন্তু এখনো তা বিভিন্ন আড্ডায়, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। নৃশংসতা কত লোমহর্ষক, কত মর্মস্পর্শী হতে পারে, মনের গভীরতম প্রদেশকে তা কী ভাবে নাড়া দিতে পারে তা দেশবাসী এ ঘটনায় প্রত্যক্ষ করেছে। আবরারের মৃত্যু নিয়ে যথেষ্ট লেখা হয়েছে কাগজের পাতায়, ইন্টারনেটে, ফেসবুকে, টুইটারে। দেশি বিদেশি টেলিভিশন ও পত্রিকায়। ভাগ্য ভালো আমরা ডিজিটাল যুগে বাস করছি। তথ্য প্রযুক্তির বিকাশের কারণে দুই চোখ বিস্ফারিত করে আমরা দেখলাম অপ্রকৃতিস্থ ও অস্বাভাবিকভাবে মানুষ পিটিয়ে হত্যার দৃশ্য। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। কিন্তু এর চেয়েও বড় বিস্ময় হলো ইউনিভার্সিটির অফিস প্রশাসনের কর্মকর্তাদের এই ঘটনার খুব কাছাকাছি নির্বিকার বসে থাকা। তারা পুরোটা সময় অফিসরুমে থাকলেও এ তাণ্ডবে নাড়া দিলো না তাদের মন, আবেগ বা বিবেক। প্রস্তুত ছিল অ্যাম্বুলেন্স, কাছেই ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তার, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোক অর্থাৎ পুলিশও ছিল।

আবরারের ঘটনা যখন দেশের আবালবৃদ্ধবনিতার অন্তরকে দুমড়ে- মুচড়ে দিয়ে গেল, ঠিক তখনই ইন্টারনেট বা ইউটিউবের স্ক্রিনে দেখা যেতে থাকল র‌্যাগ ডে বা অন্যান্য অনুষ্ঠানের অশ্লীল সব ছবি। ছেলে- মেয়েদের ইউনিভার্সিটিতে প্রবেশের সময়ে বা অধ্যয়ন শেষে মহাসাড়ম্বরে ও আনন্দে উদযাপন হয় এই অনুষ্ঠান। এই উৎসব চালু হয়েছে প্রায় একশো বছর আগে। ‘র‌্যাগ ডে’ হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বার্ষিক অনুষ্ঠান, যা আনন্দ আর হৈ-হুল্লোড়ের দিন। প্রথম ‘র‌্যাগ ডে’ উদযাপিত হয় দক্ষিণ আফ্রিকার ইউনিভার্সিটি অব প্রিটোরিয়াতে, ১৯২৫ সালে। সে যুগে ‘র‌্যাগ ডে’ বলতে বোঝাতো ‘দেবার জন্য উঠে দাঁড়ানো’ বা দানশীলতা। তরুণ ছাত্ররা এই দিন ধনী লোকদের কাছ থেকে পুরনো ছেঁড়া কাপড় জামা সংগ্রহ করে গরিবদের মধ্যে বিতরণ করত। কোনো কোনো দেশে ছাত্রদের নিজেদের পরিচালিত চ্যারিটি অর্গানাইজেশন-এর মাধ্যমে গরিবদের সাহায্য করা হতো। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে ‘র‌্যাগ ডে’র সংজ্ঞা বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই দানশীলতার ব্যাপারটি এখন ‘আঁস্তাকুড়ে’ নিক্ষিপ্ত হয়েছে। দিন সাল জানা নেই, সম্ভবত বিশ শতকের দিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘র‌্যাগ ডে’ উদযাপন শুরু হয় মহা আনন্দে, মহা সাড়ম্বরে। প্রথম দিকে ইউনিভারসিটির বন্ধু-বান্ধবীরা একে অপরের গায়ে রঙ ছিটিয়ে, নাচ গান করে, বাদ্য বাজিয়ে এবং ঠাট্টা মশকরা করে দিনটি উদযাপন করতো। তবে ধীরে ধীরে এই উদযাপনের আকার বদলে গেছে, যাচ্ছে। আবরারের ঘটনায় এই পরিবর্তন গোচরীভূত হলো আমাদের, যদিও আবরারের ঘটনার কারণ ভিন্ন। আটককৃত আসামিদের সাক্ষ্যে জানা গেছে আবরার ভিন্নমতের রাজনীতি করতো বলে ধারণা করেছিল আসামি ছাত্ররা এবং আবরার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিল বলে কিছু ছেলে তাকে শায়েস্তার পরিকল্পনা করে এবং এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। ভিন্নমত কি একটি নৃশংস হত্যার কারণ এত তুচ্ছ হতে পারে? 

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে র‌্যাগিং একটি নতুন মাত্রা পেয়েছে, আর এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রাজনীতি। খোলাখুলি বললে এই রাজনীতিকে বলা যেতে পারে ‘অপরাজনীতি’। এটা এখন স্পষ্ট যে ইউনিভার্সিটিগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে শাসকদলীয় ছাত্ররা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার এবং সাধারণ নির্দলীয় ছাত্রদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে ফেলার অপচেষ্টায় তৎপর হয়ে উঠেছে। শিক্ষাঙ্গন শুধু ছাত্র রাজনীতির দ্বারা কলঙ্কিত নয়। শিক্ষকদের মধ্যেও ঢুকে পড়েছে রাজনীতির কলুষ ছায়া। নইলে আবরারের হত্যার ঘটনার দিন বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রদের অভিভাবকত্ব প্রভোস্ট, ছাত্র কল্যাণবিষয়ক পরিচালক, হাউস টিউটর, ভিসি এঁরা সবাই নির্লিপ্তভাবে বসে রইলেন কীভাবে? প্রশ্ন সবার কাছে, প্রশ্ন আমাদের বিবেক এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে।

এই তরুণরা প্রশাসনের চোখের সামনে এমন অনাচার, উচ্ছৃঙ্খলতা, লোমহর্ষক কর্মকাণ্ড ঘটানোর সুযোগ ও সাহস পায় কী করে? হলে হলে কী করে গড়ে ওঠে টর্চার সেল, দিনের পর দিন সেখানে কার ইন্ধনে ছাত্রদের ওপর নিপীড়ন চলে? শিক্ষকরা কি এসব ব্যাপারে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিলেন? তারা কিছুই জানতেন না, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাহলে তারা কখনো কোনো পদক্ষেপ নেননি কেন? তারা কি ছাত্রদের কাছে জিম্মি? কেনো? শিক্ষকরা কি দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত? আর ছাত্ররা কি সেই দলীয় রাজনীতির সুবিধাভোগী? এর একটাই মাত্র, উত্তর ‘হ্যাঁ’। তাই এইসব অন্যায়-অনাচার বন্ধ করতে হলে অবিলম্বে শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। শিক্ষকদের অবসরের বয়স ৬০ থেকে ৬৫ বছর। তার অর্থ হলো অবসরের পরেও তারা আর ও দশ বছর বয়স পর্যন্ত রাজনীতি করতে পারবেন। আর চাকরিকালীন অধ্যাপনা, ছাত্রদের গবেষণা সহযোগিতা এবং নিজেদের লেখা গ্রন্থ প্রকাশ করে তাদের প্রকাশনার সংখ্যা বাড়াবার সুযোগ পাবেন। এর চেয়ে সুন্দর কাজ আর কি হতে পারে? সমাজের বেশিরভাগ মানুষ ছাত্র রাজনীতি বন্ধের পক্ষে নন। তবে তারা মনে করেন ছাত্ররা মূল রাজনীতি থেকে দূরে থাকবেন। কোনো রাজনৈতিক দলের ছাত্র শাখা বা student wing থাকবে না। ছাত্র রাজনীতি থাকবে তাদের নিজস্ব স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলাপ-আলোচনা, সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

কোনো জাতির তরুণ সমাজ অর্থাৎ ছাত্ররাই হলো দেশের প্রকৃত ক্ষমতা ও প্রাণশক্তি। আজকের নতুন প্রজন্ম আগামীকাল দেশ পরিচালনা করবে। জাতিকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেবে। এরাই আবার দেশ ও বিদেশের শত্রুর কাছ থেকে মাতৃভূমিকে রক্ষা করবে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় অখ-তাকে সুরক্ষা করবে। আমাদের দেশের অতীত ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে নানা আন্দোলন, সংগ্রামে দেশের তরুণ ছাত্ররাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। রাজনীতি, অর্থবিত্ত, পদমর্যাদা বা পার্থিব কোনো লোভ বা ইন্দ্রিয় শক্তির প্রলোভন ও লালসা তাদের যেনো কোনোভাবেই প্রভাবিত বা বিভ্রান্ত করতে না পারে। তবেই তারা তারুণ্যের দীপ্ত আলোয় আলোকিত হয়ে উঠবে।

খুরশীদা হক
লেখক, সাংবাদিক।

মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh