ঈদ রোজাদারদের জন্য বড় নেয়ামত

আজ উনত্রিশে রমজান। মাগরিবের পর চাঁদ দেখা গেলে আগামীকাল খুশির ঈদ। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ঈদ উল ফিতর রোযাদার ব্যক্তির জন্য উপহার বা বড় নেয়ামত। যারা রোজা পালন করেছেন তাদের জন্য ইদুল ফিতর আনন্দ ও উৎসবের দিন। আর পাপি-তাপিদের জন্য এটা শাস্তি ও আজাবের দিন। সাহাবী হযরত ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ (রাঃ) ঈদের দিন কাঁদছিলেন।

কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি  বলে ছিলেন, আজ খুশির দিন ওই ব্যক্তির জন্য, যার রোজা কবুল হয়েছে। ঈদুর ফিতরের দিন হল পুরুস্কার লাভের দিন। এদিন একদল ফেরেশতা দাঁড়িয়ে যান এবং বলতে থাকেন, ‘হে মুসলিম সম্প্রদায়! তোমারা তোমরা দয়াময় প্রভুর দিকে ছুটে চলো। তিনি তোমাদের কল্যাণ দান করবেন। তিনি তোমাদের পুরস্কার দেবেন’।

রাসূল (সাঃ)বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের ঈদকে তাকবীর দ্বারা সৌন্দর্যমন্ডিত কর’।  রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, পাঁচটি রাত জেগে যে ব্যক্তি ইবাদত করবে, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হবে। রাতগুলো হলো জিল হজ্জের রাত ২. আরাফার রাত, ৩. ঈদুল আজহার রাত ৪. ঈদুল ফিতরের রাত ৫. মধ্য শাবানের রাত। সুতারাং ঈদুল ফিতরে ইবাদত করা পুণ্যময় কাজ।

ঈদের অনাবিল সুখ-আনন্দ শুধু রোজাদারদের জন্য। যারা ইচ্ছাকৃত রোজা ছেড়ে দিয়েছে তাদের জন্য এ আনন্দ নয়।  ঈদের পুর্ণাঙ্গ আনন্দ-খুশি ও কল্যাণ অর্জন করতে হলে আরো ঘনিষ্ঠ করতে হবে আত্মীয় স্বজনদের সাথে সুসর্ম্পক, ঘনিষ্ঠ ও অন্তরঙ্গ করতে হবে পরিবার-পরিজনের সাথে। আমাদের ভাষায় ঈদ মানে আনন্দ হলে ও শাব্দিক বা সার্বিক বিবেচনায় ঈদ অর্থ শুধু আনন্দ বা আনন্দ-উচ্ছ্বাস নয়, খুশির বন্যা, ভোগাসক্তি বা অনিয়ন্ত্রিত উচ্ছলতা নয় বরং ঈদ ও একটি ইবাদত ।

ঈদুল আজহা যেমন হজ ও কোরবানীর ঈদ, তেমনি ঈদুল ফিতর রোজা রাখা বা ফিতরাদানের ঈদ। উভয়টাই পৃথক এক একটা ইবাদত। তবে এ ইবাদতের সাথে জড়িয়ে থাকে আনন্দ। মাসব্যাপী সিয়াম সাধনায় পুরস্কারের আশা অন্তরে পোষণ করা রোজা রাখার আনন্দ। আল্লাহর রহমত, গুনাহের ক্ষমা, দোজখ থেকে মুক্তি, শবেকদরে হাজার বছরের পুণ্য তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভে সবই রোজাদারের পুরুস্কার। রোজাদার রোজা শেষে প্রত্যক্ষভাবে পুরস্কার না পেলে ও তিনি বুঝতে পারেন এগুলো।

তবে রোজা কবুল হওয়া না হওয়া নিয়ে এ একটা সংশয় থাকে। গরিব-দুঃখীর মুখে হাসি ফোটাতে, তাদের ভাল খাওয়াতে পরাতে, তাদের সন্তানদের মুখে মিষ্টান্ন, আর ঈদের দিনে দু’মুঠো খাবার আর গায়ে নতুনজামা তুলে দিতে ধনীদের ফিতরাদান হলো রোজাদারদের আর একটি আনন্দ। আর ঈদের সূচনা হয় এভাবে। বায়হাকি শরীফের হাদিসে বর্ণিত আছে।

‘রাসূল (সাঃ) যখন মদিনায় উপস্থিত হলেন তখন তাদের দু’টি উৎসব পালন করতে দেখেন। আর এ উপলক্ষে তারা বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও উৎসব পালন করে আসছে। তিনি তাদের কাছে প্রশ্ন রাখলেন,এর মৌলিকত্ব ও বিশেষত্ব কি? তারা বললো আমরা অন্ধকার যুগে এটা পালন করতাম আজ ও এটা পালন করছি। এ কথা শুনে রাসূল (সাঃ)বললেন, আল্লাহ্পাক তোমাদের এ দু’টি উৎসবের পরিবর্তে এর চেয়ে অধিক উত্তম দু’টি দিন দান করেছেন এক ঈদুল আজহা আর ঈদুল ফিতর। সুতারাং আগে উৎসব বন্ধ  করে এ দু’টি দিনের নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান পালন শুরু কর।’ 

নিছক আনন্দ উৎসব ও খেল-তামাশা এবং বাহারী দামি পোশাক-পরিচ্ছদের নাম ঈদ নয়। এতে ইসলামী তাহজীব তামাদ্দুনের পরিবর্তে অনৈসলামিক কার্যকলাপের প্রসার ঘটে, যা পবিত্র ইসলামের কল্পনা ও করা যায় না। ইসলামের আনন্দ উৎসব হবে আল্লাহ নির্দেশ নীতি ও আর্দশ অনুযায়ী। এর বাইরে কোন কিছুকে ইসলামের আওতাভুক্ত করা যায় না। এজন্য রাসূল (সাঃ) জাহেলী যুগের খেল-তামাশার আনন্দ-উৎসবকে বাতিল ঘোষণা করেছেন। আল্লাহর দেয়া বিধানকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অনুপ্রাণিত করেছেন। আমরা ঈদ উৎসবকে মনে করেছি বিলাসের উৎসবে। মুসলমানদের ঈদের আনন্দ হলো, স্বার্থত্যাগের মাধ্যমে অভাবী, নিরন্নকে সাহায্য করার প্রাপ্ত আনন্দ। পরিতাপের বিষয়, আমাদের ঈদ উৎসব এখন বিকৃতি রূপ ধারণ করেছে। ত্যাগের উৎস পরিণত হয়েছে ভোগের উৎসবে।

ঈদের দিনগুলিতে আমরা সাহাবায়ে ক্বেরামের জীবন থেকে সাহায্য নিতে পারি। তারা নিজের ভালো, পরিচ্ছন্ন জামা-কাপড় পরিধান করতেন। অনেক বেশী দান করতেন। এমনকি সাধ্যের সবটুকু বিলিয়ে দিতেন। দীর্ঘ সময় মসজিদে কাটাতেন। অন্যান্য ইবাদত ও বেশী করতেন। তাতেই অনেক বেশী আনন্দিত হতেন। পক্ষান্তরে আমাদের ঈদ-উৎসবে ত্যাগটা গৌণ, আর ভোগ ও ভোজনটাই মুখ্য। আমরা নাচ, গান, আড্ডাও টেলিভিশন দেখে সময় নষ্ট করে দেই। 

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, ‘ফিতরা, জাকাত, রোজাদারকে বেহুদা, অবাঞ্ছনীয় ও নির্লজ্জতামূলক কথাবার্তা বা কাজ কর্মের মলিনতা থেকে পবিত্র করার এবং গরীব-মিসকিনদের ব্যবস্থা করার উদ্দেশ্যে  অবশ্যই আদায় যোগ্য। যে ব্যক্তি ঈদের নামাযের আগে আদায় করবে তা ওয়াজিব ফিতরা হিসাবে আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে। আর যে ব্যক্তি ঈদের নামাযের পরে তা সাধারণ দানরূপে গণ্য হবে। (আবু দাউদ ও ইব্নে মাজাহ) প্রিয় নবী (সাঃ) ঈদের দিন সকালে পরিবার- পরিজন ও পাড়া-পড়শিদের সচেতন করে তুলতেন তাদের করণীয় কর্তব্য সম্পর্কে।

হযরত আব্দুল্লাহ্ ইব্নে আব্বাস (রাঃ) বলেন, মহানবী (সাঃ) প্রত্যেক ঈদেই তার মেয়ে ও স্ত্রীদেরকে ফিতরা,দান সাদকা আদায়ের নির্দেশ দিতেন (মুসনাদে আহমদ)। সদকায়ে ফিতর আদায়ের ফলে একজন দীন দরিদ্র লোক ও ঈদের আনন্দে সামান্য হলে ও শরিক হতে পারে। কিন্তু আমাদের সমাজে আজ যেভাবে ঈদ উৎসব পালন করা হয় তা কি প্রকৃত ঈদের আনন্দের আবেদনের সঙ্গে সঙ্গতিপুর্ণ। 

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh