ইসরায়েল কি হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবেই

যারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না, তারা অতীত পুনর্যাপন করার দুর্ভাগ্য বহন করে। কথাটা উইনস্টাইন চার্চিলই বলুন আর জর্জ সান্টায়ানাই বলুন, এর দার্শনিক গুরুত্ব আজও অনস্বীকার্য। এই কথাটা আজ পুরোপুরি মিলতে যাচ্ছে দখলদার ও যুদ্ধবাদী ইসরায়েলের ক্ষেত্রে। গাজায় রণে ভঙ্গ না দিয়েই তারা এখন লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে বড় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে।

ইসরায়েলের ভেতর থেকেই দ্বন্দ্ববাদী দম্ভসুর শোনা যাচ্ছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, হিজবুল্লাহর সঙ্গে সর্বাত্মক যুদ্ধ ‘অতি-আসন্ন’। আইডিএফ তথা ইসরায়েলি প্রতিরক্ষাবাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্তা বলেছেন, হিজবুল্লাহ-বিরোধী অভিযানের জন্য একটি পরিকল্পনা অনুমোদন হয়ে গেছে। অথচ গাজার শাসকগোষ্ঠী, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধ কিন্তু এখনো থামেনি। কিংবা ইসরায়েলের কথিত লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি। না তারা হামাসকে নির্মূল করতে পেরেছে, আর না পেরেছে হামাসের হাতে এখনো জীবিত ৮০ জিম্মিকে মুক্ত করতে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে তাই নিজ দেশেই বিক্ষোভ আরও বড় হয়েছে। তার যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় ভাঙন লেগেছে, বিরোধীদলীয় নেতারা তার পদত্যাগের দাবি জানাচ্ছেন।

হামাসের গত ৭ অক্টোবরের হামলার প্রতিশোধ নিতে ওই দিন থেকেই অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় আগ্রাসন চালাচ্ছে ইসরায়েল। ওই দিন থেকেই হামাসের পক্ষে সংহতি জানিয়ে আইডিএফকে প্রতিহত করতে ইসরায়েলের দক্ষিণ সীমান্তে ইরানের সরবরাহকৃত ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট ও ড্রোন দিয়ে হামলা চালাচ্ছে হিজবুল্লাহ। এরই মধ্যে ওই সীমান্তাঞ্চল থেকে ৬০ হাজার বাসিন্দা বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এই লোকেরা নেতানিয়াহু সরকারকে হিজবুল্লাহবিরোধী অবস্থান নিতে স্বাভাবিকভাবেই চাপ দিচ্ছে। ইসরায়েলি লোকসমাজে সম্প্রতি আরও আতঙ্ক ধরিয়ে দিয়েছে একটি ভিডিওচিত্র। ড্রোন উড়িয়ে ধারণ করা ওই ভিডিওতে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর হাইফার সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনাগুলো দেখিয়েছে। এই শহরে তিন লাখ লোকের বাস। এখনো হিজবুল্লাহ সেখানে হামলা করেনি। কিন্তু এ যে তাদের নতুন টার্গেট নয়,  এর কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? এই ভয়ই পাচ্ছে ইসরায়েল, বিশেষ করে হাইফার ইসরায়েলিরা। 

নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভার সবচেয়ে কট্টর ডানপন্থি সদস্য বেজালের স্মোৎরিচ ও ইতামার বেন গভির প্রকাশ্যে বলেছেন, ইসরায়েলের উচিত দক্ষিণ লেবাননে এখনই আগ্রাসন চালানো। এমনকি এই চাপ না থাকলেও নেতানিয়াহুর কাছে এমন আগ্রাসনের পক্ষে অনেক কারণ আছে। কারণ দক্ষিণ ইসরায়েলে তার দল লিকুদের জনপ্রিয়তা অনেক বেশি। তবে যুক্তরাষ্ট্র (ইসরায়েলের প্রধান মিত্র) এবং ইরান (হিজবুল্লাহর প্রধান মিত্র)-উভয়ই চেষ্টা করছে এই যুদ্ধ যেন না বাধে। অন্তত প্রকাশ্যে তাদের এমন পদক্ষেপই নিতে দেখা যাচ্ছে। এর আগেও লেবাননে আগ্রাসন চালিয়েছে ইসরায়েল এবং ক্ষতিহীন সাফল্য কিন্তু পায়নি তারা। 

ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা (পিএলও) এক সময় জর্ডান থেকে কার্যক্রম চালাত, ইসরায়েলে আঘাত হানত। ১৯৭০ সালে জর্ডান থেকে সরে গিয়ে তারা লেবাননে জায়গা পায়। সেখান থেকে তারা দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলা চালানো শুরু করে। এই ফিলিস্তিনি সশস্ত্র যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ১৯৭৮ সালে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে আগ্রাসন চালায়। এতে খুব একটা সাফল্য তারা পায়নি। পিএলওর যোদ্ধারা আবার সীমান্তে ফিরে দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলা করে। এরপর ১৯৮২ সালে পিএলওকে নির্মূলের লক্ষ্যে রাজধানী বৈরুতসহ পুরো লেবাননে আগ্রাসন চালায় ইসরায়েল। এই সময় পিএলও নেতৃত্ব ও এর যোদ্ধাবাহিনী তিউনিসিয়ায় চলে যায়।

এই দুই আগ্রাসনের কারণে দক্ষিণ লেবাননের শিয়া জনগোষ্ঠী যে আরও বেশি উগ্রবাদী হয়ে উঠেছিল, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ যে আরও বেশি জমাট বেঁধে ছিল, তা অস্বীকার করা যায় না। আর এই সুবাদেই ইরান শিয়া নেতাদের মাধ্যমে লেবাননে প্রতিষ্ঠা করে হিজবুল্লাহ (আল্লাহর দল)। ইসরায়েলের জন্য পিএলও আর কী হুমকি ছিল, আরও বেশি হুমকি হয়ে উঠল এই হিজবুল্লাহ।

২০০৬ সালে দক্ষিণ লেবাননে তাদের হাতে জিম্মি দুই সেনাকে উদ্ধারে অভিযান চালিয়েছিল আইডিএফ। পারেনি। উল্টো দুই বছর পর তাদের মৃতদেহের বিনিময়ে বন্দি লেবানিজদের ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছিল ইসরায়েল। ইরানের অব্যাহত সমর্থনে হিজবুল্লাহ এখন আরও বেশি শক্তিশালী। ফলে হিজবুল্লাহকে নাড়াতে গেলে নিজের গদিই নড়ে যায় কিনা, সেই ভয় আছে নেতানিয়াহুর মনে। হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ সুর শানিয়েছেন, লেবাননকে ছুঁতে আসলে আগুনের ফুৎকারে ছারখার হতে হবে। আবার একসঙ্গে দুই যুদ্ধ চালানোর খেসারত খুব খারাপভাবে দিতে হতে পারে, সে ইতিহাস রচনা করে গেছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ; আফগানিস্তান যুদ্ধ-সাফল্য না পাওয়ার আগেই ইরাক আগ্রাসন করে বসেছিলেন তিনি।

এখন দেখার পালা, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নাকি ইতিহাস থেকে শিক্ষা। অনেকেই বলে, ইতিহাস থেকে আমরা এই শিক্ষা পাই যে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2024 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //