বদলে যাচ্ছে সৌদি অর্থনীতি

জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কাটিয়ে নতুন আঙ্গিকে গড়ে উঠছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী সৌদি আরবের অর্থনীতি। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) তেল ছাড়া অন্যান্য খাতের অবদানে গত বছর রেকর্ড গড়েছে দেশটি। জিডিপির ৫০ শতাংশ এসেছে তেলবহির্ভূত খাত থেকে।

চলতি বছর দেশটির জ্বালানি তেলবহির্ভূত অর্থনীতি ৪ দশমিক ৮ শতাংশ হারে বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সৌদি ক্যাপিটাল মার্কেট কোম্পানি রিয়াদ ক্যাপিটাল। জ্বালানি তেলভিত্তিক অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে সৌদি সরকার যে নীতি অবলম্বন করেছে তা এ ক্ষেত্রে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করা হচ্ছে।

কয়েক বছর আগেও আঞ্চলিক পুঁজিবাজারগুলোর তুলনায় সৌদি আরবের পুঁজিবাজারে উল্লেখ করার মতো খবর ছিল না। ২০২২ সালের পর থেকে এ বাজারে ৭০টি কোম্পানি গণপ্রস্তাব নিয়ে এসেছে। দুবাইভিত্তিক ইস্ট ক্যাপিটালের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক এমের অ্যাকাকম্যাক মনে করেন, গত ১০ বছরে সৌদি পুঁজিবাজার ৫০ বছরের অগ্রগতি অর্জন করেছে। পর্যটনভিত্তিক কোম্পানি বা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠাগুলো হয়ে উঠেছে নতুন সৌদি অর্থনীতির বড় খেলোয়াড়। শরীরচর্চা বিষয়ক কোম্পানি লিজাম স্পোর্টসের শেয়ারের দাম গত ১৮ মাসে ৮৫ শতাংশ বেড়েছে। সরকারের ডিজিটাল কর্মকাণ্ড বিষয়ক ঠিকাদারি পাওয়ার পর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক কোম্পানি এলম কোর শেয়ারের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। 

সৌদি আরবে বন্ড বাজারও গড়ে উঠছে। দেশটির ৩০ বছর মেয়াদি সৌদি পেপার বন্ডে একই ধরনের মার্কিন বন্ডের তুলনায় ২ শতাংশ বেশি সুদ পাওয়া যাচ্ছে। দেশটির সরকারের ঋণ এখনো জিডিপির ৩০ শতাংশের কম। আর রিজার্ভের পরিমাণ ৪৪ হাজার কোটি ডলার।

সৌদি অর্থনীতি ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, ২০২১-২২ সালে শিল্প ও বিনোদন খাতে ব্যাপক বৃদ্ধি দেখা গেছে। ১০৬ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে এই খাতে। খাদ্য ও বাসস্থানের মতো খাতে ৭৭ শতাংশ এবং পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ২৯ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৩ সালে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বিনোদনের মতো সামাজিক পরিষেবা খাতে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি নথিভুক্ত করা হয়েছে। এরপর রয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত। এই ক্ষেত্রে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বাণিজ্য, রেস্তোরাঁ ও হোটেল খাতে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। গত দুই বছরে ‘অভূতপূর্ব’ প্রবৃদ্ধি ঘটেছে পর্যটন খাতে। যার প্রভাব পড়েছে পরিষেবা খাতেও। এই খাতে ৩১৯ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা পর্যটন এবং বিনোদন গন্তব্যের দাবি করছে সৌদি সরকার।

সৌদির শাসনকর্তা হিসেবে একজন বাদশাহ থাকলেও আসল ক্ষমতা এমবিএস খ্যাত যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের হাতে। তার অধীনে দেশটিতে নারী কর্মসংস্থান দ্বিগুণ হয়েছে। বিনোদন ও ট্যুরিজমের সব ব্যবস্থা ও অবকাঠামো নিশ্চিত করা হয়েছে। চরম রক্ষণশীল অবস্থান থেকে সরে এসেছে দেশটি। এমনকি পবিত্র শহর মক্কা ও মদিনা বাদে অন্যান্য শহরে বিদেশিদের জন্য পানশালা ও নাইটক্লাবের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। 

এখন থেকে ৮ বছর আগে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাকেঞ্জির সহায়তায় এমবিএস ভিশন-২০৩০ মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেন। এর অনেক অংশ রয়েছে, যারা কিছু কিছু আবার ‘গিগাপ্রজেক্ট’। এসবের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য অংশ হলো ‘নিওম’। দেশটির উত্তর-পশ্চিম এলাকায় এর আওতায় গড়ে তোলা হচ্ছে একটি অত্যাধুনিক শহর, যার নাম ‘দ্য লাইন’। এই মেগাসিটি তৈরিতে খরচ হচ্ছে এক ট্রিলিয়ন ডলার বা এক লাখ কোটি ডলার। বিলাসবহুল সব ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এই প্রকল্পে। তেলভিত্তিক জ্বালানি থেকেও সরে আসছে দেশটি। সৌর বিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে তারা। 

রিয়াদ ক্যাপিটাল বলছে, সৌদি আরবের মূল্যস্ফীতির হার ২০২৪ সালে ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে, ২০২৫ সালে যা সামান্য বেড়ে ২ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছতে পারে। ১৮ মাসে দেশটিতে জ্বালানি তেলের উৎপাদন বেড়ে দিনপ্রতি ১০ মিলিয়ন ব্যারেল ছাড়িয়ে যাবে। ২০২৫ সালে এ উৎপাদন আগের বছরকে ছাড়িয়ে যাবে। উৎপাদন বাড়লেও ২০২৪ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে তেল খাতে অবদান ঋণাত্মক ২ দশমিক ২ শতাংশ থাকতে পারে।

সৌদির জ্বালানি তেলবহির্ভূত অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি গত অর্থবছরগুলোতেও অব্যাহত ছিল। এ খাতে ২০২২ সালে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৬ ও ২০২৩ সালে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। রিয়াদ ক্যাপিটাল জানিয়েছে, দেশটির জ্বালানি তেলবহির্ভূত অর্থনীতি ২০২৫ সালে আরও ত্বরান্বিত হয়ে ৫ দশমিক ২ শতাংশের হারে বাড়বে। সামনের বছরগুলো প্রবৃদ্ধির এই হার আরও দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2024 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //