প্রসঙ্গ : সৈয়দ আলী আহসানের কবিতা

দীপ্তি ত্রিপাঠী তার অভিসন্দর্ভে রবীন্দ্রোত্তর আধুনিকতার অবতার হিসেবে পাঁচজন কবির নাম উল্লেখ করেছেন, বাংলা কবিতার ইতিহাসে যারা পঞ্চপাণ্ডব বলে খ্যাত। একই সন্দর্ভে প্রেমেন্দ্র মিত্র কেন আধুনিক কবি নন, তারও কারণ দর্শানো হয়েছে। আধুনিক কবিতার স্থপতির তালিকা থেকে বাদ পড়ার কারণ কি আসলেই প্রেমেন্দ্রের অনাধুনিকতা নাকি তার প্রতি এই তালিকা কর্তৃপক্ষের ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, তা নিয়ে মতবিরোধ আছে অনেকেরই।
তারপরও কথা থাকে;
বৃষ্টি হয়ে গেলে পর
ভিজে ঠাণ্ডা বাতাসের মাটি-
মাখা গন্ধের মতন
আবছায়া মেঘ মেঘ কথা;
কে জানে তা কথা কিংবা
কেঁপে ওঠা রঙিন স্তব্ধতা। (কথা- প্রেমেন্দ্র মিত্র)
যাহোক, পরবর্তী সময়ে পঞ্চপাণ্ডবের অন্যতম- বুদ্ধদেব বসুর আধুনিক বাংলা কবিতা সংকলন আধুনিক কবিতার একটি দলিল হয়ে উঠল। বুদ্ধদেব বসু এই বইয়ের ভূমিকায় বলেছেন- ‘ছোট নৌকায় ইচ্ছেমতো যাত্রী তুলতে পারিনি।’ অনেকে বলে থাকেন আক্ষরিক অর্থেই তা ঘটেছে, এই সংকলন থেকে বাদ পড়েছেন অনেক সম্ভাবনাময় কবি। এই বাদ পড়ার কারণ কেবল বইয়ের ধারণক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নাকি ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপড়েন, তা নিয়েও আছে মতবিভেদ। তবে ব্যক্তিগত মতবিরোধের কারণে ‘বাদ দেবার’ মনোবৃত্তি বুদ্ধদেব বসুর পরেই বন্ধ হয়ে যায়নি। পরবর্তী সময়ে হুমায়ুন আজাদও মতবিরোধজনিত কারণে তার আধুনিক বাঙলা কবিতা সংকলন থেকে বাদ দিয়েছেন সৈয়দ আলী আহসান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, আল মাহমুদ, ফজল শাহাবুদ্দিন ও আব্দুল মান্নান সৈয়দের কবিতা, যা তিনি বইয়ের ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন।
আধুনিকতার অংশীদারিত্ব নিয়ে দম্ভ অথবা হীনম্মন্যতার যুগ আজকাল শেষ হলেও, আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসের পাঠগত এই গ্রন্থি মোচন হতে হয়তো আরো সময় লাগবে; কিন্তু ‘সেই উৎকৃষ্ট কবিতা’, ‘যা প্রথমবার পড়েই বিদ্যুৎ চমকের মতো ভালো লেগে যায়’ (সুবোধ সরকার), তার আবেদন পাঠক এড়াবে কী করে! সৈয়দ আলী আহসান এরকমই কতিপয় কবিতার কবি। তার কিংবদন্তি কবিতা ‘আমার পূর্ব-বাংলা’। ‘আমার পূর্ব-বাংলা’ তিনটি আলাদা পর্বে লিখিত একটি কবিতা, যা একসঙ্গে নৈসর্গিক বাংলাদেশের একটি অখণ্ড চিত্র ধরে আছে তার সারা অবয়বে। দেশ সম্পর্কে কবির আজীবনের ধারণা, দেশের প্রকৃতি ও মানুষকে দেখার অভিজ্ঞতা, মানুষের ঐতিহ্য লালিত মনোভঙ্গি এই কবিতায় যেন এক সচ্ছল প্রবাহে উৎসারিত; সেইসঙ্গে মিলিত হয়েছে তার আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজাত শিল্পচেতনা।
কাকের চোখের মতো কালোচুল
এলিয়ে
পানিতে পা ডুবিয়ে- রাঙা-উৎপল
যা’র উপমা
হৃদয় ছুঁয়ে-যাওয়া সিক্ত নীলাম্বরীতে
দেহ ঘিরে
যে দেহের উপমা স্নিগ্ধ তমাল-
তুমি আমার পূর্ব-বাংলা
পুলকিত সচ্ছলতায় প্রগাঢ় নিকুঞ্জ। (আমার পূর্ব-বাংলা- একক সন্ধ্যায় বসন্ত)
সৈয়দ আলী আহসানের কবিসত্তায় অনেক ইতিবাচক বিষয় ছিলো যা তাকে একজন গুরুত্বপূর্ণ কবির মর্যাদা দিতে পারে। যদিও প্রথম জীবনে তিনি কবি ফররুখ আহমদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কবিতা-চর্চা আরম্ভ করেন; কিন্তু অচিরেই তিনি এতে তার অস্বস্তি বুঝতে পারেন এবং নিজস্ব দেখার ভঙ্গি এবং রসচেতনার বৈশিষ্ট্যে কবিতা লিখতে শুরু করেন। ফলে বাংলা কবিতায় যুক্ত হয় আরো কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কবিতা, যা পাঠকের আগ্রহ উৎপাদন করতে সমর্থ হয়।
রাত্রিতে হারিকেন জ্বালিয়ে তারা শুয়েছিল’
শোবার আগে হেসেছিল এবং প্রদীপের শিখা
বাতাসের গান স্মরণ করেছিল। কি করে
অন্ধকার হতে হয় রাত্রি তা জানতো এবং
বনভূমি জানতো কি করে রহস্যময় হতে হয়।
এবং ঘুমুতে যাবার আগে মানুষগুলো জানতো
কি করে গায়ে চাদর টেনে দিতে হয়। (উরির চর- সমুদ্রেই যাব)
ইংরেজি সাহিত্যের আধুনিক কবিতার আঙ্গিক ও প্রকরণ নিয়ে তার বিশেষ আগ্রহ ছিলো। ফলে কবিতায় তিনি ইংরেজি সাহিত্যের প্রচ্ছায়ায় আধুনিক শিল্পরীতি প্রয়োগ করতে পছন্দ করতেন। পাশাপাশি শব্দ, অলঙ্কার, উপমা-রূপক, চিত্রকল্প ব্যবহারে তার নিজস্ব রুচি, দৃষ্টিভঙ্গী ও বিবেচনা কাজ করেছে। কবিতায় আহরিত উপকরণসমূহ বিন্যাসের ক্ষেত্রে তিনি যে নৈপুণ্য প্রদর্শন করেছেন তা সহজেই পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
তোমার সুগন্ধ কেশ থেকে
সূর্যকণা ঝরে পড়তো।
কিন্তু কেন তুমি হঠাৎ ছায়া ফেললে? (৩৪-উচ্চারণ)
সৈয়দ আলী আহসান আধুনিক কবি কিনা সে বিতর্ক তাদের কাছে মুখরোচক- যারা আধুনিকতা বিষয়ক নানাবিধ হীনমন্যতায় ভোগেন, কিন্তু তিনি যে বেশকিছু কালজয়ী কবিতা লিখেছেন সেটি নিঃসন্দেহে তর্কাতীত। এসব কবিতা আধুনিকতার তথাকথিত মানদণ্ডে উত্তীর্ণ না হলেও মানুষের মধ্যে ‘উৎকৃষ্ট কবিতার’ মতো বিদ্যুৎ চমক সৃষ্টি করে যাবে আরো বহুকাল তা পাঠকমাত্রেই স্বীকার করবেন।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh