বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ কি কার্যকর?

গণতন্ত্রের কিছু সমালোচনা ও দুর্বলতা থাকলেও এখন পর্যন্ত গণতন্ত্রই হচ্ছে তুলনামূলকভাবে অধিকতর ভালো শাসন ব্যবস্থা। গণতন্ত্রের কার্যকর ও বহুল প্রচলিত পদ্ধতি দুটির একটি হচ্ছে রাষ্ট্রপতি শাসিত গণতন্ত্র যা যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত। আর দ্বিতীয়টি সংসদীয় গণতন্ত্র, যা ব্রিটেনে কার্যকর রয়েছে। বাংলাদেশ যেহেতু এক সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন একটি ভূখণ্ড ছিল, সে অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্বাধীনতার পর সরকার পরিচালনার পদ্ধতি হিসেবে পছন্দ করেছে সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকার পদ্ধতি। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার রূপ যাই হোক না কেন, মোদ্দাকথা- এই শাসন ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু সংসদ। এটি সার্বভৌম। সংসদে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশের ব্যাপারে নানা মৌলিক সিদ্ধান্ত নেওয়া ও আইন পাস করা হয়। ফলে গণতন্ত্রের কার্যকারিতা নির্ভর করে পার্লামেন্ট কতটুকু সার্বভৌম বা কার্যকর তার ওপর।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাস মসৃন না হলেও এদেশ সরকারিভাবে একটি গণতান্ত্রিক দেশ। একটি দেশের গণতন্ত্র কতটুকু কার্যকর তা বোঝার অন্যতম নির্দেশক হলো সে দেশের জাতীয় সংসদ কতটুকু কার্যকর, তার ওপর। কীভাবে সেখানে আইন পাস হয়, আইন পাসের সময় ওই আইনের ব্যাপারে কী পরিমাণ আলোচনা হয় ইত্যাদির ওপর। কারণ সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য হলো জাতীয় সংসদ সার্বভৌমভাবে আলোচনা সমালোচনা করে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও জাতির জন্য কল্যাণকর বিষয়ে আইন পাস করবে। এ ক্ষেত্রে দলমত নির্বিশেষে ঐকমত্যে পৌঁছানো দরকার, নইলে এতে দেশের মানুষের আশা ও আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটবে না। সংসদীয় গণতন্ত্রের আরেকটি মূল বিষয় হচ্ছে সংসদ হবে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এবং সংসদই দেশ ও জাতির নেতৃত্ব দেবে। সংসদকে হতে হবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুু যেখানে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রতিনিয়ত যুক্তিপূর্ণ তর্ক ও সমালোচনা হবে। আর এরই মাধ্যমে সরকারের ও বিরোধী দলের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।

তাই একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সে জন্য দেশের উন্নয়ন ও সংসদীয় গণতন্ত্রের স্বার্থে জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলো হতে হবে অংশগ্রহণমূলক। থাকতে হবে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ভারসাম্য। এখন প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ এ চাহিদা কতটুকু পূরণ করছে? সংসদ গণতন্ত্রের প্রতীক, কথটি সত্যি বটে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান সংসদ কীভাবে চলছে তা এক বিরাট প্রশ্ন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সর্বোত্তম শাসন ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য করার মূল কারণ, এ পদ্ধতিতে ক্ষমতার মূল মালিক হচ্ছে জনগণ। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় সংসদ জনগণের প্রতিনিধিত্ব কতটুকু করছে তা আজ সবার জানা। যেভাবে আমাদের সংসদ গঠিত হয়েছে বা সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হয়েছেন তাতে গণতন্ত্রে জনবল যে ক্ষমতার মূল উৎস তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তাই একথা বলাই যায় যে, বাংলাদেশে কেবল নামেই গণতন্ত্র আছে। যে জনগণকে গণতন্ত্রে ক্ষমতার প্রকৃত উৎস বলে মনে করা হয়, এখানে আসলে তার তেমন কোনো ভূমিকা নেই। জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়াও যে গণতন্ত্র চালু থাকতে পারে বা সরকার নির্বাচিত হতে পারে তার নজির বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর অন্যকোনো দেশে প্রচলিত আছে কিনা তা জানা নেই। আমরা কথায় কথায় পাশ্ববর্তী দেশ ভারতকে অনুকরণ করি। কিন্তু আমরা আমাদের মতো করেই গণতন্ত্র ঠিক করেছি- যেখানে রাজনৈতিক এলিটরা ক্ষমতার মূল উৎস, জনগণ নয়। 

আমাদের দেশে এই প্রকারের সংসদীয় গণতন্ত্র চালু থাকায় জনগণকে এখন সংসদ ও রাজনীতি নিয়ে মাতামাতি না করলেও চলে। আর তাই জনগণের সঙ্গে সংসদ ও সংসদ সদস্যদের দুরত্ব বেড়েছে অনেক গুণ। গত ৫ জানুয়ারি ২০১৪ সালের ধারাবাহিকতায় ৩০ জানুয়ারি ২০১৯- এও আমরা ভোটারবিহীন জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রত্যক্ষ করেছি। জনগণকে এ দুটি নির্বাচনে আর কষ্ট করে ভোট দিতে যেতে হয়নি, বরং মধ্যসত্ত্বভোগীরাই সে কাজটি করে দিয়েছে খুবই শর্টকাট পদ্ধতিতে। শুধু তাই নয়, অত্যন্ত সুকৌশলে শক্তিশালী বিরোধী দলকেও জাতীয় সংসদ থেকে বাহিরে রাখা হয়েছে। যদিও দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কৌশলগতভাবে নামমাত্র বিরোধী দল রয়েছে, যাদের সংসদে ভূমিকা কি হবে তা তারা নিজেরাও জানে বলে মনে হয় না। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, জনগণ সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পার্থক্যই খুঁজে পায় না। যার প্রভাব পড়েছে মৌলিকভাবে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ার ওপর।

কিছুদিন আগে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশের ‘পার্লামেন্টওয়াচ’ নামক এক গবেষণায় জাতীয় সংসদের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা দেখে আমরা বিস্মিত হয়েছি। আমাদের জাতীয় সংসদ যে নতুন গণতন্ত্র তৈরি করেছে, সেখানে আইন পাস করতে তেমন কোনো সময় লাগে না। সময়ের অপচয় হয় না, কয়েক মিনিটে এক একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস হয়ে যায়। এরকম নজির পৃথিবীর অন্য কোথাও আর আছে কিনা জানা নেই। টিআইবি দশম জাতীয় সংসদের ওপর গবেষণা করে যে রিপোর্ট পেশ করে তাতে উল্লেখ রয়েছে, দশম জাতীয় সংসদে ৭১ শতাংশ বিল পাস হয়েছে ১ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে। আরেকটি তথ্য হলো মাত্র ১টি বিলে ৬০ মিনিটের অধিক সময় লেগেছে। সংসদে মোট যে সময় ব্যয় করা হয়েছে তার মধ্যে মাত্র ১২% ব্যয় করা হয়েছে আইন প্রণয়নের কাজে। এসব ছাড়াও ওই রিপোর্টে কোরাম সংকটকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতি কর্ম দিবসে গড়ে কোরাম সংকট ছিল ২৮ মিনিট। টিআইবি উক্ত সময়ের আর্থিক মূল্যও নির্ধারণ করেছে যা- ১৬৩ কোটি ৫৭ লক্ষ ৫৫ হাজার ৩৬৩ টাকা। 

এই হলো দশম জাতীয় সংসদের চিত্র। একাদশ জাতীয় সংসদ যে এর চেয়ে ভালো কিছু হবে তা হলফ করে বলা যায় না। টিআইবি যে চিত্রটির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে তা হলো সংসদের কার্যকারিতা এবং আইন পাশে সময় ব্যয় নিয়ে। আমাদের জাতীয় সংসদ এখন তার মৌলিক চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে। এখানে সবকিছু এখন একতরফা হয়। যদিও এতে আইনের কোনো ব্যাঘাত ঘটে না। সময় কম লাগলে যে আইন পাস ত্রুটিযুক্ত হবে তা তো কোথাও বলা নেই। তবে সংসদ, সংসদীয় গণতন্ত্র এবং জাতীয় সংসদের কার্যকারিতা বলতে যা বোঝায় তার বড্ড অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন জনগণ, গণতন্ত্র ও জাতীয় সংসদের সঙ্গে আরও দূরত্ব বাড়বে। জাতীয় সংসদ যদি জাতীয় সংসদের মতো কার্যকর না থাকে, নামকাওয়াস্তে চলা এই গণতন্ত্রকে গণতন্ত্রের তত্ত্বে ফেলা যাবে না, সংসদীয় গণতন্ত্রতো নয়ই।

লেখক: ড. মো. কামাল উদ্দিন
অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।


মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh