তারামন বিবি নামটি মনে রাখুক রাষ্ট্র

যে বয়সে মাথার বেণী দুলিয়ে গ্রামের মাঠ দাপিয়ে বেড়ানোর কথা ছিল, সে বয়সে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে নেমেছিলেন। পুতুল নিয়ে খেলার বয়সে হাতে তুলে নিয়েছিলেন স্টেনগান।

আমরা তরুণ প্রজন্ম কি জানি, তিনি কে? কতজন জানি? আমি অনেককেই এই দুটি বাক্য বলে প্রশ্ন করেছিলাম, বলুন তো কার কথা বলছি?দুঃখ নিয়ে বলি, সবাই প্রশ্ন করেছে, ‘কে উনি?’ অথচ, এই দুটি বাক্য শুনেই আমাদের বলে দেওয়া উচিত ছিল, সেই মানুষটির নাম বীরপ্রতীক তারামন বিবি।   

প্রসঙ্গটা এই কারণেই এসেছে, আজ ১ ডিসেম্বর বীরপ্রতীক তারামন বিবির প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। অথচ অনেকেই আমরা জানি না সে কথা। জানি না তারামন বিবি কে ছিলেন, কী ছিল এই দেশের জন্য তাঁর অবদান। কেউ জানি না তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন নানা ভূমিকায়। কখনো মমতাভরা হাতে রান্না করে খাইয়েছেন বাংলার দামাল সন্তানদের। কখনো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গোয়েন্দার ভূমিকায় পৌঁছে গেছেন শত্রু শিবিরে। কখনো অস্ত্র হাতে করেছেন সম্মুখযুদ্ধ। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৪!  

দুঃখের কথা হয় না শেষ! যুদ্ধ শেষে ২৫ বছর পর্যন্ত কেউ জানতো না, কোথায় আছে কেমন আছে আমাদের এই মা। মুক্তিযুদ্ধে তারামন বিবিকে তার সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বীর প্রতীক’ উপাধি দেয় তৎকালীন সরকার। সেই অবদানের পুরস্কার তাঁর হাতে উঠে ১৯৯৫ সালে। অথচ এই দেশের অলিগলিতে, রাজপথে, শ্লোগানে মিছিলে থাকার কথা ছিল এই বীর নারীর কথা। ‘নারী তুমি এগিয়ে যাও’ এই শ্লোগানের প্রতিচ্ছবি হওয়ার কথাও ছিল তারামন বিবির।

কুড়িগ্রামে, তারামন বিবির এলাকায় কথা বলেছিলাম স্থানীয়দের সঙ্গে। কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী পালনে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক—কোনো ধারার সংগঠনই মনে করেনি তাঁর কথা। 

আমার প্রশ্ন হচ্ছে, তারামন বিবিকে চিনতে না পারার দায় কার? আজকে তারামন বিবিকে কেউ মনে রাখেনি, এই দায় কার? আমার নাকি রাষ্ট্রের? তরুণ প্রজন্মের যারা মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে চায়, জানতে চায় আমাদের বীরদের কথা, তারা কতটুকু জানতে পারছে?

দুঃখজনক হলেও সত্যি, আজ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সঠিক তালিকা করা সম্ভব হয়নি। প্রায়ই কাগজের পাতা ভরে খবর আসে ‘তালিকাহীন’ মুক্তিযোদ্ধারা কাটাচ্ছেন মানবেতর জীবনযাপন। কেউ বা ভিক্ষা করছেন একটু ভালো জীবনের প্রত্যাশায়। কতোটা অসহায় আমরা। পুষ্পশয্যা দেইনি, তাদের ছেড়ে দিয়েছি কাঁটা বেছানো পথে। এই সন্তানদের কষ্টে বোধ করি দেশমাতৃকাও কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে যায়।

আজকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হতে পারতো তারামন বিবির মৃত্যুবার্ষিকী। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছাপা হতে পারতো তাঁর বায়োগ্রাফ। আমরা জানতাম যুদ্ধ ময়দানে কীভাবে ক্রলিং করতে করতে স্টেনগান নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। জানতে পারতাম ক্রলিং করতে গিয়ে তাঁর হাত-পা থেকে বেয়ে পড়া কতটুকু রক্ত পবিত্র করেছিল এই মাটিকে।

শুধু তারামন বিবিই নয়, অজানা রয়ে গেছে এমন আরো বীরের কথা। আমরা যদি জানতে পারতাম কারা ছিল আমাদের সেই সত্যিকারের নায়ক, তাহলে ১০০তে ১০০ না হোক—১০ জন হলেও অনুপ্রাণিত হয়ে দেশটা গড়ে তোলায় জীবন কাটিয়ে দিতো। হয়তো ১০টা লোক কম দুর্নীতিগ্রস্ত হতো। হতে পারতো হয়তো অনেক কিছুই।

আমরা যারা নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের কথা বলি, আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বাংলাদেশের কথা বলি, আমরা যেন নিজেরদের নিজেকে একটি প্রশ্ন রাখি—‘তারামন বিবিদের ভুলে গিয়ে কতটা সম্ভব সেই আদর্শ বাস্তবায়ন?’

আমরা চাই রাষ্ট্র মনে রাখুক তারামন বিবিদের। নতুন প্রজন্মকে তারামন বিবিদের কথা বলার দায়িত্ব তুলে নিক রাষ্ট্র। একটু ছোট করেই হোক, মনে যেন রাখি আমরা তাদের। ‘কীর্তিমানের মৃত্যু নেই’—এই কথাটা যেন বাঙালিরা বুক ফুলিয়ে বলতে পারে।

লেখক: সুশোভন সরকার
সংবাদকর্মী ও ছাত্রনেতা

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh