ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের ঔদ্ধত্য

‘বাংলাদেশকে খয়রাত দেয় চীন’

ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা এবং জি-নিউজ একই দিনে (২০ জুন) বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নিয়ে একটি সংবাদ ছেপেছে; যার শিরোনাম আলাদা হলেও বিষয়বস্তু অভিন্ন এবং দুটি পত্রিকাই লিখেছে, ‘বাংলাদেশে খয়রাতির টাকা ছিটায় চীন।’ দুটি আলাদা পত্রিকা হলেও ভাষা ও বিষয়বস্তুতে মনে হতে পারে, একজনের টেবিলে বসেই দু’জন এই সংবাদ লিখেছেন অথবা একটি পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পরে আরেকটি পত্রিকা সেটি কপি করেছে।

ঢাকা সংবাদদাতার বরাতে আনন্দবাজার পত্রিকার শিরোনাম, ‘লাদাখের পরে ঢাকাকে পাশে টানছে বেজিং’। খবরের শুরুটাই এরকম: ‘বাণিজ্যিক লগ্নি আর খয়রাতির টাকা ছড়িয়ে বাংলাদেশকে পাশে পাওয়ার চেষ্টা নতুন নয় চিনের। লাদাখে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত-সংঘর্ষে উত্তাপ ছড়ানোর পর ফের নতুন উদ্যমে সে কাজে নেমেছে বেজিং।’ রিপোর্টে লেখা হয়েছে, ‘প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বিষিয়ে দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকে একঘরে করে ফেলার কৌশল বাস্তবায়িত করছে বেজিং। কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশ তাদের নিশানা। এখানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন তারা লগ্নি করেছে, দেশের গ্রামীণ বাজারগুলিতেও পণ্যের পসরা নিয়ে হাজির হচ্ছে চিনা বণিকরা।’ ঢাকার প্রধান শেয়ার বাজারও চীনের কবজায় বলে এই সংবাদে দাবি করা হয়।

জি-নিউজের শিরোনাম আরও বেশি আক্রমণাত্মক: ‘ভারতকে চাপে ফেলতে বাংলাদেশকে খয়রাতি চীনের’ যদিও খবরের ভেতরে ‘খয়রাতি’ শব্দটি নেই। দুটি পত্রিকার খবর যে একই জায়গা থেকে সরবরাহ করা হয়েছে, সেটি অন্তত সাংবাদিকদের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। যদিও আনন্দবাজারের খবরের বরাত তাদের ঢাকা সংবাদদাতা, আর জি-নিউজের সংবাদের সূত্র বলা হচ্ছে নিজস্ব প্রতিবেদন।

বাংলাদেশে জি-নিউজের অনলাইন ভার্সনের খুব বেশি পাঠক না থাকলেও আনন্দবাজারের অনেক পাঠক রয়েছেন। এই পত্রিকাটি বাংলাদেশ সম্পর্কে বরাবরই কথিত ‘চাঞ্চল্যকর’ খবর প্রকাশ করে আলোচনায় থাকতে চায়। আনন্দবাজারের একটা বড় টার্গেট থাকে বাংলাদেশকে হেয় করা। অনেক সময় তারা সাম্প্রদায়িক উস্কানিও দেয়। বাংলাদেশের বিশিষ্টজনদের নামও তারা বিকৃত করে ছাপে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমানকে তারা লিখতো ‘রহমান’। সাবেক প্রধান বিচারপতি এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানকে তারা লিখতো ‘হবিবর রহমান’। বাংলাদেশের বিশিষ্টজনের নাম এখনো তারা এভাবে বিকৃত করে ছাপে। বিশিষ্টজন তো বটেই, সাধারণ মানুষের নাম বিকৃত করে ছাপাটাও যে কোনো স্টাইল নয়, বরং অজ্ঞতা ও ধৃষ্ঠতা; সেটুকু বোঝার মতো কাণ্ডজ্ঞান সাংবাদিকের থাকতে হয়। 

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নিয়ে আনন্দবাজার এবং জি-নিউজের এই সংবাদ নিয়ে সঙ্গত কারণেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক সমালোচনা হয়। সিনিয়র সাংবাদিকদের অনেকেই এই সংবাদটি প্রত্যাহার অথবা সংশোধনের দাবি জানান। ফেসবুকে একজন লিখেছেন, ‘আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিকতাকে খোদ কলকাতাতেই বাজারি সাংবাদিকতা বলা হয়। এবার কি তারা খয়রাতি সাংবাদিকতা শুরু করল?’ কলকাতার সাংবাদিক শুভজিৎ পুতোতুণ্ড, যিনি নিজেও একসময় আনন্দবাজারে চাকরি করেছেন, তিনিও ‘খয়রাতি’ শব্দের প্রতিবাদ জানিয়ে ফেসবুকে লিখেছেন, ‘অত্যন্ত নিম্ন রুচির, নিম্নমানের, নিম্ন মানসিকতাসম্পন্ন পত্রিকার আদর্শ উদাহরণ হতে পারে আনন্দবাজার পত্রিকা। বর্তমান সময়ে মোদি-বিজেপি ঘনিষ্ঠ হিন্দুত্ববাদী যে কোনো টেলিভিশন বিশেষ করে জি এবং রিপাবলিকের মতো টেলিভিশন অতি সুস্থ সম্পর্কেও বিষ ঢালতে পারে।’

আনন্দবাজার ও জি-নিউজের এই রিপোর্টের দুটি উদ্দেশ্য থাকতে পারে- ১. বাংলাদেশকে হেয় করা; ভারতের আনন্দবাজার টাইপের পত্রিকাগুলো বরাবরই যা করে থাকে এবং ২. এ জাতীয় অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করে বাংলাদেশের ভেতরে ভারত বিদ্বেষকে উসকে দেয়া। সুতরাং, আনন্দবাজার বা জি-নিউজের কী উদ্দেশ্য, সেটি জানা খুব জরুরি। এটি জানতে চাইতে পারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

প্রসঙ্গত, ঢাকায় আনন্দবাজারের দু’জন রিপোর্টার কাজ করেন। একজন প্রিন্ট ভার্সনে, অন্যজন ডিজিটালে। বহু বছর ধরেই প্রিন্ট ভার্সনে কাজ করেন কুদ্দুস আফ্রাদ, তিনি সাংবাদিক নেতাও। আর ডিজিটাল ভার্সনে কাজ করেন অঞ্জন রায়, যিনি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল জিটিভিরও বড় পদে আছেন। সংবাদটি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে তারা দু’জনই আলাদাভাবে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে দাবি করেছেন যে, তারা এই রিপোর্টটি লেখেননি। কুদ্দুস আফ্রাদ লিখেছেন, ‘ঢাকা সংবাদদাতার বরাতে সংবাদটি ছাপা হলেও এই রিপোর্টটি আমার লেখা নয় এবং আমি এই রিপোর্টের প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’ রিপোর্টটি নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের প্রতিক্রিয়ার কথা কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। অন্যদিকে, অঞ্জন রায়ও ফেসবুকে দাবি করেছেন, এই রিপোর্টটি তার লেখা নয় বা তিনি পাঠাননি। 

এই দু’জনের দাবি সঠিক হলে প্রমাণিত হয় যে, আনন্দবাজারের অন্য কোনো রিপোর্টার এটি তৈরি করেছেন অথবা এটি ডেস্ক রিপোর্ট, যা ঢাকা সংবাদদাতার নামে চালানো হয়েছে; কিন্তু নিজস্ব অথবা ডেস্ক রিপোর্টকে আনন্দবাজারের মতো একটি বহুল প্রচারিত পত্রিকা কেন ঢাকা সংবাদদাতার নামে চালাবে? তারা কি সচেতনভাবেই চেয়েছিল যে এটা নিয়ে বাংলাদেশে উত্তেজনা তৈরি হোক?

সিনিয়র সাংবাদিক মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকের সঙ্গে সরাসরি কথা হলো। তিনি বললেন, এটা একেবারেই অনিচ্ছাকৃত ভুল। তিনি দুঃখিত। যার জন্য ভুলটি হয়েছে তাকে সতর্ক করা হয়েছে।’

এদিকে, বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনার মুখে আনন্দবাজার পত্রিকা নিজেদের ভুল স্বীকার করে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছে। গত ২৩ জুন পত্রিকাটির প্রিন্ট ভার্সনের চতুর্থ পৃষ্ঠায় ‘ভ্রম সংশোধন’ শিরোনামে এ ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়। সেখানে তারা লিখেছে ‘লাদাখের পরে ঢাকাকে পাশে টানছে বেজিং’ শীর্ষক খবরে (২০-৬, পৃ ৮) খয়রাতি শব্দের ব্যবহারে অনেক পাঠক আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। অনিচ্ছাকৃত এই ভুলের জন্য আমরা দুঃখিত ও নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থী।’

চীন-বাংলাদেশ বাণিজ্য প্রসঙ্গে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের বক্তব্যকে অনভিপ্রেত আখ্যা দিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, ‘এটা নট ওয়েলকাম।’

তবে ভারতের দুটি সংবাদমাধ্যমে এই অভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশের পেছনে দেশটির প্রভাবশালী কোনো মহলের ইশারা যে থাকতে পারে, সেই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না! যারা এই ধারণা দেয়ার চেষ্টা করছে যে, ভারতকে না জানিয়ে বা তাকে পাশ কাটিয়ে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক তৈরি করা যাবে না। সুতরাং ভারতের সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি সে দেশের রাজনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক, থিংক-ট্যাংক ও গবেষকরা বাংলাদেশ-ভারত এবং বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নিয়ে কী ভাবেন, তাও বিবেচনায় রাখা দরকার।


আমীন আল রশীদ, সাংবাদিক

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh