বাঁচাও

ঘণ্টা দেড়েক আগেও ঝোপজঙ্গলের এত কাঁটা গাছপালা পেরিয়ে আমরা যখন এ জায়গাটিতে এসেছিলাম তখন আকাশের রঙ ঠিক এখনকার চেয়ে পুরোটাই অন্যরকম ছিল। সময়ের ব্যবধানে বৈশাখের তেজি হলুদ রোদ অপসারণ হয়ে আকাশের বুকে কালো মেঘ জুড়ে বসেছে। আকাশের মুখ এখন ভীষণ ভার। যেনো সমস্ত পৃথিবীর রাগ নিয়ে বসে আছে। চারদিক অন্ধকার হয়ে একরকম রাত নামার মত অবস্থা। যেকোনো মুহূর্তেই বৃষ্টি নামতে পারে । এদিকের নির্জনতা সচরাচর খুব ঠাণ্ডা থাকে।

তবে আজ এই মুহূর্তে একটু বেশিই নীরব। চারপাশ জঙ্গলে ঘেরা প্রাণিহীন অভয়ারণ্যের মতো। মাইল দুয়েক পর্যন্ত আশপাশে কোথাও কোনো বাড়িঘর নেই।বড় বড় ঘাস, সাপ, পোকামাকড় আর অজস্র প্রজাতির কীটপতঙ্গের সাথে রীতিমতো যুদ্ধপথ জড় করে এমন নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দৃষ্টিতে অবলোকন করতে পারা  যায়। বাঁ পাশ দিয়ে সাদা কাশফুলের বন উচ্ছল হাসি দিচ্ছে।

নিঃসঙ্গতার মাঝে সাদা ফুলের ওপর দিয়ে আকশে ডানামেলে উড়ে যাচ্ছে হাজারো ভিনদেশি বিহঙ্গকুলেরা। সরু লেকটা একদম সাপের মতই বেঁকে গেছে দূরের কোনো অজানা পথ ধরে। সূর্যটা আস্তে আস্তে অনেক নিচে নেমে আসছে। দেখে এমন মনে হচ্ছে যেন এখনই লেকের পানির সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে।

নয়নাভিরাম প্রকৃতির সাথে কিছুটা সময় কাটিয়ে আমি আর সিয়াম বাড়ি ফেরার পথে হাঁটছি। আবার ফিরতি সেই একই পথ। ঝোপজঙ্গল পেরিয়ে যেতে হবে। বড় বড় জঙ্গলের যেসব জায়গায় মাঝে মাঝে মানুষের যাতায়াত থাকে, সে পথটা অনেকটা আইলের মতো হয়ে যায়, মাটি থেকে ঘাস উঠে গিয়ে পরিষ্কার হয়ে যায়। জায়গাটা বেশ সুন্দর। আমাদের মতো অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষেরা হঠাৎ হঠাৎ এখানে আসে। 

বড় বড় ঘাস, আগাছা পেরিয়ে আমরা সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। পাঁচ ছয় পা সামনেই হবে,  একটা গুইসাপ হুড়মুড় করে তেড়ে যাচ্ছে। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে গুইসাপ যাতায়াত করছে। এটা অতি নিত্য ঘটনা। তাই আর বিচলিত হলাম না। আমরা আমাদের মতো করেই সাবধানে পা ফেলতে ফেলতে সামনে এগিয়ে চললাম।

একটু সামনে যেতেই জঙ্গলের ডান পাশ থেকে আমরা দুজনেই এক ধরনের হালকা চিৎকার শুনতে পেলাম। কোনো এক নারীর চিৎকার। চিকন কণ্ঠ। বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করছে। চিৎকারের শব্দের সাথে কান্না, অসহায়ত্ব আর প্রবল যন্ত্রণার সুর ভেসে আসছে। আমরা কৌতূহলী হয়ে উঠলাম এবং কিছু মুখে উচ্চারণ করতে গিয়ে আবার থেমে গেলাম। ঘটনাস্থলের দিকে তিন চার কদম পা ফেলে উঁকি দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করলাম। একটি মেয়ে ধর্ষিত হচ্ছে! আমরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। গলা বন্ধ হয়ে আসছে আমাদের! হঠাৎ সিয়াম চিৎকার করে বলল-

-ওই পশুটা রতন। আমাদের এলাকার হারিছ চেয়ারম্যানের ছেলে। সামনে যাস না। চল কেটে পড়ি।

-তোদের এলাকার চেয়ারম্যানের ছেলে?

-‘হুম, কেন বললাম তো! তোর বিশ্বাস হয় না? এখানে থাকা নিরাপদ না’- এই বলে সিয়াম আমার হাত ধরে সামনের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে আর মেয়েটির গলা থেকে আসা একটি শব্দ ‘বাঁচাও’ বারবার আমার কানে ভেসে আসছে। আমাদের দৃষ্টির গোচরেই এত বড় একটা অপকর্ম হচ্ছে। আমরা শুধু গোপন সাক্ষী থেকে গেলাম। কিছুই করতে পারলাম না। মনের মধ্যে আমার একটা অপরাধবোধ রয়েই গেল। আমরা এগিয়েই যাচ্ছি। আকাশের মুখ তখনো ভীষণ ভার ছিল।

পরদিন সকালবেলা। আমি ঘুমাচ্ছি। আম্মু ডাকছেন। এই ওঠ। আমি একটু বাইরে যাব। ঘুমন্ত চোখে আম্মুকে বললাম,

-কোথায় যাবে?

-লাশ দেখতে যাব।

-কী?

-পাশের এলাকায় একটি মেয়ে গলায় ফাঁস দিয়েছে। চিঠিতে নাকি লিখে গেছে মেয়েটি গতকাল ধর্ষিত হয়েছিল।

আম্মুর কথা শুনে আমার বুক কেঁপে উঠল। তৎক্ষণাৎ বিছানা থেকে উঠে বসলাম। গা শিরশির করছে। তবে কি কালকের ওই মেয়েটাই গলায় ফাঁস দিল! আম্মু চলে গেছে। দরজা বন্ধ করে এক গ্লাস পানি খেয়ে পত্রিকা হাতে নিয়ে আবার বিছানায় বসে পড়লাম। পত্রিকার শিরোনামে চোখ রাখতেই, ‘টিএসসিতে নারী লাঞ্ছনা, বস্ত্র হরণ’! পত্রিকার পাতাতেও একই ধরনের নিউজ। এমন নেগেটিভ নিউজ দেখে মনের ভেতর এক ধরনের নিন্দাসূচক ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে। দেশটা কোথায় গেল? কোথায় গেল বিবেক, মনুষ্যত্ব? ব্যক্তিত্বের আকাশেও কি মেঘ জমে গেছে? পরক্ষণেই মনে হলো, ধুত?! আমার এগুলো ভেবে কী হবে! আমি তো আর আমার দেশটাকে একা একা পাল্টাতে পারব না।

বিকালবেলা এলাকার গলির মোড়ের টঙে বসে চা খাচ্ছি। আমার ধারণা মিলে গেছে। কালকের ওই মেয়েটাই ফাঁস দিয়েছে। হারিছ চেয়ারম্যানের ছেলে রতনকে পুলিশ ধরে থানায় নিয়ে গেছে। পাশের এলাকায় ঘটনা ঘটেছে। এ এলাকাতেও তার রেশ ছড়িয়ে পড়েছে। এখন সবার মুখে মুখে একটাই প্রসঙ্গ। চা খেতে খেতে মুরব্বিরা এ বিষয়ে অনেক কথা বলছেন। আমি বসে বসে শুধু শুনছি। এক দাড়িওয়ালা চাচা উচ্চৈঃস্বরে বলছেন,

-আরে রাখেন মিয়া আপনার বিচারের আশা! বহুত তো দেখলাম। কই হয় বিচার? গেরামে গেরামে স্কুল কলেজের মাস্টরেরা ছাত্রীগো লগে অকাম-কুকাম করতাছে। ঢাকায় মাইয়া মাইনসের কাপড় খুইলা ফালাইতাছে। দেখছেন তো! খালি এসব টিভিতেই দেখাইব, একটারও বিচারের কথা হুনছেন নাকি?

সাথে সাথে আরেক মুরব্বি বলে উঠলেন, একাত্তরে দ্যাশটা স্বাধীন করছিলাম কিয়ের লিগা? এ দেখার লিগা? এখন তো রাস্তাঘাটে মা বইনের ইজ্জতই নাই। এগুলা আর কতদিন দেখুম? এ কুলাঙ্গারের শাস্তি অইলে তাও মাইনষে কিছু স্বস্তি পাইত।

১৫ দিন পর। গ্রামের বাজারে হারিছ চেয়ারম্যানের ছেলে রতনকে দেখা গেল। টঙ দোকানের সামনে রাস্তায় তার পালসার ব্র্যান্ড মোটরসাইকেলে হেলান  দিয়ে বসে আছে। এক হাতে চা অন্য হাতে সিগারেট। চায়ে চুমুক দিচ্ছে আর সেই সাথে রাজকীয় ভঙ্গিতে সিগারেটের  ধোঁয়া  ছাড়ছে। চা শেষ হতেই মোটরসাইকেলে স্টার্ট দিলো সে। পেছনের সিটে চামচা টাইপের একটা ছেলে উঠে বসল। পিচঢালা সরু পথ ধরে রতনের মোটরসাইকেল আস্তে আস্তে  অদৃশ্য  হতে হতে দেখা গেলো ওই নির্জন পথের বাঁকে ব্রেক করে দাঁড়াল শবনমের সামনে। শবনম উপেক্ষা করার চেষ্টা করল, কিন্তু অনেক কথা তাকে শুনতে হয়েছে হয়তো। যখন শবনম আমার সামনে দিয়ে যাচ্ছে তখন ওর চোখে পানি, মুখটা ভার! আকাশের মুখটা তখনও শবনমের মুখের মতো ভারী!

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh