বাঁধ ভেঙে গড়ায় আঁখি নোনাজল

বড় সাধ করে বাড়ি বানাচ্ছিলেন নিপু মন্ডল; কিন্তু পয়সার অভাবে টিন দিয়ে আর ছাদ ঢাকতে পারেননি। ইটের বাড়িতে ছিল তাই প্লাস্টিকের ছাউনি। ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের দাপটে সেই ‘বালির বাঁধ’ কবেই উড়ে গেছে। ঝড়ের খবর শুনে আগেই গিয়ে উঠেছিলেন স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তাই প্রাণে রক্ষা। এখন নিজের বাড়িতে একপ্রকার খোলা আকাশের নিচেই রাত কাটে পরিবারের সদস্যদের। দুর্গতির এখানেই শেষ নয়। মাটিতেও পা ফেলার জো নেই। সারা ঘর যে জলে থইথই। সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার দয়ারঘাট এলাকায় বাড়ি বৃদ্ধ নিপুর। নিচু জমিতে পানি জমে বলে ভিতটা বেশ উঁচু করেই বানিয়েছিলেন; কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে খোলপেটুয়া নদীর বাঁধ ভেঙে গোটা এলাকা প্লাবিত। রাত-দিন তাই অবাধে চলে জোয়ার-ভাটার খেলা। স্থানীয়দের অভিযোগ, তাদের জীবন নিয়ে খেলা করেন বড় বাবুরা (সরকারি কর্মকর্তারা)। শুকনো মৌসুমে মেম্বার, চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছেও ধরণা দেন তারা, বাঁধগুলো মজবুত করে বাঁধার জন্য; কিন্তু তারা বাঁধে না। কেননা ভেঙে গেলে যে তাদেরই লাভ। যত বিপদ, কেবল ওই অভাগাদেরই।

কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় এটি, গ্রাম-বাংলার পুরো চিত্রটাই এমন। সরকারের হিসাবে, দেশে প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ, অর্ধেকই উপকূল রক্ষায়। তবে ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর ও ২০০৯ সালে আইলার পর উপকূলীয় এলাকার এসব বাঁধের অনেক স্থানই ভেঙে যায়। বানের তোড়েও ভেসে গিয়েছিল কোনো কোনো পয়েন্ট। এর মধ্যে তাণ্ডব চালায় ঘূর্ণিঝড় ফণী ও বুলবুল। কথিত ‘জরুরি কাজ’-এর অজুহাতে চলে জোড়াতালি, নামমাত্র সংস্কার। আইলার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুলনার কয়রায় গিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন টেকসই ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের। এরপর বরাদ্দটা টেকসই হলেও বাঁধে যেন ‘বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো’। সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই ছিঁড়ে যায় মায়ার বাঁধন। নতুন প্রকল্পের নামে শুরু হয় আবার নতুন বরাদ্দ। যুগের পর যুগ ধরে এভাবেই চলছে ‘বাঁধ ব্যবসা’। সবকিছুই হয় রাজনৈতিক মাফিয়া আর বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) এক শ্রেণির বিপথগামী কর্মকর্তার যোগসাজশে। খাতা-কলমে কাজ দেখিয়ে চলে লুটপাট।

জলবায়ু অর্থায়ন ও প্রকল্পের অধীনে বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপর বছর তিনেক আগে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। তাতে উঠে আসে স্থানীয় জনগণকে উপেক্ষা করে প্রভাবশালীদের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি। যেখানে প্রভাব খাটান মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিব, ক্ষমতাসীন দলের নেতা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানরাও। সবার সঙ্গেই ‘সুসম্পর্ক’ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তাদের। প্রকল্পের ঠিকাদারদের তখন আর বাঁধ টেকসই না করে সেই মাটি ইটভাটায় বিক্রিতেও থাকে না কোনো বাধা! ভাঙনরোধে জিও ব্যাগে বালুর ‘ব্যবসা’টা তো সেই পুরনো। প্রতিবাদ জানিয়ে কেউ কেউ গলা ভাঙলেও লাভের খাতা বলতে গেলে শূন্য।

উপকূল বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি শাহেদ শফিক বলেন, ‘দেশে যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগই প্রথমে আঘাত হানে উপকূলের বেড়িবাঁধে; কিন্তু সে অনুযায়ী বাঁধ নির্মাণ হয় না। ব্যয় করা হয় না বরাদ্দের এক-তৃতীয়াংশ অর্থও। প্রতি বছর সরকারি কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও মেলে না টেকসই বেড়িবাঁধ। উল্টো বাঁধ সংস্কার যেন হয়ে উঠেছে পাউবো, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ঠিকাদারদের অর্থ লুটের স্থায়ী খাত।’

বুকজলে মানব দেয়াল

ধেয়ে আসে আম্ফান। প্রচণ্ড গতির এ ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গী উঁচু জলোচ্ছ্বাস। একে একে প্লাবিত হয় উপকূলীয় অঞ্চলগুলো। কোনো কোনো জেলায় বাঁধ ভেঙে ঢুকে পড়ে সাগরের নোনা পানি। থমথমে এ পরিস্থিতির মধ্যেই বিরল এক ইতিহাস সৃষ্টি করেন সাতক্ষীরার প্রতাপ নগরের শুভদ্রাকাঠিবাসী। প্রচণ্ড ঢেউ আর স্রোতে ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয় কপোতাক্ষ নদের বাঁধ; কিন্তু বাঁধের বন্ধন ছিন্ন হলেই যে অস্তিত্ব হারাবে পুরো গ্রাম। জীবনের শেষ শক্তিটুকু দিয়েই তা রক্ষার চেষ্টা করেন সবাই। প্রচণ্ড বাতাসের মধ্যেই নদীতে নেমে পড়েন নারী-পুরুষ, শিশু-বুড়ো। হাতে হাত রেখে পিঠ পেতে তৈরি করেন মানব দেয়াল। যেন গায়ে আছড়ে পড়ে দুর্বল হয়ে যায় হা করে ছুটে আসা ঢেউগুলো, কিছুটা হলেও যদি বাঁধটাকে সুরক্ষিত রাখা যায়! এতদিন তো ওটাই নিজের বুক পেতে রক্ষা করেছে সবাইকে। সুভদ্রাকাঠি গ্রামবাসীর এমন সাহসী দৃশ্য নিশ্চয়ই বিরল উদাহরণ হয়ে থাকবে পৃথিবীর ইতিহাসে।

৩০ দিন সিয়াম সাধনার পর আসে ঈদুল ফিতর; কিন্তু খুলনার কয়রাবাসীর মনে নোনাজলের দুঃখ। ভেঙে গেছে নদীর বাঁধ। তলিয়ে গেছে এলাকা। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। অপরিসীম ধৈর্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন গ্রামের সাত-আট হাজার মানুষ। কাজের ফাঁকে খাওয়া-দাওয়া, সবই চলে নোনাজলে। ঘনিয়ে আসে ঈদের জামাত, কিন্তু বাঁধের কাজ তো তখনো শেষ হয়নি। পানির মধ্যেই দাঁড়িয়ে ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করেন গ্রামের লোকজন। সেই ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে দুর্দশার কথা জানতে পারে সারাদেশ। কেবল চোখ বন্ধ করে রাখেন দায়িত্বপ্রাপ্তরাই।

ভাঙা-গড়ার খেলা

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, আম্ফানের আঘাতে কেবল সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি এবং খুলনার কয়রা ও দাকোপ উপজেলাতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আনুমানিক ১৭০টি স্থানে ৯৯টি বেড়িবাঁধ। বাঁধ ভাঙে ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়েও। ফলে যা হওয়ার ছিল, তা-ই হয়েছে। নোনাজলের তলায় সহস্র একর ফসলি জমি। জলোচ্ছ্বাসের স্রোতে ভেসে যায় শত শত মাছের ঘের। এমন পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক গওহার নঈম ওয়ারা বাঁধের ব্যক্তি মালিকানার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে চান। ইতিহাস টেনে তিনি বলেন, ‘বছর উনিশ-কুড়ি আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড স্থানীয় ভূমিহীনদের সঙ্গে নিয়ে ভোলার চরফ্যাশনে বেড়িবাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের একটা অসাধারণ উদাহরণ তৈরি করেছিল। বেড়িবাঁধের এক কিলোমিটার করে জায়গা দেয়া হয় একেকটি ভূমিহীন পরিবারকে, যেখানে তারা ঘর তুলে থাকে। আর বেড়িবাঁধের ঢালে সবজি বা ফসল ফলায়, বড় বড় ফলের ও কাঠের গাছ লাগায়। আর এ ব্যবস্থায় বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় প্রায় নেই বললেই চলে। বরং ভূমিহীনরা মাথাগোঁজার ঠাঁই পায়, তাদের আয়ের সংস্থান হয়। তবে এতে দুর্নীতির সুযোগ না থাকায় পরীক্ষামূলক এ প্রকল্প সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও অনুসরণ করা হয় না।’

কিছু হবে কি এবার

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র মতে, দুর্যোগে আর শতভাগ নিরাপত্তা দিতে পারছে না দেশের উপকূলীয় বাঁধগুলো। এগুলোর নকশাও সেই আমলের, ১৯৬০ থেকে ৬৫ সালের। সমতল থেকে উচ্চতা মাত্র ১০ ফুট। অথচ আম্ফানসহ সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়ে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস বয়ে আসে ১২ থেকে ১৫ ফুট ওপর দিয়ে। তাছাড়া জোড়াতালি দিয়ে বাঁধ সংস্কার অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। 

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে বাঁধের মতো ব্যয়বহুল স্থাপনার জন্য বহু কাঠখড় পুড়িয়ে বরাদ্দ পাওয়া অর্থ মুহূর্তেই জলে ঢালাও হবে নিজের পায়ে কুড়াল মারার মতো। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে দীর্ঘ ও কঠিন পথ। এর প্রস্তুতিও নিতে হবে ভেবেচিন্তে, সময় নিয়ে। তা ছাড়া বাঁধে সামাজিক বনায়ন করা হলে কিংবা ঘরবাড়ি তুললে সেটি অনেক বেশি সুরক্ষিত থাকে। কেননা নিজেদের স্বার্থেই এলাকাবাসী বেড়িবাঁধকে সুরক্ষিত রাখতে উদ্যোগী হয়। তাই যত বড় অংকের অর্থই বরাদ্দ হোক সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া কাজ করলে সব জলেই যাবে।’


কে এম ওবায়দুল্লাহ, সাংবাদিক

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh