হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

 হুমায়ুন আজাদ

হুমায়ুন আজাদ

‘জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।

নষ্টদের দানব মুঠোতে ধরা পড়বে মানবিক

সব সংঘ পরিষদ;-চ’লে যাবে অত্যন্ত উল্লাসে

চ’লে যাবে এই সমাজ সভ্যতা-সমস্ত দলিল-

নষ্টদের অধিকারে ধুয়েমুছে, যে-রকম রাষ্ট্র

আর রাষ্ট্রযন্ত্র দিকে দিকে চ’লে গেছে নষ্টদের

অধিকারে। চ’লে যাবে শহর বন্দর গ্রাম ধানখেত

কালো মেঘ লাল শাড়ি শাদা চাঁদ পাখির পালক

মন্দির মসজিদ গির্জা সিনেগগ নির্জন প্যাগোডা।

অস্ত্র আর গণতন্ত্র চ’লে গেছে, জনতাও যাবে;

চাষার সমস্ত স্বপ্ন আঁস্তাকুড়ে ছুঁড়ে একদিন

সাধের সমাজতন্ত্রও নষ্টদের অধিকারে যাবে।’

১৯৮৫ সালে হুমায়ুন আজাদ একখানি কবিতার বই প্রকাশ করেছিলেন যার নাম ‘সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’। 

এই কাব্যের নাম কবিতাটি সমগ্র পৃথিবীর জন্য অমোঘ ভবিষ্যদ্বাণী বললে সম্ভবত ভুল বলা হবে না। অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে তিনি যখন উচ্চারণ করেন ‘আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’ তখন বোঝা যায় পার্থিব ইতিহাস আদ্যোপান্ত পাঠ করেই তিনি এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন। উপরিউক্ত সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে কবিতাটি মাত্র ছত্রিশ পঙ্ক্তির। এই ছত্রিশ পঙ্ক্তির মধ্যেই তিনি এঁকে ফেলেছেন পৃথিবীর ভবিষ্যৎ চিত্র। 

আমরা যেই শ্যামল সুন্দর- স্নেহময়ী ধরিত্রীমাতার সন্তান-সেই শ্যামল ধরিত্রী একদিন চলে যাবে নষ্টদের অধিকারে। আদিম-বন্য-অমানবিক যে স্তর থেকে নিরন্তর সংগ্রাম করে মানুষ আজ এই আধুনিক উন্নত সমাজজীবন বিনির্মাণ করেছেন, সেই সমাজ সভ্যতাও একদিন চলে যাবে নষ্টদের অধিকারে। কথা ছিল রাষ্ট্রই নিরাপত্তা দেবে রাষ্ট্রে বসবাসরত সব নাগরিককে, কিন্তু দেখা যাচ্ছে পৃথিবীর সব রাষ্ট্রই আজ চলে গেছে নষ্ট-ভ্রষ্ট-পাষণ্ডদের পদতলে। ধর্মহীন মানুষকে ধর্মই একদিন দিয়েছিল মানবিক শৃঙ্খলা, কিন্তু সেই ধর্মও আজ চলে গেছে নষ্টদের দখলে। অস্ত্র আজ নষ্টদের দখলে, গণতন্ত্র নষ্টদের দখলে, এমনকি নতুন জীবনব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থার যে রঙিন স্বপ্ন দেখিয়েছিল সুকোমল সমাজতন্ত্র তাও আজ নষ্টদের অধিকারে চলে গেছে। 

নষ্টরাই আজ সব সংঘ ও পরিষদের নিয়ন্ত্রক, তাদের হাতের দানব মুঠোতে ‘শহর বন্দর গ্রাম ধানক্ষেত কালোমেঘ লাল শাড়ি শাদা চাঁদ পাখির পালক’ সবকিছু একে একে বন্দি হয়ে যাচ্ছে। তাহলে কি মাত্র ৩০ বছর আগে হুমায়ুন আজাদের উচ্চারণ করা সেই ভবিষ্যদ্বাণীই ফলতে শুরু করেছে আমাদের আশাহীন জীবনে? 

যারা সৌন্দর্যপ্রিয়, যারা প্রতিভাবান, যারা জীবনভর অপরূপ শিল্পকলা সৃষ্টি করে প্রত্যাশা করেছে অমূল্য অমরতা তারাও আক্রান্ত হবে নষ্টদের ক্ষতিকর জীবাণু দ্বারা। নষ্টদের কবলে পড়ে রবীন্দ্রনাথের মতো বিশ্বগ্রাসী দুর্লভ প্রতিভা বিলুপ্ত হবে, সুরস্রষ্টা রবিশঙ্কররা হবেন বিস্মৃত। নষ্টদের হাত থেকে কিছুই রেহাই পাবে না, না জোছনা, না ভাটিয়ালি, না কাশবন, না মাঠের রাখাল। সবকিছুকেই নতজানু হতে হবে নষ্টদের নোংরা পায়ে। দিকে দিকে আজ তা-ই হচ্ছে।

আজ বহুমাত্রিক কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদের ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি একাধারে একজন কবি, ঔপন্যাসিক, সমালোচক, ভাষাবিজ্ঞানী, কিশোর সাহিত্যিক ও কলাম প্রাবন্ধিক। ৭০টি'র উপর তার রচনা রয়েছে। তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রথাবিরোধী লেখক। 

  • মৌলি, তোমাকে বলি, তোমার মতোই আমি এক সময় ছিলাম ছোটো। ছিলাম গ্রামে, গাঁয়ে, যেখানে মেঘ নামে সবুজ হয়ে নীল হয়ে লম্বা হয়ে বাঁকা হয়ে। শাপলা ফোটে; আর রাতে চাঁদ ওঠে শাদা বেলুনের মতো। ওড়ে খেজুর ডালের অনেক ওপরে। যেখানে এপাশে পুকুর ওপাশে ঘরবাড়ি। একটু দূরে মাঠে ধান সবুজ ঘাস কুমড়োর হলদে ফুল। একদিন আমি কুমড়োর ফুল ভুলে লাউয়ের ডগার হাতছানি অবহেলা করে চাঁদের দিকে পিঠ ফিরিয়ে চলে আসি শহরে ঢাকায়...।

হুমায়ুন আজাদ মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার রাড়িখালের স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু ইন্সটিটিউশন থেকে ১৯৬২ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় পুরো পূর্ব পাকিস্তানে ২১তম হয়েছিলেন। একটিই বোর্ড ছিল তখন “ইস্ট পাকিস্তান সেকেন্ডারী এডুকেশন বোর্ড”। তারপর অনিচ্ছায় ঢাকা কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি, যদিও শওকত ওসমান ছাড়া আর কোনো শিক্ষকই দাগ কাটতে পারেননি তার মনে। জীবনের সবচেয়ে খারাপ ফল ছিল এটাই দ্বিতীয় শ্রেণীতে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা।

১৯৬৪ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। মেধাবী ছাত্র আজাদ ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ডিগ্রি এবং ১৯৬৮ সালে একই বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন; উভয় ক্ষেত্রেই তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। ১৯৭৬ সালে তিনি যুক্তরাজ্যের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল- বাংলা ভাষায় সর্বনামীয়করণ।

তার স্ত্রী লতিফা কোহিনুর। তার দুই কন্যা মৌলি আজাদ, স্মিতা আজাদ এবং একমাত্র পুত্র অনন্য আজাদ। 

হুমায়ুন আজাদ যখন ৬০-এর দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়ছিলেন, তখন ভাষাবিজ্ঞানে চম্‌স্কি-উদ্ভাবিত সৃষ্টিশীল রূপান্তরমূলক ব্যাকরণ তত্ত্বটি আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল। আজাদই প্রথম এই তত্ত্বের কাঠামোর উপর ভিত্তি করে বাংলা ভাষার গবেষণার একটি অবহেলিত ক্ষেত্র বাক্যতত্ত্ব নিয়ে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণাকর্ম সম্পাদন করেন ও বাংলা ভাষার গবেষণাকে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানে উত্তরণ ঘটান। আজাদের পিএইচডি অভিসন্দর্ভের নাম ছিল Pronominalization in Bengali (অর্থাৎ বাংলা সর্বনামীয়করণ)। পরবর্তীতে এটি একই শিরোনামের ইংরেজি বই আকারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত হয়। এরপর ১৯৮৪ সালে আজাদ বাংলা বাক্যতত্ত্বের উপর বাক্যতত্ত্ব নামে একটি বাংলা বই প্রকাশ করেন। একই সালে তিনি বাঙলা ভাষা শিরোনামে দুই খণ্ডের একটি সঙ্কলন প্রকাশ করেন, যেটিতে বাংলা ভাষার বিভিন্ন ক্ষেত্রের উপর বিগত শতাধিক বছরের বিভিন্ন ভাষাবিদ ও সাহিত্যিকের লেখা গুরুত্বপূর্ণ ভাষাতাত্ত্বিক রচনা স্থান পায়। এই তিনটি গ্রন্থই ছিল তৎকালীন বাংলা ভাষাবিজ্ঞানের ইতিহাসে অভূতপূর্ব ঘটনা। 

পরবর্তীতে আজাদ তুলনামূলক-ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান ও অর্থবিজ্ঞানের উপর দুইটি সংক্ষিপ্ত প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তক লেখেন। ৯০-এর দশকের শেষের দিকে আজাদ বাংলা ভাষার একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ রচনার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং এই ব্যাপারে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ব্যাপক পরিকল্পনাও যে তিনি করছিলেন, তার বিভিন্ন উক্তিতে তার প্রমাণ মেলে। তবে দুর্ভাগ্যবশত তিনি তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি।

আজাদ একজন প্রশিক্ষিত ভাষাবিজ্ঞানী। পিএইচ ডি গবেষণার অংশ হিসাবে তিনি চমস্কীয় ব্যাকরণের কাঠামোয় কাজ করেছেন। তার ইংরেজি বইটি এবং বাক্যতত্ত্ব এ গবেষণার ফল। 

অন্যান্য রচনায় তিনি মূলত প্রথাগত ব্যাকরণের বাইরে এসে বর্ণনামূলক বা রূপান্তরমূলক সৃষ্টিশীল ধারায় বাংলা ভাষা ব্যাখ্যার পক্ষে প্রাজ্ঞ প্রচার চালিয়েছেন। তিনি বাংলা ব্যাকরণের প্রচলিত কাঠামোর আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিস্তর লিখেছেন। বস্তুত বাংলাদেশে ‘প্রথাগত ব্যাকরণ’ কথাটা এতটা প্রচলিত হয়েছে তার লেখালেখি থেকেই। নতুন ব্যাকরণ লেখার একটা প্রস্তাবও তিনি দিয়েছিলেন; যদিও এ ধারায় নিজে অগ্রসর হননি। তার নিজের গবেষণায় অবশ্য তিনি চমস্কীয় ব্যাকরণের একটা ধারাকে কাঠামো হিসাবে ব্যবহার করে বাংলা ভাষার অংশবিশেষ বিশ্লেষণ করেছেন। পাঠের অভিজ্ঞতা থেকে নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, যথেষ্ট আয়তনের বই দুটি সুশৃঙ্খল আর সুখপাঠ্য।

হুমায়ুন আজাদের ভাষাবিজ্ঞান চর্চার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এই শৃঙ্খলা আর স্বচ্ছতা। মনোরম গদ্যে তিনি লিখেছেন, তথ্য-উপাত্তকে পদ্ধতিমাফিক সাজিয়েছেন এবং গদ্য আর গদ্যবাহিত ভাবের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছেন। সে এতটাই যে, তার ভাষাবিষয়ক বিপুল রচনায় অস্বচ্ছ পরিভাষা আর সংজ্ঞার্থ ব্যবহৃত হয়নি বললেই চলে। তিনি নিজে যেসব পরিভাষা বানিয়েছেন সেগুলো তো স্পষ্ট বটেই, এমনকি প্রচলিত যেসব পরিভাষা ব্যবহার করেছেন সেগুলোর মধ্যেও হয় স্বচ্ছতা আমদানি করেছেন অথবা বেছে নিয়েছেন অপেক্ষাকৃত সরলটি। সুশৃঙ্খল ভাষা-আলোচনা আর ভাষা-বিশ্লেষক গদ্যের স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে আজাদ অ্যাকাডেমিক অঙ্গনে অনন্য।

সাহিত্যকৃতি 

কবিতা:

বাংলা সাহিত্যের কাব্যজগতে হুমায়ুন আজাদ এক অনন্য আলোকিত নাম। তিনি বাংলা কবিতাকে তার বহুমাত্রিক লেখনীর মাধ্যমে দিয়ে গেছেন একটি সৃজনশীল ধারা। জীবনের কাছে দায়বদ্ধতা থেকে তিনি লিখেছেন অজস্র কবিতা। তার প্রবন্ধ ও কথাসাহিত্য সব প্রজন্মের প্রেরণার অন্যতম উৎস। ব্যতিক্রমী উপস্থাপন ভঙ্গিমায় তিনি সাজিয়েছেন বাংলা কবিতাকে। প্রথাবিরোধী লেখক হিসেবে তিনি পাঠকের হৃদয়ের মণিকোঠায় ঠাঁই পেয়েছেন। ভাস্বর হয়ে আছেন বাংলা সাহিত্য জগতে। আমৃত্যু তিনি প্রথাবদ্ধ কুসংষ্কারচ্ছন্ন পশ্চাদমুখী সমাজ-রাষ্ট্রের বদ্ধ শিকল থেকে মানুষকে মুক্তবুদ্ধির জ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন করতে চেয়েছিলেন।

তার প্রথম কাব্যগন্থের নাম ‘অলৌকিক ইস্টিমার’- যা প্রথম প্রকাশিত হয় পৌষ, ১৩৭৯ বঙ্গাব্দে (জানুয়ারি ১৯৭৩)। কাব্যগ্রন্থটি তিনি উৎসর্গ করেন ১৯৬৮-৭২ এর রাতদিনগুলোর উদ্দেশে। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘জ্বলো চিতাবাঘ’, প্রথম প্রকাশ হয় ফাল্গুন, ১৩৮৬ বঙ্গাব্দে (মার্চ ১৯৮০), ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’ তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ, প্রথম প্রকাশের সময় বৈশাখ ১৩৯২ বঙ্গাব্দ (এপ্রিল, ১৯৮৫)। কাব্যগ্রন্থটি বাংলাভাষার সাম্প্রতিক সময়ের দুইজন জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ (এইক্ষেত্রে হুমায়ূনের হু-টা অন্য রকম হওয়ার কথা) এবং ইমদাদুল হক মিলনকে উৎসর্গিত। ১৩৯৩ বঙ্গাব্দের ফাল্গুনে (মার্চ ১৯৮৭) প্রকাশিত হয় তার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘যতোই গভীরে যাই মধু যতোই ওপরে যাই নীল’, ‘আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে’ প্রকাশিত হয় ১৩৯৬ বঙ্গাব্দের ফাল্গুনে (ফেব্রুয়ারি ১৯৯০) প্রথমবারের মতো। এটি তার পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ। 

এর আট বছর পর ১৪০৪ এর ফাল্গুনে (ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮) প্রকাশিত হয় তার ষষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ ‘কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু’। কাব্যগ্রন্থটি কবি তার ‘প্রিয় মৃতদের জন্য’ উৎসর্গ করেন। সপ্তম কাব্যগ্রন্থ ‘পেরোনোর কিছু নেই’ প্রকাশিত হয় ১৪১০ বঙ্গাব্দের মাঘ (ফেব্রুয়ারি, ২০০৪) মাসে। এটিই হুমায়ুন আজাদের শেষ কাব্যগ্রন্থ। তবে হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর পর বঙ্গাব্দ ১৪১১ এর ফাল্গুনে (ফেব্রুয়ারি, ২০০৫) এই সাতটি কাব্যগ্রন্থসহ আরো কিছু অগ্রন্থিত ও অনূদিত কবিতা নিয়ে তার ‘কাব্যসমগ্র’ প্রকাশিত হয়।

উপন্যাস

মূলত গবেষক ও প্রাবন্ধিক হলেও হুমায়ূন আজাদ ১৯৯০-এর দশকে একজন প্রতিভাবান ঔপন্যাসিক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। ২০০৪ সালে মৃত্যু অবধি তার প্রকাশিত উপন্যাসের সংখ্যা ১৩। তার ভাষা দৃঢ়, কাহিনীর গঠন সংহতিপূর্ণ ও রাজনৈতিক দর্শন স্বতঃস্ফূর্ত। তবে কাহিনীতে যৌনতার ব্যবহার কখনো কখনো মাত্রাতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনীয় হয়েছে বলে তিনি সমালোচিত হয়েছেন। 

শেষ দিককার কয়েকটি উপন্যাসে তার দৃষ্টিভঙ্গি মূলত রাজনৈতিক রচনার শিল্পরূপকে ক্ষুণ্ণ করেছে বলে প্রতীয়মান হয়। মূলত ১৯৯৪ সালে তিনি ঔপন্যাসিক হিসেবে নিজেকে আত্মপ্রকাশ করেন প্রথম উপন্যাস ‘ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইলের’ মধ্যে দিয়ে। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয় ‘সব কিছু ভেঙ্গে পড়ে’। আর এই বইয়ের জন্য তিনি বাংলা একাডেমীর পুরস্কার পেয়েছেন। 

২০০২ সালে ‘১০০০০ এবং আরও একটি ধর্ষণ’, ২০০৩ সালে ‘একটি খুনের স্বপ্ন’ এবং ২০০৪ সালে প্রকাশিত ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ এর মতো একটি অসাধারণ নতুন মাত্রার উপন্যাস। 

প্রবন্ধ 

বাংলাদেশে যখন মৌলবাদ বিস্তারলাভ করতে থাকে, বিশেষ করে ২০০১ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত- তখন ২০০৪ এ প্রকাশিত হয় হুমায়ুন আজাদের ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ বইটি। বইটি প্রকাশিত হলে মৌলবাদীরা ক্ষেপে ওঠে, তারা মসজিদে মসজিদে হুমায়ুন আজাদের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। বইটিতে তিনি মৌলবাদীদের, ফ্যাসিবাদীদের চিত্রের শৈল্পিক রূপ দেন, মুখোশ খুলে ফেলেন ফ্যাসিবাদী জামাতের। আর তারই জের ধরে ২০০৪ সালে হুমায়ুন আজাদের উপর সন্ত্রাসী হামলা হয়, যার দায়িত্ব পরবর্তীতে জমিয়াতুল মুজাহেদীনের জঙ্গি সন্ত্রাসবাদীরা স্বীকার করে।

১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয় প্রবন্ধের বই ‘নারী’। আর এই বইয়ের প্রকাশের পর তিনি মৌলবাদীদের তীব্র রোষানলে পড়েন। মৌলবাদীদের ঘৃণ্য চেষ্টার প্রভাবে ১৯৯৫ সালে নারী বইটি নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয় বাংলাদেশ সরকার। দীর্ঘ চার বছর পর ২০০০ সালে বইটি আবার আলোর মুখ দেখে। 

রাজনৈতিক বিশ্বাস ও দর্শন

ড. হুমায়ুন আজাদ ছিলেন স্বঘোষিত নাস্তিক। তিনি আস্তাকুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন সমস্ত প্রথাকে। নিজে হয়ে উঠেছিলেন প্রথাবিরোধী। তার সব বই, প্রবন্ধ, কবিতা সৃষ্টি হয়েছে প্রথাকে অস্বীকার করে। তার প্রবচনগুচ্ছ এদেশের পাঠক সমাজকে করে তুলেছে সচেতন, অপরদিকে ভণ্ডদের করে তুলেছে ক্রুদ্ধ। আর এ কারণেই তিনি হয়ে ওঠেছিলেন এদেশের কান্ট। হুমায়ুন আজাদের লেখালেখির পুরোটাই ছিল বিজ্ঞানমনস্ক ও যুক্তিবাদী। তিনি নিজেই ছিলেন তার চিন্তা-চেতনা ও বিশ্বাসের মুখপত্র। 

তবে তিনি তার রাজনৈতিক আদর্শকে কখনো ঢেকে রাখেননি। তার বিশ্বাস ছিল বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি এবং তিনি তা অনেকবারই উল্লেখ করেছেন। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিকেই তিনি মুক্ত মানবের মুক্ত সমাজ গড়ার পক্ষে অনুকূল বলে মনে করতেন।

হুমায়ুন আজাদ বাংলাদেশের এমন একজন সাহিত্যিক যিনি তার লেখায় শ্রদ্ধা-আবেগ-প্রথার চেয়ে যুক্তিকেই মূল্য দিয়েছেন। এজন্যই বোধকরি যুক্তিহীন আক্রোশের শিকার হওয়ার পর বড় অভিমানে প্রিয় স্বদেশ থেকে বহুদূরে একাকী মৃত্যুকে তিনি বরণ করে নিয়েছিলেন। 

বহুমাত্রিক লেখক হুমায়ুন আজাদ আজ থেকে নয় বছর আগে ২০০৪ সালের ১১ আগস্ট জার্মানির মিউনিখ শহরে রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে ওই বছর ২৭ ফেব্রয়ারি হুমায়ুন আজাদ একুশে বই মেলায় উগ্র মৌলবাদীদের সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন। সেই ভয়াবহ পাশবিক হামলার ক্ষত জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাকে বহন করে যেতে হয়েছে।

হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর পর জার্মান সরকারের তত্ত্বাবধানে মিউনিখে তার এপার্টমেন্টে পাওয়া সব জিনিসপত্র ঢাকায় তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। ওই জিনিসপত্রের ভেতরেই পাওয়া যায় তার হাতের লেখা তিনটি চিঠি। চিঠি তিনটি আলাদা তিনটি পোস্ট কার্ডে লিখেছেন বড় মেয়ে মৌলিকে, ছোট মেয়ে স্মিতাকে ও একমাত্র ছেলে অনন্য আজাদকে। 

অনুমান করা হয়, ওই লেখার অক্ষরগুলোই ছিল তার জীবনের শেষ লেখা। তার মরদেহ কফিনে করে জার্মানি থেকে ঢাকায় আনা হয়। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাযার শেষে তার মরদেহ জন্মস্থান রাড়িখালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেই সমাহিত করা হয়।

প্রকাশিত গ্রন্থাবলী 

কবিতা: অলৌকিক ইস্টিমার (১৯৭৩), জ্বলো চিতাবাঘ (১৯৮০), সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে (১৯৮৫), যতোই গভীরে যাই মধু যতোই উপরে যাই নীল (১৯৮৭), আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে (১৯৯০), হুমায়ুন আজাদের শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৯৩), আধুনিক বাংলা কবিতা (১৯৯৪), কাফনে মোড়া অশ্রু বিন্দু (১৯৯৮), কাব্য সংগ্রহ (১৯৯৮), পেরোনোর কিছু নেই (২০০৪)।

কথাসাহিত্য: ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল (১৯৯৪), সব কিছু ভেঙে পড়ে (১৯৯৫), মানুষ হিসেবে আমার অপরাধসমূহ (১৯৯৬), যাদুকরের মৃত্যু (১৯৯৬), শুভব্রত, তার সম্পর্কিত সুসমাচার (১৯৯৭), রাজনীতিবিদগণ (১৯৯৮), কবি অথবা দণ্ডিত অপুরুষ (১৯৯৯), নিজের সঙ্গে নিজের জীবনের মধু (২০০০), ফালি ফালি ক'রে কাটা চাঁদ (২০০১), শ্রাবণের বৃষ্টিতে রক্তজবা (২০০২), ১০,০০০ এবং আরো একটি ধর্ষণ (২০০৩), একটি খুনের স্বপ্ন (২০০৪), পাক সার জমিন সাদ বাদ (২০০৪)।

কিশোরসাহিত্য: লাল নীল দীপাবলি বা বাঙলা সাহিত্যের জীবনী (১৯৭৬), ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না (১৯৮৫), কতো নদী সরোবর বা বাঙলা ভাষার জীবনী (১৯৮৭), আব্বুকে মনে পড়ে (১৯৮৯), বুকপকেটে জোনাকিপোকা (১৯৯৩), আমাদের শহরে একদল দেবদূত (১৯৯৬), অন্ধকারে গন্ধরাজ (২০০৩), Our Beautiful Bangladesh (২০০৪)।

সমালোচনা: শিল্পকলার বিমানবিকীকরণ ও অন্যান্য প্রবন্ধ (১৯৮৮), ভাষা-আন্দোলন: সাহিত্যিক পটভূমি (১৯৯০), নারী (১৯৯২), প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে (১৯৯২), নিবিড় নীলিমা (১৯৯২), মাতাল তরুণী (১৯৯২), নরকে অনন্ত ঋতু (১৯৯২), জলপাই রঙের অন্ধকার (১৯৯২), রবীন্দ্র প্রবন্ধ/রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তা (১৯৯৩), শামসুর রাহমান/নিঃসঙ্গ শেরপা (১৯৯৩), সীমাবদ্ধতার সূত্র (১৯৯৩), আধার ও আধেয় (১৯৯৩), আমার অবিশ্বাস (১৯৯৭), পার্বত্য চট্টগ্রাম : সবুজ পাহাড়ের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হিংসার ঝরনাধারা (১৯৯৭), মহাবিশ্ব (২০০০), দ্বিতীয় লিঙ্গ (মূল: সিমোন দ্য বোভোয়ার) (২০০১), আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম (২০০৩), ধর্মানভূতির উপকথা ও অন্যান্য (২০০৪)।

ভাষাবিজ্ঞান: Pronominalization in Bengali (১৯৮৩), বাঙলা ভাষার শত্রুমিত্র (১৯৮৩), বাক্যতত্ত্ব (১৯৮৪), বাঙলা ভাষা (প্রথম খন্ড) (১৯৮৪), বাঙলা ভাষা (দ্বিতীয় খন্ড) (১৯৮৫), তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান (১৯৮৮), অর্থবিজ্ঞান (১৯৯৯)।

অন্যান্য: হুমায়ুন আজাদের প্রবচনগুচ্ছ (১৯৯২), সাক্ষাৎকার (১৯৯৪), আততায়ীদের সঙ্গে কথোপকথন (১৯৯৫), বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময় (১৯৯৭), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রধান কবিতা (১৯৯৭)। 

পুরস্কার ও স্বীকৃতি: একুশে পদক (২০১২)

হুমায়ুন আজাদ প্রসঙ্গ এলেই যে কথাটি বলা হয় তা হলো- ‘প্রথাবিরোধী হুমায়ুন আজাদ’। সত্যিকার অর্থেই তিনি কোনো একটা বিশ্বাসে আবদ্ধ হতে চাননি। তবে কোনো বিষয়ে তিনি যদি দ্বিমত পোষণ করতেন তাহলে সেটা অবশ্যই যুক্তি দিয়ে করতেন। কোনো একটা ‘মিথে’ তিনি গণ্ডিবদ্ধ থাকতে চাননি কখনো। তিনি যদি কোনো বিশ্বাসে বিশ্বাসী না হতেন তবে সেটা ভাঙতে চাইতেন প্রচণ্ডভাবে। 

আজাদ প্রসঙ্গে ‘প্রথাবিরোধী’ কথাটা প্রচলিত হওয়ার একটা উৎস ছিল তার বইয়ের ফ্ল্যাপ। ফ্ল্যাপের গদ্যভঙ্গি নির্ভুলভাবে সাক্ষ্য দেয়, কথাগুলো তার নিজেরই লেখা। পরে নির্বাচিত প্রবন্ধ [আগামী, ১৯৯৯] বইয়ের ভূমিকায় তিনি বহুবার বলা কথাগুলো আরেকবার বলেন: ‘আমি প্রথাগত থাকিনি কোনো এলাকায়; বাঙালি প্রথায় সুখ ও স্বস্তি পায়, আমি পাইনি। আমার সব ধরণের লেখায় এবং প্রবন্ধে, তার পরিচয় রয়েছে। ...আমার লেখা নিয়ে নানা বিতর্ক বাধে, নিষিদ্ধও হয়; এগুলো সুখকর নয় প্রথার কাছে।’ এ ব্যাপারে সাধারণভাবে অন্যদের সম্মতি ছিল; অসম্মতিরও অভাব ছিল না।

কিন্তু কেউ কোথাও পর্যালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে ‘প্রথাবিরোধী’ কথাটার সুলুকসন্ধান করেনি। কথাটা কি সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছিল, নাকি আজাদের ক্ষেত্রে এর কোনো বিশেষ সংজ্ঞা তৈরি হয়েছে, তা কেউ বিচড়ে দেখেনি। দেখার দরকার ছিল। ‘প্রথা’ কথাটাকে যে অর্থেই দেখা হোক না কেন, তার যোগ অতীত আর বর্তমানের সাথে। সেদিক থেকে ‘প্রথাবিরোধিতা’ কথাটার যোগ হবে বর্তমান আর ভবিষ্যতের সাথে। যেকোনো ‘প্রথাবিরোধিতা’ আসলে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ‘প্রথা’ মাত্র। সমাজপ্রগতির ধারাক্রমের সাথে এর যোগ। ফলে ব্যাপারটাকে, যদি সত্যিই এ নামায়নের কোনোরকম তাৎপর্য থেকে থাকে, ব্যক্তি হুমায়ুন আজাদের মধ্যে সীমিত করে রাখার সুযোগ নাই। বৃহত্তর সমাজ বা অন্তত শ্রেণি-বিশেষের পর্যালোচনার অংশ হিসাবেই তা পাঠ্য।

কিন্তু এ ধরনের পাঠের কোনো ইশারা এখন পর্যন্ত খুব একটা দেখা যায়নি। আসলে আজাদের বইগুলোর প্রাথমিক ধরণের রিভিউই হয়নি। তার জীবদ্দশায় রিভিউ না হওয়ার একটা ছোট্ট কারণ ছিল। কেউ পারতপক্ষে তার বিরাগভাজন হতে চাইতেন না। কারণ তার জিহ্বা আর কলমে যথেষ্ট ধার ছিল, আর ধারটা ছিল নির্মম। কিন্তু তিনি তো প্রভাবশালী লেখক ছিলেন। তার লেখা যতই স্বতন্ত্রস্বরের হোক না কেন, তিনি তো স্বয়ম্ভু নন।

হুমায়ুন আজাদ ছিলেন একাধারে ভাষাবিজ্ঞানী, কবি, ঔপন্যাসিক, কিশোর সাহিত্যিক, রাজনৈতিক ভাষ্যকার, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। অর্থাৎ সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে তার সুদীপ্ত পদচারণা। এজন্যেই তিনি বহুমাত্রিক লেখক হিসাবে পরিচিত। সব ধরণের লেখাই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ফলে তিনি সব ধরনের লেখাতেই পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন। তিনি একাধারে সৃষ্টিশীল ও মননশীল লেখক। তার সৃষ্টিশীল লেখার মধ্যে মননশীলতা রয়েছে আবার মননশীল লেখার মধ্যে সৃষ্টিশীলতা রয়েছে। তার সাহিত্য, ভাষা, সমাজ, রাষ্ট্র বিশ্লেষণ যেমন পাঠক দ্বারা প্রশংসিত হয়েছে আবার কবিতা ও উপন্যাস লিখেও তিনি কৃতিত্ব দেখিয়েছেন।

মজার ব্যাপার কি জানেন? তিনি বাংলার অধ্যাপক হলেও পিএইচডি করেছিলেন কিন্তু ইংরেজিতে। তার প্রতিটি বইয়ের নাম চমৎকার বাংলায় লেখা।

দীর্ঘ ১৬ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও বিচারের মুখোমুখি হয়নি বিজ্ঞানমনস্কতা-ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের পক্ষে লেখা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদের খুনিরা। এটি রাষ্ট্রের জন্য সত্যিই লজ্জার, হতাশার। একটি রাষ্ট্রের অনেক শক্তিশালী দফতর থাকলেও আজও হুমায়ুন আজাদের খুনিদের ধরতে পারেনি। আবার ধরলেও শক্তহাতের অভাবে পালিয়ে যায় খুনি চক্রের সদস্য! এই যে রাষ্ট্রযন্ত্রের হাত থেকে ২০১৪ সালে ২৩ ফেব্রুয়ারি খুনি চক্রের সদস্য মিনহাজ ও সালেহীনকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় তাদের অনুসারীরা। তার জবাব কি রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্তাব্যক্তিরা দিয়েছিলেন? 

একটি অমানবিক অসংস্কৃত সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় একজন সংবেদনশীল মানুষ কীভাবে সমাজের সকল রক্তচক্ষু ও লোভলালসাকে পরাজিত করে নিজের লক্ষ্যে স্থির থাকতে পারে হুমাযুন আজাদের জীবন ও কর্ম তার উদাহরণ। শাসক গোষ্ঠীর আক্রমণ, মৌলবাদীদের হিংস্রতা কোনো কিছুই তার অবস্থান থেকে তাকে লক্ষ্যচ্যুত করতে পারেনি। সব আক্রমণকে তিনি যুক্তির শৃঙ্খলা আর শাণিত ভাষা দিয়ে প্রতিহত করেছেন। নগর-সভ্যতার মেকিত্বকে ছুঁড়ে ফেলে থাকতে চেয়েছেন লোভলালসা আর রক্তচক্ষু থেকে দূরে নিবিড় সরলতায়। তাই তার সাহিত্যে শৈশবের গ্রাম এসেছে বারবার। জন্মভূমি বিক্রমপুরের রাড়িখালের প্রতি তার আকর্ষণ ছিল আমৃত্যু। শৈশবের সেই রাড়িখাল, স্যার জে সি বোস হাই স্কুল, আড়িয়ল বিলের বর্ণনা তার বিশাল সাহিত্য জুড়ে রয়েছে। ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না-তে আবেগ ভারাতুর ভাষায় এর বর্ণনা পাওয়া যায়। বইটি লিখেছেন তার বড় মেয়ে মৌলিকে সম্বোধন করে। যাতে প্রিয় গ্রাম রাঢ়িখাল আর প্রকৃতির সেই রূপের প্রকাশ লক্ষ করা যায়:

মৌলি, তোমাকে বলি, তোমার মতোই আমি এক সময় ছিলাম ছোটো। ছিলাম গ্রামে, গাঁয়ে, যেখানে মেঘ নামে সবুজ হয়ে নীল হয়ে লম্বা হয়ে বাঁকা হয়ে। শাপলা ফোটে; আর রাতে চাঁদ ওঠে শাদা বেলুনের মতো। ওড়ে খেজুর ডালের অনেক ওপরে। যেখানে এপাশে পুকুর ওপাশে ঘরবাড়ি। একটু দূরে মাঠে ধান সবুজ ঘাস কুমড়োর হলদে ফুল। একদিন আমি কুমড়োর ফুল ভুলে লাউয়ের ডগার হাতছানি অবহেলা করে চাঁদের দিকে পিঠ ফিরিয়ে চলে আসি শহরে ঢাকায়...।

হুমায়ুন আজাদের মতো লেখককে শুধু স্মরণ নয়, অনুসরণ করতে হবে। সংক্ষিপ্ত জীবনে যে কথা তিনি লিখে গেছেন আজও তা প্রাসঙ্গিক হয়ে আছে। এভাবে আপন সৃষ্টির মাঝেই বেঁচে থাকবেন তিনি। বেঁচে আছেন তার প্রবন্ধ, কবিতা ও উপন্যাসে। অত্যন্ত স্পষ্টভাষী এই লেখক সত্য কথা বলতে কখনো পিছপা হতেন না; সেটা যতই অপ্রিয় হোক। আজকের উগ্রপন্থার এই সঙ্কটের কথা তিনি বলে গেছেন অনেক আগেই। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন বলেই সময়ের আগেই অনুধাবন করেছিলেন এই সঙ্কটকে। সংবেদনশীল এই মানুষটি ছিলেন অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন।

হুমায়ুন আজাদ ফিরে গেছেন তার প্রিয় রাড়িখাল গ্রামে। নিজের গ্রামকে নিয়ে যিনি লিখেছেন রাড়িখাল: ঘুমের ভেতরে নিবিড় শ্রাবণধারা, সেখানেই ঘুমিয়ে আছেন তিনি।। সমাজের অসুস্থতা আর বিকলাঙ্গতাকে তীব্র ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ আর পরিহাসের মাধ্যমে আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করে তিনি বেঁচে আছেন একটি মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সমস্ত সংগ্রাম আর নির্মাণে। নৈঃসঙ্গ্যে লালিত হুমায়ুন আজাদ তার নৈঃসঙ্গ্যকে ঘুচিয়ে এদেশের সংবেদনশীল, সৃজনশীল, সৌন্দর্যপিয়াসী, সাহিত্যানুরাগী আর লড়াকু মানুষের প্রেরণা হয়ে বেঁচে থাকবেন সমাজ ও কালের প্রয়োজনে।

তার কবিতা দিয়ে তাঁর প্রতি আমার আনত শ্রদ্ধা জানিয়ে আজ শেষ করছি- ভালো থেকেন কবি

ভালো থেকো ফুল, মিষ্টি বকুল, ভালো থেকো।

ভালো থেকো ধান, ভাটিয়ালি গান, ভালো থেকো।

ভালো থেকো মেঘ, মিটিমিটি তারা।

ভালো থেকো পাখি, সবুজ পাতারা।

ভালো থেকো।

ভালো থেকো চর, ছোট কুড়ে ঘর, ভালো থেকো।

ভালো থেকো চিল, আকাশের নীল, ভালো থেকো।

ভালো থেকো পাতা, নিশির শিশির।

ভালো থেকো জল, নদীটির তীর।

ভালো থেকো গাছ, পুকুরের মাছ, ভালো থেকো।

ভালো থেকো কাক, কুহুকের ডাক, ভালো থেকো।

ভালো থেকো মাঠ, রাখালের বাশিঁ।

ভালো থেকো লাউ, কুমড়োর হাসি।

ভালো থেকো আম, ছায়া ঢাকা গ্রাম, ভালো থেকো।

ভালো থেকো ঘাস, ভোরের বাতাস, ভালো থেকো।

ভালো থেকো রোদ, মাঘের কোকিল,

ভালো থেকো বক, আড়িয়ল বিল,

ভালো থেকো নাও, মধুমতি গাও,ভালো থেকো।

ভালো থেকো মেলা, লাল ছেলেবেলা, ভালো থেকো।

ভালো থেকো, ভালো থেকো, ভালো থেকো।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh