বাংলা শিশু সাহিত্যে দিলুর গল্পকার

বাংলা শিশু সাহিত্যের ‘দিলুর গল্পকার’, সাংবাদিক রাহাত খান দিলুকে নিয়ে একটি গল্প গ্রন্থ রচনার পর নতুন করে আর কোনো দিলুর গল্প লেখেননি। একটা সময়ে কেবল এটুকুই জানা ছিলো- দিলুর গল্পকার রাহাত খান। পরে যখন মাধ্যমিক স্তরের পড়া শেষ করি তখন জানতে পারি- রাহাত খান কেবলমাত্র ‘দিলুর গল্প’ লিখে ক্ষান্ত হননি, তিনি লিখেছেন চমৎকার সব উপন্যাস আর সংবাদপত্রের চাকরিসূত্রে লিখেছেন অজস্র কলাম এবং প্রবন্ধও।

গত ২৮ আগস্ট বাংলার এ সুসাহিত্যিক- ছায়াঘন এ মাটি-মানুষের মায়া ত্যাগ করে পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে। রাহাত খান ১৯৪০ সালের ১৯ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার পূর্ব জাওয়ার গ্রামের খান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। শিক্ষাজীবন শেষ করে ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজে শিক্ষকতার মাধ্যমে পেশাজীবন শুরু করেন। এরপর জগন্নাথ কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার পেশায় নিযুক্ত ছিলেন।

১৯৬৯ সালে তিনি যুক্ত হন সাংবাদিকতায়, তখনকার দিনের গুরুত্বপূর্ণ দৈনিক পত্রিকা ‘সংবাদ’-এর মাধ্যমে। এরপর তিনি দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় যোগ দেন। এক সময়ে এই পত্রিকায় তিনি সম্পাদকও হন। এভাবে তিনি সংবাদপত্রে যুক্ত ছিলেন। জনপ্রিয় কিশোর থ্রিলার সিরিজ মাসুদ রানার রাহাত খান চরিত্রটি তৈরি হয় তাকে অনুসরণ করে।

রাহাত খান সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবে যতটা জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন, তারও শতগুণ বেশি জনপ্রিয় ছিলেন কথাকার এবং শিশুসাহিত্যিক হিসেবে। বাংলা শিশুসাহিত্যে তাঁর লেখা ‘দিলুর গল্প’-এর মতো এমন মৌলিক চমৎকার রচনা আর দ্বিতীয়টি নেই। ওপার বাংলায় নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় আর এপারে রাহাত খান যেন এক সুতোয় গাঁথা। কী সাবলীল সে বয়ান- যেন আমরা হাঁটতে থাকি দিলুর সঙ্গে। দিলুর গল্পের ভেতর দিয়ে আমাদের চিরায়ত একটি পাড়ার গল্প উঠে আসে, যা আমরা ভুলতে পারি না কখনো।

রাহাত খান বাংলা ছোটগল্প ও উপন্যাস সাহিত্যে বিশিষ্ট একটি নাম। তিনি ছোটগল্প ও উপন্যাসের বিষয়-বিন্যাসে অভিনবত্ব এনেছেন, নতুনভাবে দেখেছেন তিনি সাহিত্যের এ দিকগুলোকে। সৃজনশীল রচনায় তিনি ভাষা প্রয়োগে ছিলেন নিপুণ কারিগর। কেউ কেউ তাকে শুধু নগরজীবনের কথাকার বলেন। অথচ তার অপূর্ব সব সৃষ্টিকর্ম পাঠ করলে অনুধাবন করা যায়- সাহিত্যে মাটি ও মানুষের কথা বলতে গিয়ে গ্রামীণ জীবনের অনুপম চিত্র দরদ দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। তিনি প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ ছিলেন। তিনি ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী ছিলেন। সারল্যে ভরা জীবনে তিনি জটিলতার ছাপ পড়তে দেননি কখনো। কখনো তিনি আপোষকামি হননি তার ব্যক্তিজীবনে। এইসব প্রসঙ্গ তার লেখার মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে- এ কারণেই রাহাত খানের সাহিত্যকর্ম সমাদরে আসীন।

দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে রাহাত খান ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন। তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘অনিশ্চিত লোকালয়’ প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে। এ ছাড়া তার উপন্যাস ও গল্পগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- অমল ধবল চাকরি, ছায়াদম্পতি, শহর, হে শূন্যতা, হে অনন্তের পাখি, মধ্য মাঠের খেলোয়াড়, এক প্রিয়দর্শিনী, মন্ত্রিসভার পতন, দুই নারী, কোলাহল।

নন্দিত এই কথাকার-সাংবাদিক তার সুন্দর সাহিত্যকীর্তির জন্য পেয়েছেন- একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, সুফী মোতাহার হোসেন পুরস্কারসহ নানান স্বীকৃতি।

সারল্য আর আড্ডাপ্রিয় বাংলা কথাসাহিত্যের অনন্য এই মনস্বী জীবনশিল্পীর কীর্তি কেবল বেঁচে রবে আমাদের মাঝে। যেখানে হেঁটে বেড়াবে শৈশবে সেই প্রিয় দিলু আর দিলুর গল্পরা।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh