কে হচ্ছেন ইরানের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট?

ইরান সরকার আগামী ২৮ জুন দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিন ধার্য করেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অনুগতদের নিয়ে গঠিত সংস্থা গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্যরা দেশটির প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের যাচাই-বাছাই করবেন। গত রোববার (২৬ মে) ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ইরনা প্রকাশিত খবরে  জানিয়েছে যে, নির্বাচনের প্রায় দু’সপ্তাহ আগে কাউন্সিল অনুমোদিত প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হবে।

আজ বৃহস্পতিবার (২৯ মে) থেকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম নিবন্ধন করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এই নিবন্ধন কার্যক্রম চলবে ৫ দিন।

প্রসঙ্গত, ইরানে এক মাসের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হতে যাচ্ছে। ১৯ মে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় ইরানের রক্ষণশীল প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি নিহত হবার পর তার পদ পূরণেরে জন্য এই নির্বাচন হচ্ছে। এরই মাঝে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কেবলমাত্র রক্ষণশীল প্রার্থীরাই যে অনুমোদন লাভ করতে পারে তার একটি সুস্পষ্ট পরিষ্কার চিত্র উঠে এসেছে।

এর আগে ২০২১ সালের নির্বাচনে রেকর্ড সংখ্যক কম ভোটারদের অংশগ্রহণে রাইসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। গার্ডিয়ান কাউন্সিল রাইসির সবচেয়ে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার ফলে অনেক ইরানি নির্বাচন সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, ওই নির্বাচনটি ছিল ৮৫ বছর বয়সী খামেনির শিষ্য রাইসীকে উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নেয়া যা তার সর্বোচ্চ নেতার হওয়ার লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়।

আগামী মাসের নির্বাচনে একজন সম্ভাব্য প্রার্থী হচ্ছেন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোখবার। তিনি মরহুম প্রেসিডেন্ট রাইসির প্রথম ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং ইরানের ইসলামপন্থী সংবিধানের শর্তানুসারে, রাইসির মৃত্যুর পর তিনি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম সারির একজন ছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক প্রচারণা সংস্থা ইউনাইটেড এগেনস্ট নিউক্লিয়ার ইরানের (ইউএএনআই)-এর পলিসি ডাইরেক্টর এবং ইরানের রাজনীতিবিষয়ক দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষক জেসন ব্রডস্কি বলেন, মোখবার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে নিবন্ধন করবেন কিনা সে সম্পর্কে তিনি মিশ্র সংকেত দেখতে পাচ্ছেন।

গত সোমবার (২৭ মে) ভয়েস অব আমেরিকার 'ফ্ল্যাশপয়েন্ট গ্লোবাল ক্রাইসিস' প্রোগ্রামকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি অন্যান্য সম্ভাব্য প্রতিযোগীর নিয়েও আলোচনা করেন।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনি পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাকে দেখতে চান? এমন প্রশ্নের জবাবে জেসন ব্রডস্কি বলেন, গার্ডিয়ান কাউন্সিল কোন প্রার্থীকে অযোগ্য ঘোষণা করে তা আমাদের দেখতে হবে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের এই রাউন্ডে ইরানের প্রচার মধ্যমে কয়েকজন ঘোষিত এবং সম্ভাব্য প্রার্থী রয়েছেন যাদের সম্পর্কে বলা হচ্ছে। আমি তাদের তালিকা সংক্ষেপে তুলে ধরছি।

একজন হলেন সাঈদ জালিলি। কট্টরপন্থী জালিলি সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সাবেক সেক্রেটারি ছিলেন এবং বর্তমানে কাউন্সিলে খামেনির প্রতিনিধি। জালিলি ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এগিয়ে নিতে জোরাল পদক্ষেপ সমর্থন করে আসছেন [যাকে তেহরান বলছে শান্তিপূর্ণ এবং পশ্চিমা শক্তিগুলো ভয় পায় যে ইরান একে পারমাণবিক অস্ত্র বিকাশের লক্ষ্যে করা হচ্ছে]। জালিলি ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট পদে তার প্রার্থিতা ঘোষণা করেছেন।

আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হচ্ছেন আলি লারিজানি। তিনি ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচনে অংশ গ্রহণে ইচ্ছুক বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে তিনি ক্ষমতাসীন সরকারের কাছ থেকে প্রার্থী হওয়ার সবুজ সংকেত পাওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত নন।

তিনি ২০২১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকারের দায়িত্ব পালনের পর বিব্রতকর পরিস্থিতিতে তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।

লারিজানি সম্ভবত সবচেয়ে যোগ্য সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী যিনি ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের আমলাতন্ত্রের নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল ছিলেন।

তিনি সংস্কৃতি মন্ত্রী, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম ইসলামিক রিপাবলিক অফ ইরান ব্রডকাস্টিং (আইআরআইবি-র) প্রধান এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি এবং সংসদের স্পিকার ছিলেন।

ইরানের সড়ক ও নগর উন্নয়ন মন্ত্রী মেহেরদাদ বাজরপাশকেও প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের প্রশাসনের সাবেক এক কর্মকর্তা। এর আগে বাজরপাশ বাসিজ মিলিশিয়া সংগঠনের সদস্য ছিলেন।

তিনি ‘হিজবল্লাহি’ (ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের একনিষ্ঠ সমর্থক) বলে পরিচিত তরুণ প্রজন্মের সদস্য, যাদের খামেনি গড়ে তুলেছেন।

আরেকজন প্রার্থী হচ্ছেন পারভিজ ফাত্তাহ। তিনি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এক্সিকিউশন অফ ইমাম খামেনিজ অর্ডারের (ইআইকেও) প্রধান। তিনি ইরানের শীর্ষ সামরিক বাহিনী, ইসলামিক রেভ্যুলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)সাবেক কর্মকর্তা এবং বেশ কয়েকটি অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান।

যেমন, ফাত্তাহ মোস্তাজাফান ফাউন্ডেশন দাতব্য সংস্থা এবং আইআরজিসি কো-অপারেটিভ ফাউন্ডেশনের নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। তার ওপরে যুক্তরাষ্ট্র আরোপিত একাধিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

খোমেনি তার পরবর্তী প্রেসিডেন্টের মাঝে কি ধরণের গুণাবলী বা যোগ্যতা দেখতে চান বলে আপনি মনে করেন? এমন এক প্রশ্নের জবাবে ব্রডস্কি বলেন, আমি মনে করি, খামেনি ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের উত্তরাধিকারী কে হবেন তার ওপরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখেছেন। এটাই তার সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসের এক স্পর্শকাতর মুহূর্তে তিনি এমন কাউকে প্রেসিডেন্ট পদে বসাতে চান, যিনি হবেন অত্যন্ত বিশ্বস্ত।

এটা ভুলে গেলে হবে না যে ইরানের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট চার বছরের জন্য ক্ষমতায় থাকবেন। সুতরাং, খামেনি লম্বা সময়ের জন্য এই পদটি পূরণ করছেন এবং তিনি নিশ্চিত করতে চান যে প্রেসিডেন্ট পদে যিনিই নির্বাচিত হবেন তিনি যেন তার উত্তরাধিকারী নির্বাচন প্রক্রিয়ার অগ্রাধিকারগুলোর ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা সৃষ্টি না করেন। 

সূত্র : ভয়েস অব আমেরিকা

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2024 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //