ঘুরে দাঁড়াচ্ছে রুশ অর্থনীতি

ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে রাশিয়া। এর প্রভাবে ২০২২ সালে দেশটির অর্থনীতি ২.১ শতাংশ সংকুচিত হয়। ২০২৩ সালে রুশ অর্থনীতি বার্ষিক ৩.৬ শতাংশ হারে প্রসারিত হয়। ২০২৪ সালে জিডিপি ৩.৫ শতাংশ বাড়বে বলে প্রথমে প্রক্ষেপণ করা হয়। পরে তা সংশোধন করে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য ১.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়। অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থাও অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে শ্লথগতির কথা জানায়।

তবে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) পূর্বাভাসের তুলনায় বেশি প্রবৃদ্ধি দেখেছে রুশ অর্থনীতি। ২০২৩ সালের একই সময়ের তুলনায় দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫.৪ শতাংশ। 

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যান সংস্থা রোসস্ট্যাটের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে কয়েকটি খাতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখেছে রাশিয়া। এর মধ্যে রিটেইল বা খুচরা খাতে ১০.৫ শতাংশ, উৎপাদন খাতে ৮.৮ এবং নির্মাণ খাতে প্রবৃদ্ধি ঘটেছে ৩.৫ শতাংশ। 

ইউক্রেনে বিশেষ অভিযান শুরুর পর থেকে রাশিয়ার অর্থনীতির ওপর ১৬ হাজারেরও বেশি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে পশ্চিমা দেশগুলো। উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়াকে পঙ্গু করে দেওয়া। যাতে তারা যুদ্ধে অর্থায়ন করতে ব্যর্থ হয়। ইউক্রেনের বর্তমান সরকারের ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য হওয়ার লক্ষ্যে মার্কিন আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্যও রাশিয়াকে পঙ্গু করা দরকার ছিল।

নিষেধাজ্ঞা আরোপের শুরু থেকেই, বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হ্রাস পেতে পারে। কারণ যে দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, তারা অন্যান্য দেশের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপন করবে। যেমন-ইউরোপে রাশিয়া তাদের বাণিজ্য হারানোর পর তার অনেকটাই পুষিয়ে নিয়েছে চীনের সঙ্গে তাদের বাণিজ্য ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করে।

বেশিরভাগ রুশ নাগরিক, বিশেষ করে যারা বড় শহরগুলোতে বাস করেন তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয় নয়। মূল্যস্ফীতি উচ্চমাত্রায় রয়েছে, তবে শ্রমিকদের উচ্চ বেতনের কারণে তা পুষিয়ে যাচ্ছে। যেহেতু বেকারত্বের হার এখন ঐতিহাসিকভাবে প্রায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে, মাত্র ৩ শতাংশ। ইউরোপের যে কোনো বড় অর্থনীতির দেশের চেয়ে অনেক কম। জার্মানিতে ৫.৬ শতাংশ, ফ্রান্সে ৭.৩ শতাংশ মানুষ বেকার।

কম্পিউটার চিপ ও অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য যন্ত্রাংশ আমদানির ওপর রাশিয়া ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এ ধরনের পণ্য আমদানি রাশিয়া তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে করছে; অথবা বেসামরিক ভোক্তার লেবাসে করছে। তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে রাশিয়া শ্যাডো ভেসেল বা ছায়া জাহাজ ব্যবহার করছে। একটি শ্যাডো ভেসেল রাশিয়া থেকে তেল বহন করে, সমুদ্রের মাঝখানে যায়। তারপর একটি নামাঙ্কিত ও বীমাকৃত জাহাজে তেল স্থানান্তর করে। রাশিয়া এভাবে ধূম্রজাল তৈরি করছে, যাতে কেউ বুঝতে না পারে তেল কোথা থেকে আসছে এবং পশ্চিমাদের আরোপ করা ৬০ ডলার মূল্যসীমা (প্রাইস ক্যাপ) এড়াতে পারছে। এভাবে যারা রাশিয়ার তেল কেনে, তাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু মিত্রদেশও আছে।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, রাশিয়ার অর্থনীতি এখন একটি যুদ্ধের অর্থনীতি। রুশ অর্থনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক নিকোলাস মুল্ডার রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্পকে এই প্রবৃদ্ধির পেছনের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষ্যমতে, ‘পুতিন সম্প্রতি দাবি করেছেন যে, যুদ্ধের শুরু থেকে প্রায় ৫ লাখ নতুন কর্মী এই শিল্পে যোগ দিয়েছেন। তারা বেশি অর্থ উপার্জন করায় এটি অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’ আধুনিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাশিয়া তার জিডিপির ৬ শতাংশ সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করেছে, যা রাশিয়ার অর্থনীতির প্রধান চালক হয়ে উঠেছে।

তবে শুধু সামরিক খাত নয়; ভোক্তা ব্যয়, শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধিকেও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শিল্প উৎপাদন ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ বেড়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উল্লম্ফন ঘটিয়েছে। এটি রাশিয়ার অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতাকেই নির্দেশ করে। 

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2024 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //