নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে ক্ষমতা ধারণার বিনির্মাণ

অদূর ভবিষ্যতে আমাদের দেশে কোনো বড় ধরনের রাজনৈতিক দুর্যোগ না ঘটে তাহলে হয়তো বা আগামী বছরের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জন করবে বাংলাদেশ। সেটা নিশ্চয়ই আমাদের সবার জন্য হবে একটা বড় অর্জনের বিষয়। আবার শুধু কাগজে-কলমে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়া মানেই কিন্তু সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাওয়া নয়। পূর্ণ গণতন্ত্র, সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন আমরা দেখি তা অর্জনে আরও বহুদূর যেতে হবে আমাদের। সেই যাত্রাপথে একটা বড় চ্যালেঞ্জ হলো- নারীর প্রতি চলা অব্যাহত সহিংসতা, যা উন্নয়নের নানা ক্ষেত্রে আমাদের বিভিন্ন অর্জন ম্লান করে দেয়। যখন আমরা দেখি নারীর প্রতি সহিংসতায় বাংলাদেশের বৈশ্বিক স্থান ২৮তম (ইউএনএফপিএ জরিপ)। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৫ সালের জরিপ মতে, দেশের প্রায় ৭২ শতাংশ বিবাহিত নারী জীবনে একবার হলেও স্বামী কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং প্রায় ৫০ শতাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে তার জীবনকালে শারীরিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ধর্ষণ আর ধর্ষণের পর হত্যার মতো অমার্জনীয় অপরাধের ঘটনাও ঘটছে অব্যাহতভাবে। 

বলে রাখা প্রয়োজন যে, নারীর প্রতি সহিংসতার বিষয়টি বেশ জটিল আকার ধারণ করেছে এবং এর ধরণও বহুমাত্রিক হয়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতা কেনো হয় তাও আমাদের অজানা নয়। একটা পুঁজিবাদী, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় যখন পুরুষকেই শক্তিশালী হিসেবে চিত্রিত করা হয়, তখনই এই সমস্যার বীজ এখানেই ব্যাপিত হয়ে থাকে। আর রীতি-নীতি-সংস্কৃতি-আচার-ব্যবহার সবই কিন্তু অবদান রাখে ‘হেজিমোনিক ম্যাসকুলিনিটি’ বা ‘পৌরুষ’ ধারণাটা তৈরি করতে। এই পুরুষ ক্ষমতার চর্চা করে, এই পুরুষ আধিপত্যবাদী এবং এই পুরুষ শারীরিক ও মানসিকভাবে নারীকে কোণঠাসা করে রাখাটা তার দায়িত্ব মনে করে। প্রথমেই দরকার ‘পৌরুষের’ এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা। কিন্তু চ্যালেঞ্জ করার এই প্রক্রিয়া যদি হয় বিক্ষিপ্ত এবং বিচ্ছিন্ন, যদি হয় অপরিকল্পিত আর যদি হয় স্বল্পমেয়াদি তাহলে তা কোনো ফল বয়ে আনবে না।

আমাদের বুঝতে হবে যে, ক্ষমতার প্রচলিত ধারণাই ‘হেজিমোনিক ম্যাসকুলিনিটি’ ধারণাকে প্রভাবিত করে। সেজন্য প্রথমেই দরকার ক্ষমতার প্রচলিত ধারণাকে বিনির্মাণ করার। ক্ষমতার মানে বা বহিঃপ্রকাশ যদি হয় আধিপত্য বিস্তার, তথাকথিত দুর্বলকে চেপে ধরা, ভিন্নমতকে গলাচিপে দমন করা এবং প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে পেশি শক্তির ব্যবহার করা, তাহলে যে পুরুষ ‘পৌরুষের’ ধারণাকে ধারণ করে সে পুরুষ হিসেবে নিজেকে ক্ষমতাবান প্রমাণ করার জন্য নারীর প্রতি প্রতিনিয়ত সহিংস হবে সেটাই অনুমেয়।

বিষয়টাকে বৈজ্ঞানিকভাবেও ব্যাখা করা যায়। আমাদের মস্তিষ্ক কিন্তু সব সিদ্ধান্ত নেয় নানা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি হওয়া ‘জ্ঞানভিত্তিক পক্ষপাত’ (Cognitive Bias) থেকে। জন্মের পর থেকে একটা করে ঘটনা ঘটে আর তা আমাদের মস্তিষ্কের স্মৃতিতে সঞ্চিত হতে থাকে, ঠিক অনেকটা কম্পিউটারের মেমরির মতো। তারপর যখন সিদ্ধান্ত নিতে হয় তখন মেমরি থেকে মস্তিষ্ক শটকাট রাস্তাটা বেছে নেয়। এর মাধ্যমে আমরা থাকি চাপমুক্ত। এখন আমাদের স্মৃতি যদি ভর্তি থাকে ‘পৌরুষের’ প্রথাগত ধারণা দিয়ে, কোনো ধরনের যুক্তি-তর্ক ছাড়াই নারী তখন হয়ে পড়ে সহিংসতার লক্ষ্য। ফলে শুধু আইন করে বা প্রচারাভিযান চালিয়ে সহিংসতা বন্ধে খুব একটা অগ্রগতি হবে না ধরেই নেওয়া যায়।

কল্পনা করা যাক একজন রিকশাওলার কথা। সারাদিন তাকে সইতে হয় সওয়ারদের ধমক, ভাড়া নিয়ে বচসা, ট্রাফিক পুলিশের ধমক এবং কখনো কখনো লাঠির বাড়ি। সারাদিনের অসম্মান আর অবজ্ঞায় ঘেরা অভিজ্ঞতার পর ঘরে ফিরে সে নিজের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চাইবে। এক্ষেত্রে সে তার চোখে কম ক্ষমতাবান যারা (নিজের বউ বা সন্তান) তাদের প্রতি অসহিষ্ণু আচরণ করার মানসিকতা বহন করলে সেটা কি কোনো অবাক করা ঘটনা হবে? তাই এখন দরকার ক্ষমতার বিকল্প সংজ্ঞায়ন ও প্রচার-প্রচারণা। সেই ক্ষমতা যা অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। দরকার সেই ক্ষমতার প্রচার, যে অন্যকে শ্রদ্ধা করে, সম্পর্কগুলোকে মর্যাদা দেয় আর বিশ্বাস করে বৈচিত্র্যতায়। 

আমাদের সময় এসেছে সেইসব পুরুষকে ‘ক্ষমতাবান’ বা ‘আসল পুরুষ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, যারা ‘পৌরুষের’ প্রচলিত ধারণাকে লালন করবে না, বরং চ্যালেঞ্জ করবে এবং নারী পুরুষের সম্মানজনক সম্পর্কে বিশ্বাস করবে। পরিসংখ্যানের ভয়াবহ দিকগুলো সব সময় আমাদের আকৃষ্ট করে। কিন্তু অনেক সময়ই আমরা একটি সমস্যাকে ঘিরে থাকা সম্ভাবনার কথা ভুলে যাই। যেমন পরিসংখ্যানই বলছে এতকিছুর পরও দেশের অন্তত ২৮ ভাগ পুরুষ নারী নির্যাতন করে না। সময় এসেছে এদেরকে সামনে তুলে ধরার। সমাজে এই বিশ্বাস তো জন্মাতে হবে যে- পরিবর্তন সম্ভব। আমি আমার অনেক সহকর্মীকে চিনি যারা স্ত্রীকে সহযোগিতা করার জন্যই রান্না করেন, কিন্তু ‘পৌরুষের’ ধারণার বিপরীত হওয়ায় অন্যের হাসাহাসির বিষয়ে পরিণত হওয়া এড়াতে তারা প্রকাশ্যে এই ভূমিকার কথা শেয়ার করেন না। এই ধারণাগুলো ভাঙতে সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে।

তবে এ ধরনের পরিবর্তন স্বল্পকালীন উদ্যোগে সম্ভব নয়। দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আর বিনিয়োগ ও প্রচার-প্রচারণা। সেই বিনিয়োগ ও প্রচার-প্রচারণা শুরু হওয়া দরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত আজকে যারা বিদ্যালয়ে যাচ্ছে তাদের নিয়ে পরিকল্পিতভাবে কাজ করা। স্কুলে কি শেখানো হবে, কে শেখাবে, কিভাবে শেখাবে- সবই নতুন করে ভাবা দরকার। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ‘পৌরুষের’ ধ্যান-ধারণাকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ করার দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। আর শিক্ষক-শিক্ষিকারাই পারেন বাচ্চাদের ‘জ্ঞানভিত্তিক পক্ষপাত’ গঠনে প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখতে। স্কুলের পাশাপাশি শিশুদের মনোবিকাশের জন্য দরকার বিভিন্ন সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে তাদেরকে সক্রিয় অংশগ্রহণ করা।

আমরা যখন বড় হয়েছি তখন ইন্টারনেটের গেম ছিল না, ছিল কচি-কাঁচার মেলা বা খেলাঘরের মতো অনেক শিশু-কিশোর সংগঠন। এখন পরিকল্পিতভাবে আমাদের ফিরে যেতে হবে শিশুদের জন্য সংগঠন তৈরি করার কাজে যাতে তারা বিকল্প ক্ষমতার ধারণা নিয়ে বড় হয়। এরপর দরকার এলাকাভিত্তিক কর্মসূচি, যেখানে পুরুষরা যুক্ত হবে নারীর প্রতি সহিংসতার বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব বা ক্ষতি নিয়ে আলোচনায়। আর দরকার কর্মক্ষেত্রকে নারীর জন্য নিরাপদ করার। আমাদের এখনই ভাবতে হবে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’কে পুরোপুরি কাজে লাগানোর। নারীরা কর্মক্ষেত্রে আসছে, সামনে আরও ব্যাপক সংখ্যক নারী আসবে, যা পুরো দেশের জিডিপিকে চাঙ্গা রাখতে দরকার হবে। আগামী ২০ বছরে আনুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রবেশ বহুগুণ বেড়ে যাবে। এখানে রাষ্ট্রকে সক্রিয় হতে হবে যাতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নারী নিপীড়ন বন্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করে। সরকারকে নজরদারির মধ্যে আনতে হবে যাতে করে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সবাই এই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কার্যকর প্রয়োগ ঘটায়। প্রয়োজনে আনুষঙ্গিক আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে শক্তিশালী করা। সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এসবের প্রতিফলন থাকা দরকার। 

নারীর প্রতি সহিংসতা অব্যাহত রেখে সমতাভিত্তিক আর বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সুপরিকল্পিত আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিকল্প নেই।


মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh