
পৃথিবী প্রতিনিয়তই গাজায় ঘটে চলা নৃশংসতার সাক্ষী হচ্ছে-এই হিম শীতল বিয়োগান্ত দৃশ্যের ধারাবাহিকতায় সাংবাদিকরাও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত। গাজার সাংবাদিকরা যখন ভেবেছিলেন পরিস্থিতি আর খারাপ হতে পারে না, ঠিক তখনই বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নৃশংস দখলদার বাহিনী আরেকটি ঠান্ডা মাথায় হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এবার এর শিকার আলজাজিরার সাংবাদিক আনাস আল-শরিফ এবং মোহাম্মদ ক্রাইকিয়া, ভিডিওগ্রাফার ইব্রাহিম তাহের, মোহাম্মদ নোফাল এবং তাদের সহকর্মীরা। তারা আল-শিফা হাসপাতালের কাছে একটি তাঁবুতে আশ্রয় নিচ্ছিলেন এবং তখনই সরাসরি হামলায় নিহত হন।
যুদ্ধবাজ ইসরায়েল গাজা দখলের ঘোষিত লক্ষ্যকে ত্বরান্বিত করতে আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘন করে সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করার ক্ষেত্রে কোনো সংযম দেখায়নি। এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত তারা ২৩৮ জন সংবাদকর্মীকে হত্যা করেছে। গাজার যুদ্ধে যত সাংবাদিক এবং মিডিয়াকর্মী নিহত হয়েছেন তা এ যাবৎকালের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। গাজায় ২০২৪ সালে সর্বাধিকসংখ্যক সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, যার বেশির ভাগই ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে। সাংবাদিকদের পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করে হত্যা কেবল স্থানীয় বা আঞ্চলিক ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখার বিষয় নয়; এটি যুদ্ধক্ষেত্রে সাংবাদিকদের সুরক্ষা সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক নিয়মের মারাত্মক লঙ্ঘন। সাংবাদিকরা যুদ্ধের বাস্তবতা প্রকাশ্যে আনতে জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছেন, তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারা দায়িত্ববোধের চূড়ান্ত অবনমনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গাজা একমাত্র জায়গা নয়, যেখানে সাংবাদিকরা অবরুদ্ধ এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হুমকি, ভয় দেখানো ও খুনের সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে সেসব ঘটনার সঙ্গে ইসরায়েলের ক্ষেত্রে পার্থক্য হলো ইসরায়েল যুদ্ধের ময়দানে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের হত্যা করলে তথাকথিত মুক্ত বিশ্বের নেতারা কোনো ভ্রুক্ষেপ করেন না, তাদের বিচারের দাবি তোলেন না। আর কিছু গণমাধ্যম সংস্থা তথ্য যাচাই না করেই হত্যাকাণ্ডের শিকার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি সরকারের মিথ্যা অভিযোগের পুনরাবৃত্তি করে সংবাদ প্রকাশ করে, যা অত্যন্ত মর্মান্তিক।
একজন নতুন সাংবাদিকের জন্য এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়। কারণ শুধু বিশ্বের জনগণের কাছে সত্য তুলে ধরার দায়িত্ব পালনের জন্যই সাংবাদিকদের হুমকি, হয়রানি ও হত্যা করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালন আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। ২০২৩ সালে গড়ে প্রতি চার দিনে একজন সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকর্মী নিহত হন। ২০২৪ সালে এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান প্রতি তিন দিনে নেমে আসে।
গাজার সাংবাদিকরা আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা নন, বরং স্থানীয় সাংবাদিক, যারা ভূমি, জনগণ ও সেখানকার বাস্তবতাকে সবচেয়ে ভালোভাবে জানেন। এই সাংবাদিকরা কেবল গাজার ট্র্যাজেডির প্রতিবেদন করছেন না; এর মধ্যেই জীবন যাপন করছেন। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বৃদ্ধি আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন নয়। গভীর পরিকল্পনার অংশ। স্বৈরশাসক ও শাসকগোষ্ঠী গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে চায় তাদের অপরাধ গোপন করতে। গাজার সাংবাদিক হত্যার বিষয়টিও অনেকটা তেমন। এটি আমাদের সবাইকে আতঙ্কিত করে তোলার জন্য যথেষ্ট। এটি কেবল সাংবাদিকদের ওপর নয়, বরং সমগ্র বিশ্ববাসীর জানার, মানবিক দুর্ভোগের গভীরতা বোঝার এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহি করার অধিকারের ওপর আক্রমণ।
২৩০ জনেরও বেশি সাংবাদিক হত্যার পাশাপাশি ইসরায়েল এখন অনাহারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। সাংবাদিকরাও এর শিকার হচ্ছেন। গাজায় আমি আমার আলজাজিরার সহকর্মী এবং তার পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছি। আনাস আল-শরিফ এবং তার সহকর্মীদের সর্বশেষ হত্যার সঙ্গে সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের শিকার মোট সাংবাদিকের সংখ্যা ৯ জনে দাঁড়িয়েছে।
তা সত্ত্বেও আমরা আমাদের পেশাগত কর্তব্য পালন অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিচ্ছি। ইসরায়েলিরা আমাদের এবং বিশ্বকে অন্ধকারে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমরা গণহত্যার খবর প্রকাশে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দলগুলোকে শক্তিশালী করার জন্য এবং বিশ্বব্যাপী দর্শকের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার জন্য আমরা অক্লান্ত পরিশ্রম করব, যাদের তথ্য পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তবে এর জন্য আন্তর্জাতিক সংহতি, সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু ও হত্যা বন্ধ করা, গাজা উপত্যকায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার এবং কার্যক্রমের স্বাধীনতা প্রদানের জন্য ইসরায়েলের ওপর পূর্ণ চাপ প্রয়োগ করা দরকার।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সাংবাদিকদের সুরক্ষা এবং গাজায় চলমান মানবিক বিপর্যয় ও গণহত্যা সম্পর্কে বিশ্বকে জানানোর জন্য যারা ঝুঁকি নেন তাদের নিরাপত্তার জন্য জরুরি এবং সিদ্ধান্তমূলকভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে। সাংবাদিকরা যাতে সহিংসতার ভয় ছাড়া দায়িত্ব পালন করতে পারেন তা নিশ্চিত করতে হবে। এর বাইরে যা কিছু করা হবে তা মত প্রকাশের স্বাধীনতার সবচেয়ে মৌলিক নীতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
আমরা গাজার সাহসী সাংবাদিকদের কাছে ঋণী, তাদের জোরালো কণ্ঠস্বরের জন্য। তাদের কাজগুলো ইতিহাসের প্রথম খসড়া হয়ে থাকবে, যেখানে ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদরা একবিংশ শতাব্দীতে চালানো সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যার ভয়াবহতা টেলিভিশনে প্রচারিত সংবাদে দেখবেন এবং অধ্যায়ন করবেন। যুদ্ধ ও সংঘাত সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য জানার অধিকার কোনো বিলাসিতা নয়; এটি বিশ্বব্যাপী জনগণের কল্যাণ, মানবাধিকারের সুরক্ষা এবং যুদ্ধাপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য বিশ্বব্যাপী প্রচেষ্টার অপরিহার্য অংশ। যখন সাংবাদিকদের থামিয়ে দেওয়া হয়, তখন আমরা সবাই বিভ্রান্তিকর তথ্য, প্রচারণা ও ক্ষমতার অনিয়ন্ত্রিত অপব্যবহারের ঝুঁকিতে পড়ি।
আমরা এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। যদি বিশ্ব সাংবাদিকদের হত্যা, অনাহার ও নির্যাতন সহ্য করতে থাকে, তাহলে কেবল সাংবাদিকতাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং জবাবদিহি, গণতন্ত্র ও আরো ন্যায়সংগত ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যুদ্ধে সাংবাদিকদের সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো জরুরিভাবে শক্তিশালী করে প্রয়োগ করতে হবে এবং এই আইন লঙ্ঘন করলে সরকারগুলোকে জবাবদিহি করতে হবে।
আন্তর্জাতিক সাংবাদিক কমিউনিটি এবং বিশ্বকে এই বিষয়ে আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। গাজার সাংবাদিকদের সাহস, অঙ্গীকার ও ত্যাগ আমাদের পূর্ণ সমর্থন ছাড়া আর কিছুই দাবি করে না। যুদ্ধের নির্মম সত্যের মুখোমুখি যারা দাঁড়িয়েছিলেন তাদের রক্ষা করার ক্ষেত্রে আমাদের নিষ্ক্রিয়তা ইতিহাসে এক বিরাট ব্যর্থতা হিসেবে লিপিবদ্ধ থাকবে।
দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত
অনুবাদ : জান্নাতুল ফেরদৌস নায়ার