মানুষের ধ্বংসলীলা আমাজনকে কতোদিন টিকিয়ে রাখবে

মহাবন আমাজন বিশ্বের বিস্ময়। মাত্র কিছুদিন আগে আমাজনের অগ্নিকাণ্ড পৃথিবীকে ভাবিয়ে তুলেছে। কারণ এই বন পৃথিবীর ফুসফুস নামে পরিচিত। সুন্দরবন যেমন বাংলাদেশের ফুসফুস তেমনি আমাজন পৃথিবীর ফুসফুস। ফলে আমাজনের ক্ষতি আমাদের বিশ্বের জন্যই ক্ষতি। প্রকৃতির তাণ্ডবের পর এখন নতুন করে ভাবাচ্ছে মানুষের কর্মকাণ্ড। 

নতুন এই কর্মকাণ্ডকে মৃত্যু প্রকল্পও বলা হচ্ছে। এই বন,পাহাড় ধ্বংস করে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ বিশ্বরোড নির্মাণের পরিকল্পনা করেছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বলসোনারো। তার সরকারের দাবি, এর ফলে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। আদিবাসিরাই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হচ্ছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থেই কি তাই ঘটবে? কোনো প্রাকৃতিক ছন্দ ধ্বংস করা হলে তার বিনিময়ে আজ পর্যন্ত মানুষ কি কোনো উপকার পেয়েছে? নাকি আদতেই মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?

এই আমাজনেই বহু আদিবাসি গোষ্ঠির বসবাস। যারা নিজেরাও এই পরিবেশেই নিজেকে রাখতে পছন্দ করে। এই বনে যদি প্রকৃত মালিক থাকে তাহলে হাজার বছর ধরে বসবাস করে আসা এসব আদিবাসীরাই। তাদের কাছে এই প্রকল্প কতটা গ্রহণযোগ্য হবে সেটাই প্রশ্নের। আদিবাসী নেতারা বলসোনারো সরকারের এই পরিকল্পনাকে মৃত্যু প্রকল্প বলছে। 

পরিকল্পিত এই প্রকল্পের নাম ’দ্য ট্রান্স-আমাজোনিয়ান হাইওয়ে’। এই প্রকল্পটি ব্রাজিলের এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় ও উচ্চাকাংঙ্খি প্রকল্প। ১৯৫৩ সালে সেনাশাসনের আমলে এ প্রকল্পের ঘোষণা দেয়া হয়। মানুষ প্রকৃতিকে বশ মানিয়েছে। তবে মানুষের এই প্রতিনিয়ত অত্যাচারে প্রকৃতি আজ হিংস্র, উন্মত্ত ও ক্ষিপ্ত। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে তাই মাঝে মধ্যেই প্রকৃতির ধ্বংসলীলা চলে। এই ধ্বংসলীলার জন্য আজ পৃথিবীতে বহু মানুষ গৃহহীন। 

মহাবন আমাজন প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি। ব্রাজিলে অবস্থিত এই বন সম্পর্কে একসময় বলা হতো এই বন কখনো ধ্বংস হবে না। বই পুস্তকে আমাজন নিয়ে বহু লেখা আমরা পড়েছি। বহু কল্পকাহিনী, সিনেমা এই আমাজন বন ঘিরে তৈরি হয়েছে। তবে মানুষের ক্রমবিকশিত সভ্যতার কার্যকলাপে আমাজানও সংকুচিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই মহাবন সংকুচিত হতে শুরু করেছে। মানুষের লোভের ভয়াল থাবা। 

যখন দাবানলে পুড়ছিলো আমাজন তখন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে আমাজনে এখন অবৈধ উপায়ে নজিরবিহীনভাবে সোনার খনির খোঁজ করছে স্থানীয় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ। হাজার হাজার অবৈধ খনির সন্ধানকারীরা সোনার খোঁজে খননকাজ পরিচালনা করেছে। এ কাজে তারা নদী দূষণ,গাছ কাটা এসব পরিবেশের ওপর মারাত্বক চাপ পরে এ ধরনের কাজ করেছে। এতে প্রতিদিনই আমাজনের প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। সাধারণ সৌন্দর্য হারাচ্ছে বিশ্ব ঐতিহ্যের ধারক আমাজন। 

বলা হয়, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বরসোনারা সরকারের সাথে মিত্রতা রয়েছে এসব শিল্পকারখানা এবং খনির অনুসন্ধানকারীদের। এটি উন্নয়নের একটি রাস্তা হলেও প্রকৃতি যে নিজেই প্রতিশোধ নিতে পারে তার প্রমাণ এই আমাজন। যে আগুন নেভাতে গিয়ে ঘাম ছুটে গেছে বিশ্বের। বন সাবাড় হচ্ছে এবং নদীর তীর উপচে বাদামি রঙের কাদার স্তুপ জমছে। প্রতিবছর এখানে অন্তত ৩০ টন স্বর্ণ অবৈধভাবে কেনাবেচা হয়। এ পেশার সাথে জড়িত রয়েছে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক যারা অধিকাংশই দরিদ্র শ্রেণির। প্রতি মিনিটে জ্বলেছে প্রায় ১০ হাজার বর্গমিটার এলাকা। সাধারণত দেখা যায় তীব্র খরার কারণে বনাঞ্চলে দাবানলের সৃষ্টি হয়। আইএনপিই গবেষকরা বলেছেন, এ বছর আমাজনের জলবায়ু ও বৃষ্টিপাতের পরিমাণ নিয়ে কোনো অস্বাভাবিকতা নেই।  

আমাজনের ওপর নির্ভর করে আছে নানা রকম প্রাণীকূল। বৈচিত্র্য সম্ভারে আমাজনের দ্বিতীয়টি নেই। একটি বিষয় স্পষ্ট যে আমাজনের আজকের এই পরিণতির জন্য মানুষের লোভ এবং লাভের হিসাবই দায়ি। যে আমাজনের ওপর পৃথিবীর প্রাকৃতিক ভারসাম্যের একটি বড় অংশ নির্ভরশীল সেখানে মানুষের জন্য আজ পৃথিবীর ফুসফুসের এই পরিণতি। এই সুন্দর পৃথিবীর এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। যে গতিতে জলবায়ু পরিবর্তিত হচ্ছে তাতে অচিরেই পৃথিবীর কোনো কোনো দেশ ভয়াবহ সংকটে পরতে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবেও অধিকাংশ দেশের জন্য হুমকি। এই হুমকি মোকাবেলায় জলবায়ু পরিবর্তন এবং অভিযোজন শব্দটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। পৃথিবীর বাতাস ক্রমেই বিষাক্ত হয়ে উঠছে। অথচ এই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল একসময় সুশীতল, বিষমুক্ত ছিলো। সেই আগের মতো বাযুমণ্ডল পেতে হলে পক্ষে এক লাখ কোটি গাছ লাগালে বায়ুমণ্ডল হয়ে উঠবে সেই ১০০ বছর আগের মতো। এমনটাই জানিয়েছেন সুইজারল্যান্ডের জুরিখে সুইস ফেডারেল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (ইটিএইচ জুরিখ) একটি গবেষণা। 

আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান জার্নাল ’সায়েন্স’ এ গবেষনাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, শুধুমাত্র গাছ লাগালেই আসন্ন সংকট থেকে সমাধান সম্ভব। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জেরে যে হারে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে তাতে অনেরক নিচু শহর মারাত্বক হুমকিতে রয়েছে। আর শিল্পায়নের জোয়ারে বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইড বেড়েই চলেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, এক লাখ কোটি গাছ লাগাতে জমির অভাব হবে না। হিসেব করে দেখিয়েছে, যদি আপনার সদিচ্ছা আর আন্তরিকতা থাকে দ্রুত এক লাখ কোটি গাছ বসিয়ে ফেলার তাহলে অন্তত জায়গার অভাবে সেসব গাছের বেড়ে উঠতে ও বেঁচে থাকতে কোনো অসুবিধা হবে না। ইথিওপিয়ায় একদিনে ৩৫ কোটি গাছ লাগিয়ে রেকর্ড গড়েছে। 

প্রশ্নটা রেকর্ডের নয় অস্তিত্বের। জলবায়ু পরিবর্তন ধারনাটি আরো কয়েক দশক আগে থেকেই জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছে। কিন্তু আলোচনার সাথে সাথে জলবায়ুজনিত পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাব মোকাবেলায় কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে কার্যত জলবায়ু পরিবর্তিত হয়েছে এবং সারাবিশ্ব এখন এর ফল ভোগ করছে। উন্নত বা অনুন্নত দেশ কেউ এর প্রভাব থেকে বাদ যাচ্ছে না। তবে সক্ষমতা বিবেচনায় এবং অবস্থা পর্যবেক্ষণে কারো ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার সামর্থ রয়েছে আর কারো সে সামর্থ্য কম। 

আজ জলবায়ু পরিবর্তনে দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হয়। এক. জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলায় করণীয় ঠিক করা। দুই. অভিযোজন করা অর্থাৎ পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়া। গত বছর বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের ব্যাপারে সব দেশ সম্মত হয়েছে। কার্যত গত পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের খারাপ দিক বেশ ভালোই বুঝতে পারছি। তীব্র শীত বা খরা, অতিবৃষ্টি, প্রলয়ঙ্করী ঝড়, তীব্র তাপদাহ, অসময়ে বন্যা, ভূমিধস, টর্ণেডো ও সুনামির মতো মারাত্বক সব প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশ্বকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। মানুষের লোভের পরিণতিতে অথবা প্রাকৃতিক কারণেই হোক আমাজানের এই ক্ষত মানুষের জন্যও শুভ নয়। আমাজানকে পৃথিবীর ফুসফুস বলা হলেও বাস্তবিকপক্ষে প্রতিটি বনাঞ্চলই পৃথিবীর ফুসফুস হিসেবে কাজ করে। প্রতিটি বনাঞ্চল রক্ষা করার দায়িত্বই মানুষের। যে উন্নয়নের নামে বনাঞ্চল ধ্বংস করে সম্পদের পাহাড় গড়ছি সেই সম্পদ একদিন মানুষের কাধেই বোঝা হয়ে সভ্যতা ধ্বংসের কারণ হবে। উন্নয়নের নামে মহাসড়ক তৈরির এই পরিকল্পনা নতুন করে আমাজনকে সংকটে ফেলতে পারে। সেক্ষেত্রে সেখানকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় এই বনকে নিজের মতো রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। 

লেখক: অলোক আচার্য, শিক্ষক।

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh