ভূরাজনীতিতে করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাব কতটুকু?

করোনাভাইরাস মহামারির সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী প্রায় ১০ কোটি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২১ লাখ মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। 

১৫ জানুয়ারি এক দিনেই মৃত্যুবরণ করেন ১৪ হাজার ৯১৩ জন। এর তুলনায় গত ১৭ এপ্রিল মৃতের সংখ্যা ছিল আট হাজার ৫২৭ জন। অর্থাৎ প্রথম ঢেউয়ের তুলনায় দ্বিতীয় ঢেউয়ে মৃতের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গত জুলাই মাসে এই সংখ্যা বেশ বাড়লেও তা ২২ জুলাইয়ের সাত হাজার ৩২৬ জনের বেশি ছিল না। 

সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে; চার লাখ পাঁচ হাজার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্রাজিলে; দুই লাখ নয় হাজার। তৃতীয় সর্বোচ্চ ভারতে; এক লাখ ৫২ হাজার। চতুর্থ সর্বোচ্চ মেক্সিকোতে; এক লাখ ৪০ হাজার। এরপর রয়েছে ব্রিটেন, ইতালি, ফ্রান্স, রাশিয়া, ইরান, স্পেন, কলম্বিয়া, জার্মানি, আর্জেন্টিনা, পেরু, দক্ষিণ আফ্রিকা ও পোল্যান্ড। প্রতি এক লাখ জনসংখ্যার মাঝে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে বেলজিয়ামে; ১৭৫ জন মানুষের। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্লোভেনিয়ায় ১৫৩ জন; দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ইতালিতে ১৩৫ জন। জনসংখ্যার বিচারে মৃত্যুর সংখ্যা ইউরোপে সবচেয়ে বেশি। প্রথম ১০টি দেশের সবই ইউরোপের। ১১তম স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া প্রথম ২০টি দেশের ১৬টিই ইউরোপের।

করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাব সারাবিশ্বের ওপর পড়লেও সব ক্ষেত্রে তা সমান নয়। ভূরাজনীতিতে মহামারির প্রভাব হিসাব করতে গেলে ইউরোপ ও আমেরিকার কথাই আসবে শুরুতে। একইসঙ্গে সেই অঞ্চলগুলোতে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বিপর্যয়ের কথাও আসবে, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার নিম্নগামিতাকে করোনাভাইরাস আরও দ্রুতগামী করেছে। অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক দুর্বলতার সময়ে আঞ্চলিক শক্তিগুলো ভূরাজনৈতিক শূন্যস্থান পূরণ করতে এগিয়ে এসেছে। এতে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আরও প্রবল হয়েছে। এই প্রতিযোগিতার অনেকটাই মহামারির আগে থেকে চললেও এর ওপর মহামারির প্রভাব উল্লেখ করার মতো।

মহামারির মাঝেও চলেছে লিবিয়ার যুদ্ধ, যেখানে তুরস্ক হস্তক্ষেপ করে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়েছে। নাগোর্নো-কারাবাখ নিয়ে আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার মাঝে চলেছে যুদ্ধ; সেখানেও তুরস্ক হস্তক্ষেপ করেছে। হিমালয়ের পাদদেশে ভারত ও চীনের মাঝে হয়েছে সংঘর্ষ; যদিও তা পুরোদস্তুর সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়নি। ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হর্ন অব আফ্রিকা’র ইথিওপিয়াতে শুরু হয়েছে গৃহযুদ্ধ। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালিতে হয়েছে সামরিক অভ্যুত্থান। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে। সৌদি ব্লকের দেশগুলোও তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে যাচ্ছে। এই ঘটনাগুলোর ওপর মহামারির সরাসরি প্রভাব না থাকলেও পরোক্ষ প্রভাব কিছুটা হলেও ছিল।

প্রশ্নবিদ্ধ পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থা

মার্কিন ভূরাজনৈতিক চিন্তাবিদ জর্জ ফ্রিডম্যান ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’-এর এক লেখায় বলেন, মহামারির সমাধান স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাছে চাওয়া হলেও তারা সেই মুহূর্তে কোনো প্রতিষেধক বা ওষুধ দিতে সক্ষম হয়নি। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যখন ভেন্টিলেটর, মাস্ক ও টেস্টিং কিটের মতো জিনিসগুলো চাওয়া শুরু করে, তখন তা অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থাকেও চাপে ফেলে দেয়। আর পুরো ব্যাপারটি রাজনৈতিক হওয়ার কারণে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও চাপে পড়ে যায়। 

মহামারি মারাত্মক আকার ধারণ করায় তখন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থেকে আসা সামাজিক সমাধানকেই বেছে নেয়া হয়; যেটিকে বলা হয় ‘লকডাউন’। ফলে অর্থনীতির চাকা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ এই মুহূর্তে সহজলভ্য মেডিক্যাল সমাধান অর্থনৈতিক ধস ডেকে আনছে। 

জর্জ ফ্রিডম্যান ওই নিবন্ধে আরো বলেন, অর্থনৈতিক স্থবিরতার ফলাফল হলো- দীর্ঘমেয়াদে পুরো অর্থনীতিকেই ধ্বংস করে ফেলা। কাজেই মেডিকেল সমাধানের চাপ সহ্য করার জন্য স্বল্প মেয়াদে রাজনৈতিক ব্যবস্থা থেকে দেয়া হয় অর্থনৈতিক প্রণোদনা। 

ফ্রিডম্যান বলছেন যে, লকডাউন কোনো টেকসই সমাধান নয়। জনগণকে ঘরের মাঝে আটকে থাকতে বাধ্য করলে অর্থনৈতিক, পারিবারিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং সামাজিক চাপে পড়ে একসময় তারা নিয়ম ভেঙে বের হয়ে আসবেই। জোরপূর্বক লকডাউন বাস্তবায়নের ফলাফল হবে ভয়াবহ সামাজিক অসন্তোষ। ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি ছাড়াও সামাজিক সংস্থাগুলোর ওপর মানুষের আস্থা বিলুপ্ত হবে। মানুষের কাছে মনে হতে থাকবে যে, এর কোনো সমাধান কেউ দিতে পারেনি। 

‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) এক বিশ্লেষণে বলা হয়, করোনাভাইরাসের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রভাব শুধু ব্যাপকই ছিল না, এটা হবে সুদূরপ্রসারী। আর চীনে যখন রোগের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়, তখন অনেকেই মনে করেছিলেন যে, লকডাউনের মতো একটি সমাধানের পথে এগোলে রোগের সংক্রমণ এড়ানো সম্ভব হবে; কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা গেল, লকডাউন পূর্ব এশিয়ার বেশ কিছু দেশে মোটামুটি কাজ করলেও ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়াতে তেমন সফল হয়নি। বিশ্বের মোট সংক্রমণের এক-তৃতীয়াংশই ছিল যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও ব্রাজিলে।

মার্কিন নীতি-নির্ধারণী গবেষণা সংস্থা আটলান্টিক কাউন্সিলের এক বিশ্লেষণে করোনা-পরবর্তী বিশ্বের একটা মলিন ছবি আঁকা হয়। সেখানে লেখা হয়, মার্কিন নেতৃত্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তৈরি বিশ্বব্যবস্থা এখন হুমকির মুখে। এই বিশ্বব্যবস্থার মাঝে রয়েছে উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক ভাবধারার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আইনের শাসন, মুক্ত বাজার অর্থনীতি ও শক্তিশালী দেশগুলোর মদদে গড়ে ওঠা কতগুলো আন্তর্জাতিক সংস্থা। পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনীতি সমস্যায় পতিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চীনের উত্থান হচ্ছে। একইসঙ্গে বৈশ্বিক মহামন্দার মাঝে একেকটি দেশ নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। বৈশ্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য তৈরি সংস্থাগুলো নিজেদের ব্যর্থতাকে লুকাতে সক্ষম হয়নি। আটলান্টিকের দুই পাড়ের দেশগুলো নিজেকে বাঁচাতে তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিচ্ছে। বিশ্বে আইনের শাসন, চিন্তার স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া আর কোনো গতি নেই বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। 

প্রশ্ন হলো- যুক্তরাষ্ট্র কি আসলেই সেরকম পদক্ষেপ নেয়ার সক্ষমতা রাখে? অন্তত ২০২০ সালের নভেম্বরে চরম বিরোধপূর্ণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর এক বিভক্ত রাষ্ট্রকে মাথায় রেখে যুক্তরাষ্ট্র সেই সক্ষমতা কতটুকু দেখাতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

অর্থনৈতিক মহামন্দা ও সামাজিক অসন্তোষ

অস্ট্রেলীয় নীতি-নির্ধারণী গবেষণা সংস্থা লোয়ি ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনাভাইরাস সংক্রমণের আগেই বিশ্ব অর্থনীতি ধুঁকে ধুঁকে চলছিল। ২০১৯ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ দশমিক ৯ শতাংশ। বেকারত্বের হার বৃদ্ধি, জিডিপির নিম্নগামিতা, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যের ব্যাপক বৃদ্ধি, এক রাষ্ট্রের সঙ্গে আরেক রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ব্যাপক পার্থক্য, ইত্যাদি সমস্যা বিশ্বে সামাজিক অসন্তোষ তৈরি করার ক্ষেত্র তৈরি করেই রেখেছিল। 

যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির মৃত্যুর পর যে ব্যাপক বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল, তার ভিতও ছিল মূলত অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং মহামারির মাঝে ব্যাপক বেকারত্বের করাল গ্রাসের বহিঃপ্রকাশ। বিশ্বব্যাপী অনেক দেশেই বিক্ষোভ ও সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, যেগুলোর ফলাফল অঞ্চলভেদে ভিন্ন হতে পারে। বিভিন্ন দেশে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেয়েছে; অথবা ক্ষমতায় টিকে থাকতে প্রতিবাদী জনগণের ওপর আরও বেশি করে চড়াও হচ্ছে সরকারগুলো। 

তুরস্কের আনতালিয়া বিলিম ইউনিভার্সিটির প্রফেসর তারিক ওগুজলু ডেইলি সাবাহ পত্রিকায় এক নিবন্ধে বলেন, বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বহুগুণে বেড়ে যাওয়ার কারণেই মূলত করোনাভাইরাস সারাদুনিয়াতে এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। ভাইরাসের সংক্রমণে চীনের অর্থনীতি স্থবির হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চীনের সাপ্লাই চেইনের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতা 

লোয়ি ইনস্টিটিউট জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মাঝে বাণিজ্য যুদ্ধ ও বিশ্বায়নের বিরুদ্ধাচরণ করে জাতীয়তাবাদের উত্থান মহামারির আগে থেকেই শুরু হয়ে যায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের একে-অপরকে দোষারোপ করে দ্বন্দ্বে জড়ানোটা করোনাভাইরাসের কারণে আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে গেছে। 

২০০৮ সালে বৈশ্বিক মন্দার পরপর যুক্তরাষ্ট্র যখন নিজের অর্থনীতিকে পুনরায় দাঁড় করাতে এবং বিশ্বব্যাপী তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ জড়িয়ে ব্যস্ত ছিল, সেই সুযোগে চীন শূন্যস্থান পূরণে মনোযোগী হয়। ঠিক একইভাবে মহামারির মাঝে পশ্চিমা শক্তি যখন নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত, সে সময় চীনারা দক্ষিণ চীন সাগর এবং পূর্ব চীন সাগরে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করে নিতে চাইছে। এর সমান্তরালে হংকংয়ের আন্দোলনকারীদের যখন চীনা সরকার জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, তখন পশ্চিমা দেশগুলো আন্দোলনকারীদের পক্ষাবলম্বন করে চীনের সঙ্গে দ্বন্দ্বকে আরো গভীর করছে। ফলে মার্কিন কোম্পানিগুলো চীন ছাড়তে শুরু করে এবং ফলশ্রুতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা কমছে। 

তবে হংকংয়ের আন্দোলন চীনের উইঘুর ও তিব্বতের মতো অঞ্চলগুলোতে যেন ছড়িয়ে না পড়ে, সে ব্যাপারে চীনা সরকার যথেষ্ট সাবধান থাকতে চাইবে। 

মার্কিন নীতি-নির্ধারণী গবেষণা সংস্থা হাডসন ইনস্টিটিউটের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, করোনাভাইরাসের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের প্রযুক্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব আরো বাড়বে। চীনারা করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে বিগ ডাটা, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ফেশিয়াল রেকগনিশন এবং ড্রোনের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে চীনকে প্রযুক্তিতেই শুধু এগিয়ে নেবে না, নিজ জনগণের উপর নিয়ন্ত্রণ আরও বৃদ্ধি করবে। 

চীন ‘মেইড ইন চায়না-২০২৫’ প্রকল্পের অধীনে অতি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকার উদ্দেশ্যে আরো বিনিয়োগ করবে। আর উল্টোদিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা দেশগুলো চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করতে থাকবে। তবে চীন থেকে শিল্প সরিয়ে নেওয়ার যে ইচ্ছা ব্যক্ত করা হচ্ছে, তা বাস্তবায়ন করাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুব সহজ হবে না। আর চীনের বড় বাজার হারিয়ে কোনো কোম্পানিই নিজেদের আয় কমাতে চাইবে না। 

তারিক ওগুজলু বলেন, মহামারির কারণে গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়ন হয়তো কিছুটা স্থবির হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মাঝে ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতার কারণে চীন আঞ্চলিকভাবে নিজস্ব একটি বিশ্বায়নের দিকে এগোবে। সাপ্লাই চেইনের মাঝে নিজেদের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ না হলে কঠিন সময়ে তা কতটা মারাত্মক হতে পারে, তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ দেখেছে। সেই হিসেবেই তারা চাইবে পারস্পরিক একটা নির্ভরশীলতা তৈরি করতে, যাতে ভবিষ্যতে আবারও বিপদে পড়তে না হয়। আশপাশের দেশগুলো চীনের আগ্রাসী তৎপরতায় ভীত হলেও এটি তারা বুঝতে পারছে যে, মহামারির পর অর্থনীতিকে পুনরায় জাগাতে চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউর ওপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি করাটা মোটেই সমীচীন নয়। 

স্বাস্থ্য, টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য বিমোচন, ইত্যাদি বিষয়ে বৈশ্বিকভাবে চীনা এবং মার্কিনি মডেলের প্রতিযোগিতা হবে। উভয় দেশই নিজেদের উন্নয়নের মডেল অন্যান্য দেশের কাছে বিক্রি করতে চাইবে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) আলোচনায় আসতেই থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি মার্শাল প্ল্যানের মতো কোনো পরিকল্পনা নিয়ে আসতে না পারে, তাহলে চীনকে সরিয়ে দিয়ে বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রাখাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কষ্টকরই হবে।

এশিয়ায় ব্রিটেনের প্রত্যাবর্তন

করোনাভাইরাস মহামারির মাঝেও ইইউ থেকে ব্রিটেনের বের হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ থাকেনি। ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতার সুযোগ নিতে এবং একইসঙ্গে ব্যাপক অর্থনৈতিক মন্দা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে ব্রিটেন ইইউর গন্ডি থেকে বের হয়ে বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চাইছে। 

ব্রিটেনের নীতি-নির্ধারণী গবেষণা সংস্থা চ্যাটহ্যাম হাউসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্রিটেন ইন্দো-প্যাসিফিককে আরো গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর ইন্দো-প্যাসিফিকের জন্য নতুন একজন ডিরেক্টর জেনারেল নিয়োগ দিচ্ছে। একইসঙ্গে ব্রিটেন তার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলকে একটি ফ্রেমওয়ার্কের মাঝে সাজাচ্ছে। এশিয়ায় সামরিক অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করার জন্য ব্রিটিশ সরকার সামরিক বাজেট বৃদ্ধি করেছে। এই সামরিক অবস্থানের মূল কেন্দ্রবিন্দু ভারত মহাসাগর ও মধ্যপ্রাচ্য হলেও তা দক্ষিণ চীন সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।

মধ্যপ্রাচ্যে দ্বন্দ্ব ও তেলের বাজারে অস্থিরতা 

আইআইএসএসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মহামারি ঘোষণা করার ঠিক আগে আগেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কুদস ফোর্সের জেনারেল কাসেম সুলেইমানিকে ড্রোন হামলায় হত্যা করে। এ ছাড়া লেবানন এবং ইরাকের রাস্তায় হাজারো মানুষের বিক্ষোভ গোটা অঞ্চলকে অস্থির করে রেখেছিল আরও আগে থেকেই। 

শাসন ব্যবস্থার ব্যর্থতা ও নিম্নগামী অর্থনীতি মানুষকে রাস্তায় নামতে বাধ্য করে। সিরিয়া, ইয়েমেন ও লিবিয়ার যুদ্ধও চলমান ছিল। আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় ইরানের সঙ্গে সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে আমিরাতের দ্বন্দ্ব বেড়েই চলছিল। 

ইরান ও তুরস্ক আঞ্চলিকভাবে তাদের প্রভাব বিস্তারে ব্যাপকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। তবে একইসঙ্গে তেলের বাজারে দরপতনের কারণে তেল রফতানির ওপর নির্ভরশীল ধনী দেশগুলোর অর্থনীতি যেমন ধাক্কা খেয়েছে, তেমনি এই দেশগুলোতে মানবসম্পদ রফতানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোও সমস্যায় পতিত হয়েছে। আর অর্থনৈতিক দীনতা ও অব্যবস্থাপনার ফলশ্রুতিতে শাসকশ্রেণির ওপর জনগণের আক্রোশ বেড়েই চলেছে। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে করোনাভাইরাসের আবির্ভাব পুরো অঞ্চলের ভূরাজনীতিকে আরও জটিল করে তোলে।

লোয়ি ইনস্টিটিউট জানায়, করোনাভাইরাস মহামারি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করেছে। মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধ ও ভাইরাসের চাপে পড়ে ইরান হয়তো আঞ্চলিকভাবে আরো সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এতে সৌদি গ্রুপের দেশগুলোর সঙ্গে যেমন ইরানের সংঘাত বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হবে, একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলও এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে। 

ডেনভার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হায়দার খান আল জাজিরায় লেখা এক নিবন্ধে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের ব্যাপক দরপতনের সময় রাশিয়া নিজেকে বেশ ভালোই মানিয়ে নিয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে রাশিয়া তাদের অর্থনীতিকে বেশ কিছুটা বহুমুখী করেছে। তেলের মূল্য কমে যাওয়ার কারণে আমদানিকারক হিসেবে চীন বেশ লাভবান হয়েছে। অপরদিকে করোনার কারণে স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে ব্যাপক বিপর্যয়ের কারণে তেলের বাজার নিয়ে প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিম্নগামিতা গতিশীল হতে পারে এবং চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা ঢুকে পড়তে পারে। চীনকে নিয়ন্ত্রণ করতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের সিদ্ধান্তগুলো সংঘাতের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিতে পারে।

উদ্দেশ্যহীন ইইউ ও জাতীয়তাবাদের উত্থান

হাডসন ইনস্টিটিউট জানায়, করোনাভাইরাস ইউরোপীয় ইউনিয়নের অস্তিত্বকেই হুমকির মাঝে ফেলে দিচ্ছে। ইইউ তৈরি হয়েছিল এমন এক সমঝোতার মাঝ দিয়ে, যার মাধ্যমে ইউরোপের এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে কোনো ঝামেলা থাকবে না। সদস্য দেশগুলো এটি মেনে নেবে, কারণ এর বিনিময়ে তারা ইইউর অন্য দেশগুলোর বাজারে কোনো বাধা ছাড়াই ঢুকতে পারবে; কিন্তু বর্তমান ইইউর মূল সমস্যা হলো- জনগণের আনুগত্য ইইউর প্রতি নয়, বরং তাদের নিজ দেশের প্রতি। 

যতদিন ইইউ তার সদস্য দেশগুলোকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখাতে পেরেছে, ততদিন তারা ইইউর সদস্য থাকার পিছনে শক্তিশালী কারণ পেয়েছে। তবে সিরিয়া, লিবিয়া ও মালি যুদ্ধের ফলে ইউরোপে শরণার্থীর ঢল ও অর্থনৈতিক মহামন্দায় ইইউর অস্তিত্ব প্রশ্নের মাঝে পড়েছে। উত্তর ও দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলোর মাঝে বৈষম্য সকলের সামনে উপস্থাপিত হয়েছে। 

ফলে ইউরোপজুড়ে ডানপন্থী জাতীয়তাবাদীদের উত্থান পরিলক্ষিত হচ্ছে, যারা বর্তমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলছে। ইউরোপের দেশগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের ভোট পেতে জাতীয়তাবাদকেই ব্যবহার করবে। তারা সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে ইউরোপীয় সমাধান নয়; জাতীয় সমাধানের পথ খুঁজবে। মহামারি ব্যবস্থাপনায় ইইউর দুর্বল পদক্ষেপগুলো জনগণের কাছে ইইউর চিন্তাকে অবান্তর করে তুলবে। আর করোনাভাইরাসের কারণে মার্কিন অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানির ওপর নির্ভরশীল ইউরোপের অর্থনীতি, বিশেষ করে জার্মানির অর্থনীতি চাপের মুখে পড়বে। 

জর্জ ফ্রিডম্যান এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, মহামারির সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে ইউরোপের জনগণ তাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দিকেই তাকাবে; কারণ সেই নেতৃবৃন্দের তাদের জনগণের প্রতি একটি দায়বদ্ধতা রয়েছে। ব্রাসেলসের ইইউ নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে জনগণ এই সমস্যার সমাধান আশা করে না। জাতীয় দুর্যোগের সময় জনগণের কাছে জাতীয় পরিচয় ও স্বশাসনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর সে কারণেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো জাতীয় নেতৃবৃন্দই নিচ্ছে; ইইউ নিচ্ছে না। যদিও ইইউএর সব দেশেই মহামারি ছড়িয়ে পড়েছে, তবুও তারা নিজেদের জান-মালের নিরাপত্তা দিতে অন্য দেশের সঙ্গে সীমানা আটকে রাখার পথেই এগিয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইইউর সীমানাহীন চিন্তা কাজ করেনি। একটি জোট কতটুকু ভালোভাবে কাজ করছে, তা বুঝতে হলে দেখতে হবে তারা খারাপ সময়ে কিভাবে কাজ করে।

কঠিন সময়ে ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের স্বার্থকেই প্রথমে দেখেছে; তারপর অন্যের স্বার্থ দেখেছে। নিজ ভাষা, ইতিহাস এবং বিশ্বাসের মাঝেই ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের গণ্ডিকে সীমাবদ্ধ করেছে। বাকিরা সবসময়ই কম প্রাধান্য পেয়েছে। ইইউ তৈরি হয়েছিল এই দেয়ালগুলো ভেঙে ফেলার জন্য, তা সফল হয়নি। ইউরোপীয় পরিচয় তৈরি করার চেষ্টা যতটা সফল হবে বলে ভাবা হয়েছিল, তা হয়নি।

ফ্রিডম্যান শুধু ইইউর মাঝেই দেয়াল তোলার কথা বলেননি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের একটি রাজ্য আরেক রাজ্যের সঙ্গে প্রায় একই ধরনের ব্যবহার করেছে। যেমন টেক্সাসের গভর্নর পার্শ্ববর্তী লুইজিয়ানা রাজ্যের সঙ্গে যাতায়াত বন্ধ করে দিয়েছিল, কারণ টেক্সাসের চেয়ে লুইজিয়ানায় সংক্রমণ বেশি ছিল তখন; কিন্তু লুইজিয়ানার সঙ্গে সীমানা বন্ধ করেও টেক্সাস তার সংক্রমণ থামাতে পারেনি।

দেয়াল তুলে দেয়ার ব্যাপারটি ইউরোপের একার নয়। তবে ইউরোপের ক্ষেত্রে এর পিছনে একটি লম্বা ইতিহাস রয়েছে। এক দেশ আরেক দেশের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে, সর্বদা সংঘাতের ভয় তাদের গ্রাস করেছে। টেক্সাস এবং লুইজিয়ানার মাঝে মনোমালিন্য খুব বেশিদূর হয়তো যাবে না; তবে ইইউর সদস্য দেশগুলোর জন্য এই বিভেদ মারাত্মক। একইসঙ্গে মার্কিনিদের চোখে বাকি বিশ্বের প্রতি অবিশ্বাসও হবে মারাত্মক। বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর ওপর মানুষের আস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh