যে পাঁচ কারণে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের দুর্দশা

আফগানিস্তানের বিপক্ষে বিপুল ব্যবধানে হারের পর বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে চলছে আলোচনা সমালোচনা। প্রশ্ন উঠেছে অনেক সিনিয়র ক্রিকেটারের দায়িত্ববোধ নিয়ে। 
এদিকে, ১৯ বছর ধরে ক্রিকেট খেলেও আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্ট ম্যাচে ২২৪ রানের বিপুল ব্যবধানে হেরে যাওয়ার পর আবারো বাংলাদেশের টেস্ট খেলার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ক্রিকেট বিশ্লেষক ও সমর্থকরা।
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে, বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের এই দুর্দশার কারণ হিসেবে পাঁচটি কারণ উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক দেশকালের পাঠকদের জন্য কারণগুলো উল্লেখ করা হলো।

ঘরোয়া ক্রিকেটে অনীহা
জাতীয় দলের বেশীরভাগ খেলোয়াড়ের রয়েছে ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রতি অনীহা। ক্রিকেট বিশ্লেষক ও ধারাভাষ্যকার সাথিরা জাকির জেসির মতে, বাংলাদেশে ঘরোয়া লিগে যাদের খেলা উচিত তারা তেমন খেলেন না। তার মতে, বড় ফরম্যাটের অনুশীলনটা আলাদা। 
তিনি মনে করেন, খেলোয়াড় যারা আছেন তারা ভালো, কিন্তু লম্বা সময় উইকেটে থাকা, ব্যাটিং করা এটা গুরুত্বপূর্ণ। আফগানিস্তানের মতো নতুন দলও টেস্টের মেজাজ বুঝে ব্যাটিং করেছে। ঘরোয়া লিগের বড় দৈর্ঘ্যের ম্যাচে দেখা যায় বেশিরভাগ ক্রিকেটার বিশ্রাম নেন অথবা অন্য কোনো খেলায় ব্যস্ত থাকেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ক্রিকেট সাংবাদিক রুহুল মাহফুজ জয় বলছেন, "ঘরোয়া প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট যেভাবে হয়, তাতে খেলোয়াড়রা টেস্টের জন্যে প্রস্তুত হতে পারেন না। অধিনায়ক তৈরি হয় না। স্থানীয় কোচদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। কোনো দলই জেতার জন্যে খেলে না"।
তিনি বলেন, "সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা করছে বোনাস পয়েন্ট সিস্টেম। প্রথম ইনিংসে লিড নিতে পারলে বোনাস, সাড়ে তিন/চারশ রান করতে পারলে বোনাস পাওয়া যায়। যেকারণে জেতার প্রতি আগ্রহ কম। ক্রিকেটার এবং কোচদের বিরাট একটা অংশ টেস্ট ক্রিকেট কী, তা বোঝেন না।"

অধিনায়কত্ব নিয়ে বিতর্ক
টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ দলে মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদও নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের কেউই লম্বা সময় ধরে অধিনায়ক থাকতে পারেননি। সাকিব আল হাসান এখন টেস্ট দলের অধিনায়ক। কিন্তু সদ্য শেষ হওয়া আফগানিস্তান টেস্ট শুরুর আগে ও পরে সাকিব বলেছেন যে, অধিনায়কত্বে তার আগ্রহ নেই যদি না কিছু জিনিস ঠিক করা হয়। সেসব বিষয়ে আলোচনার প্রয়োজন আছে বলেও মনে করেন তিনি।
এ ব্যাপারে, সাথিরা জাকির জেসি মনে করেন- "সাকিব আল হাসান যখন বিশ্বকাপে খেলেছেন সেটা ছিল দুর্দান্ত। এখানে তার দলের চাপ নিয়ে খেলতে হচ্ছে, বিশ্বকাপে নির্ভার অবস্থায় খেলেছেন সাকিব আল হাসান।" 
তিনি বলেন, এখন বাংলাদেশের এমন একটা সময় যাচ্ছে যখন অধিনায়ক হিসেবে সাকিব ছাড়া অন্য কাউকে বেছে নেয়া কঠিন। বাকিরা আগেই অধিনায়ক থেকেছেন কিন্তু ফলাফল আসেনি। এর বাইরে যারা আছেন তারা একাদশেই নিয়মিত নন।"

শুধুই স্পিননির্ভর উইকেট
২০১৬ সালে ইংল্যান্ড ও ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঘরের মাঠের সিরিজে একটি করে ম্যাচ জিতেছিল বাংলাদেশ। দুটি সিরিজের জন্যই তৈরি করা হয়েছিল স্পিননির্ভর উইকেট। অন্যদিকে আফগানিস্তান স্পিনে বেশ ভালো আগে থেকেই। স্পিনে বাংলাদেশের চেয়েও ভালো বোলিং লাইন-আপ আফগানিস্তানের আছে বলে মনে করেন জেসি।
তার মতে, "রশিদ খান তো আছেনই, তার সাথে জহির খান, নবী ওরা বেশ ভালো। ওরা বেশ বড় টার্ন পেয়েছে। বাংলাদেশের স্পিনাররা সেটা পাননি। এই দলের শক্তিমত্তার জায়গা কোথায় সেটা আগে দেখা প্রয়োজন ছিল। আফগানিস্তানের স্পিনার বাংলাদেশের চেয়ে ভালো তাই উইকেটের সুবিধাটা তারাই পেয়েছে।"

পরিকল্পনার অভাব
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য রেখে এগোচ্ছে না বলে অভিমত রুহুল মাহফুজ জয়ের। তিনি মনে করেন, "উঠতি ক্রিকেটারদের যত্ন নেয় গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগ। আফগানিস্তান গত কয় বছরে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করছে এই বিভাগে। গেম ডেভেলপমেন্টের ম্যানেজার ছিলেন বিসিবির সবচেয়ে মেধাবী ক্রিকেট মস্তিষ্ক বলে পরিচিত নাজমুল আবেদীন ফাহিম। যিনি ক্রিকেটার গড়ার কারিগর। তার সময়েই সাকিব-মুশফিক-তামিমরা উঠে এসেছেন"।
কিন্তু বিসিবি তাকে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারছে না বলে মনে করেন  তিনি।  তার মতে বলেন, "ওনাকে সরিয়ে নারী দলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। গেম ডেভেলপমেন্টের বর্তমান ম্যানেজার ক্রিকেটের টেকনিক্যাল কোনো লোক নন। নাজমুল আবেদীন ফাহিমের তত্বাবধানে গত এশিয়া কাপে মেয়েরা চ্যাম্পিয়ন হয়। তিনি এখন সেই দায়িত্বেও নেই"।

দল নির্বাচন
বাংলাদেশ দলের আফগানিস্তানের বিপক্ষে ১১ সদস্যের যে দলটি মাঠে নেমেছে সেখানো কোনো পেস বোলার ছিল না। এটা নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে অনেক। কিন্তু সামগ্রিক দল নির্বাচনেও নানা গাফিলতি দেখেছেন রুহুল মাহফুজ জয়।
তিনি মনে করেন, "সুইং করানোর ক্ষমতার কারণে রাহীকে বিশ্বকাপ দলে নেওয়া হলো। তাকে একটি ম্যাচেও খেলানো হয়নি। সেই রাহীই পরের শ্রীলঙ্কা সিরিজের দলে নেই। এই যে ইয়াসিন আরাফাত নামের ২০ বছর বয়সী পেসারকে আফগানিস্তান-জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজে ডাকা হলো, তিনি টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের স্বীকৃত কোনো ম্যাচ খেলেননি। তিনি কোথায় নিজেকে প্রমাণ করলেন, নির্বাচকরাই ভাল বলতে পারবেন। রাহী, তাসকিন, রনি এই তিন পেসার গত তিনটি বিপিএলে যথেষ্ট নজরকাড়া পারফর্ম করেছেন। এই তিনজনকে পাশ কাটিয়ে ইয়াসিনকে ডাকা হয়েছে।"
এছাড়া তাসকিন আহমেদকে টেস্ট দলে নেয়া হলেও, কোনো ম্যাচ না খেলা সত্ত্বেও তাকে টি-টোয়েন্ট দল থেকে বাদ দেয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।


মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh