রেসিপ্রোসিটি

করোনাকালের ভঙ্গুর সমাজ-সম্পর্ক প্রসঙ্গে

এক.
অতীতের প্রতিটি মহামারিই কোনো না কোনোভাবে সমাজ-সম্পর্কে নানারকম আঘাত-অপঘাতের সৃষ্টি করেছিল। হালের করোনাকালও সে রকমই একটি বিপজ্জনক সময়। খ্রিস্টপূর্ব ৪৩০ অব্দে পেলোপনেসিয়ান যুদ্ধের অব্যবহিত পরপরই টাইফয়েড মহামারি এথেন্স ছাড়িয়ে লিবিয়া, ইথিওপিয়া ও মিসরে ওই ভূভাগের এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠীর উজাড়ীকরণের কারণ হয়েছিল। ১৬৫ খ্রিস্টাব্দে অ্যান্টোনিন প্লেগ গুটিবসন্ত আকারে হুনদের দ্বারা জার্মানদের মধ্যে সংক্রমিত হয়। লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। তারপর ২৫৪ খ্রিস্টাব্দে সাইপ্রিয়ান প্লেগ, ৫৪১ খ্রিস্টাব্দে জাস্টিনিয়ান প্লেগ, একাদশ শতকের কুষ্ঠ, এবং চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি ছড়িয়ে পড়া ব্ল্যাক ডেথ পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু ঘটায়। পঞ্চদশ শতকের শেষ থেকে ষষ্ঠদশ শতকের শুরুতে স্পেনীয় উপনিবেশকারী ও ভূমিদখলকারীদের মাধ্যমে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে গুটিবসন্ত মহামারি ছড়িয়ে পড়ে। ফলাফল আজটেক সভ্যতার বিলুপ্তি। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে বহিরাগতদের মাধ্যমে পরিবাহিত গুটিবসন্ত ও অন্যান্য রোগে আমেরিকায় পাঁচ কোটি ষাট লাখ আদিবাসী নিশ্চিহ্ন হয়।

১৮৫৫ সালে ইউনান থেকে সমগ্র চীন এবং ভারতে ব্যাপক মাত্রায় যে বিউবনিক অতিমারি ছড়িয়ে পড়ে, তার বিস্তার ১৯৬০ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ একশ’ বছরেরও বেশি সময় পর্যন্ত টিকে ছিলো। ১৮৭৫ সালে ফিজিতে অতিমারি ছড়িয়েছিল ব্রিটেনের রাণীর একটি প্রতিনিধি দলের অস্ট্রেলিয়া সফরের মাধ্যমে। ১৮৯৯ সালের রাশিয়ান ফ্লু, ১৯১৮ সালের বিখ্যাত স্প্যানিশ ফ্লু, ১৯৫৭ সালের এশিয়ান ফ্লু, ১৯৮১ সাল হতে এইডস, ২০০৩ সালের সার্স ইত্যাদি রোগবিস্তারের পর বিশ্বময় রোগ-ব্যবস্থাপনা বিশেষ শক্তি অর্জন করেছে; (Aberth 2005, Barry 2004, Bray, R. S. 2004) কিন্তু ২০১৯-২০২০ সালের কভিড-১৯ বা করোনাভাইরাসের দোর্দণ্ড প্রতাপের কাছে আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার শক্তিমত্তাও অপ্রতুল প্রমাণিত হয়েছে।

দুই.
আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যায় মারি মোকাবেলার মূল লক্ষ্য দুইটি। এক. সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ। দুই. প্রাণের সুরক্ষা (Hayes 2005) আপাত সত্য এই যে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ হলেই প্রাণের সুরক্ষা হয়। সে জন্য চিকিৎসাবিদ্যা, রোগতত্ত্ব বিজ্ঞান এবং ওষুধ শিল্প এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে; কিন্তু ওষুধ-পথ্য, উন্নত চিকিৎসা সেবা ও রোগতত্ত্ববিদ্যায় উৎকর্ষতাই প্রাণের সুরক্ষা কবচ হতে পারে না। তার প্রমাণ করোনাকালে সমাজ-সম্পর্কের ভঙ্গুরতা। প্রাত্যহিক খবর- সন্তান কভিড-১৯ আক্রান্ত মাকে বনে ফেলে এসেছে। লাশ সিঁড়িতে পড়ে থাকলেও স্ত্রী-সন্তান কছে যায়নি। স্বামীকে একা দাহ করেছেন স্ত্রী। কেউ শেষকৃত্যে যোগ দেননি। করোনাভাইরাস আক্রান্তকে একঘরে করা হয়েছে। তাদের বাড়িতে বাইরে হতে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এলাকাবাসীর বিরোধের মুখে এলাকায় কবর হয়নি সম্মানিতজনের। বাইরে থেকে ছিটিকিনি আটকানো কক্ষে বন্দি পরিবারপ্রধান পানি পানি আহাজারিতে প্রাণপাত করেছেন, পরিবারের কেউ এক গ্লাস পানিও এগিয়ে দেননি।

বাংলাদেশেই শুধু নয়, সারাবিশ্বেই সমাজ-সম্পর্ক ঠুনকো হয়ে পড়ছে। উন্নত দেশগুলো থেকে প্রতিদিনই নানা মাত্রায় ও ধরনে সেসব তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে। করোনাকাল একটি সত্যকেই প্রতিষ্ঠিত করে চলেছে- রোগনিয়ন্ত্রণ নীতিনির্ধারকরা চিকিৎসাবিদ্যা এবং মানববিদ্যার চর্চা ও গবেষণায় সমানভাবে গুরুত্ব দেননি। উভয়টির প্রয়োগও এখনো পারম্পর্যহীন। তার একটি প্রমাণ হলো- যুগের পর যুগ জনস্বাস্থ্যবিদ্যা এবং সামাজিক রোগতত্ত্ববিদ্যা ‘প্যানিক’ বা মাত্রাছাড়া ভীতি-আতঙ্ক এবং ‘স্টিগমা’ বা ‘কলঙ্ক-ঘৃণা’কে মারি বিস্তারের দুটি প্রধান কারণ নির্দেশ করে এলেও আধুনিক রোগনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এই অভিজ্ঞানটিকে তেমন আমলে নেয়নি। এইডস রোগ একটি সময় মানুষের মাঝে এতটাই স্টিগমা ছড়িয়েছিল যে ‘কফ-থুতু থেকে এইডস ছড়ায় না’ তথ্যটি প্রতিষ্ঠা করতেও কয়েক যুগ সময় লেগে গেছে। হালের রোগ নিরাময় ব্যবস্থায় ‘রেসিপ্রোসিটি’র নৃবৈজ্ঞানিক অনুধ্যানও অনুপস্থিত (Mason 2001, Orr 2006)।

‘স্টিগমা’ এবং ‘প্যানিক’ নিয়ন্ত্রণের একটি বড় উপায় সমাজ-সম্পর্কে ‘রেসিপ্রোসিটি’ টিকিয়ে রাখা (Sahlins 2006, Schneider 1995, Taussig 1989)|। অথচ ‘রেসিপ্রোসিটি’ বিষয়টি প্রায় কখনোই রোগনিরাময় কর্মপদ্ধতির আলোচনায় আনা হয় না। মার্শাল সাহলিন্স, এরিক উলফ, রেডফোর্ড, র‌্যপ্যাপোর্ট এবং ইম্যানুয়েলসহ প্রায় সব নৃবিজ্ঞানীই একমত যে, অতিমারি-মহামারিসহ সব দুর্যোগের কালেই পারস্পরিক দান-প্রতিদানের প্রয়োজন বাড়ে (Kolm 2008)। গ্রামীণ সমাজ ও আদি সমাজগুলো একজন আরেকজনের পরস্পরের বিপদে-আপদে সম্বল হয়ে ওঠে বলেই তারা নিঃশেষ হতে হতেও নিঃশেষ হয় না। গা-ঝাড়া দিয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। আবারও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফেরে।

‘রেসিপ্রোসিটি’ বা ‘পরস্পর নির্ভরশীলতা’ সেটিই, যাকে কবিতার ভাষায় বলি- ‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’, অথবা ‘দেবে আর নেবে মিলাবে মিলিবে’। ‘রেসিপ্রোসিটি’ ‘সামাজিক যোগাযোগ’এর সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া রোধ করে। রোগ-নিরাময়ে হালে আমরা ‘বিহ্যাভিয়র চেঞ্জ কমিউনিকেশন’ বা ‘অভ্যাস-পরিবর্তন যোগাযোগ’ নামীয় যে প্রত্যয় ব্যবহার করি, সেটি আসলে ‘রেসিপ্রোসিটি’ এবং ‘সামাজিক যোগাযোগ’ (Hornik 2002)। উদাহরণ- বাংলাদেশে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা বিষয়ে জনসচেতনতা। উন্মুক্ত স্থানে পয়ঃনিষ্কাশনের বিপদগুলো বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের কাছে পৌঁছানো গেছে। এই ‘অভ্যাস-পরিবর্তন যোগাযোগ’টি কার্যকর হওয়ায় বাংলাদেশে কলেরা, ডায়রিয়া ও অন্যান্য অনেক পানিবাহিত রোগের প্রকোপ একেবারেই কমে গেছে। এসব রোগ নিয়ন্ত্রণে থাকায় শিশুস্বাস্থ্য ও মাতৃস্বাস্থ্যের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেছে। জন্মকালীন শিশুমৃত্যু, গর্ভস্থ শিশুমৃত্যু, অকাল গর্ভপাত ইত্যাদি সমস্যারও সমাধান মিলেছে।

তিন.
প্রথাগত চিকিৎসাবিদ্যায় মহামারি নিরাময় এখনো প্রতিষেধক ও ওষুধ আবিষ্কারনির্ভর। প্যানিক এবং স্টিগমা সমস্যা সমাধানের কার্যকর যোগাযোগ ও চর্চা চিকিৎসাবিদ্যায় এখনো উপেক্ষিত। অথচ মহামারিকালীন প্যানিক এবং স্টিগমা মহামারিকে অনিয়ন্ত্রণযোগ্য করে তোলে। ২০১৬ সালে রোগতত্ত্ববিদ সান্ড্রা মেয়্যার জানান, মহামারিতে মৃত্যুর এবং দ্রুত মৃত্যুর অন্তত ৫০ শতাংশই ঘটে ‘প্যানিক অ্যাটাক’-এর কারণে (Koch A 2019)। অথচ এটি একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, ‘রেসিপ্রোসিটি’ এবং যথার্থ রোগ-নিরাময় যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুপস্থিত থাকলে গুজব, কুসংস্কার, প্যানিক অথবা স্টিগমা কোনো কিছুই নিয়ন্ত্রণে থাকে না। ফলে মহামারির উল্লম্ফন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।


১২৪০ দশকের শুরুতে পোপ নবম গ্রেগরি একটি ফতোয়া দেন- শয়তান লুসিফার বিড়ালের রূপ ধরে লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। বিড়াল ডাইনি, প্রেতিনী ও কুহকিনীদের বাহন। বিড়াল মানেই অমঙ্গল। ‘প্যানিক’ এর ফলে নির্বিচার বিড়াল নিধনের ঘটনা ঘটতে লাগল। বিড়াল মেরে ফেলায় ইউরোপে অস্বাভাবিক হারে ইঁদুর বেড়ে যায়। কালো বিড়ালকে দায়ী করা হলেও হুঁশ-বুদ্ধিহীন ও ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ অতশত কালো-সাদা মনে রাখেনি। নির্বিচারে সব রকম বিড়াল মেরে সাফ করে ফেলে। বিড়াল নেই, তাই ইঁদুর বাড়ল। ময়লা স্যাঁতসেঁতে প্রতিবেশ ইঁদুরের প্রিয়। এই পরিবেশে ইঁদুরের গায়ে উকুনের মতো এক ধরনের অণুজীবের জন্ম ও বিস্তার ঘটল। একেকটি ইঁদুরের গায়ে লাখো কোটি জীবাণু। তারা দৌড়ায় দ্রুতগতিতে। মুখ দেয় সবকিছুতে। ইঁদুরের উপদ্রবে শুরু হলো এক ধরনের প্লেগ মহামারি। তাতে বিলীন হলো অন্তত ২০০ কোটি মানুষ। ইতিহাসে ‘ব্ল্যাক ডেথ’ নাম পাওয়া এই মহামারি গ্রামের পর গ্রাম উজাড় করেছিল। এই বিশাল মৃত্যুর বহরের পেছনে ‘ভীতিকর আতঙ্ক’ বা ‘প্যানিক’ ছিলো বড় ক্রীড়নক (Darnton 1984)।

প্যানিক সমাজময় অহেতুক ভীতিই তৈরি করে না, অন্যান্য নতুন রোগেরও সূত্রপাতও ঘটায় (Orr 2006)। বাংলাদেশেও চল্লিশ হতে ষাটের দশকে একটি গুজব রটে। ওলাওঠা মহামারি সেই সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। কীভাবে যেন প্যানিক ছড়াল- ওলাবিবি নামক এক অভিশপ্ত ডাইনির কারণে রোগটি হচ্ছে। ওলাবিবির বাহন খোঁড়া কুকুর। সাধারণ মানুষ নির্বিচারে যে কোনো কুকুরই নিধন করতে শুরু করল। এক সময় গ্রামের পর গ্রাম কুকুরশূন্য হয়ে পড়ল। সে সময় মানুষ রাস্তাঘাটে যত্রতত্র পয়ঃনিষ্কাশন করত। কুকুর বিষ্ঠাভোজি হওয়ায় রাস্তাঘাট দ্রুতই বিষ্ঠামুক্ত হতো। কুকুরনিধনের পর যত্রতত্র পড়ে থাকা মলমূত্র হতে রোগজীবাণু অল্পেই পানিতে এবং বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। মাছিবাহিত এবং পানিবাহিত হয়ে সেগুলো গেল মানুষের উদরে। কলেরা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় করে দিয়েছিল একসময় (Nair & Takeda 1984)।

অন্যদিকে, ‘রেসিপ্রোসিটি’ চালু থাকলে মহামারিকালেও সমাজ-সম্পর্ক মানবিক ও কাম্য মিথষ্ক্রিয়ামুখী হয়ে ওঠে। সমাজ সংহতি বাড়ে। স্টিগমা ও প্যানিক দূর হয়। একটি উদারণ আলোচ্য- চতুর্দশ শতকে ইউরোপের অভিজাতদের সঙ্গে সিল্করুটে প্রাচ্যের বণিকদের বাণিজ্য সম্পর্ক ছিলো। একবার এক চীনা বণিকের মাধ্যমে অভিজাতদের মধ্যে বিউবনিক প্লেগ সংক্রমিত হলো। তাদের সঙ্গে চার্চের গভীর প্রাত্যহিক সম্পর্ক। বিভিন্ন চার্চের পাদ্রীগণ আবার প্রাত্যহিক সভায় সমবেত হতেন। ফলে পাদ্রীদের মধ্যে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ল। প্লেগে আক্রান্ত অভিজাতগণ রোগমুক্তির প্রার্থনায় সপরিবারে চার্চের পাদ্রীদের অধীনে প্রার্থনাসভায় আসতে শুরু করলেন। ফলে হালের করোনাভাইরাসের বিস্তৃতির মতোই সে সময়ে বিস্তাররত বিউবনিক প্লেগে অভিজাত এবং পাদ্রীরা মরতে থাকলেন। এভাবে অধিকাংশ চার্চ পাদ্রীশূন্য হয়ে পড়ল। অবস্থা অভিজাততন্ত্রের নিয়ন্ত্রণের এতটাই বাইরে চলে গেল যে, বাধ্য হয়ে ইংরেজিভাষী দরিদ্র অ্যাংলো-স্যাক্সন ও কেল্ট কৃষকদের পৌরোহিত্য করার জন্য চার্চে নিয়োগ দেওয়া শুরু হলো। সে সময় ব্রিটেনে ইংরেজি (ওল্ড ইংলিশ, বর্তমান সময়ের দোআঁশলা ইংরেজি নয়) ছিল দরিদ্র কৃষক-প্রজাদের গ্রামীণ ভাষা। অভিজাতজন এবং চার্চের পুরোহিতগণ লাতিন এবং নর্মান ফ্রেঞ্চ ভাষাভাষী ছিলেন। নতুন নিয়োগপ্রাপ্তরাই ইংরেজিকে জনপ্রিয় করে তোলেন। সেই ইংরেজি ভাষা এখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিমান ভাষা। সে সময় হতেই সমাজের নিম্নবর্গ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে শুরু করেন। তারা শিক্ষা-দীক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে অভিজাতদের মতোই এগিয়ে যেতে থাকেন। ফলে সামন্ত সমাজের সনাতন শ্রেণিবিন্যাসের অনড় ধারাটিও শক্তি হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। মানুষে-মানুষে ব্যবধান অনেক কমে আসে (Millward & Hayes 2012)।



চার.
রোগ নিরাময়ে ‘রেসিপ্রোসিটি’র ধারণাটি সুপ্রাচীন। নৃবিজ্ঞানীদেরও আগে ধর্মপ্রচারক, অভিযাত্রী, নতুন ভূমি আবিষ্কারক এবং উপনিবেশকারীদের রোজনামচা হতেও এই সত্যটি স্পষ্ট যে, আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোতেও রোগ নিরাময়ে ‘রেসিপ্রোসিটি’ এবং কার্যকর যোগাযোগই প্যানিক এবং স্টিগমা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতো। উপনিবেশকালে উপনিবেশকারীদের নৃশংস অবদমন ও নিধনযজ্ঞের কারণে ‘রেসিপ্রোক্যাল সোস্যাল কমিউনিকেশন’ (Bel, et. al ed. 2010) বা ‘পারস্পরিক সামাজিক যোগাযোগ’ দারুণভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে আদিবাসী সমাজগুলো বিলুপ্ত হয়ে পড়েছিল।

প্রায় ছয়শ’ বছর আগে যখন ইউরোপীয় ধর্মপ্রচারকরা পৃথিবীর অজানা-অচেনা নতুন নতুন ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিলেন, তারা আদিবাসীদের রোগ নিরাময় চর্চার কয়েকটি বিষয়ে ধারণা পেয়েছিলেন, যেমন- ক. সামাজিক রোগতত্ত্ববিদ্যা। আদিবাসীগণ ঝড়-ঝঞ্ঝাট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মারি ও মড়কের সঙ্গে যুদ্ধ করার নতুন নতুন বুদ্ধি আবিষ্কার করেন। খ. লোকজ-জ্ঞান বা ইন্ডিজেনাস নলেজ। লোকজ-জ্ঞান ধর্মপ্রচারকদের অভিভূত করে। কারণ তারা দেখতে পেলেন- লতা-পাতা, শিকড়-বাকড় ব্যবহারের মাধ্যমেও দুর্গম লোকালয়ের আদিবাসী জনগোষ্ঠী বেশ ভালোভাবেই শক্ত-সুঠামদেহে টিকে আছেন। তাদের আবাসে রোগ-শোক, মহামারি-অতিমারির আঘাত বরং ইউরোপীয় সমাজের চেয়েও কম। গ. আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাবনা। আদিবাসী সমাজসমূহে ইন্ডিজেনাস নলেজ প্রয়োগের অভিজ্ঞতা আধুনিক ওষুধ শিল্পের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিল। ইন্ডিজেনাস নলেজের সূত্র ধরে ইউরোপীয়রা বুঝে গিয়েছিল- প্রাকৃতিক নির্যাস, গাছগাছালি হতেই ওষুধ-পথ্যের আসল রসদ মিলবে। ঘ. সোস্যাল ম্যাপিং বা সামাজিক মানচিত্র অংকন এবং রিসোর্চ ম্যাপিং বা সম্পদ মানচিত্র অংকন। এই দুইটি কৌশল দ্বারা আদিবাসীরা পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষা করতেন, এবং আপদকালীন সময়ে ব্যবহারযোগ্য ও বিনিময়যোগ্য সম্পদের খতিয়ান রাখতেন (Zehner 2018) (বিস্তারিত টীকায় দ্রষ্টব্য)

‘রেসিপ্রোক্যাল কমিউনিকেশন’ বা পারস্পরিক যোগাযোগ আদিবাসী সমাজগুলোতেও বিদ্যমান ছিল। অথচ বিশ্বজুড়ে করোনাকালে ‘যোগাযোগের সমস্যা’ই মহামারি নিরাময়ের একটি বড় বাধা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কোনোরকম পূর্বপ্রস্তুতি এবং তথ্যের আদান-প্রদান না থাকায় কোয়ারেন্টিন বা গৃহান্তরীণ ব্যবস্থা জনসমাজে একটি অপরিচিত ও আকস্মিক অপঘাতের রূপ পরিগ্রহ করেছে। এই ব্যবস্থা আন্তর্ব্যক্তিক সম্পর্কে আকস্মিক ছেদ টানার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ব্যক্তির যোগাযোগহীনতাকেও উৎকটভাবে দৃশ্যমান করে দিয়েছে। ‘যোগাযোগের সমস্যা’র মূলে থাকে ‘আস্থাহীনতার সংকট’ (Bray 2004, Hayes 2005)। ‘আস্থাহীনতার সংকট’ মহামারি নিরাময়ের দুরুহতাকে আরও প্রকট করে তোলে। কোনোভাবেই কোনো মাধ্যমে কোনোরকম সহায়তা ও সহযোগিতা মিলবে না- শুধু এমন বিশ্বাস দৃঢ় হলেই সমাজ-সম্পর্ক এতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। সন্তানের করোনাগ্রস্ত মাকে বনে ফেলে আসা, অথবা স্ত্রী-সন্তানের মৃত ব্যক্তিকে সিঁড়ির গোড়ায় ফেলে রাখা- এমন আচরণ তীব্র ‘যোগাযোগের সমস্যা’র উপস্থিতিই জানান দেয়।

শেষ কথা
‘রেসিপ্রোসিটি’র প্রয়োজনীয়তার পক্ষে সমাজবিজ্ঞান-সমর্থিত তথ্য থাকার পরেও আমাদের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনা এখনো ‘রেসিপ্রোসিটি’কে মহামারি প্রতিরোধের একটি সহযোগী উপায় গণ্য করতে পারেনি। অথচ ‘রেসিপ্রোসিটি’ মহামারি নিয়ন্ত্রণ চিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার দাবিদার। কারণ, পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বা ‘রেসিপ্রোসিটি’ সমাজ-সম্পর্ককে একটি ছাতার মতো সুরক্ষা দেবে, সামাজিক ইতিহাস হতে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ তৈরি করবে, ‘র‌্যাপোর্ট তৈরি’র মাধ্যম হয়ে উঠবে, অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে, প্যানিক এবং স্টিগমা নিয়ন্ত্রণের উপায় খুঁজে পেতে সহায়তা করবে এবং অর্থপূর্ণ সমাজ-সম্পর্ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় উত্তরণ ঘটিয়ে মহামারি নিরাময়ে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। (Hornik 2002, Bel 2010)

সহায়ক পাঠসূত্র
Aberth. John. 2005. The Black Death : The Great Mortality of 1348–1350 : A Brief History with Documents. New York: Palgrave Macmillan.
Barry, John M. 2004. The Great Influenza: The Epic Story of the Deadliest Plague in History. New York: Viking.
Bray, R. S. 2004. Armies of Pestilence: The Impacts of Disease on History. New York: James Clarke and Co.
Bel, B. et. al ed. 2010. Communication, Culture and Confrontation. Los Angeles : Sage
Darnton, R. 1984. The Great Cat Massacre and Other Episodes in French Cultural History. USA: Basic Books.
Goffman, E. 1963. Stigma : Notes on the Management of Spoiled Identity. Middelsex, England : Pelican Books.
Hayes, J. N. 2005. Epidemics and Pandemics : Their Impact on Human History. Santa Barbara, California: ABCCLIO.
Hornik, R. C. ed. 2002. Public Health Communication : Evidence for Behaviour Change. Mahwah, New Jersey London : Lawrence Erlbaum Associates, Publishers.
Kocha, A. 2019. https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S0277379118307261 Pages 13-36. USA : Elsevier.
Kolm, Serge-Christophe. 2008. Reciprocity : An economics of social relations. UK : Cambridge University Press.
Mason, T. et al (eds) 2001. Stigma and Social Exclusions in Healthcare. London and New York : Routledge.
Millward, C. M. & Mary Hayes 2012. A Biography of the English Language. Boston : Wadsworth.
Nair, G. B. & Y. Takeda ed. 1984. Cholera Outbreaks. Berlin : Springer.
Orr, J. 2006. Panic Diaries: A Genealogy of Panic Disorder. Durham। North Carolina. Duke University Press.
Rosenstiel, A. 1959. “Anthropology and the Missionary”. The Journal of the Royal Anthropological Institute of Great Britain and Ireland 89 : 1. Ireland : RAIGBI. pp. 107-115.
Sahlins, M. 2006. “The Original Affluent Society”. Republished in Jacquline Solway eds. The Politics of Egalitarianism : Theory and Practice. New York: Beghahn Books.
Schneider, J. 1995. “Introduction : The analytic strategies of Eric R. Wolf”. In Jane Schneider and Rayna ed. Articulating hidden histories. Berkeley, California : University of California Press.
Taussig, M. 1989. “History as commodity: In some recent American (anthropological) literature”. Critique of Anthropology 9.1 : 7–23.
Zehner, E. 2018. “Missionaries and Anthropology”. In Hilary Callan eds The International Encyclopedia of Anthropology : USA : John Wiley & Sons.


টীকা

ক. পঞ্চদশ শতকের শুরু হতে নতুন নতুন ভূখণ্ড আবিষ্কার, উপনিবেশ নির্মাণ, ব্ল্যাক ডেথ, প্লেগ, দুর্ভিক্ষ, মড়ক, মহামারি-অতিমারি ইত্যাদির আঘাতে সমাজ-সম্পর্কে নানারকম বাঁকবদল ঘটেছে। এইসব বাঁকবদলের ইতিহাস আলোচনা করতে গিয়ে নৃবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানকে ব্যাপক অপবাদ ও ভুল ব্যাখ্যার শিকার হতে হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর জ্ঞানচর্চায় নৃবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে- এসব বিদ্যা আসলে ‘উপনিবেশবাদের মানসপুত্র’ বা ‘ব্রেইনচাইল্ড অব কলোনিয়ালিজম’। অভিযোগের কারণ, সামাজিক বিজ্ঞান উপনিবেশিকদের লেখালেখি ও নথিপত্রকে ব্যবহার করে সমাজ-সম্পর্ক আলোচনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে নিজেরা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অথচ সমাজ-সম্পর্কের মনস্তত্ত্ব পাঠ করার সহজ ঐতিহাসিক পদ্ধতি আবিষ্কারের কারণে সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের প্রশংসিত হওয়াই বাঞ্ছনীয় ছিলো। করোনাকালেও সমাজ-সম্পর্কের ভঙ্গুরতা হতে নিস্তার পাওয়ার জন্য সামাজিক বিজ্ঞানের দ্বারস্থ হওয়া প্রয়োজন।

খ. মিশনারিগণ শিখলেন যে ঝড়-ঝঞ্ঝাট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মারি ও মড়কের সঙ্গে যুদ্ধ করার নতুন নতুন বুদ্ধি বের করা না গেলে মানুষ বাঁচবে না। মানুষ না বাঁচলে পরমপ্রভুর ঐশিবাণী এবং বাইবেলীয় শিক্ষা কার কাছে পৌঁছাবেন? নিজেদেরও বাঁচতে হবে। নইলে কারা দিগ্বিদিক ছড়িয়ে দেবেন ঐশিবাণী? সংগ্রামী মনোবল তাদের জন্য বাধ্যতামূলকই ছিল বলা চলে। তবু তাদের অনেকেই প্রাণ হারাতেন। ডারউইনীয় ‘সার্ভাইভ্যাল অব দ্য ফিটেস্ট’ সূত্র ধরে সংগ্রামী যারা টিকে থাকতেন, তারা তাদের সংগ্রামের ইতিবৃত্ত বিস্তৃতভাবে লিখে যেতেন। উদ্দেশ্য- পরের প্রজন্মের ধর্ম প্রচারকগণের যেন কাজটি সহজ হয় এবং শিক্ষানবীশদের জন্য শেখার উপকরণ হিসেবে কাজ করে। এভাবে তাদের লেখা ডায়েরিগুলো হতে অভিজ্ঞতা নিংড়ে দুইটি ছদ্মবিজ্ঞান বা স্যুডোসায়েন্সের জন্ম হলো। একটি আদি সামাজিক রোগতত্ত্ববিদ্যা বা প্রাইমারি সোশ্যাল এপিডেমিওলজি। অন্যটি আদি লোকজ-জ্ঞান বা অ্যান্সিয়েন্ট ইন্ডিজেনাস নলেজ। দ্বিতিয়টি অর্থাৎ আদি লোকজ-জ্ঞান ধর্মপ্রচারকদের অভিভূত করে। কারণ তারা দেখতে পেলেন লতা-পাতা, শিকড়-বাকড় ব্যবহারের মাধ্যমেও দুর্গম লোকালয়ের আদিবাসী জনগোষ্ঠী বেশ ভালোভাবেই শক্ত-সুঠাম দেহে টিকে আছেন। তাদের আবাসে রোগ-শোক, মহামারি-অতিমারির আঘাত বরং ইউরোপীয় সমাজের চেয়েও কম।
গ. মিশনারিরা বুঝলেন- সম্পূর্ণ ভিন্ন ও ‘অন্য’ অদেখা মানুষদের সঙ্গে মিশে যাওয়ার নতুন নতুন সহজসাধ্য কলাকৌশল ও বুদ্ধি আবিষ্কার না করলে ধর্মপ্রচার মোটেই সহজসাধ্য কাজ হবে না। তাই তারা নতুন লোকালয়ে বিয়ে-শাদি, কৃষিকাজ, ভাষা শেখা ইত্যাদিতে দারুণ মনোযোগ দিলেন। এই উপমহাদেশে যেমন ব্রাসি হ্যালহেড ও উইলিয়ম কেরিরা ভাষা শিক্ষা, ভাষার ব্যাকরণ নির্মাণ, ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি অনেক কিছুই করেছেন। সংক্ষেপে তাদের উদ্দেশ্য ছিলো স্থানীয়দের মন জয় করা এবং তাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া। এই কৌশলের নাম ‘র‌্যাপোর্ট বিল্ডিং’ বা খাতির জমানো এবং অন্যের মন জয় করে আস্থায় ঢুকে যাওয়া। তারা কীভাবে নতুন জনগোষ্ঠীর মাঝে মিশে গিয়েছিলেন, সেসব ‘অংশগ্রহণ-রোজনামচা লিখতেন। ‘পার্টিসিপেশন টেকনিক’ খাতায় তুলে রাখতেন। সেগুলো হতে জানা যায়, আদি সমাজের সামাজিক রোগ-ব্যবস্থাপনার একটি যাদুর কাঠি ছিল। কাঠিটির নাম ‘রেসিপ্রোসিটি’। বাংলায় ‘পারস্পর্য’ বলা চলে।

ঘ. আদিসমাজে মিশে যেতে পারার সুফল আত্মসাৎও করেছিল ইউরোপ। ইউরোপীয়রা বুঝে গিয়েছিল যে, প্রাকৃতিক নির্যাস, গাছাগাছালি হতেই ওষুধ-পথ্যের আসল রসদ মিলবে। যেসব ভূখণ্ডে এসব প্রাকৃতিক সম্পদের অবাধ জোগান আছে, সেগুলোতে উপনিবেশ স্থাপন অপরিহার্য হয়ে পড়ল। স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্য হতে এগিয়ে আসা বাধাদানকারীদের দমন করার জন্য নিষ্ঠুর এবং নৃশংসও হতে হয়েছিল ইউরোপীয়দের। মোদ্দাকথা, আধুনিক ওষুধ শিল্প গড়ার পেছনে আদি সমাজগুলোর ইন্ডিজেনাস নলেজ ব্যবহার দেখে শেখা বড়সড় অনুঘটক হয়ে উঠেছিল।


ঙ. পাদ্রীরা যখন ধর্মপ্রচারের কাজ শেষে ইউরোপে ফিরতেন, পোপের দপ্তরে তাদের প্রতিবেদন দাখিল করতে হতো। কী করেছেন, কীভাবে করেছেন- সেসব বিস্তৃত বর্ণনাগুলোর নাম ছিল ‘ইন্টার‌্যাকশন রিপোর্টিং’ বা ‘পারস্পরিকতা প্রতিবেদন’। বাংলাদেশে ‘ইটার‌্যাকশন’কে বাংলায় ‘মিথষ্ক্রিয়া’ লেখা হয়। অবশ্য সামাজিক বিজ্ঞানের বড়সড় অংশই ‘ইন্টার‌্যাকশন’ আলোচনার দখলে থাকে। পাদ্রীদের ‘ইটার‌্যাকশন রিপোর্ট’গুলো দ্বারা কর্টেস, কলম্বাস, ভেসপুচি প্রমুখ দিগি¦জয়ীরা ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছিলেন। এইসব জ্ঞান ব্যবহার করেই তারা নতুন নতুন ভূমিতে উপনিবেশ গড়েন, আদিবাসীদের মাঝে গণহত্যা চালান, দাস ব্যবসা শুরু করেন।

চ. পাদ্রীরা হয়তো কখনোই চাননি রাজ-রাজড়া এবং বণিকরা তাদের নির্মাণ করা জ্ঞানকে অপব্যবহারের মাধ্যমে মানুষকে উপনিবেশে পরিণত করবে। সমাজবিজ্ঞানী এবং নৃবিজ্ঞানীরাও উপনিবেশিক বা পাদ্রীদের পক্ষ নিচ্ছেন না; কিন্তু তাদের তৈরি করা জ্ঞান ব্যবহার করে সমাজ-সম্পর্ক পরিবর্তনের গতিপথ ও ধারাবাহিকতা ব্যাখ্যা করছেন মাত্র।

ছ. পাদ্রীরা ‘সোস্যাল ম্যাপিং’ বা সামাজিক মানচিত্র অংকন এবং ‘রিসোর্স ম্যাপিং’ বা সম্পদ-মানচিত্র অংকন- এই দুইটি কাজ দারুণ এগিয়ে নিয়েছিলেন। কাজ দুটি আলাদা নয়, বরং একই কাজের দুটি দিক। বোঝার সুবিধার্থে বলে নেওয়া ভালো- সাম্প্রতিককালে উন্নয়ন সমাজবিজ্ঞানে ‘পার্টিসিপেটরি র‌্যাপিড অ্যাপ্রাইজ্যাল’ বা পিআরএ বলে একটি দীক্ষা বেশ জনপ্রিয়। বাংলায় বলা যায় ‘অংশগ্রহণমূলক দ্রুত সমীক্ষা’। রবার্ট চেম্বার্স এবং তার অনুসারীরা পিআরএ দীক্ষাটিকে বিশ্বময় জনপ্রিয় করেছেন। কারণ, পিআরএ দ্বারা গ্রাম-সমাজের উন্নয়নকামীদের ব্যাপক জন-অংশগ্রহণ যেমন ঘটানো যায়, তেমনি তাদের মাধ্যমেই তাদের চাহিদা-প্রয়োজন, সক্ষমতা ইত্যাদিও খুব সহজেই নির্ভরযোগ্যভাবে মাপা যায়। এ জন্য এর আরেক নাম ‘পার্টিসিপেটরি রুর‌্যাল আপ্রাইজাল’, বা ‘অংশগ্রহণমূলক গ্রামীণ সমীক্ষা’। পিআরএর অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কয়েকটি কৌশলের মধ্যে ‘সোস্যাল ম্যাপিং’ অন্যতম।

ধরা যাক, একজন সমাজবিজ্ঞানী বা নৃবিজ্ঞানী একটি অজানা-অচেনা নতুন গ্রামে গেলেন। শুরুতেই তিনি যা করবেন তার নাম ‘র‌্যাপোর্ট বিল্ডিং’। সহজ কথা- মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়ে খাতিরের মাধ্যমে গ্রামবাসীদের আস্থা অর্জন করবেন। প্রিয়পাত্র হয়ে উঠবেন। যেহেতু গ্রামের পথ-ঘাট অলিগলি তার জানা নেই, সেই নতুন ভূখণ্ডের মানুষজন তার জন্য মাটিতে আঁকিবুকি করেই জানিয়ে দেবেন কোথায়, কী কী ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে (যেমন, খাল-বিল, চার্চ, স্কুল, বিনোদনকেন্দ্র)। সেই আঁকাগুলো তারা অনুলিখন বা অংকন করে কাগজে, চামড়ায় বা ভূর্জ্যপত্রে তুলে নিতেন। কোথায় কোথায় কী কী সম্পদ আছে সেসব তথ্যও এসব মানচিত্র হতে চিহ্নিত করা যেত। সমস্যা হয়েছে ধর্মপ্রচারকরা না চাইলেও এই সামাজিক-মানচিত্র এবং সম্পদ-মানচিত্রগুলো উপনিবেশকারীদের পরিশ্রম কমিয়ে দেয়। এগুলো ব্যবহার করে তাঁরা নির্বিঘ্নে নতুন ভূখণ্ডে নেমে উপনিবেশ স্থাপন করে, প্লেগ ছড়ায়, এবং বিশাল জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়।

জ. রেসিপ্রোসিটি : আমরা একজন অন্যজনকে কিছু দান করি। অথবা তার প্রয়োজন মেটাই। বিনিময়ে তিনিও আমাকে সমান বা বেশি ফেরত দেন। অথবা দান করি না, ধার দিই। বিনিময়ে তিনি ধার শোধ করেন। সমানে সমান। শোধবোধ; কিন্তু সমানের চেয়ে অনেক বেশি কিছু তিনি দেন। অতিরিক্ত কী কী দেন? দেন সম্মান, ভালবাসা, সমীহ, কৃতজ্ঞতা, বন্ধুত্ব, নির্ভরতা, আশ্বাস, বিশ্বাস, সাহচর্য, সামাজিকতা, আত্মীয়তা আরও বহু কিছু। ধরা যাক, ‘ক’ এর ঘরে আজ খাবার বাড়ন্ত। ‘খ’ এর আর্থিক অবস্থা ‘ক’ এর চেয়ে বিশেষ ভালো নয়। ‘খ’ এর ঘরে অবশ্য খাবার আছে। ‘খ’ ‘ক’কে আজকের দিনটি চলার জন্য খাবার দিয়ে এলো। সঙ্গে দশটি টাকা দিয়ে এলো। এই বিনিময়ে অবস্তুগত সম্পর্কের পুনরুৎপাদন হয়; কিন্তু সবই ঘটে নিঃস্বার্থভাবে। এজন্য ‘রেসিপ্রোসিটি’ দোকানের কেনাকাটা নয়। ‘বায়িং’ এবং ‘সেলিং’ নয়। ‘বায়িং’ এবং ‘সেলিং’ স্বয়ংসম্পূর্ণ দুটি বিপরীত বস্তুগত লাভালাভের সম্পর্ক নির্দেশমূলক শব্দ; সমাজ-সম্পর্ক নির্দেশমূলক শব্দ নয়।

ঝ. বিড়াল নিধনজনিত প্লেগ মহামারির ইতিহাসটিই প্রতিষ্ঠিত। তবে ডার্নটন খানিকটা সন্দেহ পোষণ করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কালো বিড়াল শয়তানের প্রতিভূ গুজবটি রটিয়েছিল দাসরা। এক অত্যাচারী মনিবনীর পোষা একদল কালো বিড়ালের সেবায় একজন দাস নিয়োজিত ছিলেন। বিড়াল-পরিচর্যায় সামান্য ভুল-ভ্রান্তি হলেই শাস্তিস্বরূপ তাকে বিড়ালের উচ্ছিষ্ট খাবার খেতে বাধ্য করা হতো। সেই দাস অন্যান্য দাসদের সহায়তায় কিছু নাটকীয় অভিনীত ঘটনার মাধ্যমে বিড়ালকে শয়তানের প্রতিভূ এবং বিড়ালমালিক নারীটিকে ডাইনি-ডাকিনী পরিচয়ে পরিচিত করে তুলতে সক্ষম হয়।


লেখক: হেলাল মহিউদ্দীন
অধ্যাপক, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh